কুড়িগ্রাম সদর ও চিলমারী—দুই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নাম মো. মাহমুদুল হাসান। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে। বদলি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে আর্থিক লেনদেন ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ্য অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক নেতারা। চিলমারী উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বদলির নীতিমালা ভঙ্গ করে বেশ অনিয়ম করা হয়েছে। তালিকায় ২ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক মহসিনা খাতুনকে তিনজনের মধ্যে থেকে, ৩ নম্বর ক্রমিকের বাবলু মিয়াকে চারজনের মধ্যে থেকে, ৪ নম্বর ক্রমিকের তামান্না ইসলাম তৃষাকে তিনজনের মধ্যে থেকে, ৫ নম্বর ক্রমিকের নূর আলমকে চারজনের মধ্যে থেকে, ৮ নম্বর ক্রমিকের মনোয়ারুলকে চারজনের মধ্যে থেকে, ৯ নম্বর ক্রমিকের মোবারক হোসেনকে তিনজনের মধ্যে থেকে, ১০ নম্বর ক্রমিকের জনাব আলীকে দুজনের মধ্যে থেকে এবং ১১ নম্বর ক্রমিকের মাসুমা আক্তারকে দুজন শিক্ষকের মধ্য থেকে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাসুমা আক্তার ও তামান্না ইসলাম তৃষাসহ একাধিক শিক্ষকের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির আদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কমিটির বিরুদ্ধে। একই ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার শিক্ষক বদলির তালিকাতেও। এই উপজেলায় ২ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক বাশিরুল মুমিন খন্দকারকে দুজন শিক্ষকের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩ নম্বর ক্রমিকে থাকা রোখসানা পারভীনকে ৩ জনের, ৪ নম্বর তালিকায় থাকা পাপড়ী রানীকে ৬ জনের এবং ৮ নম্বর ক্রমিকে থাকা ফরিদা বেগমকে সর্বোচ্চ ১০ জনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির সুযোগ দিয়েছে উপজেলা কমিটি। তালিকায় ১০ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক আব্দুর রহিমকে সদরের পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি দেখানো হয়েছে। অথচ শিক্ষা অফিসের শূন্য পদের তালিকায় ওই স্কুলটির নাম ছিল না। এমনকি আব্দুর রহিম তাঁর বদলির পছন্দক্রমেও ওই স্কুলের নাম উল্লেখ করেননি। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেলে চিলমারী ও সদর উপজেলার শিক্ষকদের বদলির আদেশ জারি করে ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’। এতে চিলমারী উপজেলায় ১১ জন এবং সদর উপজেলায় ১২ জন সহকারী শিক্ষককে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এরপরই রাজনৈতিক চাপ ও অর্থবাণিজ্যের মাধ্যমে নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রাপ্যতাহীন শিক্ষকদের বদলির সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে কমিটির বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে জানা যায়, দুই উপজেলাতেই ৮ জন করে শিক্ষকের ক্ষেত্রে এমন অনিয়মের সত্যতা রয়েছে। এ নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কমিটি। এ বিষয়ে শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ও চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘ডেপুটেশনে থাকা শিক্ষক, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা শিক্ষক, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে না দেওয়া এবং দুজনের মধ্যে থেকে একজনকে বদলি করার নীতিমালা আছে। আমরা সেসব নীতিমালা মেনেই বদলি করেছি।’ অন্যদিকে, বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রকাশিত বদলির আদেশ পর্যালোচনা করে বেশ কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। এ নিয়ে আমরা মিটিং করেছি, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। আবারও মিটিং করে সব সমস্যার সমাধান করা হবে।’
আট বছরের প্রবাস জীবনের ক্লান্তি ভুলে আপন ঘরে স্বজনদের সঙ্গে একটু স্বস্তিতে দিন কাটানোর আশায় দেশে ফিরেছিলেন নজরুল ইসলাম রাব্বি। কিন্তু দেশে ফিরে নিজের আশ্রয়ের শেষ ঠিকানা পরিবারেই ঠাঁই হয়নি তার। বাবার বাধার মুখে গত এক সপ্তাহ ধরে ঘরের বাইরে রাত কাটাচ্ছেন এই প্রবাসী যুবক। এ নিয়ে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে ফেনী মডেল থানার ওসির কক্ষে মীমাংসা বৈঠক হয়। সেখানেও উপস্থিত বাবা-ছেলে মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। পরে পুলিশ তাদের পারিবারিক এসব বিষয় আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার জন্য অনুরোধ জানান। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নের দক্ষিণ খানে বাড়ি এলাকার জামাল উদ্দিনের ছেলে নজরুল ইসলাম রাব্বি গত ২৮ সেপ্টেম্বর ৮ বছর পর সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন। বাড়ি গিয়ে দেখেন বাবার ঘরে তালা ঝুলছে এবং পাশের ঘরটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে, যাতে তিনি কোনোভাবেই প্রবেশ করতে না পারেন। রাব্বির অভিযোগ, তার বাবা জামাল উদ্দিন তাকে ঘরে ঢুকতে দিচ্ছেন না এবং এখন তাকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এমনকি তার বোনকেও নিজের সন্তান বলে মানছেন না বাবা। রাব্বি বলেন, প্রবাসে থেকে পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করেছি। বাবা ও আমি মিলেমিশে জায়গা কিনে এই ঘর তৈরি করেছি। এখন ২৯ বছর বয়সে এসে শুনতে হচ্ছে আমি নাকি তার ছেলেই না! উনি আমার মাকে ২০২৩ সালের দিকে ডিভোর্স দিয়েছেন, তা তিনি দিতেই পারেন। কিন্তু সন্তান হিসেবে আমাদের ওপর কেন এই অবিচার? আমার অনুরোধ থাকবে, প্রশাসন যেন বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে আমার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেয়। তবে ছেলের সব অভিযোগ অস্বীকার করে বাবা জামাল উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ও আমার ছেলে না। আড়াই বছর আগে তার মায়ের সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। আমি নিজেও এক সময় প্রবাসী ছিলাম। কুমিল্লার ভিটেমাটি বিক্রি করে নতুন করে ১৬ শতক জায়গা কিনে নিজস্ব উপার্জনে ১০ বছর আগে এই দোতলা ঘর করেছি, কারও এক টাকাও নেইনি। বর্তমানে আমি ডায়বেটিসহ নানা রোগে ভুগছি। কেউ আমার কোনো খবর রাখেনি। ছেলেকে বেপরোয়া উল্লেখ করে জামাল উদ্দিন আরও অভিযোগ করে বলেন, প্রথমে ওকে কুয়েত পাঠিয়েছিলাম। সেখানে কাজ না করে অনলাইনে বন্ধুদের আড্ডায় পড়ে জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে। পরে হোটেল ব্যবসা দিয়েও লস খায়। দেশে এনে আবার আত্মীয়স্বজনদের সহযোগিতায় সৌদি পাঠানো হয়। সে আমাকে বিভিন্ন সময় মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে এবং আমাকে ‘মানসিক রোগী’ বলে অপপ্রচার চালিয়েছে। এর আগে সে আমাকে আট মাস ঘরে ঢুকতে দেয়নি। উল্টো আমার ভাড়াটিয়াদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেছে। বাধ্য হয়ে আমি তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক অভিযোগ দায়ের করেছি। এই অভিযোগ অস্বীকার করে ছেলে রাব্বি বলেন, মাকে এত বছরের সংসারের পর তালাক দিয়েছে। তখন সাময়িক রাগারাগি থেকে কিছু বলেছিলাম। তাই বলে আমাকে তো তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। অন্যদিকে, জামাল উদ্দিনের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে তদন্তে যাওয়া ফেনী মডেল থানার (এসআই) আবু হাসনাত মিশু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে খারাপ আচরণের বিষয়ে জামাল উদ্দিনের অভিযোগ পেয়ে সোমবার আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ছেলেসহ সবার সঙ্গে কথা বলেছি। যতটুকু বুঝতে পারছি এটি একটি পারিবারিক কলহ। যার কারণে বাবা ছেলের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে ছেলেটি ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শর্শদি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তারেক ইকবাল মনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, এটি আসলে দীর্ঘ দিনের পারিবারিক কলহ। স্থানীয়রা বহুবার চেষ্টা করেও সমাধান করতে পারেনি। এর কারণে এলাকার বদনাম হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত এ বিবাদের মিমাংসা হোক। ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এটি আসলে একটি পারিবারিক কলহের ঘটনা। এ বিষয়ে মীমাংসার জন্য আমরা মঙ্গলবার সকালে বাবা ছেলে দুইজনকেই থানায় ডেকেছিলাম। তারা এলাকার লোকসহ থানায় এসেছিলেন। আমরা উভয় পক্ষের বিস্তারিত আলোচনা শুনে সমঝোতার প্রস্তাব দিলে কোনো পক্ষই আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। পরে এই বিষয়ে তাদের আদালতে যাওয়ার পরামর্শ প্রদান করে আমরা বৈঠক শেষ করেছি।
পঞ্চগড়ের বোদায় ‘কথা আছে’ বলে এক নারী মোটরসাইকেল থামানোর পর চালককে মারধর, টাকা ও মোটরসাইকেল লুটের অভিযোগ উঠেছে পাঁচ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় করা মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার দুজন হলেন বোদা পৌর যুবদলের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন ওরফে রনি (৩০) এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য সোহেল রানা (৩৪)। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাত ৯টার দিকে আটোয়ারী উপজেলার বাসিন্দা পরিমল চন্দ্র বর্মন (৩০) মোটরসাইকেলে করে বোদা উপজেলা শহরসংলগ্ন প্রামাণিকপাড়া-শিমুলতলী মোড়ে যান। এ সময় অপরিচিত এক নারী তাঁর মোটরসাইকেল থামিয়ে ‘কথা আছে’ বলে জানান। পরিমল ওই নারীর সঙ্গে কথা বলার সময় কয়েকজন যুবক সেখানে এসে ওই নারীর সঙ্গে তাঁর অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে বিষয়টি বসে সমাধান করার কথা বলে ইউসুফ আলীর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আবারও মারধর করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহার অনুযায়ী, ওই বাড়িতেও পরিমল ওই নারীকে দেখতে পান। এ সময় তাঁর পকেট থেকে ২৫ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁর মোটরসাইকেলটি আটকে রেখে চারটি ১০০ টাকা মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্যদের কাছে বিষয়টি জানান পরিমল। পরদিন বিকেলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি প্রামাণিকপাড়া-শিমুলতলী মোড়ে যান। সেখানে যুবদল নেতা আনোয়ার হোসেন ও সোহেল রানাকে দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাঁদের আটক করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে স্বাক্ষর করা স্ট্যাম্প ও মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজনকে হেফাজতে নেয়। এ ঘটনায় রোববার দিবাগত রাত ১টার দিকে বোদা থানায় পাঁচ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে মামলা করেন পরিমল চন্দ্র বর্মন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন বোদা পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীন মজুমদার (৫০), ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব হোসেন আরিফ (৩৫) এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি রাজু ইসলাম (৩২)। এদিকে, ঘটনার পর রাজু ইসলাম ছাড়া অপর চার যুবদল নেতার প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সব পদ স্থগিত করেছে বোদা পৌর যুবদল। পৌর যুবদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মো. অলিয়ার রহমান ও সদস্যসচিব মো. আফছারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত কারণ দর্শানোর নোটিশে অভিযুক্তদের কেন স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না, তা তিন দিনের মধ্যে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বোদা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অলকান্ত রায় বলেন, গ্রেপ্তার আনোয়ার হোসেন ও সোহেল রানাকে সোমবার আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারমুখী যানবাহনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এই সেতু দিয়ে পারাপার হয় এবং আদায় হয় বিপুল পরিমাণ সরকারি টোল। কিন্তু সেই টোল আদায় ও হিসাব সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। সাম্প্রতিক অভিযোগের কেন্দ্রে এসেছে টোল আদায়ের স্বচ্ছতা, যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা, টোকেন/রসিদ প্রদান এবং আদায়কৃত অর্থের সঙ্গে সরকারি হিসাবে জমা দেওয়া অর্থের সামঞ্জস্য। এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি কতটা হচ্ছে, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী (চ: দা:) মো. মাইদুল ইসলামের দায়িত্বে শাহ আমানত সেতুর টোল ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন টোল আদায়ে জড়িত কর্মচারীরা। টোকেন ছাড়া টোল আদায়ের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শাহ আমানত সেতুতে টোল আদায় নিয়ে এর আগেও গণমাধ্যমে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে টোকেন না দিয়ে টাকা আদায় এবং আগের প্রিন্ট করা রসিদ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। এবং রশিদ দিলেও রশীদে গাড়ীর নাম্বার উল্লেখ থাকে না, লেখা থাকে শুধু চার ডিজিটের শূন্য। এখনো সেই প্রক্রিয়া চলমান আছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী। এই অনিয়মের কারণে সরকার মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, টোকেন ছাড়াই টোল আদায়ের অভিযোগের পাশাপাশি মাসভিত্তিক মোট টোল আদায়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য প্রকাশ করে না সওজ। এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে—প্রতিদিন সেতু দিয়ে কত যানবাহন পার হচ্ছে, তার বিপরীতে কত যানবাহনের কাছ থেকে টোল আদায় হচ্ছে এবং আদায়কৃত অর্থের পুরোটা সরকারি হিসাবে জমা হচ্ছে কি না? হিসাবের অমিলেই কি লুকিয়ে আছে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ? তথ্য সূত্রে জানা যায়, যানবাহনের সংখ্যা ও টোল আদায়ের হিসাব নথিভুক্ত করা টোল আদায় কারি প্রতিষ্ঠানের এবং সওজ কর্তৃপক্ষ তা তদারকি করবে। কিন্তু টোল আদায় বেড়ে গেলে, এবং পরিমাণ কমে গেলে ওই সময়ে কত যানবাহন সেতু পার হয়েছে—সে তথ্য দিতে পারেনা সংশ্লিষ্ট টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান। এখনো সেই অনিয়ম চলছে বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সওজের এক কর্মকর্তা জানান, শাহ আমানত সেতুর টোল আদায়ে সংঘবদ্ধ সিণ্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া কখন কিভাবে আদায় করা টোল মেরে দেয় কেউও টের পায় না, এই টাকার একটি প্যাকেট প্রতিদিন সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে চলে যায়। এই চেয়ারে শুধু তিনি নন যেই বসে সেই হরিলুটের সঙ্গে জড়িত। সরকারি (ই-জিপি) নথিতে দেখা যায়, শাহ আমানত সেতুর তিন বছরের (Web-Based Toll Collection, Operation and Management) সেবার জন্য চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের মাধ্যমে একটি ক্রয়প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রাক্কলিত ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ টোল ব্যবস্থাপনা কেবল টাকা সংগ্রহের বিষয় নয়, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহন গণনা, টোল হিসাব, ডাটা সংরক্ষণ, অর্থ জমা এবং সরকারি রাজস্বের হিসাব মিলিয়ে দেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই অবস্থায় অভিযোগ উঠছে—সওজ থেকে এসব কার্যক্রমের যথাযথ তদারকি হচ্ছে কি না এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর সিণ্ডিকেটের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ? একাধিকবার অভিযোগ, তারপরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে শাহ আমানত সেতুর টোল ব্যবস্থাপনা নিয়ে শুধু রাজস্বের হিসাব নয়, টোল প্লাজায় যানজট এবং অটোমেশন নিয়েও আগেও সমস্যা প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে আরএফআইডি ও এএনপিআর ক্যামেরা, অনিবন্ধিত যানবাহন এবং টোল আদায়ের প্রক্রিয়ার জটিলতার কথা উঠে আসে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা থাকার পরও যদি টোল আদায় ও যানবাহনের সংখ্যার মধ্যে অসঙ্গতি থাকে, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কোথায়? এভাবেই কি সংঘবদ্ধ সিণ্ডিকেট মাসের পর মাস টোল আদায়ে কি হরিলুট করে যাবে? তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র শাহ আমানত সেতুর টোল আদায়ে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রতিদিনের যানবাহন চলাচলের ডাটা, প্রতিটি লেনের টোল আদায়ের হিসাব, টোকেন ও রসিদের সিরিয়াল, সফটওয়্যার/সার্ভারের লগ, সিসিটিভি ফুটেজ, দৈনিক আদায়কৃত অর্থের ব্যাংক জমা, সরকারি কোষাগারে জমার চালান, টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের বিল ও পেমেন্ট, এবং সওজের তদারকি প্রতিবেদন পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। তখন থলের বিড়াল দ্রুত বেরিয়ে আসবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে—নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের যানবাহন চলাচলের সংখ্যা বনাম টোল আদায়ের অর্থ—এই দুটি তথ্য পাশাপাশি রাখলেই কোনো ঘাটতি বা অসঙ্গতি আছে কি না, তা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে। নির্বাহী প্রকৌশলী মাইদুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম টোল ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে জানা গেছে, তিনিও সুকৌশলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করছেন নিয়মিত, সওজ অফিসের নির্দিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও টোল আদায়কারীরা মাইদুলের সহযোগী বলে জানা যায়, তারা কখন কি ভাবে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করবে তার হিসাব পানির মত সচ্ছ। কারণ এই দপ্তরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীরাও টোল আদায়ে হরিলুট করেছেন বলে সওজের সুত্রে জানা গেছে নির্ভরযোগ্য সূত্র আরও জানিয়েছেন, প্রতিদিন লাখ লাখ সরকারি টাকা মাইদুলের পকেটে ঢুকে, এটা নিয়মতান্ত্রিক ভাবে চলমান প্রক্রিয়া, এখানে যেই নির্বাহী প্রকৌশলী আসুক টোলের টাকা তাদের কাছে স্ব-সম্মানে পৌছে দেওয়া হয়। তবে এ বিষয় নির্বাহী প্রকৌশলী মাইদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি শাহ আমানত সেতুর টোল আদায় সরকারি রাজস্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে এখানে সামান্য অনিয়মও সরকারের আর্থিক ক্ষতির কারণ। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সওজের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি দুদকের তদন্ত ও নিরপেক্ষ অডিট বা তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে টোল আদায়ের সম্পূর্ণ ডাটা জনসম্মুখে প্রকাশ এবং প্রতিদিনের যানবাহন সংখ্যা ও আদায়কৃত অর্থের স্বয়ংক্রিয় মিল নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। উল্লেখ্য— চট্টগ্রামের কর্ণফুলী (শাহ আমানত) সেতুর টোল আদায়ের জন্য ইজারাদার প্রতিষ্ঠান ছিল। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কোম্পানি ‘সেল-ভ্যান জেভি’ তারা চুক্তির মাধ্যমে শাহ আমানত সেতুর টোল প্লাজায় স্বয়ংক্রিয় ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টোল আদায় এবং সেতুর সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে আসছিল, কিন্তু তাদের মেয়াদ শেষ হওয়াতে বর্তমানে সওজের সড়ক বিভাগ নিজস্ব পদ্ধতিতে টোল আদায় করছে বলে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০১৫ সালে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিন বছরের প্রকল্প শেষ করতে এক যুগ সময় লেগে যাবে তা অনেকটা অবিশ্বাস্য! সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে কেন এমন সময় ক্ষেপণ হলো– এমন তথ্য খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেলো গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলীর নাম। যে যখন দায়িত্বে ছিলেন কাজের কাজ কিছু না হলেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ম্যানেজ হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম বিলও দিয়ে গেছেন। আর প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণেরও বেশি বন্দি নিয়ে চলছে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের কার্যক্রম। একইসঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। কারাগার প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ভালো। দ্রুতই কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। তবে যেসব কাজ অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলো আলাদা প্যাকেজ করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, ময়মনসিংহ গণপূর্ত জোন অনুসন্ধানে জানা যায়, গণপূর্তের ময়মনসিংহ জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কারাগারের সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা পাঁচ নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিহ্নিত করা গেছে, যারা এ কাজে গাফিলতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। তারা হলেন এ কে এম কামরুজ্জামান, মো. বদরুল আলম, মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মো. মোবারক হোসেন এবং বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস। এছাড়া এই সময়ে কারাগার নির্মাণে দায়িত্ব পালন করেন আরও দুই নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামান চুন্নু ও রাশেদ হাসান। গণপূর্ত সূত্রে জানা যায়, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম কামরুজ্জামান বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী আছেন নির্বাহী প্রকৌশলী (উন্নয়ন) হিসেবে। মো. বদরুল আলম বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (রিজার্ভ) হিসেবে যুক্ত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ময়মনসিংহ গণপূর্ত জোন) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘কারাগার প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ভালো। দ্রুতই কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। তবে যেসব কাজ অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলো আলাদা প্যাকেজ করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ গণপূর্তের একাধিক সূত্র জানায়, প্রকল্প অনুমোদনের পরও নির্মাণকাজ শুরু হতে কিছুটা সময় লাগে। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা এসব প্রকৌশলীর কেউই প্রকল্পের কাজ দেরিতে শুরু হওয়ার পর বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রিভাইজড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আরডিপি) অনুমোদনের উদ্যোগ নেননি। এ কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লোকসান থেকে বাঁচতে কাজের গতি কমিয়ে দেয়। ঠিকাদার ধীর গতিতে কাজ করে গেলেও তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম কামরুজ্জামান, মো. বদরুল আলম, মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মো. মোবারক হোসেন এবং বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম বিল দিয়ে গেছেন, আর সেখান থেকে নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন। জানা যায়, প্রকল্পের শুরুতেই পরিকল্পনাগত বিভিন্ন সমস্যা ছিল। পর্যাপ্ত মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় দুই হাজার বন্দির আবাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থান, গুদাম ও ওয়াচ টাওয়ারসহ বিভিন্ন স্থাপনার নকশা ও পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়। ভবনের আয়তন ও নকশা সংশোধনের প্রয়োজনও দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা থেকে ২৪০ কোটি টাকায়। একইসঙ্গে কাজের প্যাকেজ ১৩টি থেকে বাড়িয়ে ৩০টি করা হয়। জানা যায়, সম্প্রসারণ এই প্রকল্পের আওতায় ছোট-বড় প্রায় ৪০টি স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব স্থাপনার মধ্যে একতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত বিভিন্ন উচ্চতার ভবন রয়েছে। পাশাপাশি ফাঁসির মঞ্চ ও ডে-টাইম ল্যাট্রিনের মতো স্থাপনাও নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নারী বন্দিদের জন্য নির্ধারিত অংশের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। পুরুষ বন্দিদের ভবনের একটি অংশ ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণ চলছে। তবে এখনো বাকি রয়েছে কনডেমড সেল, সিকিউরিটি সেল, রান্নাঘর, আটা কল, জেল, স্কুল ও লাইব্রেরির কাজ। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্পের শুরু থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমি সেখানে দায়িত্বে ছিলাম। তখন কারাগারে বন্দি থাকায় দ্রুত কাজ শুরু করা যায়নি। তাদের অন্যত্র শিফট করে তারপর কাজ শুরু করতে হয়েছে। যার কারণে কাজ ধীরগতিতে হয়।’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম বিল দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক আগের ঘটনা এটি। এ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না।’ ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘২০১৮ সালের দিকে আরডিপি সংশোধন না হওয়ার কারণে ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। পরে মে মাসেই আরডিপি সংশোধন হলে কাজ শুরু হয়।’
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজের অফিস সহকারী ইব্রাহীম হোসেন বাবুলের হাজিরা খাতায় টানা ২৬ মাস কোনো স্বাক্ষর নেই। তিনি সীতাকুণ্ড পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি। কলেজসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর থেকে তিনি কর্মস্থলে অনিয়মিত। অথচ একই সময়ে তার নামে নিয়মিত বেতন-ভাতা ব্যাংক হিসাবে জমা ও উত্তোলন হয়েছে। দীর্ঘ অনুপস্থিতির পরও কীভাবে তার বেতন বিল প্রস্তুত, যাচাই ও অনুমোদন হয়েছে—খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন বলেন, গত ২১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক ও আর্থিক নথি পর্যালোচনা করতে গিয়ে এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি আমার নজরে আসে। ঘটনাটি সামনে আসার পরই তাৎক্ষণিকভাবে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কলেজ সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে কেবল হাজিরা খাতা নয়, সংশ্লিষ্ট সময়ের ছুটির আবেদন ও অনুমোদনপত্র, চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র, মাসভিত্তিক বেতন বিল ও ক্যাশবুকসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক নথি নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মস্থলে উপস্থিতির রেকর্ড না থাকা সত্ত্বেও কোন নথির ভিত্তিতে তার নামে বেতন বিল প্রস্তুত করা হয়েছে, কারা এই বিল তৈরি ও যাচাই করেছেন এবং কার প্রত্যয়ন ও অনুমোদনের পর অর্থ ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়েছে— এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুসা জানান, কারণ দর্শানোর জবাবে অফিস সহকারী বাবুল তার শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার জন্য তার ছুটি যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত ছিল কিনা এবং অসুস্থতার দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত বৈধ নথি রয়েছে কিনা, তা তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখছে। কলেজ পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য মো. জহিরুল ইসলাম নাছির বলেন, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও কীভাবে দীর্ঘ সময় ব্যাংক থেকে বেতন উত্তোলন করা হলো, বিষয়টি তিনি সম্প্রতি কলেজ পরিচালনা কমিটির একটি সভায় উত্থাপন করেছিলেন। তবে সভায় বিষয়টি তোলার পরও তিনি এ সংক্রান্ত কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাননি। নাছির আরো দাবি করেন, ইব্রাহীম হোসেন বাবুল বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। তৎকালীন স্থানীয় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁর এই নিয়োগ হয়েছিল এদিকে অভিযুক্ত কেরানি ইব্রাহীম হোসেন বাবুলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ, তীব্র মূলধন সংকট আর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে ধুঁকছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। ঋণ কেলেঙ্কারি আর লুটপাটের ধাক্কায় ব্যাংকটি যখন সাধারণ আমানতকারীদের আমানতের সুরক্ষা দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেই সময়েও ব্যাংকের টাকায় নিজেদের পকেট ভরাতে দ্বিধা করেননি ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। একদিকে লোকসানে থাকা ব্যাংকের ভুয়া মুনাফা দেখিয়ে বোনাসের নামে কর্মকর্তারা ভাগ করে নিয়েছেন ১৫৩ কোটি টাকা, অন্যদিকে সরকারি আইন লঙ্ঘন করে দুপুরের খাবারের (লাঞ্চ সাবসিডি) নাম করে তুলে নিয়েছেন আরও ১১৩ কোটি টাকা। সরকারি এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জনতা ব্যাংকের এমন আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি তহবিল ভাগবাটোয়ারার চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু কর্মকর্তাদের নীতিবহির্ভূত লাঞ্চ সুবিধা ও বোনাস দেওয়ার নামেই কর্মকর্তাদের পকেটে গেছে ব্যাংকটির মোট ২৬৬ কোটি ৫০ লাখ ৩৩ হাজার ৩১১ টাকা। আর এটি এমন এক সময়, যখন ব্যাংকটি লোকসানে ধুঁকছে। সম্প্রতি নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে করা জনতা ব্যাংকের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এবং চাকরি আদেশ-২০১৫ তোয়াক্কা না করে ব্যাংকের এসব আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে। ভুয়া মুনাফা দেখিয়ে ১৫৩ কোটি টাকার বোনাস: বাণিজ্যিক অডিটের নথি অনুযায়ী, কাগজে-কলমে কাল্পনিক ও ভুয়া মুনাফা দেখিয়ে ২০২৩ সালে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৩ দশমিক ৭৫ গুণ হারে বিশাল অঙ্কের উৎসব ও উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ব্যাংক তহবিল থেকে তুলে নেওয়া হয় মোট ১৫৩ কোটি ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার ৯৫৪ টাকা। তবে এ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে মানা হয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত (খেলাপি) ঋণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং প্রভিশন ঘাটতি থাকায় ব্যাংকটিতে কোনো মুনাফা অর্জিত হয়নি। বাস্তবে ব্যাংকটি তখন লোকসানে নিমজ্জিত ছিল। কিন্তু অডিট এড়াতে ও কর্মকর্তাদের পকেট ভারী করতে পরিচালনা পর্ষদের ৮২০তম সভায় ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র গোপন রাখা হয়। অডিট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্মকর্তাদের উৎসাহ বোনাস দিতে চাইলে চূড়ান্ত মূল্যায়নে ব্যাংকের স্কোর ন্যূনতম ৫০ হতে হবে। কিন্তু জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত আর্থিক ও পরিচালন মূল্যায়নে প্রাপ্ত স্কোর ছিল মাত্র ৩৫। স্কোর ৫০-এর নিচে নামলে কোনো কর্মকর্তা এক টাকাও বোনাস পাওয়ার যোগ্য নন। কিন্তু জনতা ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সরকারের এ বাধ্যবাধকতাকে তোয়াক্কা করেনি। এ ছাড়া, সরকারি নির্দেশনাবলি অনুযায়ী বোনাস দেওয়ার পূর্বশর্ত হলো ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা অর্জন। কিন্তু নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ব্যাংকটিতে মোট ২১ হাজার ১৮১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও জনতা ব্যাংক রাখতে পেরেছিল মাত্র ৫ হাজার ৮৩৫ কোটি ৪ লাখ টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৩৪৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ বিশাল ঘাটতি গোপন রেখে কাগজে-কলমে ৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা মুনাফা দেখানো হয়। একই সময়ে ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত ঋণ ২০২২ সালের ১৫ হাজার ৭৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ২৪ হাজার ৮৯৬ কোটি ২৮ লাখ টাকায় পৌঁছায়। নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চূড়ান্ত স্কোর ৫০-এর কম হওয়া এবং প্রভিশন ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এ বোনাস প্রদান ছিল নিয়মবহির্ভূত। প্রভিশন ঘাটতি গোপন করে ভুয়া মুনাফার ভিত্তিতে বোনাস বিতরণ শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, এটি ব্যাংক তহবিলের অপব্যবহারের শামিল। নিরীক্ষা দল এ সমুদয় অর্থ বেআইনি ও অনাদায়ি আর্থিক ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করে অবিলম্বে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আদায় করে ব্যাংক কোষাগারে জমা করার সুপারিশ করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জনতা ব্যাংকের আর্থিক সংকটের বড় কারণ খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি। ২০২৫ সালের জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে ৭২ হাজার ৫৩৯ কোটি এবং ২০২৬ সালের জুনে ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে রয়েছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত হিসাবে জনতা ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৫৫ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির নিট লোকসান হয় ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুনে যা হয়েছে ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা, যা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যাংকটির মূলধন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মূলধন ঘাটতি ছিল ১৮ হাজার ৩৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকট জনতা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। সরকারি আদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১১৩ কোটি টাকার ‘লাঞ্চ’ বিলাস: এদিকে কর্মকর্তাদের শুধু অনৈতিক বোনাস দিয়েই থেমে থাকেনি জনতা ব্যাংক, বেআইনি লাঞ্চ সাবসিডির নামেও ব্যাংকের বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একদিকে যখন ভুয়া মুনাফায় বোনাসের ভাগবাটোয়ারা চলছিল, অন্যদিকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দুপুরের খাবারের নামে বিশেষ সুবিধা দিতে চালু করা হয় ‘লাঞ্চ সাবসিডি’। সরকারি বেতন কাঠামো এবং পে-অর্ডারের তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে ব্যাংকের হাজার হাজার কর্মকর্তাকে দুপুরের খাবারের ভাতা বা লাঞ্চ সাবসিডি দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা নির্ধারিত হয় সরকারি ‘চাকরি (ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান) (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ-২০১৫’ অনুযায়ী। উক্ত আদেশের ২০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ব্যাংকের ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা কাজের বিপরীতে মাসিক ২০০ টাকা হারে টিফিন ভাতা পাওয়ার যোগ্য হবেন। এর বাইরে ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের কোনো কর্মকর্তা লাঞ্চ সাবসিডি বা দৈনিক খাবারের ভাতা পেতে পারেন না এবং দৈনিক ভিত্তিতে তা প্রদানের কোনো আইনি সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে সরকারি বেতন আদেশের ২০ অনুচ্ছেদ অমান্য করে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ৪০৬তম সভায় ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের সব কর্মকর্তার জন্য প্রতিদিনের ‘লাঞ্চ সাবসিডি’ অনুমোদন করা হয়। এ সিদ্ধান্তের ফলে পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি অনুযায়ী প্রতিদিন ২০০ টাকা হারে এ অর্থ দেওয়া হয়। পর্ষদের ওই সিদ্ধান্তের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর ধরে ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে ব্যাংকের কোষাগারের বিপুল অঙ্কের টাকা। কেবল এ নিয়মবহির্ভূত লাঞ্চ সাবসিডি বাবদ ব্যাংকটির ব্যয় হয়েছে ১১৩ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫৭ টাকা। অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যাংকের কোনো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রীয় আইন বা সরকারি আদেশ লঙ্ঘন করে নিজস্ব কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা অনুমোদন করতে পারে না। ফলে এই ১১৩ কোটি টাকার ব্যয় বেআইনি ও অপব্যয় হিসেবে গণ্য হবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি ব্যাংকের যখন মূলধন ঘাটতি থাকে, খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ে, তখন ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মচারীদের কৃচ্ছ্রসাধনের পথ অবলম্বন করার কথা। অথচ জনতা ব্যাংকের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে আইন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অডিট পর্যালোচনায় জানা যায়, অডিট দল যখন এসব বিষয়ে ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চায়, তখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে জবাব দিয়েছে, তা অডিটের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। বোনাসের বিষয়ে ব্যাংক জানিয়েছে, তারা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ হিসাব ও পর্ষদ অনুমোদনের ভিত্তিতে বোনাস দিয়েছে। কিন্তু নিরীক্ষা বলছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট স্কোর (৫০) না পাওয়া এবং ব্যাংকে বিপুল প্রভিশন ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এ জবাব গ্রহণযোগ্য নয়। লাঞ্চ সাবসিডির বিষয়ে ব্যাংক জানিয়েছে, পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহা বাড়াতে এ ভাতা দেওয়া হয়েছে। তবে অডিটে ব্যাংকের এ জবাবকে ‘স্বীকৃতিমূলক অনিয়ম’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি আদেশ-২০১৫-এর অনুচ্ছেদ ২০ লঙ্ঘন করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কোনো ভাতা অনুমোদন করতে পারে না এবং এটি সরকারি কোষাগার থেকে অবৈধভাবে অর্থ তুলে নেওয়ার শামিল। অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, যখন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক খেলাপি ঋণের চাপে সংকটে রয়েছে, তখন কর্মকর্তাদের এমন বোনাস ও ভাতা গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কৃত্রিম মুনাফা দেখিয়ে বোনাস দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তারা মনে করেন। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মজিবর রহমান বলেন, পরিচালনা বোর্ডের অনুমোদন নিয়েই বোনাস এবং লাঞ্চ সাবসিডি দেওয়া হয়েছে। এটা দীর্ঘদিন ধরেই চলমান, অন্যান্য ব্যাংকেও এর প্রচলন রয়েছে। অডিট অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যাংকের কাজের ধরন মিলিয়ে আপত্তি তুলেছে। অথচ বোনাস ও লাঞ্চ ভাতার পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদিত এবং দেশের সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অডিট অধিদপ্তরকে দেওয়া ব্যাখ্যায় জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ৮২০তম সভার অনুমোদনক্রমে ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যমান কর্মস্পৃহা ও কর্মউদ্দীপনা অটুট রাখাসহ ভবিষ্যতে তাদের ব্যাংকের সার্বিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নকাজে স্বপ্রণোদিত অংশগ্রহণে অধিকতর অনুপ্রাণিত ও উৎসাহ জোগানোর লক্ষ্যে ২০২৩ সালের জন্য সংরক্ষিত প্রভিশন থেকে ৩ দশমিক ৭৫ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ উৎসাহ বোনাস হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। লাঞ্চ সাবসিডির বিষয়ে ব্যাংকটি জানিয়েছে, জনতা ব্যাংকের সব গ্রেডের কর্মচারীদের অনুকূলে কল্যাণমূলক স্কিমের অধীন লাঞ্চ ও হালকা নাস্তা বাবদ সাবসিডি প্রদান করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের ২৫২তম সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য তিনটি রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লাঞ্চ সাবসিডি ও হালকা নাস্তা খরচ বাবদ ২০০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। চলমান লাঞ্চ ও হালকা নাস্তা বাবদ সাবসিডি খরচের বিষয়টি চাকরি আদেশ-২০১৫-এর ২০ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ‘টিফিন ভাতার’ সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উক্ত অনুচ্ছেদে ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডের কর্মচারীদের মাসিক ২০০ টাকা টিফিন ভাতা প্রাপ্যতার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। সেই হিসেবে যদি কর্মচারীদের টিফিন ভাতার সঙ্গে লাঞ্চ সাবসিডি ও হালকা নাস্তা বাবদ ২০০ টাকা দেওয়া হতো, তাহলে চাকরি আদেশের পরিপন্থী হতো। এক্ষেত্রে বেতন ও বিভিন্ন ভাতাদির সঙ্গে লাঞ্চ ও হালকা নাস্তা বাবদ সাবসিডির বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রভিশন ঘাটতি থাকার পরেও কীভাবে তারা কর্মকর্তাদের বোনাস দিয়েছে এবং কী যুক্তিতে লাঞ্চ সাবসিডি দিয়েছে, সেটার জবাব জনতা ব্যাংকই ভালো দিতে পারবে। তিনি বলেন, বাণিজ্যিক অডিট আপত্তি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া; কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করবে না। সংশ্লিষ্ট জনতা ব্যাংককেই অডিট অধিদপ্তরকে সন্তোষজনক জবাব দিতে হবে। তবে রুটিন পরিদর্শনে বাংলাদেশ ব্যাংক অডিট ফাইল এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপ খতিয়ে দেখে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে বোনাস নেওয়ার সুযোগ নেই। এই অডিটে যে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আমরা আসার আগেই হয়েছে। তবে এখন আর এভাবে ইনসেনটিভ দেওয়া হয় না। এখন যাতে আগের মতো অনিয়ম না হয়, সেটি নিশ্চিতের পাশাপাশি আগের ক্ষতিগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। বোনাস-লাঞ্চের নামে ২৬৬ কোটি টাকা নেওয়ার বিষয়টি জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সরকারি নিয়ম ভঙ্গ করে কর্মকর্তাদের এভাবে বোনাস ও ভাতা দেওয়া সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম এবং জনগণের অর্থের সঙ্গে প্রতারণা। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য ব্যাংকও নেয়’—জনতা ব্যাংকের দেওয়া এমন যুক্তিও অযৌক্তিক। একটি অপরাধ কখনোই অন্য কোনো অপরাধকে বৈধ করতে পারে না। অনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণকারী কর্মকর্তা—সবাইকে জবাবদিহির আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা উচিত।
মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ৬৮ বোতল ভারতীয় নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপসহ মোঃ ইউসুফ আলী (২৪) নামে এক যুবককে আটক করেছে বিজিবি। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ভোর ৫টার দিকে শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের মনাকষা গ্রাম এলাকায় এ অভিযান চালায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) এর মনাকষা বিওপির একটি বিশেষ টহলদল। বিজিবি সূত্রে জানা যায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মনাকষা এলাকায় একটি যাত্রীবাহী অটোরিকশায় তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় অটোরিকশায় থাকা ইউসুফ আলীকে তল্লাশি করে তার বহন করা ব্যাগের ভেতর লুকানো অবস্থায় ৬৮ বোতল ভারতীয় নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা সিরাপের আনুমানিক বাজারমূল্য ২৭ হাজার ২০০ টাকা। আটক ইউসুফ আলী শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের পারচৌকা গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে। পরে আটক ব্যক্তি ও উদ্ধার করা এস্কাফ সিরাপ শিবগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান, পিএসসি, ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, পুশ-ইন প্রতিরোধ এবং মাদকসহ যেকোনো ধরনের অবৈধ চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি সবসময় তৎপর রয়েছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আভানের মৃত্যু নিয়ে চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, রোগ নির্ণয়ে ভুল সিদ্ধান্ত এবং অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কারণে শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। শিশু আভানের বাবা মৃদুল ইসলাম একজন গণমাধ্যমকর্মী। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকাহত পরিবারটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে আভানকে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা প্রথম দিকে ডেঙ্গুর আশঙ্কা করে চিকিৎসা শুরু করেন। পরিবারের দাবি, পরবর্তী সময়ে একাধিকবার ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হলেও প্রতিবারই ফলাফল নেগেটিভ আসে। এরপরও শিশুটিকে ডেঙ্গু-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আইসিইউতে নেওয়ার পর অবনতি পরিবারের অভিযোগ, কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২ অক্টোবর আভানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। স্বজনদের দাবি, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরাসরি উপস্থিত না থেকে ফোনে নির্দেশনা দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। পরিবারের দাবি, আইসিইউতে নেওয়ার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। এ সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে পরিবারকে জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত ৩ অক্টোবর বিকেল ৫টার দিকে আভানের মৃত্যু হয়। অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন শিশুটির পরিবার অভিযোগ করেছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় আভানকে উচ্চমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, এর পর শিশুটির শরীরে গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে ‘শক সিনড্রোম’-এর মতো জটিলতা তৈরি হয়। তবে অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যথাযথ ছিল কি না, শিশুটির মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না—তা চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা ও বিশেষজ্ঞ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। চিকিৎসা নথি নিয়েও পরিবারের প্রশ্ন স্বজনদের অভিযোগ, শিশুটির মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র ও কেস সামারি চাওয়া হলেও শুরুতে তা পেতে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পরে চাপের মুখে কিছু প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবার। পরিবারের ভাষ্য, সরবরাহ করা চিকিৎসা নথিতে রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন এবং শক সিনড্রোমের উল্লেখ রয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে কোনো গাফিলতি, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ছিল কি না—তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে। ‘জাস্টিস ফর আভান’ কর্মসূচির ঘোষণা ঘটনার পর শিশুটির পরিবারের পক্ষে ‘জাস্টিস ফর আভান’ স্লোগানে দায়ীদের বিচারের দাবি জানানো হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে—ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা, চিকিৎসায় কোনো অনিয়ম বা অবহেলা হয়ে থাকলে দায়ীদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। পরিবারের পক্ষ থেকে হাসপাতালের লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পেশাগত অনুমোদন বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। নিরপেক্ষ তদন্তই এখন মূল দাবি শিশু আভানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, চিকিৎসার কোন পর্যায়ে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রা ও প্রয়োগ যথাযথ ছিল কি না, আইসিইউতে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের ধরন কেমন ছিল এবং হাসপাতালের চিকিৎসা প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য, চিকিৎসা নথি এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মতামত যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে আভানের মরদেহ নিয়ে স্বজনরা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকাহত পরিবারটি দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং কারও দায় প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বাথরুম থেকে অজ্ঞাত নারীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তার পরিচয় জানা যায়নি। বয়স আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে হবে। ঢামেক হাসপাতালে কর্মরত আনসারের প্লাটুন কমান্ডার মো. শাহদাদ জানিয়েছেন, হাসপাতালের নিচতলায় ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝে একটি বাথরুমে ওই নারীকে পানির পাইপের সঙ্গে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পুলিশ ক্যাম্পে অবগত করা হয়। পরে শাহবাগ থানার পুলিশ লাশ উদ্ধার করে, আইনি প্রক্রিয়া শেষে ঢামেক মর্গে লাশ পাঠানো হয়েছে। নিহতের পরিচয় পাওয়ার চেষ্টা করছেন পুলিশ।
গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া ৩০ মামলার আসামি পিচ্চি রাজা গাজীপুরের বাইমাইল এলাকা থেকে নয়, ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকেই পালিয়েছিলেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমা, স্কট পার্টির ইনচার্জ এসআই প্রবীর কুমার ও প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার (০৫ অক্টোবর) দুপুরে গাজীপুর মহানগর পুলিশের সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার.. পুলিশ কমিশনার জানান, গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ৩০ আসামিকে ঢাকার আদালতে হাজিরা ও মামলার শুনানির জন্য নেওয়া হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে রাতে তাদের কাশিমপুর কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার পথে পিচ্চি রাজা প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান। ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় বলা হয়, রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রিজন ভ্যানটি গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় পৌঁছালে সঙ্গে থাকা এসআই প্রদীপ কুমার পিচ্চি রাজাকে টয়লেট করানোর জন্য গাড়ি থেকে নামান। এ সময় সুযোগ নিয়ে পিচ্চি রাজা দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে অন্য ২৯ আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়। ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে প্রিজন ভ্যানের সঙ্গে থাকা এসআই প্রবীর কুমার, কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন, মো. সাকিব, শাকিল হোসেন এবং প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, প্রকৃত ঘটনা ছিল ভিন্ন। পুলিশ কমিশনার জানান, ঢাকা জেলা জজ আদালত থেকে ২৯ আসামিকে নিয়ে স্কট পার্টি প্রিজন ভ্যানটি কাশিমপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়। পথে ঢাকার তাঁতীবাজারের পুপলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছে প্রিজন ভ্যানটি থামানো হয়। সেখানে স্কট পার্টির ইনচার্জ এসআই প্রবীর কুমার চালক নায়েক কামাল হোসেনের কাছ থেকে প্রিজন ভ্যানের চাবি নেন। এরপর পিচ্চি রাজা ও হাজতি আসামি খাইরুল বাশারকে ভ্যান থেকে বের করে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। খাইরুল বাশারকে প্রিজন ভ্যানের চালকের পাশের আসনে বসানো হলেও পিচ্চি রাজা ও এসআই প্রবীর কুমার আর ভ্যানে ওঠেননি। পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ওই সময় অপেক্ষমাণ একটি প্রাইভেটকারে করে পিচ্চি রাজা পালিয়ে যান। পরে এসআই প্রবীর কুমার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাইমাইল এলাকায় গিয়ে প্রিজন ভ্যানে ওঠেন এবং স্কট পার্টির সদস্যদের নিয়ে মামলার এজাহারে বর্ণিত ‘বাইমাইল থেকে পালানোর’ ঘটনা সাজান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পুলিশ কমিশনার বলেন, বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমা, স্কট লিডার এসআই প্রবীর কুমার এবং প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় চালক কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে নগদ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য আসামিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
মামলাআগ্রাবাদ কনভেনশন হলের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফাহিম আহমেদ ও সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (বর্তমানে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী) মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরীসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রবিবার (৪ অক্টোবর) দুদক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। শাহ-আলম ফারুক এর আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। সে সময়ে গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকৌশলী শাহ-আলম ফারুক চৌধুরী এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, নথি জালিয়াতি এবং সরকারি জমি ও ভাড়া বাবদ ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এই মামলা অনুমোদন করা হয়। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেরা লাভবান হওয়া এবং অন্যকে লাভবান করার উদ্দেশ্যে ভুয়া রেকর্ডপত্র ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তারা চট্টগ্রামস্থ আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় ২৪ দশমিক ৯৬ শতক সরকারি জমি অবৈধভাবে দখলে রাখেন এবং বকেয়া ভাড়া পরিশোধ না করে জালিয়াতি ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে মোট ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৮ টাকা আত্মসাৎ করেন। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একটি মামলা রুজুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
এইচএম মানিক, সিনিয়র রিপোর্টার : আইটি প্রশিক্ষণ ও নিশ্চিত কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অগ্রীম জামানত ও একাডেমিক সার্টিফিকে এবং তা পরবর্তীতে তা ফেরত না দিয়ে ভীতি প্রদর্শনের এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে কুমিল্লার একটি কথিত আইটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন স্থানীয় বহু তরুণ-তরুণী ও চাকরিপ্রার্থী। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে প্রশিক্ষণ ও কাজের গ্যারান্টি দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করায়। তবে শর্ত হিসেবে প্রশিক্ষণ শুরুর আগেই প্রত্যেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা এককালীন 'জামানত' বা ডিপোজিট হিসেবে রেখে দেয়। জামানত নেওয়ার সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়—প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট মেয়াদের কাজ শেষে বা সার্টিফিকেট প্রদানের সময় এই জামানতের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তবে প্রশিক্ষণ শেষে সার্টিফিকেট হাতে পেলেও জামানতের টাকা ফেরত পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো নাজেহাল হতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জামানতের টাকা ফেরত চাইতে গেলে প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা তাদের সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করে এবং ভুয়া মামলা ও পুলিশের ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক (ছদ্মনাম ব্যবহারকারী) কয়েকজন ভুক্তভোগী তাদের ক্ষোভ ও অভিজ্ঞতার কথা জানান: * আফরোজা,নিলা,তিথি (ছদ্মনাম): সাংবাদিকদের বলেন কুমিল্লা আইটি ইনিস্টিটিউট প্রশিক্ষণ শেষে জামানতের পুরো টাকা ফেরত পাব। এখন সার্টিফিকেট দেওয়ার পর টাকা চাইতে গেলে তারা আমাকে বিভিন্ন অজুহাতে ঘুরাচ্ছে এবং ভুয়া আইনি ঝামেলায় ফেলার হুমকি দিচ্ছে।" * হালিম (ছদ্মনাম): "আমি কষ্ট করে জামানতের টাকা জোগাড় করে জমা দিয়েছিলাম। এখন টাকা ফেরত না দিয়ে তারা উল্টো হুমকি দিচ্ছে। আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।" * কোহিনুর (ছদ্মনাম): "আইটি খাতে কাজের নামে এটি একটি পরিকল্পিত ফাঁদ। প্রশিক্ষণ দেওয়ার নাম করে গ্রাহকের জামানত আটকে রাখা এবং ভয় দেখানোই তাদের মূল ব্যবসায়িক কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।" সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বৈধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা আইটি কোম্পানির কাজ বা প্রশিক্ষণের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অফেরতযোগ্য 'জামানত' বা ডিপোজিট নেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। প্রশিক্ষণ ও চাকরির লোভ দেখিয়ে এককালীন বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া। জামানত আটকে রেখে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ করার সুযোগ বন্ধ করা। জামানতের টাকা ফেরত না পেয়ে তরুণ-তরুণীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। টাকা ফেরত চাওয়ায় মিথ্যা মামলা ও পুলিশি হুমকির মুখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে হয়। এ ধরনের প্রতারণার কারণে প্রকৃত ও বৈধ আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে যাচ্ছে। এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে এবং তরুণদের সুরক্ষা নিশ্চিতে অনতিবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত উক্ত কথিত আইটি সেন্টারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। জেলায় পরিচালিত আইটি ট্রেনিং সেন্টার ও ফার্মগুলোর ট্রেড লাইসেন্স এবং কার্যক্রম বৈধ কি না তা নিয়মিত তদারকি করা। বৈধ ও অবৈধ প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য তুলে ধরে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রচার-প্রচারণা চালানো। কোনো আইটি প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ বা কাজের জন্য জামানত চাইলে শুরুতেই তা প্রত্যাখ্যান করা। ভর্তি বা চুক্তির আগে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, ব্যাকগ্রাউন্ড ও পূর্ববর্তী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা যাচাই করা। প্রতারণার শিকার হলে চুপ না থেকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP) বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা। কারিগরি শিক্ষার নামে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা বন্ধে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
রহমত আরিফ ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লীতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১০৫ পিস কমলা রঙের ট্যাপেন্ডাটল ট্যাবলেটসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার (৫ অক্টোবর) সকালে ভূল্লী উপজেলাধীন বালিয়া ইউনিয়নের বড় বালিয়া মণ্ডলপাড়া জামে মসজিদের পাশের পাকা সড়ক থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার টিকাপাড়া গ্রামের মো. মকবুল হোসেনের ছেলে মো. ফাহিম মোর্শেদ গালিব (৩৩) এবং বরুনাগাঁও গ্রামের মো. নিজামউদ্দিনের ছেলে মো. রানা (৩৫)। পুলিশ জানায়, ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ সুপার বেলাল হোসেনের সার্বিক দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে ভূল্লী থানা পুলিশের টানা ২৪ ঘণ্টার বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের একপর্যায়ে তাদের আটক করে তল্লাশি চালিয়ে ১০৫ পিস ট্যাপেন্ডাটল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ভূল্লী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) সারণির ২৯(ক)/৪১ ধারায় মামলা করা হয়েছে। মামলাটি ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দায়ের করা হয়, যার নম্বর-০৫। ভূল্লী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, মাদক উদ্ধার, মাদক মামলার আসামি এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। রহমত আরিফ ঠাকুরগাঁও ০১৭৪০৮৬১০৮০
দেড় হাজার কোটি টাকার ‘সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা) প্রকল্প’ শুধু কেনাকাটার দুর্নীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বনায়নের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং বাণিজ্য এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের ঘিরে ‘মাসোহারা সিন্ডিকেট’-এর চিত্রও সামনে এসেছে। প্রকল্পের টাকা ভাগাভাগি ও কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে খোদ প্রকল্প পরিচালককে (পিডি) সরিয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগও করেছেন বন কর্মকর্তাদের কয়েকজন। প্রকল্পের আওতায় ‘সমৃদ্ধকরণ বাগান’ তৈরির নামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের নথিতে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে অ-কাঠ বনজ পণ্য বা এনটিএফপিভিত্তিক বাগান তৈরির নামে আরও ১৩ কোটি ১০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, দেশের কয়েকটি অঞ্চলে কোনো ধরনের বাগান না করেই শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। দুই খাত মিলিয়ে দুর্নীতির অভিযোগের পরিমাণ ৬৩ কোটি ১০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। পিডি বদলেও আর্থিক সমঝোতা : বন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সুফল প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক রাকিবুল হাসান মুকুলকে সরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে ছিল আর্থিক সমঝোতার বিষয়। তাদের দাবি, প্রকল্পের মোট বাজেট থেকে ১০ শতাংশ অর্থ কমিশন হিসাবে দেওয়ার জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ড. গোবিন্দ রায়কে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তাকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের আর্থিক সমঝোতা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চেষ্টা করেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। লাভজনক পদে ‘পোস্টিং বাণিজ্য’ : সুফল প্রকল্পের বনায়ন ও বাজেট বরাদ্দ যেখানে বেশি ছিল, সেসব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসার জন্য আর্থিক লেনদেনের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বন কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন চেকস্টেশনে পদায়ন ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া হতো। দুদকের অভিযানসংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বন অধিদপ্তরে বদলি, পদায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। মাসোহারার অভিযোগ : প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, রেঞ্জ ও চেকস্টেশন থেকে নিয়মিত ‘মাসোহারা’ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন বন কর্মকর্তা। অভিযোগকারীদের দাবি, দেশের প্রায় ৪৫ জন বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছ থেকে মাসে কয়েক কোটি টাকা, প্রায় ৪২০টি রেঞ্জ থেকে আরও কয়েক কোটি টাকা এবং বিভিন্ন চেকস্টেশন থেকেও নিয়মিত অর্থ নেওয়ার একটি ব্যবস্থা ছিল। তাদের দাবি, এই ‘মাসোহারা সিন্ডিকেট’-এর মাধ্যমে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়া হতো। ‘বিশেষ বলয়’ নিয়ন্ত্রণে প্রকল্প : ২০২০ সালের মার্চে মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী প্রধান বন সংরক্ষকের দায়িত্ব নেন। তার ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত একটি ‘বিশেষ বলয়’ সুফল প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেয় বলেও দাবি করেছেন কর্মকর্তাদের কয়েকজন। ওই বলয়ে আরএসএম মনিরুল ইসলাম, বিপুল কৃষ্ণ দাস, মো. আব্দুল আওয়াল সরকার, মিহির কুমার দে, মো. মাইন উদ্দিন, ড. গোবিন্দ রায় ও জাহেদুল কবিরের নাম এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগের (ক্ষমতাচ্যুত) আমলে তৎকালীন বন ও পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় আরএসএম মনিরুল ইসলাম মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অন্য এক বন কর্মকর্তার ভূমিকা ছিল। প্রধান বন সংরক্ষক তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রভাবশালী মহলের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। দুদকের জালে দুর্নীতির খতিয়ান : সুফল প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন অধিদপ্তরে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিম। তারা বিভিন্ন নথি সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একই বছরের আগস্টে সুফল প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও প্রকল্পটির বনায়ন কার্যক্রম নিয়ে দুদকের গভীর অনুসন্ধানের কথা এসেছে। কাগজে দেখানো বনায়নের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় প্রায় ৩৫০ হেক্টরের ব্যবধান নিয়েও অনুসন্ধান চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২ ধরনের নথি চাওয়া হয় : এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানের অংশ হিসাবে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় প্রধান বন সংরক্ষকের দপ্তরে সুফল প্রকল্পের ১২ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথি চাওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল মূল ও সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব, প্রতিটি ক্রয় প্যাকেজের দরপত্র, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, গাড়ি ও সরঞ্জাম কেনার চুক্তি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, বনায়নের স্থানভিত্তিক তালিকা, অবস্থান নির্ণায়ক তথ্য, উপগ্রহচিত্র, নার্সারি থেকে চারা উত্তোলন ও বিতরণের রেজিস্ট্রার, বাগানভিত্তিক হিসাব, টিস্যু কালচার ল্যাবের উৎপাদন তথ্য, প্রকল্পের অর্থছাড় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে তথ্য সরবরাহ না করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর একাধিকবার সময় নেয়। এরপরও চাওয়া তথ্যের বড় অংশ পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পের সব কাজ নিয়ম মেনে হয়ে থাকলে ব্যয়, ক্রয় ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের নথি প্রকাশে বাধা কোথায়? তথ্যের লুকোচুরি, নীরব অভিযুক্তরা : প্রকল্পের অভিযোগের বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করলেও তিনি কোনো সদুত্তর দেননি। পরে তথ্য অধিকার আইনে চাওয়া তথ্যের বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি শুধু ‘দিচ্ছি, দেব’ বলে সময়ক্ষেপণ করেছেন। সুফল প্রকল্পের পরিচালক ড. গোবিন্দ রায়ের সঙ্গেও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনিও কোনো উত্তর দেননি। সুফল প্রকল্পের অভিযোগ যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় অধিকাংশ তথ্যই সরকারি নথিতে থাকার কথা। একটি গাড়ির দাম কেন বেশি-তার উত্তর রয়েছে দরপত্রে। ফটোকপি মেশিন কত দামে কেনা হয়েছে, তা জানা যাবে কার্যাদেশে। কোনো বাগান সত্যিই হয়েছে কি না, তার প্রমাণ থাকার কথা অবস্থান নির্ণায়ক তথ্য, মাঠপর্যায়ের ছবি ও উপগ্রহচিত্রে। ল্যাব চালু হয়েছে কি না, তার উত্তর রয়েছে উৎপাদন রেজিস্ট্রারে। প্রকল্পের অর্থ কোথায় গেছে, তা জানা সম্ভব অর্থছাড়, হিসাব ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। ফলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পর নির্ধারিত সময়ে তথ্য না দেওয়া এবং গড়িমসি করায় দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে। বন রক্ষার জন্য নেওয়া প্রকল্পে যদি বনায়ন কেবল কাগজেই থাকে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত অবকাঠামো যথাযথভাবে ব্যবহার না হয়, ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য ব্যবধান থাকে এবং প্রকল্পের নথি চেয়েও তা পাওয়া না যায়, তাহলে প্রশ্ন শুধু আর্থিক অনিয়মের নয়-রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সরকারি অর্থের ব্যবহার ও জবাবদিহি নিয়েও। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার এই জাতীয় প্রকল্পের মূল ও সংশোধিত ডিপিপি, দরপত্র, ঠিকাদারি বিল এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন জনগণের সামনে প্রকাশের দাবি উঠেছে। বনের জন্য বরাদ্দ অর্থ কোথায় গেছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, দুদক গত বছর ‘সুফল’সহ বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বন অধিদপ্তরে একটি অভিযান পরিচালনা করে। পরে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করা হয়। তিনি বলেন, অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা বন অধিদপ্তরে রেকর্ডপত্র তলব করেছেন। বন অধিদপ্তরের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা বিএনপির পার্টি অফিসের জন্য ভাড়া নেওয়া গৌরীপুর বাজারের একটি ভবনের ভাড়া ২১ মাস ধরে বকেয়া রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভবনটির মালিক মো. ফাহাদ। তার দাবি, ভাড়া পরিশোধের জন্য একাধিকবার তাগাদা দিলেও বিএনপি নেতারা টাকা না দিয়ে সময়ক্ষেপণ করছেন। ভবন মালিক জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর গৌরীপুর বাজারের ওই দোকানটি অটো গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়া ছিল। পরে দাউদকান্দি উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ভিপি জাহাঙ্গীর আলম সেখানে বিএনপির পার্টি অফিস করার জন্য জায়গাটি নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মো. ফাহাদ বলেন, ‘আমরা ওই দোকান থেকে দুই লাখ টাকা অগ্রিম এবং মাসে ১৪ হাজার টাকা ভাড়া পেতাম। বিএনপির অফিস হবে বিবেচনায় মাসে ১০ হাজার টাকা ভাড়ায় দিতে রাজি হই। কিন্তু ২০ মাস শেষ হয়ে ২১ মাসে পড়েছে, এখনো নিয়মিত ভাড়া দেওয়া হয়নি। একবার ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কোনো ভাড়া দেওয়া হয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ঈদের সময় ভাড়া চেয়েছিলাম। তখন ঈদের পর দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। গত মাসেও টাকা চেয়েছি। তারা দেবেন, দিচ্ছেন বলে শুধু সময় দিচ্ছেন। টাকা খুঁজতে খুঁজতে আমরা হয়রান হয়ে গেছি।’ তবে ভবন মালিকের অভিযোগ অস্বীকার করে দাউদকান্দি উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ভিপি জাহাঙ্গীর আলম দৈনিক আমার দেশকে বলেন, ‘‘কথাটি সঠিক নয়। আমাদের প্রায় ১০ মাসের ভাড়া বকেয়া রয়েছে। গত মাসে আমাদের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমরা শিগগিরই ভাড়া পরিশোধ করে দেব। আর যদি কমিটি গঠন না হয়, তাহলে অফিস ছেড়ে দেব।’’ ভিপি জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, ‘আমরা দোকানটি অটো গ্যারেজের মালিক আমিনের কাছ থেকে নিয়েছি। আমি আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। মূল মালিক ফাহাদের সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি।’ ওই দোকানটি প্রথমে অটো গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া নিয়েছিলেন আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি ভাড়া নেওয়ার পর বিএনপি নেতা ভিপি জাহাঙ্গীর আলম এসে এখানে অফিস করার জন্য বলেন। তখন আমি তাকে বলি, এটি জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে ফাহাদের দোকান। তাদের সঙ্গে কথা বলে নিতে পারেন। এরপর থেকেই ভাড়া নিয়ে তাদের সঙ্গে সমস্যা চলছে বলে জানতে পেরেছি।’ এ বিষয়ে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তৌহিদুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘এই অফিসটি উপজেলা বিএনপি নিয়েছে। ভাড়া বকেয়া আছে কি না, এ বিষয়ে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাতে পারব। এর বেশি কিছু আমি এখন বলতে পারছি না।’
বিদায়লগ্নে এসেও কাটেনি মোহের ঘোর, থামেনি অর্থলিপ্সা। ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী, আগামী ১ অক্টোবর তাঁর যাওয়ার কথা অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (পিআরএল)। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেখানে একজন কর্মকর্তার ডেস্কে থাকার কথা বিদায়ের প্রস্তুতি আর ফাইল বুঝিয়ে দেওয়ার তাড়া, সেখানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়েরের দপ্তরে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিদায়ের কোনো বিষাদ সেখানে নেই; বরং শেষ মুহূর্তের ফায়দা লুটতে সেখানে বসেছে এক নজিরবিহীন ‘ঘুষ ও ফাইল অনুমোদন উৎসব’। অবসরের ঠিক আগের দিনগুলোতে শেষ রাত পর্যন্ত তড়িঘড়ি করে বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ফাইলের অনুমোদন এবং কোটি কোটি টাকার অনৈতিক আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করার এক অবিশ্বাস্য মহোৎসবে মেতে উঠেছেন এই শীর্ষ কর্মকর্তা। অনুসন্ধানে এই শীর্ষ কর্মকর্তার ক্ষমতার অপব্যবহার যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে, তার বিপুল অবৈধ সম্পদের যে খতিয়ান উঠে এসেছে, তা দেখে চোখ কপালে উঠেছে খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। সূত্র বলছে, গণপূর্তের ঠিকাদার পাড়া থেকে শুরু করে প্রকৌশলীদের অন্দরমহল সবখানেই আবুল খায়েরের পরিচিতি ‘মিস্টার ৫%’ খায়ের’ হিসেবে। চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা এবং সর্বশেষ ঢাকা জোনে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে তুলেছিলেন এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, যেকোনো সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, ঠিকাদার নিয়োগ কিংবা কাজের চূড়ান্ত বিল পাসের ফাইল তাঁর টেবিল থেকে ছাড়াতে অলিখিতভাবে দিতে হয় ৫ শতাংশ নগদ কমিশন। কমিশন দিতে সামান্য দেরি হলেই ফাইল আটকে যেত লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে। আর যারা এই অনৈতিক আবদারে সায় দিতেন না, তাঁদের কপালে জুটত ব্ল্যাকলিস্টেড হওয়ার হুমকি। ঢাকা জোনের এক ভুক্তভোগী ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা খায়েরের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। ৫% কাটমানি না দিলে ফাইলের একটা পাতাও নড়ে না। এখন তিনি অবসরে যাচ্ছেন, তাই বকেয়া কমিশন উসুল করতে আমাদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছেন। টাকা না দিলে রানিং প্রজেক্টের বিল আটকে রাখার হুমকি দিচ্ছেন।” বছরের পর বছর ধরে ঠিকাদারদের পকেট কেটে এবং সরকারি কোষাগার লুটে আবুল খায়ের গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। নিজের, স্ত্রী এবং নিকটাত্মীয়দের নামে ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরার মতো অভিজাত এলাকায় অন্তত ২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সন্ধান মিলেছে। রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্প, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভিআইপি জোন এবং ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় বিঘার পর বিঘা জমি ও আলিশান খামারবাড়ি (ফার্মহাউস) গড়ে তুলেছেন তিনি। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে থাকাকালীন নকশা জালিয়াতি, প্লট অবৈধভাবে বরাদ্দ এবং ভুয়া বিল ভাউচার পাসের মাধ্যমে একাই প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। ১ অক্টোবরের পিআরএল-এর ডেডলাইনকে সামনে রেখে তিনি তড়িঘড়ি করে ব্যাকডেটে বিভিন্ন প্রজেক্টের কার্যাদেশ ও বিতর্কিত বিল ছাড়ের ফাইল সই করছেন। অভিযোগ উঠেছে, বিদায় নেওয়ার পর যেন কোনো ঠিকাদার বকেয়া কমিশনের টাকা আটকে না রাখে, সেজন্য পিআরএল-এর ঠিক আগের দিনগুলোতে অগ্রিম টাকা বুঝে নিয়ে ফাইল ছাড়ার এই ‘মহালুটপাট’ চালাচ্ছেন তিনি। গণপূর্তেরই এক কর্মকর্তা বলেন, “অফিসের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী বিদায়ের আগে পেনশনের ফাইল ও দায়িত্ব হস্তান্তরের কাজ করার কথা। কিন্তু খায়ের স্যার গভীর রাত পর্যন্ত বিতর্কিত ফাইল সই করছেন। যেসব ফাইলে বড় বড় আর্থিক অসঙ্গতি আছে, সেগুলোও এখন অলৌকিকভাবে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে।” অবসরের ঠিক পূর্বমুহূর্তে গণমাধ্যমে তাঁর এই ‘ঘুষ উৎসব’ এবং শত কোটি টাকার মানিলন্ডারিং-এর খবর তোলপাড় সৃষ্টি করার পর নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের অনুসন্ধান দলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মো. আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। পিআরএল-এ যাওয়ার সুযোগ নিয়ে তিনি যেন কোনোভাবেই আইন ও জবাবদিহিতার বাইরে চলে যেতে না পারেন, সেজন্য আমরা প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ শুরু করেছি। ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আইনি প্রক্রিয়াও আমাদের বিবেচনায় রয়েছে।” দেশের নতুন ও পরিবর্তনকালীন সময়েও একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তার এমন লাগামহীন দুর্নীতি ও শেষ মুহূর্তের লুটপাট কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না গণপূর্তের সাধারণ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারেরা। এখন দেখার বিষয়, বিদায়ের তোড়জোড় করা এই ‘লুটপাটের রাজপুত্র’ দুদকের লোহার খাঁচায় বন্দি হন, নাকি অধরাই থেকে যান!
গণপূর্ত অধিদপ্তরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠছে। সরকারি প্রকল্পের টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, বদলি-পদায়নে আর্থিক লেনদেন এবং কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ঠিকাদার ও গণপূর্তের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগের ভিত্তিতে এসব তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে লিখিত জমা দিয়েছেন কয়েকজন ঠিকাদার। অভিযোগে বলা হয়, গণপূর্তের বিভিন্ন বড় প্রকল্পের দরপত্রে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। মিরপুর, সাভার, মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরের একাধিক প্রকল্পের নামও অভিযোগে উঠে এসেছে। কুমিল্লার একটি ই/এম টেন্ডারে ভুয়া সার্টিফিকেটধারী ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে কালো টাকার জোরে থমকে গেছে তদন্ত। ঠিকাদারদের একাংশের অভিযোগ, বদরুল আলমকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি গোষ্ঠী কাজ করছে। নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে অধস্তন প্রকৌশলীদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, টাকা ছাড়া কিছুই বুঝেন না প্রকৌশলী বদরুল স্যার। তা ছাড়া নির্ধারিত ঠিকাদার ছাড়া কাজ পাওয়ার সুযোগ নাই। বদরুল আলমের বিরুদ্ধে গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন প্রকৌশলীর অভিযোগ, তাঁদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে বদরুল আলমের টাকা লেনদেনের তথ্য নথি দুদকে জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। বদরুল আলমের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। এসব অভিযোগ যাচাই করতে তাঁর আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল এবং ব্যাংক লেনদেন নানা তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগের বিষয়ে বদরুল আলম খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন,সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় সমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নীতিমালার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং স্বাধীন নজরদারি জরুরি। সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ই-জিপির পাশাপাশি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ও কর্মদক্ষতা নিরীক্ষা প্রয়োজন। নিয়ম থাকলেই হবে না, সেগুলোর সমান ও কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।
২০১৫ কিংবা ২০১৬ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে যোগদান। কয়েক বছরের মাথায় চলতি দায়িত্ব পেয়ে পদবি দাঁড়ায় ‘অথরাইজড অফিসার’। আর এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকা শহরের ইমারত নির্মাণ তদারকি ও নকশা অনুমোদনের দায়িত্বে থেকে ‘দিনকে রাত’ করে গড়ে তোলেন বিপুল সম্পদের পাহাড়। চাকরিজীবন মাত্র ১০ থেকে ১২ বছরের। কিন্তু যখনই অনিয়ম-দুর্নীতির থলে থেকে বিড়াল বের হতে শুরু করে তখনই নানা কায়দা-কৌশলে বিদেশে পাড়ি জমান। আর ফেরেন না দেশে, যোগ দেন না কর্মস্থলে। আইনি ঝামেলা এড়িয়ে বাকি জীবন বিদেশে আয়েশে কাটানোই যেন তাদের মূল লক্ষ্য। রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমের অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে রাজউক চেয়ারম্যান বলছেন, বিদেশ গিয়ে যারা আর ফেরেনি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতি হলে করণীয় সম্পর্কে সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে রাজউক দ্রুত বিভাগীয় মামলা করতে পারে। পাশাপাশি অভিযোগগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হলে তারা দুর্নীতির অনুসন্ধানের পাশাপাশি অর্থপাচারের বিষয়টি তদন্ত করতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও (বিএফআইইউ) এ বিষয়ে পৃথক তদন্ত পরিচালনা করতে পারে।’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ জোন ৪/১-এর দায়িত্বে ছিলেন অথরাইজড অফিসার মাকিদ এহসান। তার বিদেশ ভ্রমণের ছুটির আবেদন দেখে তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞার কিছুটা সন্দেহ হয় এবং তিনি ছুটি নামঞ্জুর করেন। কিন্তু মাকিদ এহসান থেমে থাকেননি। তিনি গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনকে ‘ম্যানেজ’ করে একপ্রকার চাপ সৃষ্টি করেন এবং ১৫ দিনের ছুটি বাগিয়ে নেন। এরপর আমেরিকা গিয়ে আর দেশে ফেরেননি রাজউকের এই কর্মকর্তা। গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে প্রেষণে আসা অপর কর্মকর্তা নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ হোসেন ২০২০ সালের মার্চে ৩ বছরের জন্য পিএইচডি করতে বিদেশে যান। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও আর চাকরিতে ফেরেননি। একই কৌশলে ২০২৪ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান অথরাইজড অফিসার মো. ইমরুল হাসান। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে যাওয়ার আগে তিনি কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমতি নেননি। সরকারি পাসপোর্টের পাশাপাশি তার কাছে থাকা অন্য একটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইমিগ্রেশন পার হন। বিদেশে যাওয়ার পর তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যান মো. ছিদ্দিকুর রহমানকে ফোন করে ইমরুল হাসান জানিয়ে দেন, তিনি আর দেশে ফিরবেন না এবং চাকরিতেও যোগ দেবেন না। দীর্ঘদিন রাজউকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জোন-৩ ও জোন-৪-এর দায়িত্বে ছিলেন এই ইমরুল হাসান। তার অধীন ছিল গুলশান, বনানী, বারিধারা, খিলক্ষেত, পূর্বাচল, বসুন্ধরা, মিরপুর, নিকুঞ্জ, ভাষানটেক ও পল্লবীর মতো অভিজাত এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেন। এছাড়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্বালানি খাতে প্রায় ১২ লাখ টাকার অডিট আপত্তিসহ একটি বিভাগীয় মামলা রয়েছে। ইমরুল হাসানের খালাতো ভাই অথরাইজড অফিসার শেখ মাহাব্বির রনিও একই পথে হেঁটেছেন। ২০১৬ সালে রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে যোগ দিয়ে কাজ করেছেন জোন-৮-এ। পরে অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জোন ৩/১-এ। তিনিও বিদেশ গিয়ে আর ফেরেননি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে জোন-৮/২-এর অথরাইজড অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম (সাইফ) বিদেশে পাড়ি জমান। জাপানে এক বছর মেয়াদি মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য অফিশিয়াল অনুমতি নিয়ে গেলেও, জাপান থেকে তিনি এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দিয়েছেন। এ কর্মকর্তারও দেশে বা রাজউকের চাকরিতে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে, রাজউকের আরেক আলোচিত অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াস বিনা অনুমতিতে বিদেশে যান। মূলত অনুমতি ছাড়া যাওয়ার কারণ ছিল তিনিও আর ফিরবেন না। তবে বিদেশে স্থায়ী হতে না পেরে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আবার চাকরিতে যোগ দেন। রাজউক তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে। তবে চতুর এই কর্মকর্তা তৎকালীন প্রভাবশালী প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) উজ্জ্বল মল্লিককে ম্যানেজ করে বিভাগীয় মামলা রফা-দফা করেন এবং পূর্ণ শক্তিতে চাকরিতে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি জোন-৭/১ (শ্যামপুর, কদমতলী, দনিয়া) এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে বিদেশে যাওয়ার সম্ভাব্য তালিকায় আছেন জোন-১/১ এর অথরাইজড অফিসার শেখ মুহাম্মদ এহসানুল ইমাম। তার বিরুদ্ধে ১১ বছরের চাকরি জীবনে জোন ১, ২, ৩, ৫ ও ৭-এ দায়িত্ব পালনকালে বড় বড় বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করে আইনের ব্যত্যয় ঘটানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, সরকারি খাস জমি রূপায়ন হাউজিং এস্টেটকে দেওয়ার ঘটনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুদক তাকে আসামি করে মামলা দেয়। মামলার কয়েকজন আসামি অব্যাহতি পেলেও তিনি পাননি। ফলে ঝুঁকি এড়াতে যেকোনো সময় তিনি বিদেশে পাড়ি দিতে পারেন বলে মনে করছেন রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা। এছাড়া রাজউকের ‘প’ আদ্যক্ষরের দুই অথরাইজড অফিসারের বিদেশ পাড়ি দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান চালাচ্ছে। অন্যজনের বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে ইমারত নির্মাণ তদারকির বিষয়ে নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে একজন রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। আরেকজন সম্প্রতি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অথরাইজড অফিসারের ক্ষমতা পেয়েছেন। সূত্র জানায়, রাজউকে বর্তমানে ২৪টি জোন থাকলেও সব মিলিয়ে ১৮ থেকে ২০ জন অথরাইজড অফিসার মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ অবৈধ সুবিধা ছাড়া কোনো ফাইল এগিয়ে নেন না। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভবনের ফ্লোর এরিয়া রেশিও (ফার), সেটব্যাক কিংবা অন্যান্য আইনি শর্ত উপেক্ষা করে নির্মাণের সুযোগ দেন তারা। অনুসন্ধানে জানা যায়, একটি ১০ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এর চেয়ে উঁচু ভবনের ক্ষেত্রে সেই অঙ্ক ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায় গিয়ে পৌঁছায়। আবার ৫ থেকে ৭ তলা ভবনের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা দাবি করা হয়। বড় প্রকল্প বা বিধিমালাগত জটিলতা থাকলে ঘুষের অংক বাড়ে বহুগুণ। আর নকশা অনুমোদনের মধ্যস্ততাকারী হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরেই রাজউকের পদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শকরাও কাজ করে থাকেন। সার্বিক বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম সিজেডেএন টোয়েন্টফোর ডটকমকে বলেন, ‘যেসব কর্মকর্তা অনুমোদন না নিয়ে বিদেশে গেছেন বা নির্ধারিত ছুটির পর চাকরিতে ফেরেননি, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনকে ইতোমধ্যে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে।’ এই বিষয়ে সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, ‘চাকরি অবস্থায় অনুমোদন ছাড়া বিদেশে গেলে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কর্মকর্তাদের বিশেষ খাতির বা সখ্য থাকলে এসব বিষয় থেকে তারা রেহাই পেয়ে যান।’
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচ বিভাগের অধীনে নেওয়া ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সেচ উন্নয়ন প্রকল্পে’ ৬০২ কোটি টাকার কাজে নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প পরিচালনা, ঠিকাদার নিয়োগ থেকে শুরু করে কৃষকদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়- সবক্ষেত্রেই ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের এই প্রকল্পে কাগজে-কলমে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কাজ অগ্রগতি হয়েছে বলা হলেও কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। প্রকল্পের ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, কাগজে-কলমে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখানো, কৃষকদের কাছ থেকে ঘুষগ্রহণ, নিন্মমানের কাজ এবং কমিশন বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ পিডি নুরুল ইসলাম ও সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গণমাধ্যমে বিএডিসির এই অনিয়মের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে কাজ শুরু করেছে দুদকের একটি অনুসন্ধান টিম। দুদক ইতোমধ্যে নথিপত্র যাচাই-বাছাই শুরু করেছে। প্রকল্পের মূল কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে- সৌরচালিত ডাগওয়েল নির্মাণ, খাল পুনঃখনন, পাম্প হাউজ নির্মাণ, ২ কিউসেক ফোর্সমোড পাম্প সেট স্থাপন, ৫ কিউসেক সোলার পাম্প, বড় আকারের সেচ অবকাঠামো, মাঝারি আকারের সেচ অবকাঠামো, ছোট আকারের সেচ অবকাঠামোসহ, বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণকাজ। তথ্য সূত্রে জানা যায়, কাজ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন প্রকল্প পরিচালক পিডি নুরুল ইসলাম। এবং সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বাকী টাকা টাকা লুট করেন। মাঠপর্যায়ে এসব কাজের অনেকটাই হয়নি যা হয়েছে নিম্নমানের। টেন্ডার সিন্ডিকেট, কাগুজে বিল-ভাউচার তৈরি এবং নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বরাদ্দের বড় অংশ এভাবেই আত্মসাৎ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাঠে নালা নেই, কাজ নেই, পানি নেই, কিন্তু কাগজপত্রে ‘কাজ শেষ’। সিন্ডিকেটের পকেটে চলে গেছে কোটি কোটি টাকা। এই জালিয়াতিতে হাজার হাজার কৃষকের সেচের স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে। কাগজপত্রে ভূতুড়ে উন্নয়ন। এই প্রকল্পের জালিয়াতির ‘ভিলেন’ খোদ প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম ও সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ। এদিকে—অনিয়ম ফাঁস হতেই নতুন পিডি অফিসে পা রাখার ঠিক এক ঘণ্টা আগে দপ্তর ছেড়ে চম্পট দেন পিডি নুরুল। লাপাত্তা হলেও শেষ মুহূর্তে পছন্দের লোকজনকে টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া এবং সহকারী প্রকৌশলীকে দিয়ে সাব-কন্ট্রাক্ট করাতে মরিয়া হয়েছেন নুরুল ইসলাম। ইতিপূর্বেও ৩৬ খাতের দুর্নীতির রেকর্ড রয়েছে বিতর্কিত এই পিডির ও তমাল দাশের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পটিতে গত দুই অর্থবছরে মাঠপর্যায়ে কোনো কাজই করা হয়নি। অথচ চট্টগ্রাম জোন ও দোহাজারীতে ৩০টি গ্রুপ এবং রাউজান, মিরসরাই ও হাটহাজারী জোনে ৩৫টি গ্রুপসহ অন্তত ১০০টি কোটেশন দরপত্র দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ভুয়া বিল উত্তোলন করা হয়েছে। রাউজান, মিরসরাই ও হাটহাজারী জোনের দায়িত্বে থাকা বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশের সঙ্গে যোগসাজশে মাঠপর্যায়ে কোনো অবকাঠামোগত কাজ না করেই এসব ভুয়া বিলের ছাড়পত্র দেন পিডি নুরুল ইসলাম বদলি ঠেকাতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্বারে দৌড়ঝাঁপ নজিরবিহীন অনিয়ম ও জালিয়াতির মধ্যে গত ২১ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা-২ শাখার সচিব আবু জাফর রাশেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে বিএডিসি রাঙ্গামাটি সেচ রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী (সেচ) মোহাম্মদ সাহেদকে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর নতুন পিডির দায়িত্ব গ্রহণের কথা ছিল। নতুন প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাহেদ বলেন, ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে তিনি কালুরঘাটস্থ বিএডিসি চট্টগ্রাম সার্কেল অফিসে দায়িত্ব নিতে যান। তবে তাঁর পৌঁছানোর ঠিক এক ঘণ্টা আগে অফিস ছেড়ে পালিয়ে যান নুরুল ইসলাম। এর আগে তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে আদেশের কপি পাঠানো হলেও এবং একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অভিযোগ রয়েছে, বদলি ঠেকানোর জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে দৌড়ঝাঁপ ও ভারী তদবির চালাচ্ছেন তিনি। সহকারী প্রকৌশলী তমাল নিজেই যখন ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’ অফিস ছেড়ে পালিয়ে বেড়ালেও গত ৬ সেপ্টেম্বর ইস্যুকৃত বিভিন্ন টেন্ডারের কাজ তড়িঘড়ি মূল্যায়ন করে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন নুরুল ইসলাম। অনুসন্ধানে দেখা যায়, পিডির নিজস্ব সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছে, মেসার্স শেখ আনাছ, এম.আর.এস. বিপ্লব, ম্যাক্স ওয়েল, সেবা এন্টারপ্রাইজ, সাদিক এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সিনহা এন্টারপ্রাইজ এবং এ রহমান এন্টারপ্রাইজ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো টেন্ডার ও কোটেশনে মোটা অংকের কমিশন দিয়ে একাধিক কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ সরাসরি পিডি নুরুল ইসলামে ও ঠিকাদারদের ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে কাজ করেন। অন্য কোনো সাধারণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেলে সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশকে জোরপূর্বক ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’ হিসেবে কাজ দিতে বাধ্য করা হতো একাধিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে। এছাড়া চলতি বছরের মে মাসে মেগা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করে দশটি প্রতিষ্ঠানকে কাজের জন্য মূল্যায়ন করা হলেও, ৯টি বৈধ প্রতিষ্ঠানকে অদ্যাবধি কোনো কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ার নিয়ম না মেনে টেন্ডারের আগে প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের ভাই বিপ্লবের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এম.আর.এস. বিপ্লব’কে কাজটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ইতিমধ্যেই বিলের টাকাও তুলে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিতর্কিত এই কাজ তদারকির দায়িত্বে ছিলেন সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ। এর মাঝে তমাল পিডির লুটপাটের অংশ হিসেবে তিনিও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। নুরুল ইসলামের দুর্নীতির রেকর্ড নতুন নয়। ২০২১ সালের ২০ জুন অনিয়মের অভিযোগে মাত্র চার মাসের মাথায় তাঁকে এই প্রকল্পের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে হবিগঞ্জে বদলি করা হয়েছিল। সেখানে বিএডিসির ভবন নির্মাণে নিম্নমানের কাজ করার প্রমাণ মেলে। কর্তৃপক্ষের তদন্তে সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে ৩৬টি খাতে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল। সুপেয় ও সেচের পানির তীব্র সংকটে কৃষি ও সেচের জন্য বড় ধাক্কা উপকূলীয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সুপেয় ও সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকট নিরসনে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন মেয়াদে ৬০২ কোটি ২৬ লাখ টাকার এই সেচ প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। ৮০ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় এনে প্রতি বছর ১ লাখ টন অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও শুরুতেই পিডির হরিলুটে ভেস্তে যেতে বসেছে এই সরকারি উদ্যোগ। এই বিষয়ে বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি, এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া মেলেনি। এসব জালিয়াতি ও পলায়নের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। বিএডিসির যুগ্ম পরিচালক (বীজ বিপণন) মো. মাহমুদুল আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এছাড়া বিএডিসির সচিব (উপসচিব) আবু জাফর রাশেদের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি। প্রিয় পাঠক—সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশের
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে দুই বিমানকর্মীর জুতার ভেতর বিশেষ কায়দায় লুকানো ৮০টি স্বর্ণেরবার উদ্ধার করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। উদ্ধার স্বর্ণের মোট ওজন প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (CIID) কর্মকর্তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সতর্ক অবস্থান নেন। পরে দুবাই থেকে ঢাকায় আসা এমিরেটস এয়ারলাইন্সের EK0582 ফ্লাইটের রানওয়েতে দুই বিমানকর্মীর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে তাদের তল্লাশি করা হয়। এ সময় তাদের পরিহিত জুতার ভেতরে বিশেষ কায়দায় লুকানো অবস্থায় স্বর্ণেরবারগুলো পাওয়া যায়। উদ্ধার করা স্বর্ণের সংখ্যা ৮০টি। প্রতিটি স্বর্ণবারের ওজন প্রায় ১১৭ গ্রাম। সব মিলিয়ে উদ্ধারকৃত স্বর্ণের ওজন প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি। কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিমানকর্মীদের জুতার ভেতরে স্বর্ণবার লুকিয়ে আনার ঘটনাটি চোরাচালানের একটি অভিনব কৌশল। এ ঘটনায় কারা জড়িত, স্বর্ণগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং ঢাকায় কার কাছে এসব স্বর্ণ পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সংঘবদ্ধ একটি চক্র বিমানকর্মীদের ব্যবহার করে স্বর্ণ চোরাচালানের চেষ্টা করে থাকতে পারে। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের চালানটির সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদসহ তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৫ আন্তর্জাতিক হকি বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ ফুটবল প্রেমীদের মতো হকি প্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের কঠিন পর্ব অতিক্রম করে দুই দলই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য এই ফাইনাল ম্যাচে উভয় দল নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত। আর্জেন্টিনা দল এই টুর্নামেন্টে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। অধিনায়ক লুকাস মার্টিনেজ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছি। দলের সবাই একসঙ্গে কাজ করে ফাইনালে পৌঁছেছি। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট — বিশ্বকাপ জিততে হবে। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ বজায় রেখেছি এবং আগামী ম্যাচেও তা বজায় রাখব।” আর্জেন্টিনা দলের ফিজিক্যাল ট্রেনার জানান, দল খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য বিশেষ অনুশীলন চালাচ্ছে যাতে ফাইনালে তারা চাপ সামলাতে পারে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের কোচ মাইকেল ডি ইয়ং ফাইনালের আগের প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দল গত কয়েক মাস ধরে কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছে। খেলোয়াড়রা মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা চাই এই বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস গড়ে একটি শক্তিশালী ছাপ রেখে যেতে।” কোচ আরো বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র ফাইনালে উঠা নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়। আমরা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিজেদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।” বিশ্বের হকি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ফাইনাল ম্যাচটি গত দশকের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা হতে চলেছে। উভয় দলের কৌশল, বল নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুতগতির খেলায় যে মেধা প্রদর্শিত হয়েছে, তা ফুটবলের মতো অন্য কোনো খেলার ক্ষেত্রে বিরল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফাইনালে দলের মানসিক স্থিতিশীলতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা বিজয় নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে। মাঠে উভয় দলের খেলোয়াড়রা দ্রুতগতির পাস, শক্তিশালী ডিফেন্স এবং আক্রমণাত্মক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মাঠ মাতানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকারের গতিবেগ এবং নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডারদের কৌশলগত দক্ষতা ম্যাচে প্রধান আকর্ষণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও গোলরক্ষকদের প্রতিটি সেভ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াও ম্যাচের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশ্বজুড়ে লাখো হকি ভক্ত এই ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার দেখার জন্য অপেক্ষায় আছেন। অনলাইনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ম্যাচের লাইভ স্ট্রিমিং অনুষ্ঠিত হবে এবং অনেক দেশের টেলিভিশনও সরাসরি সম্প্রচার করবে। হকি প্রেমীরা এই ম্যাচ থেকে দারুণ উত্তেজনা, দক্ষতা এবং খেলা উপভোগ করার আশা করছে। মাঠের বাইরেও ভক্তদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ফ্যান জোন আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে খেলোয়াড় ও দর্শকরা একত্রে সময় কাটিয়ে খেলার আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। এছাড়াও টুর্নামেন্ট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে এবং খেলা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে দুই দলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে আগামী দিনে বিশ্ব হকির নতুন ধারার রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এই ম্যাচের ফলাফল আগামী দশক ধরে হকির কৌশলগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের হকি টুর্নামেন্ট হওয়ায় এর প্রতি ভক্তদের আগ্রহ ও উন্মাদনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সবাই আশা করছেন, আগামীকালের ফাইনাল হবে একটি স্মরণীয় খেলা, যেখানে স্পোর্টসম্যানশিপ, দক্ষতা ও উত্তেজনা থাকবে সর্বোচ্চ মাত্রায়।