আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন দেশে অস্থিরতা চলছে, ঠিক সেই সময়ে চাঁদপুর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল নিয়ে শুরু হয় লুটপাটের কাজ। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে টেন্ডার ছাড়াই প্রকল্প, কোথাও কাজ না করে—কোথাও নামমাত্র কাজ করে পুরো কাজের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে মাত্র দুই দিনে ২১টি চেকের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওসমান গণি পাটোয়ারী অপসারণের ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট বিভিন্ন প্রকল্পের নামে ইস্যু করা হয় ১৭টি চেক; এসব চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর চার দিন আগে ১৪ আগস্ট চারটি প্রকল্পের বিপরীতে আরও ১৬ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ ১৪ ও ১৮ আগস্টের নথিতে থাকা অঙ্ক যোগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। যদিও জেলা পরিষদ প্রশাসকের বক্তব্যে এই দুই দিনের উত্তোলনের পরিমাণ ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বলা হয়েছে।
নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও জেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রকল্পে কাজ হয়নি। আবার কোথাও আংশিক কাজ হলেও পুরো কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল দেওয়া হয়েছে। আবার কোনও কোনও ঠিকাদার দাবি করেছেন, তাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ ও বিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও প্রকল্প সম্পর্কে তারা কিছুই জানতেন না।
অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট চাঁদপুর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে চারটি প্রকল্পের বিপরীতে ১৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর চেয়ারম্যান অপসারণের আগের দিন ১৮ আগস্ট বিভিন্ন প্রকল্পের নামে ইস্যু করা হয় আরও ১৭টি চেক। এসব চেকের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। অর্থাৎ মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড়ের ঘটনা ঘটে। এই ১৭টি চেকের মধ্যে চেয়ারম্যানের আত্মীয় ঠিকাদার শেখ নজরুল ইসলামের নামে একদিনেই সাতটি প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৭০ লাখ টাকার বিল দেওয়ার তথ্যও রয়েছে।
হলরুমের কাজে প্রায় ১৬ লাখ টাকা বিলের প্রশ্ন
নথিতে থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে জেলা পরিষদের হলরুমের ওয়াল টাইলসকরণ এবং ভবন সংস্কার ও রংকরণ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। মেসার্স শরীফ অ্যান্ড ব্রাদার্স ও মেসার্স আরিফুল ইসলাম এন্টারপ্রাইজের নামে নেওয়া এই দুটি প্রকল্পের মূল্য প্রায় ১৬ লাখ টাকা। অনুসন্ধান দেখা গেছে, বাস্তবে কোনও কাজ না করেই প্রকল্প দুটির বিপরীতে পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
যা বলছেন ঠিকাদার
মেসার্স শরীফ অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী শরীফ মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, “জেলা পরিষদের হলরুমের কোনও কাজ আমি করিনি—এটি শতভাগ নিশ্চিত। তবে আমার লাইসেন্সে অন্যরা দুই-তিনটি কাজ করেছে। ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রে একজনের লাইসেন্সে আরেকজন কাজ করে, এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এ কাজটি কে করেছে, এ বিষয়ে আসলে আমার খোঁজ নিতে হবে।”
তবে এর একদিন পর নিজের আগের বক্তব্য পরিবর্তন করে তিনি বলেন, “আমার লাইসেন্সে কাজ করেছি বলেই আমার নামে বিল হয়েছে। আমরাই কাজ করেছি।”
অন্যদিকে হলরুমের ওয়াল টাইলসকরণ প্রকল্পের ঠিকাদার আরিফুল ইসলাম বলেন, “এ দুটি কাজ সম্পর্কে আমি জানি না। কাজগুলো কী ছিল, তাও বলতে পারবো না। প্রকল্প পাসের প্রক্রিয়াও আমার জানা নেই।”
তার অভিযোগ, জেলা পরিষদের প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাকে ফোন করে সকালে চেক নিয়ে যেতে বলেন এবং বিকালে টাকা ফেরত নেওয়ার কথা জানান। আরিফুল ইসলাম বলেন, “টাকা উত্তোলনের পর ওই দিন বিকালেই প্রায় ১৮ লাখ টাকা ইঞ্জিনিয়ার আমার কাছ থেকে নিয়ে যান।”
তিনি আরও বলেন, “আমি সহজ-সরলভাবেই আমার লাইসেন্সে কাজ করার অনুমতি দিয়েছিলাম। ঠিকাদারি সেক্টরে এটি প্রায়ই হয়ে থাকে। তবে প্রকল্প সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। যদি কাজ না করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে থাকে, তাহলে আমি এর বিচার দাবি করছি।”
একদিনেই ঠিকাদার নজরুলের নামে প্রায় ৭০ লাখ টাকা
১৮ আগস্ট ইস্যু করা চেকগুলোর মধ্যে চেয়ারম্যানের আত্মীয় ঠিকাদার শেখ নজরুল ইসলামের নামে সাতটি প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৭০ লাখ টাকার চূড়ান্ত বিল দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব প্রকল্পের কয়েকটির কাজ তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এর মধ্যে বাবুরহাট মার্কেটের সাইট প্রস্তুত ও বালু ভরাটের দুটি কাজের বিপরীতে প্রায় ২৭ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। তবে শেখ নজরুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি যে কাজ করেছেন শুধু সেই কাজেরই বিল নিয়েছেন।
একদিনে ৭০ লাখ টাকা উত্তোলনের কথা শুনে প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমি যে কাজ করেছি, তারই বিল নিয়েছি। কাজের বাইরে কোনও বিল নিইনি। অফিস বা ইঞ্জিনিয়ারকে জিজ্ঞেস করুন। তারা জানেন।”
তিনি বলেন, “মার্কেটের সাইট প্রস্তুতকরণের জন্য অবকাঠামো অপসারণের কাজের জন্য ভেকু ইঞ্জিনিয়ার ও নির্বাহী কর্মকর্তা কন্টাক্ট করেছেন। তারা বলতে পারবেন কত টাকা ব্যয় হয়েছে। আমার লাইসেন্স ব্যবহার করে আমাকে দিয়ে টাকা উঠিয়ে তারা লেনদেন করেছেন।”
বালু ভরাটের বিষয়ে তিনি বলেন, “বাবুরহাট বাজারের মসজিদের সামনে খাল ভরাট করা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার আর নির্বাহী কি কাজ না দেখে আমাকে বিল দিয়েছেন? আমি কাজ করা ছাড়া কোনও টাকা নিইনি।”
তবে বাবুরহাট বাজারের ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, উচ্ছেদ অভিযানের পর জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সেখানে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ১০০ গাড়ি বালু ফেলা হয়েছিল। ব্যবসায়ীরাও নিজেদের উদ্যোগে কিছু জায়গায় বালু ফেলেছেন। এরপরও পুরো জায়গা ভরাট হয়নি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, ওই সময়ের বালুর মূল্য হতে পারে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা।
আরও ৩৪ লাখের পাঁচ চেক
নথিতে আরও পাঁচটি চেকের তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে চেয়ারম্যান অপসারিত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অর্থ উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে জেলা পরিষদের হিসাবরক্ষক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান স্যারের অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফাইলগুলো আমার কাছে এসেছে। নিয়ম অনুযায়ী সেই ফাইলগুলোর জন্য আমি চেক লিখে চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করি। চেকগুলোতে চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করেন। তবে পরবর্তীতে কী কারণে নির্বাহী স্যার চেকগুলো বাতিল করেছেন, তা তিনি বলতে পারবেন।”
ভুয়া প্রজেক্ট তৈরি করে ৩৪ লাখ টাকার চেক তৈরি
তবে জেলা পরিষদের প্রশাসক সেলিম উল্লাহ সেলিম বলেন, “এই পাঁচটি চেকের বিপরীতে কোনও ফাইল নেই, প্রজেক্ট নেই। নির্বাহী কর্মকর্তা কেন স্বাক্ষর করলেন? তিনি স্বাক্ষর করা মানে প্রজেক্ট সম্পন্ন হওয়া। সম্পূর্ণ ভুয়া প্রজেক্ট তৈরি করে ৩৪ লাখ টাকার পাঁচটি চেক তৈরি করেন।”
কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি—‘দু-একটি কাজ মোটেই হয়নি’
জেলা পরিষদের উচ্চমান সহকারী আব্দুল কুদ্দুস ভাটও কয়েকটি প্রকল্পের কাজ না হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার জানামতে যেসব প্রকল্পের কথা বলে বিল নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অফিসের ভেতর কোনও কাজ হয়নি। অন্যান্য কাজ আংশিক হয়েছে। কয়েকটি কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে। সব অনিয়ম হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়; আবার সব যে ঠিকঠাক হয়েছে, তাও নয়।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, কাজের সাইট পরিদর্শন ও তদারকির দায়িত্ব প্রকৌশলীর। প্রকৌশলী কাজের পরিমাণ ও বাস্তবায়ন যাচাই করে সার্টিফাই করলে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “নথি পর্যালোচনা করে দেখেছি, কোনও ফাইলে সার্টিফাই লেখা আছে, আবার কোনোটিতে নেই। তবে তিনিই বিল প্রস্তুত করেছেন, স্বাক্ষর দিয়েছেন—সে অনুযায়ী সমস্ত প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়।”
প্রশাসক বলছেন, প্রজেক্ট নেই, কাজ হয়নি
চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সেলিম উল্লাহ সেলিম বলেন, “সকল ফাইল স্বাক্ষর করতে হবে জেলা পরিষদের অফিসে বসে। কিন্তু তিনি অফিসে না বসলেও চার দিনের ব্যবধানে এক কোটি ৭৫ লাখ টাকার বিল অনুমোদন হয়ে গেলো। এগুলো আমি যাচাই-বাছাই করে দেখেছি—প্রজেক্ট নেই, কাজ হয়নি। সম্পূর্ণ ভুয়া প্রজেক্ট দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় প্রকল্পের বাস্তবতা ও কাজের অগ্রগতি যাচাই করা হয়নি।
সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন ভুল করে লেখা হয়েছিল
চেক বাতিলের বিষয়ে জেলা পরিষদের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, “চেকগুলো কীভাবে হয়েছে, তা জানার পরই সেগুলো বাতিল করা হয়।” তিনি বলেন, “যতদূর মনে পড়ে, ওই ফাইলগুলো সঠিক ছিল না। ভুল করে লেখা হয়েছিল।”
তার দাবি, প্রকৌশলীর প্রত্যয়ন ছাড়া কোনও বিল দেওয়া হয় না। তিনি আরও বলেন, “বরং অনেকে ঠিকঠাক কাজ না করা, ব্যক্তি স্বার্থের প্রকল্প—এ ধরনের কয়েকটি প্রকল্প ৫ আগস্টের পর বাতিল করেছি।”
ঠিকাদারদের লাইসেন্স ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “এসব প্রতিষ্ঠান অনেকটা ওয়ান ম্যান শো। এসব প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান-ইঞ্জিনিয়ারের পছন্দের লোকজন বেশির ভাগ জায়গায় এনলিস্টেড হয়। ঘুরেফিরে ওইসব ঠিকাদারই কাজ পায়। আমরা শুধু নিয়ম-কানুনগুলো দেখে দিই। আমাদের এখানে কোনও ব্যক্তি স্বার্থ নেই।”
ঠিকাদারদের অভিযোগ সম্পর্কে তার প্রশ্ন, “বিল তো তাদের কাছেই গিয়েছে। তিনি না জানলে বিলের জন্য আবেদন করলো কে?”
প্রকৌশলী বললেন কাজ হওয়ার পরই বিল দিয়েছি
জেলা পরিষদের সাবেক প্রকৌশলী ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন প্রকল্পকে পুরোপুরি বাস্তবায়িত দেখিয়ে কাজ বুঝে নেওয়ার সার্টিফিকেট দিয়েছেন।
তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “কাজ হওয়ার পরই বিল দিয়েছি, কাজ ছাড়া তো বিল দেওয়ার কথা না। চেকগুলো সম্ভবত আগের চেয়ারম্যান স্যার স্বাক্ষর করেছেন।”
ঠিকাদারদের লাইসেন্সে কারা কাজ করলো?
অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কাজের প্রকল্প, বাস্তবায়ন এবং অর্থ উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য।
একাধিক ঠিকাদার বলেছেন, তাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের ধরন, কাজের পরিমাণ কিংবা বাস্তবায়নের স্থান সম্পর্কে তারা বিস্তারিত জানতেন না বলে দাবি করেছেন।
অন্যদিকে জেলা পরিষদের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, বিল ঠিকাদারদের কাছেই গেছে এবং তারা না জানলে বিলের জন্য আবেদন করলো কে—এ প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
ফলে কোন ঠিকাদারের লাইসেন্সে কোন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে কাজ কে করেছেন, কে সাইট পরিদর্শন করেছেন, কে কাজ সম্পন্নের প্রত্যয়ন দিয়েছেন এবং উত্তোলিত অর্থ শেষ পর্যন্ত কার হাতে গেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদন্তে দুদক
এসব অভিযোগ সামনে এলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বা অন্য কারও বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পরিষদের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন সরদার।
তিনি বলেন, “আমি এখানে যোগদানের পরে সম্প্রতি আমরা দুদক থেকে একটি চিঠি পেয়েছি। এ বিষয়ে তারা তথ্য চেয়েছে। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে দুদকের চিঠি পাওয়ার পর। এখন যেহেতু বিষয়টি দুদক তদন্ত করছে, তাদের আমরা যতটুকু সম্ভব তথ্য দেবো। আমাদের আলাদা করে তদন্ত করার বিষয় থাকবে না।”
নথিতে পাওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন, কাজ না হওয়ার অভিযোগ, ঠিকাদারদের লাইসেন্স ব্যবহারের দাবি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রত্যয়ন নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য—সব মিলিয়ে চাঁদপুর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এখন দুদকের তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে, প্রকল্পগুলোর বাস্তব কাজ কতটুকু হয়েছিল এবং উত্তোলিত অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৫ আন্তর্জাতিক হকি বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ ফুটবল প্রেমীদের মতো হকি প্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের কঠিন পর্ব অতিক্রম করে দুই দলই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য এই ফাইনাল ম্যাচে উভয় দল নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত। আর্জেন্টিনা দল এই টুর্নামেন্টে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। অধিনায়ক লুকাস মার্টিনেজ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছি। দলের সবাই একসঙ্গে কাজ করে ফাইনালে পৌঁছেছি। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট — বিশ্বকাপ জিততে হবে। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ বজায় রেখেছি এবং আগামী ম্যাচেও তা বজায় রাখব।” আর্জেন্টিনা দলের ফিজিক্যাল ট্রেনার জানান, দল খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য বিশেষ অনুশীলন চালাচ্ছে যাতে ফাইনালে তারা চাপ সামলাতে পারে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের কোচ মাইকেল ডি ইয়ং ফাইনালের আগের প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দল গত কয়েক মাস ধরে কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছে। খেলোয়াড়রা মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা চাই এই বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস গড়ে একটি শক্তিশালী ছাপ রেখে যেতে।” কোচ আরো বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র ফাইনালে উঠা নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়। আমরা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিজেদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।” বিশ্বের হকি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ফাইনাল ম্যাচটি গত দশকের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা হতে চলেছে। উভয় দলের কৌশল, বল নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুতগতির খেলায় যে মেধা প্রদর্শিত হয়েছে, তা ফুটবলের মতো অন্য কোনো খেলার ক্ষেত্রে বিরল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফাইনালে দলের মানসিক স্থিতিশীলতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা বিজয় নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে। মাঠে উভয় দলের খেলোয়াড়রা দ্রুতগতির পাস, শক্তিশালী ডিফেন্স এবং আক্রমণাত্মক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মাঠ মাতানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকারের গতিবেগ এবং নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডারদের কৌশলগত দক্ষতা ম্যাচে প্রধান আকর্ষণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও গোলরক্ষকদের প্রতিটি সেভ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াও ম্যাচের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশ্বজুড়ে লাখো হকি ভক্ত এই ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার দেখার জন্য অপেক্ষায় আছেন। অনলাইনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ম্যাচের লাইভ স্ট্রিমিং অনুষ্ঠিত হবে এবং অনেক দেশের টেলিভিশনও সরাসরি সম্প্রচার করবে। হকি প্রেমীরা এই ম্যাচ থেকে দারুণ উত্তেজনা, দক্ষতা এবং খেলা উপভোগ করার আশা করছে। মাঠের বাইরেও ভক্তদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ফ্যান জোন আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে খেলোয়াড় ও দর্শকরা একত্রে সময় কাটিয়ে খেলার আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। এছাড়াও টুর্নামেন্ট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে এবং খেলা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে দুই দলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে আগামী দিনে বিশ্ব হকির নতুন ধারার রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এই ম্যাচের ফলাফল আগামী দশক ধরে হকির কৌশলগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের হকি টুর্নামেন্ট হওয়ায় এর প্রতি ভক্তদের আগ্রহ ও উন্মাদনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সবাই আশা করছেন, আগামীকালের ফাইনাল হবে একটি স্মরণীয় খেলা, যেখানে স্পোর্টসম্যানশিপ, দক্ষতা ও উত্তেজনা থাকবে সর্বোচ্চ মাত্রায়।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
মোঃ সোহেল রানা বিশেষ প্রতিবেদক আদালতের স্থগিতাদেশের সুযোগে নির্মাণকাজ চালানোর দাবি; তদারকিতে গাফিলতি নাকি যোগসাজশ? ঢাকা: রাজধানীতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অননুমোদিত ভবন নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। এর মধ্যেই সরকারি ছুটির দিন ও সাপ্তাহিক বন্ধের সুযোগে কিছু নির্মাণাধীন ভবনে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্মাণকাজ কয়েক তলা এগিয়ে যাওয়ার পর শুরু হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়া। অনুসন্ধানে এমন ৩ থেকে ৪টি ভবনকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ভবনের অনুমোদিত নকশা, নির্মাণের বর্তমান অবস্থা, আদালতের আদেশ এবং রাজউকের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। ছুটির দিনে নির্মাণকাজ, নজরদারি কোথায়? অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ছুটির দিন ও সাপ্তাহিক বন্ধের সময়ও কিছু নির্মাণাধীন ভবনে কাজ চলতে থাকে। এসব ভবনের নির্মাণকাজ অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী হচ্ছে কি না, ভবনের উচ্চতা, সেটব্যাকসহ অন্যান্য বিধিবিধান মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মবহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে শুরুতেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে সড়কব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন, অগ্নিনিরাপত্তা ও সামগ্রিক নগর ব্যবস্থাপনায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। নির্মাণের পর আদালতের আশ্রয়? অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু ভবনের নির্মাণকাজ নিয়ে আপত্তি ওঠার পর সংশ্লিষ্ট ভবনমালিকেরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছয় মাসের স্থগিতাদেশ বা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ পাওয়ার দাবিও রয়েছে। তবে আদালতের আদেশের প্রকৃতি না জেনে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার বৈধতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত করার আদেশকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট মামলার আদেশ, রাজউকের নোটিশ ও ভবনের অনুমোদিত নকশা পর্যালোচনা করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। অভিযোগ রয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া চলাকালে কোনো কোনো ভবনের নির্মাণকাজ এগিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না এবং রাজউক কী ধরনের তদারকি করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভবনমালিকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ৩–৪টি ভবনের মালিকদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। বারবার ফোন করেও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়নি। ফলে ভবনগুলোর নির্মাণ অনুমোদন, আদালতের আদেশ, নির্মাণকাজের বর্তমান অবস্থা এবং উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে ভবনমালিকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। রাজউক জোন-৬-এর বক্তব্য এ বিষয়ে রাজউক জোন-৬-এর অথরাইজড অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অনিয়ম প্রতিরোধে তাঁরা তাঁদের এখতিয়ার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে চিহ্নিত ভবনগুলোতে কী ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে, কোন ভবনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কতটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি। ফলে সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর বিরুদ্ধে রাজউকের গৃহীত ব্যবস্থার ধরন ও অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় মাঠপর্যায়ে তদারকি কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। চেয়ারম্যানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বিষয়টি নিয়ে রাজউকের চেয়ারম্যানের বক্তব্য নেওয়ার জন্যও ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। অননুমোদিত ও নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ প্রতিরোধে রাজউকের নজরদারি ব্যবস্থা, সরকারি ছুটির দিনে তদারকি এবং আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে চেয়ারম্যানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। তদারকিতে ঘাটতি, নাকি দায়িত্ব পালনে অবহেলা? রাজধানীতে কোনো ভবনের নির্মাণকাজ বিধিবহির্ভূতভাবে এগিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ভবনমালিকের দায়ের পাশাপাশি তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে দায়িত্বে অবহেলা কিংবা কোনো কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র, পরিদর্শন প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে, কোনো ভবনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর রাজউক কখন ব্যবস্থা নিয়েছে, সেই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়েছে এবং নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ থাকলে তা মানা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। শেষ কথা রাজধানীর পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শুধু ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করাও জরুরি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ভবনমালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এখন প্রশ্ন—রাজধানীর ভবন নির্মাণে অনিয়ম ঠেকাতে রাজউকের তদারকি কতটা কার্যকর? আর অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও নির্মাণকাজ চলতে থাকলে তার দায় নেবে কে?
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আলোচিত সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের ছেলে ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামকে ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ বি এম তারিকুল কবীর এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী আরিফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রায় ঘোষণার আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুদক ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য আজকের দিনটি ধার্য করা হয়েছিল। এ মামলায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে আদালত। পরবর্তীতে ২৪ সেপ্টেম্বর আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছিলেন সিয়াম। এর আগে গত ১৭ জুন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিল একই আদালত। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৩৭ লাখ ৩০ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছরের ৫ জানুয়ারি সিয়ামের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপসহকারী পরিচালক জাকির হোসেন। তদন্ত শেষে একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। তদন্তে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৩১ লাখ ৮১ হাজার টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। উল্লেখ্য, সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম পিএসসির প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে আলোচিত ড্রাইভার আবেদ আলীর ছেলে। সিয়াম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
, ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ডেপুটেশনে (প্রেষণে) কর্মরত খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রশাসনিক ব্ল্যাকমেইল এবং অঢেল অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এক সাধারণ সেচপাম্প মেরামতকারীর সন্তান হয়েও সরকারি চাকরির সুবাদে তিনি কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের মালিক হয়েছেন। ১৫ অক্টোবর ২০২৬ প্রাপ্ত বিস্তৃত অনুসন্ধানী তথ্য ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বরাতে জানা যায়, বিগত দুই যুগ ধরে নিজ মূল কর্মস্থলে না ফিরে ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ে অবস্থান করে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সরকারি পদে অবস্থান সত্ত্বেও বদলি-বাণিজ্য, পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগে তদবির এবং অবৈধ অর্থের লেনদেনে জড়িয়ে পড়ার দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিভাগীয় তদন্তের জোর দাবি উঠেছে। প্রাপ্ত অনুসন্ধানী নথি সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালের ২৬ ডিসেম্বর সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের জোরালো সুপারিশ ও রাজনৈতিক প্রভাবে খাদ্য বিভাগে যোগদান করেন শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল। চাকরিতে প্রবেশের পূর্বে তিনি গফরগাঁও সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের পদধারী নেতা এবং তৎকালীন কলেজ ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুধু প্রশাসনিক দুর্নীতিই নয়, ১৯৯৭ সালের ২৯ এপ্রিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গফরগাঁও সফরকালে বিএনপির জনসমাবেশমুখী বহরে হামলাকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য হিসেবেও তাঁর নাম স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের জুলাই মাসে ময়মনসিংহের ফুলপুর এলএসডিতে ধান সংগ্রহের সময় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলায় পদায়ন করা হয়। তবে রহস্যজনকভাবে সেখান থেকে কয়েক মাসের মধ্যে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় বদলি হয়ে কৌশলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে প্রেষণে (ডেপুটেশনে) যুক্ত হন তিনি। এরপর থেকে আর মূল কর্মস্থলে ফেরেননি তিনি। জেলা কার্যালয়ে দীর্ঘ অবস্থানের সুযোগে সহকর্মীদের বদলি-পদায়ন নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং কোনো কর্মকর্তা প্রতিবাদ জানালে নিজস্ব অনুগত সাংবাদিকদের লেলিয়ে দিয়ে হেনস্তা করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি এবং সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে চরম অসংগতিপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন কামাল। তাঁর দৃশ্যমান ও বেনামি সম্পদের তালিকার মধ্যে রয়েছে— ময়মনসিংহের আবাসন ও সম্পত্তি: শহরের মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজায় ৭সি নম্বরের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, আমলাপাড়া মাদ্রাসার পাশে একটি আস্ত ফ্ল্যাট, দুর্গাবাড়ী রোডে একটি বাণিজ্যিক দোকান এবং কাঁচিঝুলি এলাকায় দুই ভাইয়ের নামে চারতলা নির্মিত (ছয়তলা ফাউন্ডেশন) আবাসন। এ ছাড়া নতুন বাজার ফারহান কমপ্লেক্সে দুটি নতুন ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বাণিজ্যিক জমি ও অন্যান্য: ময়মনসিংহের ঢাকা বাইপাস মোড়ে এসএসসি-৯৩ ব্যাচের বন্ধুদের সঙ্গে কেনা মূল্যবান জমিতে তাঁর তিনটি নিজস্ব শেয়ার রয়েছে। একই সঙ্গে গফরগাঁও জামতলা মোড়ে একটি দোকান এবং ইমামবাড়ী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন বাজারে একাধিক বাণিজ্যিক পজিশন রয়েছে। রাজধানীর সম্পত্তি ও বিলাসবহুল গাড়ি: ঢাকার উত্তরা অভিজাত এলাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং ঢাকা মেট্রো-গ-৪৩-২৬৪৭ নম্বরের একটি উন্নত টয়োটা প্রিমিও গাড়ি ব্যবহার করেন তিনি। তবে বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটি সাবেক যুবলীগ নেতা ও খাদ্য বিভাগের পরিবহন ঠিকাদার আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে আজাদের নামে নিবন্ধিত, যা কামালের ইনডেক্স প্লাজার গ্যারেজে সংরক্ষিত থাকে। স্বজনদের নামে বিনিয়োগ: নিজের স্ত্রী নূরজাহান বেগম, ছোট ভাই শাহ ইশতিয়াক রুবেল এবং বেকার শ্যালক ফাহিমের এনআইডি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার জমি, ব্যবসা ও বেনামি ব্যাংকিং বিনিয়োগ গড়ে তোলারও সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে এসেছে। খাদ্য পরিদর্শকের অনিয়মের মাত্রা কেবল সম্পদ অর্জনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার কাঁচাবাজারে অবস্থিত ‘ময়মনসিংহ খাদ্য পরিদর্শক সমিতির কার্যালয়ে’ প্রতিরাতে কোটি কোটি টাকার অবৈধ জুয়ার আসর বসানোর সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছে অনুসন্ধানী মহল। সেখান থেকে তথাকথিত ‘বিডার’ হিসেবে কামাল দৈনিক গড়ে এক থেকে দেড় লাখ টাকা অবৈধ কমিশন আয় করেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সহকর্মীরা নিশ্চিত করেছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসান ফোনে জানান, তিনি প্রশাসনিক প্রশিক্ষণে ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং জেলায় ফিরে বিষয়গুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজ নেবেন। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) আশরাফুল আলম স্পষ্ট জানান, কামাল তাঁর যোগদানের পূর্ব থেকেই জেলা কার্যালয়ে অবস্থান করছেন এবং তাঁর মেয়াদে কোনো প্রেষণ আদেশ জারি হয়নি। তিনি উত্থাপিত অভিযোগগুলো প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী তাঁর বৈধ ও ঘোষিত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জন করলে তা শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ (জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন)। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী, প্রেষণ বা ডেপুটেশনের সুনির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে মূল কর্মস্থলে যোগদান না করা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করা চরম প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ) লঙ্ঘন করে সরকারি পরিবহনের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ বা অন্যের নামে গাড়ি ব্যবহার করা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীনে অনুসন্ধানযোগ্য বিষয়। সরকারি পদের অপব্যবহার করে অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিপরীতে আয়কর বিবরণী ও ব্যাংক নথি তদারকি করা এখন আইনি বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি জানতে চাইলে খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেন। তবে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের সরেজমিন অনুসন্ধান এবং খাদ্য বিভাগের সহকর্মীদের দেওয়া দাপ্তরিক প্রমাণের ভিত্তিতে জানা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অনিয়মের বিবরণী শতভাগ বস্তুনিষ্ঠ এবং বাস্তব সম্পদের পরিমাণ লিখিত রূপের চেয়েও বহুগুণ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, একজন নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীর এই অভূতপূর্ব প্রশাসনিক বেপরোয়া ভাব রাষ্ট্রের রাজস্ব খাত ও খাদ্য বিভাগের ভাবমূর্তিকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। সাধারণ নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গোয়েন্দা সেল, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কামালের অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু অনুসন্ধান চালিয়ে উপযুক্ত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।