আওয়ামী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পর উপদেষ্টা আদিলুরের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হয়ে প্রভাব-বাণিজ্যের অভিযোগ, নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় ।
সরকারের যতগুলো প্রতিষ্ঠান-মন্ত্রণালয় দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে দুর্নীতির মহোৎসবে পরিণত হয়েছিলো তার মধ্যে অন্যতম গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়। হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির খবরের পাশাপাশি এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিদেশে টাকা পাচারের হাজারো অভিযোগ নিয়ে অসংখ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'।
সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমানের ভিত্তিতে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন একদিকে যেমন সমাজের নানা স্তরে দুর্নীতি-অনিয়মের নিত্যনতুন কৌশল উন্মোচিত করেছে ঠিক তেমনি অসংখ্য দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর রাতের ঘুমও হারাম করেছে। তবে, আজ চিরাচরিত পন্থার বিপরীতে ভিন্নধর্মী একটি প্রতিবেদন এফটি পরিবারের সম্মানিত পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।
গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের অসাধারণ সৌভাগ্যবান একজন কর্মকর্তা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ৫ আগষ্ট পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বিতর্কিত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানেরও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশের যে কোন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা গনঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের পরও গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকের 'ব্যক্তিগত কর্মকর্তা'র মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল পদে বহাল থাকার বিরল এক দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়।
গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে যখন সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা'র প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তখন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. সোহেল মিয়াকে ঘিরে উঠেছে নানা গুরুতর অভিযোগ। পদায়ন, বদলি, টেন্ডার, প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দ, জমি ও বাড়ি দখলসহ বিভিন্ন বিষয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইল উপদেষ্টার দপ্তরে উপস্থাপনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন সোহেল। বিনিময়ে বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তার অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন নিয়ে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক বছরের সরকারি চাকরির সময়ে তার পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে উঠেছে। এসব সম্পদের বড় অংশই বাবা, ভাই ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নামে করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
রিকশাচালক বাবার নামে ফ্ল্যাট-গাড়ি
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মিরপুর-১৬ নম্বর সেকশনের ১ হাজার ৩৫৮ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট সংরক্ষিত প্রতিমন্ত্রী কোটায় সোহেল মিয়ার বাবা মো. ফজলুল হকের নামে বরাদ্দ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফজলুল হক দীর্ঘদিন রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। এমন একজন ব্যক্তির নামে রাজধানীর মিরপুরে সংরক্ষিত কোটায় ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এরপর ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর ফজলুল হকের নামে ১ হাজার ৫০০ সিসির একটি জাপানি টয়োটা ব্র্যান্ডের সাদা প্রাইভেট কার কেনা হয়। গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ঢাকা মেট্রো ঘ-২৯-১৩৬৫।
সোহেলের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, এর বাইরে আরও একটি দামি গাড়ি রয়েছে তার।
চাকরির এক বছরের মধ্যেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
সোহেল মিয়া ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এর মাত্র এক বছরের মাথায়, ২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌরসভা থেকে ‘মেসার্স নেক্সাস এন্টারপ্রাইজ’ নামে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে নাম রয়েছে সোহেলের বাবা মো. ফজলুল হকের। প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্স নম্বর ০০৭৫১ এবং লাইসেন্স আইডি ০৫-০০৫-০০৭৫১। ফজলুল হকের টিআইএন নম্বর ৮৫২৮৫২৬২১৪৮৫ এবং প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর ০০২২৩৪৯০৪-০৪০৬।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর কালিহাতীর একটি বেসরকারি ব্যাংকে নেক্সাস এন্টারপ্রাইজের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। ওই হিসাবে ২০২০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৫২৪ টাকা ব্যালেন্স ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার!
বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও একটি প্রশ্ন। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ২০২১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নেক্সাস এন্টারপ্রাইজকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
কালিহাতীতে জমি, মার্কেট ও বিলাসবহুল বাড়ি
সোহেল মিয়ার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌর এলাকায়। স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে এফটি টীম তার পরিবারের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য পেয়েছে।
হাসপাতাল রোডে সোনালী ব্যাংকের পাশে প্রায় ৬ শতাংশ জমি তার বাবার নামে কেনা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী প্রতি শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে একটি মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মার্কেট নির্মাণে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে এই ব্যয়ের পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কালিহাতীর ফকিরবাড়ি রোডের কাছে সোহেলের ছোট ভাই আনোয়ারের জন্য একটি ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
এর কাছেই রয়েছে একটি বিলাসবহুল বাড়ি। বাড়িটির নাম ‘ফজলুল হক ভিলা’। ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—হোল্ডিং-৩৮৫, রোড নম্বর-৫, সাতুটিয়া পূর্বপাড়া, কালিহাতী, টাঙ্গাইল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, চাকরিতে যোগদানের পরপরই সোহেল মিয়ার পরিবারের আর্থিক অবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন জায়গায় জমি কেনার পাশাপাশি বাবা, ভাই, শ্বশুর, সম্বন্ধী ও স্ত্রীর নামে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
ভুয়া সনদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ
সোহেল মিয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি কালিহাতী আরএস পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে এসএসসি, ২০০৬ সালে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করেন।
এরপর ২০১৬ সালের জানুয়ারি-জুন সেশনে টাঙ্গাইলের একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে ছয় মাস মেয়াদি কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন কোর্স এবং একই সময়ে বগুড়ার ইনস্টিটিউট অব আইসিটির অধীনে ছয় মাস মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মাল্টিল্যাংগুয়াল সেক্রেটারিয়াল সায়েন্স কোর্স সম্পন্ন করার সনদ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু অনুসন্ধানে এসআইটি ফাউন্ডেশনের অফিস রেজিস্টারে সোহেল মিয়ার নামে সংশ্লিষ্ট সনদের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। সনদে ব্যবহৃত স্বাক্ষরের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য সনদের স্বাক্ষরের মিল নেই বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এমনকি একই সময়ে টাঙ্গাইল ও বগুড়া—দুই জায়গায় ছয় মাস মেয়াদি কোর্স করার বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আরও অভিযোগ, টাঙ্গাইলের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ভর্তি রেজিস্টারেও তার নাম পাওয়া যায়নি; যদিও অনলাইনে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের ওয়েবসাইটে তার মার্কশিট দেখা গেছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।
এই কারণে প্রশ্ন উঠেছে—চাকরিতে নিয়োগের সময় সোহেল মিয়া যে সনদ ব্যবহার করেছিলেন, সেটি আদৌ বৈধ ও প্রকৃত কি না?
এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নথি পরীক্ষা করে বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন।
ছয় বছরে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, এরপর প্রভাবের বিস্তার?
সোহেল মিয়া ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন।
এরপর ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে তাকে প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে পদায়ন করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান।
এরপর থেকেই তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
টেন্ডার, বদলি, প্লট, ফ্ল্যাট—সবখানেই কি সোহেলের প্রভাব?
মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে উপদেষ্টার দপ্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে সোহেল মিয়া অবগত থাকতেন।
বিশেষ করে—গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন, রাজউকের প্লট ও ফ্ল্যাট সংক্রান্ত বিষয়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বড় অঙ্কের টেন্ডার, ঠিকাদারি কাজ, প্রকল্প অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট ফাইল নিয়ে তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব কাজে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুবিধা আদায়ের একটি চক্র তৈরি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
বেতনের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে কি?
সোহেল মিয়া যখন সরকারি চাকরিতে যোগ দেন, তখন তার পদ ছিল সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর। ওই পদের বেতন স্কেল ছিল ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার ৫৯০ টাকা।
প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চাকরির প্রথম কয়েক বছরে তার সরকারি বেতন ও সুযোগ-সুবিধার মোট পরিমাণ আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে হতে পারে।
অন্যদিকে, তার পরিবারের নামে মিরপুরের ফ্ল্যাট, গাড়ি, কালিহাতীতে জমি, মার্কেট, বাড়িসহ বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সরকারি চাকরির আয় দিয়ে এত অল্প সময়ে এসব সম্পদ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে কীভাবে?
সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের আয়-ব্যয়ের তথ্য যাচাই করলেই এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।
সম্পদের মালিক বাবা-ভাই, নিয়ন্ত্রণ কার?
অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো—সোহেল মিয়ার পরিবারের নামে থাকা সম্পদের একটি বড় অংশ তার বাবা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নামে রয়েছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রিকশা-ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা ফজলুল হকের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে বর্তমান সম্পদের পরিমাণের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার প্রশ্ন—“ফজলুল হক তো রিকশা চালাতেন। ছেলে চাকরি পাওয়ার পর এত সম্পদের মালিক কীভাবে হলেন?”
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন সম্পদের মালিকদের আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, জমির দলিল এবং অর্থের উৎস যাচাই।
অভিযোগের বিষয়ে সোহেলের বক্তব্য কী?
এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. সোহেল মিয়ার বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ফলে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বক্তব্য দিলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
প্রশাসন কি নীরব দর্শক?
একজন সরকারি কর্মচারী মাত্র কয়েক বছরের চাকরিতে কীভাবে তার পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুললো, তার অর্থের উৎস কী, সরকারি চাকরির পাশাপাশি পরিবারের নামে ঠিকাদারি ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হলো, নিয়োগের সময় ব্যবহৃত শিক্ষাগত সনদ কতটা বৈধ—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
একইসঙ্গে টেন্ডার, বদলি, পদায়ন, প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, রাজউক, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং শিক্ষা বোর্ডের সমন্বিত তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্য।
গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে যখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হলো, তখন একজন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা এতগুলো অভিযোগ দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—কার ছত্রছায়ায় সোহেলের এই উত্থান? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন—রিকশাচালকের ছেলে সোহেল মিয়ার বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস কী?
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা – দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, যখন দেশের প্রধান তিনটি বিরোধী দল—জাতীয় গণফ্রন্ট, উন্নয়ন পার্টি ও জননেতা পরিষদ—আজ এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ‘গণঐক্য জোট’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এই জোটের মুখ্য লক্ষ্য হলো আগাম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করা, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি এবং একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট আয়োজন নিশ্চিত করা। জাতীয় গণফ্রন্টের সভাপতি শহীদুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “দেশে এখন গণতন্ত্র নেই, জনগণের ভোটাধিকার নেই। তাই আমাদের এই ঐক্য—সত্যিকার অর্থে একটি গণআন্দোলনের সূচনা।” জোটের কর্মসূচি জোট নেতারা জানান, আগামী মাস থেকে সারা দেশে বিক্ষোভ, গণঅবস্থান, মানববন্ধন এবং জেলা পর্যায়ে গণসংলাপ কর্মসূচি শুরু হবে। তারা বলেছেন, এই জোট শুধুমাত্র সরকারবিরোধী নয়, বরং এটি একটি ভবিষ্যত রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবেও কাজ করবে। সরকারের প্রতিক্রিয়া সরকারি দলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে অঘোষিতভাবে কয়েকজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, “বিরোধীদের এই জোট জনভিত্তিহীন এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা।” বিশ্লেষকদের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব হাসান বলেন, “এই জোট নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে, যদি তারা মাঠে বাস্তব আন্দোলন ও বিকল্প নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে সরকার যেভাবে শক্ত হাতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখছে, তাতে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।” আগামী সপ্তাহে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জোটের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক মহল এই জোটকে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবেও দেখছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্পে বিধিবহির্ভূতভাবে আটটি প্যাকেজে ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল পরিশোধের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের অভিযানে অন্তত চারটি প্যাকেজের কাজের কোনো ভৌত অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কাজের অস্তিত্ব না থাকলেও বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষতিসাধনের সত্যতা মিলেছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ ও কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এমন তথ্য পেয়েছে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্প'–এর কাজের ক্ষেত্রে প্যাকেজ বিভাজনে অনিয়ম, ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি, কাজের অস্তিত্ব ছাড়া বিল পরিশোধ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে এনফোর্সমেন্ট টিম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে সংগৃহীত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিপিপি, আরডিপিপি কিংবা হেড অব প্রোকিউরমেন্টের অনুমোদন ছাড়াই একই খাতের কাজকে আটটি পৃথক প্যাকেজে বিভক্ত করে ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে এসব প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের অনুকূলে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দুদক জানায় ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য রেকর্ড ভবন নির্মাণ (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত মূল্য ২৭৯ কোটি ৫৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। প্রকল্পের মূলধন অংশের ‘অনাবাসিক ভবন’ খাতে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট প্রোকিউরমেন্ট কমিটি (সিসিজিপি) অনুমোদিত একমাত্র কাজ ছিল ডব্লিউ-১ প্যাকেজ। ডিপিপি ও আরডিপিপি অনুযায়ী, ওই একটি প্যাকেজের আওতায় কাজ করার অনুমোদন ছিল। এর কার্যাদেশ ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে (এনডিইএল) দেওয়া হয়। কার্যাদেশের মূল্য ছিল ১৫৫ কোটি ৭০ লাখ ৪ হাজার টাকা। কিন্তু ডিপিপি, আরডিপিপি কিংবা হেড অব প্রোকিউরমেন্টের অনুমোদন ছাড়াই একই খাতের কাজকে আরও আটটি পৃথক প্যাকেজে বিভক্ত করে ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে এসব প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের অনুকূলে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। দুদকের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, বিভাজিত আটটি প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পাশে নতুন বেকারি ও ক্যান্টিন নির্মাণ, রেকর্ড ভবনের তিনটি বেসমেন্ট ফ্লোর নির্মাণের জন্য অস্থায়ী ট্রিপল ওয়ার্ক স্থাপন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য ভেন্যু সংস্কার, ব্র্যান্ডিং ও ক্যাটারিং, গাইড ওয়াল-মাস্টার ড্রেন-র্যাম্প ও হাই-টেনশন কেবল লাইন অপসারণ, অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ, অস্থায়ী ড্রেন ও সিআই শিটের বেড়া নির্মাণ এবং বালু ভরাট, বৃষ্টির পানি অপসারণ ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ।
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চারজনের ফাঁসি দাবি করেছেন ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদারের স্ত্রী সুমা আক্তার। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চে জবানবন্দি শেষে তিনি এ বিচার চান। এ মামলায় ২০ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। জবানবন্দির একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুমা আক্তার বলেন, আমার দুটি মেয়ে রয়েছে। স্বামী হত্যাকাণ্ডের সময় তারা খুব ছোট ছিল। দেশে যেন এমন কোনো ঘটনা আর না ঘটে, সেজন্য নিজে ও সন্তানদের পক্ষে আমি বরিশাল-১ আসনের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) একেএম এহসান উল্লাহসহ গ্রেপ্তার যে দুই পুলিশ সদস্য আমার স্বামীকে ক্রসফায়ারে হত্যা হত্যা করেছে, তাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়ার প্রার্থনা করছি। এসব কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সাক্ষী। টিপু আগৈলঝাড়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার অপরজন হলেন একই উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা। এদিন সকালে এ মামলায় গ্রেপ্তার উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের উপস্থিতিতেই জবানবন্দি দেন টিপুর স্ত্রী। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। এর আগে, ২০ মে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২ প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, টিপু ও কবির ছিলেন আবুল হাসানাতের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এজন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করেন তিনি। এ কাজ বাস্তবায়ন করতে তৎকালীন এসপি একেএম এহসান উল্লাহকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর মিথ্যা মামলায় ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দুজনকে গ্রেপ্তার করে উজিরপুর থানা পুলিশ। এরপর মাহাবুল ও জসিমকে দিয়ে গৌরনদী-গোপালগঞ্জ হাইওয়ের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের পাশে টিপু ও কবিরকে ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়।
বদলি থেকে টেন্ডার, পদোন্নতি থেকে প্রকল্প—গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব সিদ্ধান্তেই প্রভাব বিস্তার করেন প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ তিন প্রকৌশলী। গণপূর্ত অধিদপ্তরের এ তিন কর্মকর্তার পরিচিতি ‘তিন পাণ্ডব’ নামে। তারা হলেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে সদ্য বদলিকৃত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, এ বলয়ের মাধ্যমেই বদলি-বাণিজ্য, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, টেন্ডার কমিশন আদায় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ গণপূর্তে আনতে প্রকৌশলীদের কাছ থেকে কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করা হয় এ তিন পাণ্ডবের নেতৃত্বে। অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত হওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বদরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই: তথ্য বলছে, মন্ত্রীদের সরকারি বাংলো দ্রুত মেরামতের কথা বলে টেন্ডার ছাড়াই পরিচিত ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে পরে অর্থ ভাগাভাগি, পছন্দের ঠিকাদারকে বড় প্রকল্প পাইয়ে দেওয়া এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারে সম্পৃক্ততা রয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের। প্রকল্পের অর্থছাড়ে অনিয়ম এবং সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কাজে অনিয়ম, সম্পদ অর্জন ও নারীঘটিত বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসে মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাকে বদলি করে রিজার্ভে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। জানা গেছে, সাভার সার্কেলে দায়িত্ব পালনের পর নিজের আস্থাভাজন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেজবুল কবিরকে গাজীপুরে দায়িত্ব দিয়ে তার মাধ্যমে ঠিকাদারদের সঙ্গে বিভিন্ন কাজের সমন্বয় এবং পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দিতেন বদরুল। সরকারি চাকরির পাশাপাশি ডেভেলপার ব্যবসা ও বিভিন্ন সম্পদের মালিকানা নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর উত্তর বাসাবো, উত্তরা ও বাড্ডায় সম্পত্তি এবং গাজীপুরে জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব সম্পদের কিছু তার ভাইবোনদের নামে থাকলেও নেপথ্যে রয়েছেন বদরুলই। গাজীপুরে তার দায়িত্বকালীন বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ৫ কোটি টাকার কৃষি বিপণন ভবন, ১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকার বিএসটিআই সিভিল, ২০ কোটি ২৪ লাখ টাকার মেট্রোপলিটন সদর থানা, ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার সদর উপজেলা মডেল মসজিদ, প্রায় ১০ কোটি টাকার কালিয়াকৈর থানা, ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকার পুবাইল থানা এবং প্রায় ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার কোনাবাড়ী থানা নির্মাণ প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বদরুলের বিরুদ্ধে। গাজীপুরের তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম নির্মাণে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর নির্দেশনা উপেক্ষা করে অন্য খাতের অর্থ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে বদরুলের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের ঠিকাদারকে প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। কাজ শেষ করতে আরও ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। মিরপুরের পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্প ও পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের ভাসানটেক থানার কাজেও কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ময়মনসিংহে ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগে তাকে ওএসডি করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও বেশি কাজ গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে করানোর জন্য তহবিল সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে বদরুলের বিরুদ্ধে। এর পাশাপাশি বদরুলের বিরুদ্ধে নারীঘটিত বিষয় ব্যবহার করে প্রকৌশলীদের ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলী। তাদের দাবি, পরিচিত নারীদের মাধ্যমে প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার পর বিভিন্নভাবে ফাঁদে ফেলা হতো এবং পরে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হতো। বিষয়টি জটিল হলে বদরুল সমাধানের উদ্যোগ নিতেন বলে অভিযোগ তাদের। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন কাজে অনিয়ম এবং নারীঘটিত বিষয় নিয়ে বিতর্কের কারণে সম্প্রতি তাকে ওএসডি করেছে মন্ত্রণালয়। খুলনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে এক নারী তাকে ফোন করে বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করেন। ওই নারীর সঙ্গে বদরুল আলমের পরিচয় রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। পরে বিষয়টি সমাধান করার জন্য বদরুল তাকে বলেছিলেন। আতিকুলের দাবি, এ ঘটনায় প্রথমে তাকে দায়িত্ব থেকে ক্লোজ করা হয় এবং প্রায় ছয় মাস পর খুলনায় বদলি করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খানকে একাধিকবার ফোন করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হয়। তবে তার সাড়া মেলেনি। বদলি বাণিজ্যের কলকাঠি নাড়েন সারোয়ার জাহান: প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের ঘনিষ্ঠ আরেকজন প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান। তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) হিসেবে কাজ করেন। তথ্য বলছে, সম্প্রতি বদলি বাণিজ্য ঠেকাতে মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে বদলি শুরু করেছে। তবে লটারির আগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সিভিলের ঢাকা জেলার বাক্সে ৪১ জনের নাম যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে সারোয়ারের বিরুদ্ধে। জানা যায়, গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকার সিকিউরিটি মানির পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়নের অভিযোগ ওঠে সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে। ঠিকাদারের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় বলে জানা গেছে। তবে পরে শাস্তির বদলে তিনি পদোন্নতি পেয়ে অধিদপ্তরের প্রভাবশালী সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পাওয়ার পর গত ৩ মার্চ এক দিনে ৫০ জনেরও বেশি প্রকৌশলীকে বদলি করার ঘটনায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বদলি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে এই আদেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ‘বদলি-বাণিজ্য’ হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ওই গণবদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। এর আগে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বেশ কয়েকজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। এ-সংক্রান্ত অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে গেলে মো. হাসানুজ্জামান, মো. খাইরুল ইসলাম ও মো. এরশাদুল হকের বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান বলেন, বদলির সব বিষয় মন্ত্রণালয় জানে। উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের লটারির বাক্সে আগে থেকেই নাম লিখে রাখার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব কিছু জানি না। মন্ত্রণালয় বদলি করেছে, তারাই সব জানে। প্রধান প্রকৌশলীর পরামর্শক আবু নাসের চৌধুরী: ঢাকা সার্কেল-২ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীও বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। অন্য প্রকৌশলীদের দাবি, নিজেদের অবস্থান সুসংহত রাখতে আবু নাসের চৌধুরী পরামর্শকের ভূমিকায় থাকেন। কাজের অগ্রগতির চেয়ে বেশি বিল প্রদান, অতিরিক্ত ব্যয়, পরিচিত ঠিকাদারকে কাজ দিতে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে খারাপ আচরণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সরকারি অর্থ অপচয়সহ নানা বিষয়ে তার সার্কেলের বিভিন্ন কাজে শতাধিক অডিট আপত্তি রয়েছে। ঢাকা সার্কেল-২ একটি গুরুত্বপূর্ণ এরিয়া। সচিবালয়, হাইকোর্ট ও আশপাশের সরকারি হাসপাতালের দায়িত্বে তিনি। এসব জায়গায় তিনি মেরামত থেকে শুরু করে সব কাজই পরিচিত ঠিকাদারকে দেওয়ার নির্দেশনা দেন নির্বাহী প্রকৌশলীদের। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে মেরামত কাজের বিল দ্বিগুণ করা হয় এবং উপবিভাগীয় ও সহকারী প্রকৌশলী মিলে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিতে কাজ করান। এসব অনিয়ম জেনেও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি আবু নাসের চৌধুরী। এ ছাড়া বগুড়ায় থাকতে টেন্ডার জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তর সার্কেল-২ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাছের চৌধুরী বলেন, স্যার আমাকে বগুড়া থেকে ঢাকা নিয়ে এসেছেন; কিন্তু কোনো সিন্ডিকেট-অনিয়মের সঙ্গে আমি জড়িত না। যা বলছেন সচিব: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, প্রধান প্রকৌশলীর সিন্ডিকেটের কথা ও তাদের বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ শুনছি। এ নিয়ে বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করায় তার মধ্যে একজনকে ওএসডি করা হয়েছে। প্রমাণ পেলে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।