বদলি থেকে টেন্ডার, পদোন্নতি থেকে প্রকল্প—গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব সিদ্ধান্তেই প্রভাব বিস্তার করেন প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ তিন প্রকৌশলী। গণপূর্ত অধিদপ্তরের এ তিন কর্মকর্তার পরিচিতি ‘তিন পাণ্ডব’ নামে। তারা হলেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে সদ্য বদলিকৃত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, এ বলয়ের মাধ্যমেই বদলি-বাণিজ্য, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, টেন্ডার কমিশন আদায় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ গণপূর্তে আনতে প্রকৌশলীদের কাছ থেকে কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করা হয় এ তিন পাণ্ডবের নেতৃত্বে। অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত হওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
বদরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই: তথ্য বলছে, মন্ত্রীদের সরকারি বাংলো দ্রুত মেরামতের কথা বলে টেন্ডার ছাড়াই পরিচিত ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে পরে অর্থ ভাগাভাগি, পছন্দের ঠিকাদারকে বড় প্রকল্প পাইয়ে দেওয়া এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারে সম্পৃক্ততা রয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের। প্রকল্পের অর্থছাড়ে অনিয়ম এবং সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কাজে অনিয়ম, সম্পদ অর্জন ও নারীঘটিত বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসে মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাকে বদলি করে রিজার্ভে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, সাভার সার্কেলে দায়িত্ব পালনের পর নিজের আস্থাভাজন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেজবুল কবিরকে গাজীপুরে দায়িত্ব দিয়ে তার মাধ্যমে ঠিকাদারদের সঙ্গে বিভিন্ন কাজের সমন্বয় এবং পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দিতেন বদরুল। সরকারি চাকরির পাশাপাশি ডেভেলপার ব্যবসা ও বিভিন্ন সম্পদের মালিকানা নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর উত্তর বাসাবো, উত্তরা ও বাড্ডায় সম্পত্তি এবং গাজীপুরে জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব সম্পদের কিছু তার ভাইবোনদের নামে থাকলেও নেপথ্যে রয়েছেন বদরুলই।
গাজীপুরে তার দায়িত্বকালীন বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ৫ কোটি টাকার কৃষি বিপণন ভবন, ১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকার বিএসটিআই সিভিল, ২০ কোটি ২৪ লাখ টাকার মেট্রোপলিটন সদর থানা, ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার সদর উপজেলা মডেল মসজিদ, প্রায় ১০ কোটি টাকার কালিয়াকৈর থানা, ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকার পুবাইল থানা এবং প্রায় ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার কোনাবাড়ী থানা নির্মাণ প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বদরুলের বিরুদ্ধে।
গাজীপুরের তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম নির্মাণে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর নির্দেশনা উপেক্ষা করে অন্য খাতের অর্থ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে বদরুলের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের ঠিকাদারকে প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। কাজ শেষ করতে আরও ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। মিরপুরের পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্প ও পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের ভাসানটেক থানার কাজেও কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ময়মনসিংহে ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগে তাকে ওএসডি করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও বেশি কাজ গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে করানোর জন্য তহবিল সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে বদরুলের বিরুদ্ধে।
এর পাশাপাশি বদরুলের বিরুদ্ধে নারীঘটিত বিষয় ব্যবহার করে প্রকৌশলীদের ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলী। তাদের দাবি, পরিচিত নারীদের মাধ্যমে প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার পর বিভিন্নভাবে ফাঁদে ফেলা হতো এবং পরে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হতো। বিষয়টি জটিল হলে বদরুল সমাধানের উদ্যোগ নিতেন বলে অভিযোগ তাদের। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন কাজে অনিয়ম এবং নারীঘটিত বিষয় নিয়ে বিতর্কের কারণে সম্প্রতি তাকে ওএসডি করেছে মন্ত্রণালয়।
খুলনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে এক নারী তাকে ফোন করে বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করেন। ওই নারীর সঙ্গে বদরুল আলমের পরিচয় রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। পরে বিষয়টি সমাধান করার জন্য বদরুল তাকে বলেছিলেন। আতিকুলের দাবি, এ ঘটনায় প্রথমে তাকে দায়িত্ব থেকে ক্লোজ করা হয় এবং প্রায় ছয় মাস পর খুলনায় বদলি করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খানকে একাধিকবার ফোন করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হয়। তবে তার সাড়া মেলেনি।
বদলি বাণিজ্যের কলকাঠি নাড়েন সারোয়ার জাহান: প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের ঘনিষ্ঠ আরেকজন প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান। তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) হিসেবে কাজ করেন। তথ্য বলছে, সম্প্রতি বদলি বাণিজ্য ঠেকাতে মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে বদলি শুরু করেছে। তবে লটারির আগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সিভিলের ঢাকা জেলার বাক্সে ৪১ জনের নাম যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে সারোয়ারের বিরুদ্ধে।
জানা যায়, গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকার সিকিউরিটি মানির পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়নের অভিযোগ ওঠে সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে। ঠিকাদারের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় বলে জানা গেছে। তবে পরে শাস্তির বদলে তিনি পদোন্নতি পেয়ে অধিদপ্তরের প্রভাবশালী সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পাওয়ার পর গত ৩ মার্চ এক দিনে ৫০ জনেরও বেশি প্রকৌশলীকে বদলি করার ঘটনায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বদলি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে এই আদেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ‘বদলি-বাণিজ্য’ হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ওই গণবদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। এর আগে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বেশ কয়েকজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। এ-সংক্রান্ত অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে গেলে মো. হাসানুজ্জামান, মো. খাইরুল ইসলাম ও মো. এরশাদুল হকের বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান বলেন, বদলির সব বিষয় মন্ত্রণালয় জানে। উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের লটারির বাক্সে আগে থেকেই নাম লিখে রাখার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব কিছু জানি না। মন্ত্রণালয় বদলি করেছে, তারাই সব জানে।
প্রধান প্রকৌশলীর পরামর্শক আবু নাসের চৌধুরী: ঢাকা সার্কেল-২ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীও বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। অন্য প্রকৌশলীদের দাবি, নিজেদের অবস্থান সুসংহত রাখতে আবু নাসের চৌধুরী পরামর্শকের ভূমিকায় থাকেন। কাজের অগ্রগতির চেয়ে বেশি বিল প্রদান, অতিরিক্ত ব্যয়, পরিচিত ঠিকাদারকে কাজ দিতে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে খারাপ আচরণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সরকারি অর্থ অপচয়সহ নানা বিষয়ে তার সার্কেলের বিভিন্ন কাজে শতাধিক অডিট আপত্তি রয়েছে।
ঢাকা সার্কেল-২ একটি গুরুত্বপূর্ণ এরিয়া। সচিবালয়, হাইকোর্ট ও আশপাশের সরকারি হাসপাতালের দায়িত্বে তিনি। এসব জায়গায় তিনি মেরামত থেকে শুরু করে সব কাজই পরিচিত ঠিকাদারকে দেওয়ার নির্দেশনা দেন নির্বাহী প্রকৌশলীদের। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে মেরামত কাজের বিল দ্বিগুণ করা হয় এবং উপবিভাগীয় ও সহকারী প্রকৌশলী মিলে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিতে কাজ করান। এসব অনিয়ম জেনেও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি আবু নাসের চৌধুরী। এ ছাড়া বগুড়ায় থাকতে টেন্ডার জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তর সার্কেল-২ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাছের চৌধুরী বলেন, স্যার আমাকে বগুড়া থেকে ঢাকা নিয়ে এসেছেন; কিন্তু কোনো সিন্ডিকেট-অনিয়মের সঙ্গে আমি জড়িত না।
যা বলছেন সচিব: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, প্রধান প্রকৌশলীর সিন্ডিকেটের কথা ও তাদের বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ শুনছি। এ নিয়ে বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করায় তার মধ্যে একজনকে ওএসডি করা হয়েছে। প্রমাণ পেলে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের খুলনা জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিগত আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকারের আমলে প্রভাব বিস্তার করে ঢাকা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে পোস্টিং বাগিয়ে নিয়ে বেনামী ঠিকাদারি ব্যবসাসহ ব্যাপক দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি সরকারি বরাদ্দের বড় একটি অংশ পকেটে পুরেছেন বলে তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইঞ্জিনিয়ার সাইফুর রহমান সবচেয়ে বেশি অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়ে তিনি আজিমপুর বিভাগে নিজস্ব ঠিকাদারি সিন্ডিকেট প্রথা চালু করেন, যা এখনো বলবৎ রয়েছে। একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিটি ফাইলে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ কমিশন না দিলে সাইফুর রহমান কোনো বিলে স্বাক্ষর করতেন না। এছাড়াও আজিমপুরে অবস্থানকালে এক নারী হিসাব সহকারীকে ঘিরেও তার বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের নানা মুখরোচক আলোচনার সৃষ্টি হয়। অভিযোগের তালিকায় আরো রয়েছে কুখ্যাত ঠিকাদার জিকে শামীম ও গোল্ডেন মনিরের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি। এমনকি গুলশানের রেডিসন ও ওয়েস্টিন হোটেলে তাদের অর্থায়নে আয়োজিত বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত গণহত্যায় আওয়ামী লীগের পক্ষে নেপথ্যে তিনি অর্থ যোগান দিয়েছিলেন বলেও জোরালো গুঞ্জন রয়েছে। নামে-বেনামে রূপকথার মতো সম্পদের পাহাড়: সরকারি চাকরির সুবাদে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও ঘুষ-কমিশনের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে সাইফুর রহমান দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছেন সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য। প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী তার উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে: রাজধানীতে আবাসন: ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে দুটি বিলাসবহুল বহুতল বাড়ি এবং পূর্বাচল নতুন শহরে মূল্যবান প্লট। টাঙ্গাইলে বিশাল সাম্রাজ্য: টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে সুবিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ি, বাজার রোডে ৩ তলা বাণিজ্যিক মার্কেট (যাকে তিনি ভাইদের সম্পদ বলে দাবি করেন), ঘাটাইলে সালাউদ্দিন সেনানিবাস মোড়ে পূর্বে স্থাপিত এলপিজি ফিলিং স্টেশন (যা বর্তমানে ভেঙ্গে সোনার তরী পার্ক তৈরি করা হয়েছে) এবং এর কাছেই কোটি টাকা মূল্যের জমিতে গড়ে তোলা কাঠবাদাম রেস্টুরেন্ট। বিদেশে অঢেল সম্পদ: যুক্তরাষ্ট্রে তার মেয়ের নামে কেনা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে তার বর্তমান স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের আনুমানিক মূল্য অর্ধশতাধিক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রকৌশলী সাইফুর রহমানকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। জনস্বার্থে এই কর্মকর্তার সার্বিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের বিস্তারিত অনুসন্ধানী তথ্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের মূল প্রতিষ্ঠাতা ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরীর আদি জন্মস্থান ও দেশের বাড়ি হলো সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁও গ্রামে। মাত্র ১১ বছর বয়সে সিলেট থেকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানো এই তাসবিরুল লন্ডনের ‘ফোর্ট লোটন হাই স্কুল’ ও ‘হ্যাকনি কলেজ’ থেকে এ-লেভেল শেষ করে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ‘অক্সফোর্ড এভিয়েশন’ থেকে বিমান চালনার প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউকের সিভিল এভিয়েশন থেকে কমার্শিয়াল লাইসেন্স পেয়ে তিনি আমেরিকার আকাশে এবং দেশে ফিরে বেক্সিমকোর জিএমজি এয়ারলাইনসের প্রধান পাইলট হিসেবে দাপটের সাথে বিমান চালানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও লাইসেন্স নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম ‘ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ’ ব্যবসাটি চালু করা হয়েছিল।. পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাসবিরুল সিন্ডিকেট রাতারাতি খোলস বদলে ওবায়দুল কাদের ও সালমান এফ রহমানদের প্রভাবশালী এভিয়েশন সিন্ডিকেটের সাথে হাত মেলায়। . সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর প্রভাবশালী মন্ত্রীদের পেছনে মোটা অঙ্কের নগদ ঘুষ ঢেলে শেয়ার বাজারে এই মহাজালিয়াতি সফল করতে তাসবিরুলকে সরাসরি বুদ্ধি ও ছক দিয়ে সাহায্য করেছিলেন তাঁর স্ত্রী, সিলেটেরই আরেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশী খন্দকার তাসলিমা চৌধুরী। . সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও ক্ষোভের আসল জায়গা হলো এই দুই চোরের ঠিকানা; বাংলাদেশে থাকাকালীন এই তাসবিরুল দম্পতির রাজকীয় আস্তানা ছিল রাজধানী ঢাকার অতি অভিজাত উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ২০ নম্বর রোডের ৪ নম্বর বাড়িতে (৫ম তলা)।. দেশের অর্থনীতিকে দেউলিয়া বানাতে এবং নিজেদের সিলেট অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে এক পারিবারিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তারা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শত শত কোটি টাকা ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে নিজেদের পকেটে ভরে নেন। . দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিমানের ভুয়া পার্টস ও খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয়ের ভুয়া খরচ দেখিয়ে এই তাসবিরুল দম্পতি হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করে মধ্যপ্রাচ্যের অতি বিলাসী দেশ দুবাইয়ের জুমেইরাহ ভিলেজ সার্কেল এলাকায় নিজের নামে ৭টি আলিশান অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। . আজ দেশের সাধারণ মানুষ যখন একবেলা খাবারের জন্য হাহাকার করছে, তখন এই শীর্ষ অর্থ পাচারকারী ও চরম বেইমান তাসবিরুল বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে সুদূর যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন। . যুক্তরাজ্যের ল্যান্ড রেজিস্ট্রি এবং কোম্পানি হাউজের অফিশিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি লন্ডনের হ্যাকনি বরোর অভিজাত আবাসিক এলাকা ‘স্টোক নিউইংটন’ (N16 7SL)-এর বিলাসভহুল ফ্ল্যাটে সস্ত্রীক নিরাপদ আশ্রয় বানিয়েছেন। . কালো টাকা সাদা করার আড়ালে লন্ডনে তাঁর গড়া সুগন্ধি ব্যবসা "TAC PERFUMES & COSMETICS (UK) LTD" (মূল শোরুম: 12 Railway Street, Chatham) এখনও সেখানে সম্পূর্ণ সচল ও লাভজনকভাবে চালানো হচ্ছে। . এই সুগন্ধি ব্র্যান্ডের আড়ালেই সেন্ট্রাল লন্ডনের অতি দামী কমার্শিয়াল জোন ‘সিটি রোড’ (128 City Road)-এর আলিশান দপ্তরে বসে তিনি আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন এবং বাংলাদেশের আইনি চোখ ফাঁকি দিচ্ছেন। . অন্যদিকে, এই চোরের ফেলে যাওয়া কয়েকশ কোটি টাকার ১১টি পরিত্যক্ত বিমান বছরের পর বছর ধরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ দখল করে আছে। . এই বিশাল লোহার কঙ্কালগুলো সরাতে এবং স্ক্র্যাপ হিসেবে আন্তর্জাতিক নিলাম করতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিপুল পরিমাণ আইনি ব্যয় ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই মেগা ডাকাতির পেছনে থাকা সাবেক পরিচালনা pর্ষদের অন্যতম হোতারা হলেন তাঁর আপন ভাই তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী ও শ্যালক খন্দকার মাহফুজুর রহমান, যারা সাধারণ মানুষের শেয়ারের টাকা লুটে এখন আত্মগোপনে আছেন। আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মূল্যে পুরোনো উড়োজাহাজ কেনা ও শেয়ার জালিয়াতির অকাট্য অভিযোগে ২০১৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই তাসবিরুল ও তাঁর দোসরদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি অনুসন্ধান ও তলবি নোটিশ জারি করেছিল।. কেবল শেয়ার বাজারই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়ে তা সম্পূর্ণ খেলাপি করে দেশের শীর্ষ ৩০০ মেগা ঋণখেলাপির তালিকায় অফিশিয়ালি নাম লিখিয়েছেন এই তাসবিরুল দম্পতি।
একটা সময় সরকারি যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সাজসজ্জা কিংবা ভিআইপি অনুষ্ঠানের কাজে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো ‘প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’কে। গত দেড় যুগ ধরে এমন অঘোষিত সংস্কৃতি ছিলো সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিগত সময়ের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত প্যারাডাইম সাময়িকভাবে হোঁচট খায়। কিন্তু এ সংকট কাটিয়ে ‘বীরদর্পে’ ফিরতে খুব বেশি সময় লাগেনি প্রতিষ্ঠানটির। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনেকটা হাঁকডাক দিয়ে প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সংক্রান্ত নথিপত্র বস্তাবন্দি অবস্থায় পূর্ত ভবনের প্রশাসন বিভাগে পড়ে আছে বলে জানা যায়। আর নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিও গত দুই বছরে সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সেতু ভবন, মন্ত্রিপাড়া, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, এনবিআর ভবন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগ অডিট প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ আঁতাতের মাধ্যমে কাজ পেয়ে যাচ্ছে। এসব অভিযোগ যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’ গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ইতোপূর্বে সাবেক এক গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসিরের আশীর্বাদ বন্ধ হলেও সেখানে নতুন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে দাড়িঁয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) ড. আবু নাসের চৌধুরী। ঢাকা সার্কেল-২ এর দায়িত্বে থাকা এ প্রকৌশলী বর্তমানে সার্কেল-১ এর অতিরিক্ত দায়িত্বও বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুটি সার্কেলের অধীনে থাকা সব কাজ প্রচলিত বাজার দর থেকে উচ্চমূল্যে প্যারাডাইমের ঝুড়িতে জমা পড়ছে। সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাবেক গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। তার চাহিদামত সব ডিভিশন থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এরপর নথিপত্র সংগ্রহ করলেও তা পূর্ত ভবনের সংস্থাপন শাখায় বস্তাবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আবু নাসেরের এখতিয়ারাধীন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সার্কেল-২ এর আওতায় রয়েছে- গণপূর্ত ভবন, হাইকোর্ট, ইডেন গণপূর্ত বিভাগ (সচিবালয়), তেজগাঁও, বিটিভি, ওয়ারী, কেরানীগঞ্জ কারাগার এবং ঢাকার বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ। সরকারি ভবন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের বড় অংশই এই সার্কেলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। সেখানে প্যারাডাইমের কাজই বেশি। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৭১ পুরানা পল্টন ভবনে সিটিজেন সার্ভিস সেন্টার স্থাপনের জন্য ৩৮ লাখ টাকার সংস্কারকাজ পায় প্যারাডাইম। এরপর সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনের বিভিন্ন কক্ষ সংস্কারের ৬১ লাখ টাকার কাজ, একই ভবনের ১৪/ক নম্বর কক্ষ আধুনিকায়নের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ভিভিআইপি কনফারেন্স রুমসংলগ্ন নতুন টয়লেট নির্মাণ ও অন্যান্য সংস্কারকাজে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশও যায় প্রতিষ্ঠানটির হাতে। এছাড়া সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে ৫৫ লাখ টাকা, ৪ নম্বর ভবনে ৭৪ লাখ টাকা এবং ডে-কেয়ার সেন্টার সংস্কারে ৪৪ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে তারা। একই সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তর্জাতিক কনফারেন্স রুম নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজে ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশ, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির দেয়াল সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ৫৭ লাখ টাকার কাজ এবং সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইসিটি রুম, টয়লেট ও শেড নির্মাণসহ নানাবিধ উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশও পেয়েছে প্যারাডাইম। শুধু সচিবালয়ই নয়, গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য সরকারি স্থাপনাতেও বিস্তৃত হয়েছে প্যারাডাইমের কার্যক্রম। শেরেবাংলা নগরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪২ লাখ টাকার সংস্কারকাজ, আগারগাঁওয়ের এসএমআরসি ভবনের প্রায় ১৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া ও বিভিন্ন হলের নির্মাণ, পরিবর্তন ও সম্প্রসারণসংক্রান্ত দুটি প্রকল্পে মোট ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সময়ে বনানীতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সেতু ভবন সংস্কার, রেট্রোফিটিং ও পুনর্নির্মাণসংক্রান্ত তিনটি পৃথক প্যাকেজে প্রায় ১১ কোটি টাকার কার্যাদেশও পায় প্যারাডাইম। পাশাপাশি এনবিআর ভবনের ৪৯ লাখ টাকার কাজও বাগিয়ে নেয় তারা। স্বাস্থ্যখাতেও সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। পূর্ত অধিদপ্তরের ডেলিগেটেড কাজ হিসেবে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার গ্লাস কার্টেইন ওয়াল স্থাপন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শহীদ ডা. মিলন অডিটোরিয়ামের ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার সংস্কার এবং অডিটোরিয়াম চত্বরের রাস্তা মেরামতের ৩৭ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে প্যারাডাইমের কার্যাদেশ বাড়ার সময়ই প্রশাসনিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসেন আবু নাসের চৌধুরী। গত ১৩ আগস্ট নারীঘটিত বিষয়সহ বিভিন্ন অভিযোগে সার্কেল-১ এর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলমকে সরিয়ে দেওয়া হলে সেই দায়িত্বও পান তিনি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলগুলোর একটি ‘সার্কেল-১’। এর আওতায় রয়েছে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২, নগর গণপূর্ত বিভাগ এবং আরবরিকালচার বিভাগ। এই সার্কেলের অধীনেই রয়েছে বঙ্গভবন, মন্ত্রীপাড়া, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, জুলাই জাদুঘর (সাবেক গণভবন), ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, রমনা পার্ক এলেনবাড়ি, জাজেস কমপ্লেক্স, মতিঝিল এবং কাকরাইল থানাসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা। ফলে বর্তমানে রাজধানীর সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিপুল অঙ্কের পরিচালন বাজেট তদারকির দায়িত্ব রয়েছে আবু নাসেরের হাতে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন ব্যয়ের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সার্কেল-২ এর আওতাধীন ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগের জন্য ২৫ কোটি টাকা, মেডিকেল গণপূর্ত বিভাগ ঢাকার জন্য ১৫ কোটি টাকা, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর জন্য ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর জন্য ২৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সার্কেল-১ এর আওতাধীন নগর গণপূর্ত বিভাগের জন্য ৩০ কোটি টাকা, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর জন্য ১১ কোটি ৭৫ লাখ, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এর জন্য ২৩ কোটি এবং আরবরিকালচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এলেনবাড়ীতে বঙ্গবন্ধু কর্ণার করে আলোচনায় থাকা আবু নাসের সরকার পরিবর্তনের পর প্রভাব যেন আরও বেড়েছে। এ প্রকৌশলীর ছোঁয়ায় বড় পরিসরে কাজ পেতে শুরু করেছে প্যারাডাইম। একপর্যায়ে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুরের সচিবালয়ের কার্যালয়ের সাজসজ্জার দায়িত্বও দেওয়া হয় প্যারাডাইমকে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করবো না।’ অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফয়সাল মোহাম্মদ বলেন, ‘সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকারের সঙ্গে আমাদের ফার্মের কোনো সম্পর্ক নেই। আর সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির অবসরে যাওয়ার পর আমাদের ফার্মে শুধু পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।’ প্যারাডাইমের বিষয়ে গঠিত তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কমিটি গঠন হয়েছে কি না তা আমরা জানি না। আমাদের কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি।’ প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাজ পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সচিবালয়ে কোনো কাজ করিনি। প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সার্কেলের অধীনেও কোনো প্রকল্পে কাজ করিনি।’