আনুমানিক ৩৯ হাজার টাকা বেতনে কর্মরত একজন সরকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ১২ বছরে সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা আয় করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তুহিন চৌধুরীর শত কোটি টাকার বিপুল সম্পদের উৎস কি?
⇔ নেত্রকোনার বারহাট্রায় কয়েক একর জমি
⇔ একাধিক মাছের ঘের
⇔ বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ী
⇔ রাজধানীর গুলশান এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট
⇔ মা, ভাই-বোনের নামে কয়েক কোটি টাকার জমি, বাড়ী
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃনমুল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত-এমন অভিযোগ এখন হরহামেশাই শোনা যাচ্ছে লোকমুখে। মুখে সুশাসনের কথা বললেও আদতে তারা সকলেই নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। এর উজ্জ্বল উদাহরণ কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের রাজস্ব কর্মকর্তা তুহিন চৌধুরী।
একটি আপাদমস্তক শিক্ষক পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে তুহিন চৌধুরী আজ নামে বেনামে শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন। একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে নেত্রকোনায় ছুটে । সরেজমিন পরিদর্শনকালে এফটি টীম তুহিন চৌধুরীর নামে কোটি টাকা মূল্যের ডুপ্লেক্স বাড়ি, গোয়েলা রোডে বিশ শতক জমিতে তিনটি ঘরসহ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি, গোয়েলা রোড থেকে দশ মাদ যাওয়ার পথে এক একর জমির উপর একটি মাছের ঘের, বাড়ির পাশে আর একটি ঘের, প্রায় ১৫/২০ একর জমির সন্ধান পেয়েছে যার আনুমানিক বাজার মূল্য ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা।
এছাড়া, রাজধানীর গুলশান ও এর আশেপাশে একাধিক বিলাসবহুল ফ্লাট রয়েছে তুহিন চৌধুরীর। সূত্র মতে, রাজধানী গুলশানে যে ফ্লাটে তিনি বসবাস করেন তার আনুমানিক বাজার মূল্য ৯/১০ কোটি টাকা। তুহিন চৌধুরীর নামে বেনামে কয়েক কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স, এফডিআর রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, নীতি-নৈতিকতার ধার না ধরে শিক্ষকতার ন্যায় মহান পেশাকে কলংকিত করে তুহিন চৌধুরীর আশীর্বাদে তার পরিবারের ৫ জন সদস্যই হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক। গ্রামের বাসিন্দারাও অবাক তাদের এই সম্পদ অর্জনে। প্রাথমিক আলাপচারিতায় তারা বলেন, বারোঘর গ্রামের প্রতিটি মৌজায় এই পরিবারের বিপুল পরিমান জমি রয়েছে। অধিকাংশ জমিই স্থানীয় দালালদের সাথে যোগসাজশ করে উচ্চ মূল্যে ক্রয় করা হয়েছে। একটি শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের এত বিপুল সম্পদ আহরণের উৎস নিয়ে তারা সন্দিহান।
আনুমানিক ৩৯ হাজার টাকা বেতনে কর্মরত একজন সরকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ১২ বছরে সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা আয় করতে পারেন। তুহিন চৌধুরী এই বিপুল পরিমান সম্পদের মালিক কোন জাদুর কাঠির সংস্পর্শে বনে গেলেন; এই প্রশ্নের উত্তর কে দিবে?
সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে ১২ বছরের কর্মজীবনে দুর্নীতি অনিয়মের মাধ্যমে আজ তিনি যে অঢেল সম্পদের সম্পদের মালিক হয়েছেন তার দায় বিভিন্ন সময়ে তুহিন চৌধুরীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কখনোই এড়াতে পারেন না। একজন তুহিন চৌধুরীর আজকের এই অবস্থানে আসার নেপথ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল।
বর্তমানে রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের অধীনে হিলি স্থল কাস্টমস স্টেশনে কর্মরত তুহিন চৌধুরীকে গত ১৬ জুলাই রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার মোহাম্মদ সফিউর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বুড়িমারী স্থল কাস্টমস স্টেশনে বদলি করা হয়েছে।
কর্মস্থল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার সম্পদও বৃদ্ধি হয়েছে লাগামহীনভাবে। যশোর, ঢাকা বন্ড কমিশনারেট, তামাবিল ও চট্টগ্রাম কাস্টমস—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলকে ঘিরেই তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
শিক্ষক পরিবার থেকে রাজস্ব কর্মকর্তা
নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বারোঘর গ্রামে বাড়ি তুহিন চৌধুরীর। সম্প্রতি, সরেজমিনে তুহিন চৌধুরীর গ্রামের বাড়ী পরিদর্শন করে একটি বিশেষ অনুসন্ধানী টীম। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার বাবা চন্দন চৌধুরী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে মারা যান। তুহিনের মায়ের নাম নিলিমা দেবনাথ। তিনি প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তুহিন চৌধুরীরা ৩ ভাই ১ বোন। বড় ভাই তুষার চৌধুরী ও বড় বোন বাণী চৌধুরী। তারা দুজনই প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মেঝ ভাই শিশির চৌধুরী স্থানীয় সরকারি একটি কলেজের শিক্ষক। আর তুহিন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে চাকরি কর্মরত।
গোটা পরিবার শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত হলেও তুহিন পরিবারের সবার নামেই গ্রামে বিপুল সম্পদ করেছেন। প্রত্যেকের নামেই গ্রামে ১০-১৫ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টে রয়েছে ডিপিএস এবং এফডিআর। গ্রামের বাসিন্দারাও অবাক তাদের এই সম্পদ অর্জনে। প্রাথমিক আলাপচারিতায় তারা বলেন, বারোঘর গ্রামের প্রতিটি মৌজায় এই পরিবারের বিপুল পরিমান জমি রয়েছে। অধিকাংশ জমিই স্থানীয় দালালদের সাথে যোগসাজশ করে উচ্চ মূল্যে ক্রয় করা হয়েছে। একটি শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের এত বিপুল সম্পদ আহরণের উৎস নিয়ে তারা সন্দিহান বলেও মত প্রকাশ করেছেন এফটি টীমের কাছে।
২০১৪ সালে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর মাত্র এক যুগের ব্যবধানে তুহিন চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে গড়ে ওঠা এই বিশাল সাম্রাজ্যের উৎস কি—এমন প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। এছাড়াও প্রশ্ন উঠেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের নেতৃত্ব নিয়েও। কারণ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক হওয়া সত্বেও এমন বিতর্কিত একজন রাজস্ব কর্মকর্তার বিপুল সম্পদ আহরণের বিষয়ে তিনি কি অবগত ছিলেন না? এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের কাজ কি শুধু সাধারণ মানুষের বাড়তি সম্পদ নিয়েই অনুসন্ধান করা? তাদের সম্পদের অনুসন্ধান করবে কে? এমন প্রশ্ন এখন পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানের সামনে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মস্থলে ঘুষ, মাসোহারা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। এনিয়ে বিস্তারিত আজকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।
যশোরেই হাতেখড়ি মাসোহারার
২০১৪ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তুহিন চৌধুরীর প্রথম কর্মস্থল ছিল যশোর ভ্যাট কমিশনারেট। সেখানে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ভ্যাট-সংক্রান্ত অজুহাতে যশোরের নামকরা সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই অর্থ আদায় করা হতো।
বন্ড কমিশনারেটে ‘প্রভাব’ ও সম্পদ বৃদ্ধি
২০১৬ সালে তাঁর বদলি হয় তৎকালীন ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট নামে পরিচিত হয়। একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ করে তিনি বন্ডে পদায়ন নেন। আর এই বন্ড থেকেই তিনি হয়ে উঠেন কোটি কোটি টাকার মালিক।
বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে বেপরোয়া হয়ে উঠেন তুহিন চৌধুরী। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রাখা, ছাড়পত্র দিতে ঘুষ দাবি এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছিলো তার বিরুদ্ধে। এক পর্যায়ে কমিশনার তাকে ৬ মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্তও করেন। সেসময় টাকা আর ক্ষমতার গরম দেখিয়ে তিনি কমিশনারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন এবং বিষয়টি তখনকার কমিশনার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে পর্যন্ত অবহিত করেন। কিন্তু এই বিষয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর কালক্ষেপন তুহিন চৌধুরীকে আরও আগ্রাসী করে তোলে। সাসপেন্ড থেকে ফিরে এসে তিনি বীরদর্পে ফাইল ধরে ধরে দুর্নীতি করেছেন।
তামাবিলে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য
পরবর্তী সময়ে সিলেটের তামাবিল শুল্ক স্টেশনে দায়িত্ব পালন করেন তুহিন। তামাবিলে থাকাকালীন তিনি এমন কোন দুর্নীতি নেই যা তিনি করেননি। ট্রাক ধরে ধরে ৫০ হাজার করে টাকা নিতেন। প্রতিদিন এই তামাবিল থেকে তিনি ১০ লাখ টাকা তখন আয় করতেন। এসময়ে তিনি যুক্ত হয়ে যান মাদকের সঙ্গে। সিলেটের তামাবিলে পোস্টিং থাকার সময় বিজিবির হাতে মদ নিয়ে তিনি আটক হন। তখন এই কর্মকর্তাকে নিয়ে বিজিবি সংবাদ সম্মেলন করে এমনকি অধিকাংশ জাতীয় গণমাধ্যমে তার ছবিসহ প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ম্যানেজ করে তিনি পার পেয়ে যান।
তুহিন চৌধুরী সিলেটে থাকাকালীন মদের ব্যবসাও করতেন। সিলেটের একাধিক সূত্র এফটি টীমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে সিলেটে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা ৪০ লাখ টাকা তার গ্রামের এক মুদি দোকানের ব্যবসায়ীর একাউন্টে জমা করেছিলেন। পরবর্তীতে এটি জানাজানি হলে সেই মুদি দোকানদারকে তিনি ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ করেন।
চট্টগ্রাম কাস্টমসে ‘সিন্ডিকেট’!
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে দায়িত্ব পালনকালে তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগ ওঠে। এছাড়াও চট্টগ্রাম কাস্টমসে দায়িত্ব পালনকালে একটি বড় রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় তুহিন চৌধুরীর নাম সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসে।
সূত্র মতে, ২০২৪ সালে একটি আমদানি চালানের শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে তুহিন চৌধুরী দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে শুল্ক গোয়েন্দার পরীক্ষায় উক্ত চালানে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য পাওয়া যায় এবং অতিরিক্ত শুল্ককর ও জরিমানাসহ কয়েক কোটি টাকা আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে সেই ঘটনায় তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে অবৈধ অর্থ গ্রহণের উঠলেও উর্ধতন কর্তৃপক্ষ এবারও কোন বিভাগীয় পদক্ষেপ গ্রহন করেনি।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কাজ করা একাধিক সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২ বছর চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত থাকাকালীন তুহিন চৌধুরী কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেন। তিনি পুরো চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন। সেই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো - কোন পণ্য কখন খালাস হবে, কোন ফাইল আগে নিষ্পত্তি হবে এবং কোন আমদানিকারকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে। এমনকি তুহিন চৌধুরী রাজস্ব বোর্ডের উচ্চ মহলে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে নিজের পছন্দসই কর্মকর্তাদের পোস্টিং করাতেন এবং নিজেও কমিশনারের নাম ভাঙ্গিয়ে পোর্টে পণ্য দেখার নামে পণ্য ধরে ধরে ঘুষ নিতেন।
দুই মাসে এস এ পরিবহনে কোটি টাকা প্রেরণ
চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত থাকা অবস্থায় মাত্র দুই মাসে ৫৪ লক্ষাধিক টাকা ও মূল্যবান ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ কোটি টাকা এস,এ পরিবহনে নিজ বাড়ি নেত্রকোনায় পাঠিয়েছেন। তুহিন চৌধুরীর এই অকল্পনীয় লেনদেন জনমনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে । কাস্টম সংশ্লিষ্ট অনেকেই এই বিষয়কে অকল্পনীয় কাণ্ড হিসেবে অবহিত করেছেন। হতবাক হয়েছেন অনেকেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমসে কর্মরত অনেকেই বলেন, গত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে অর্থাৎ ৫ আগস্টের আগে তুহিন টাকার পাহাড় করেছেন শুনেছি। তবে এতো টাকা কামিয়েছে তা ভাবিনি। ২ মাসে যদি কোটি টাকা বাড়িতে পাঠায় তাহলে দুই বছরে কতো টাকা কামিয়েছে তা ভাববার বিষয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র দুই মাসের মধ্যে এস এ পরিবহনের মাধ্যমে ১৩টি চালানে মোট ৫৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা তার (তুহিন) এর গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় জনৈক রতন নামের এক ব্যক্তির কাছে পাঠানো হয়েছে। অপর এক চালানে শিশির চৌধুরীর নামে ৯ পদের প্রায় ৭ লক্ষ টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিক মালামাল পাঠানো হয়েছে । জানা গেছে জনৈক শিশির চৌধুরী তুহিন চৌধুরীর ভাই। শিশির চৌধুরী একটি বেসরকারি কলেজের প্রভাষক বলে সুত্র জানিয়েছে।
উল্লেখিত ১৩ টি চালানের মধ্যে ১২টি চালানের প্রেরক একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি, যিনি তুহিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ জন বলে পরিচিত। অপর একটি চালান খোদ তুহিন চৌধুরীর নামে। এই চালানের ৫ লক্ষ টাকা পাঠানো হয় ঢাকায় আর আমিন নামক জনৈক ব্যক্তির কাছে। বাকি টাকা চট্টগ্রাম থেকে নেত্রকোনায় পাঠানো হয়েছে, যেখানেই তুহিন চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি। নেত্রকোনা যে রতনের কাছে টাকা পাঠানো হয়েছে চালানে উল্লেখিত মোবাইল নাম্বারে ফোন করে জানতে চাইলে তিনি (রতন) বলেন, এইসব টাকা তুহিন স্যার পাঠিয়েছেন। আমি এস,এ পরিবহন থেকে গ্রহণ করে যাকে দিতে বলেছেন তাকে দিয়েছি। এক প্রশ্নের জবাবে রতন বলেন, তুহিন স্যার অনেক জায়গা-জমি ক্রয় ও বন্ধক নিয়েছেন।
নৈতিক স্থলন
রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের বিতর্কিত রাজস্ব কর্মকর্তা তুহিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনও নানা স্ক্যান্ডালের সাথে জড়িয়ে আছে। অভিযোগ রয়েছে, তুহিন চৌধুরী ২০১২ সালে প্রথম বিয়ে করেন। তবে পরবর্তীতে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে চাকরির আবেদনের উদ্দেশ্যে তিনি তার বিয়ের তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখেন।
পরবর্তীতে, প্রথম স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় থাকা অবস্থাতেই তিনি অন্য এক বিবাহিত নারীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে প্রথম স্ত্রীকে প্রতারিত করে তিনি ওই নারীকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং তাকে নিয়েই বর্তমানে রাজধানীর গুলশানে ১০ কোটি টাকা দিয়ে কেনা আলিশান এক ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।
এসব বিষয়ে জানতে কাস্টম ও ভ্যাট কর্মকর্তা তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, কাস্টমস ও ভ্যাটে কর্মরত অনেকেরই অবৈধ সম্পদ রয়েছে। কারও কম কারও বেশি। এত সম্পদ কিভাবে করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটা কি আপনাকে বলতে হবে? এসব বিষয়ে দেখার জন্য দুদক আছে, সিআইসি আছে, আরও সংস্থা আছে। তারা দেখবে, আপনি দেখার কে? এই কথা বলে উত্তেজিত হয়ে তিনি ফোনটি কেটে দেন।
একটি শিক্ষক পরিবার থেকে উঠে আসা তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নিজের ও পরিবারের সকল সদস্যদের নামে থাকা বিপুল জমি, বাড়ি, এফডিআর, ডিপিএসসহ বিভিন্ন সম্পদই মূলত প্রশ্ন তুলেছে—একটি শিক্ষক পরিবার এবং একজন সরকারি চাকরিজীবী সদস্যের বৈধ আয় দিয়ে নিজের ও পরিবারের নামে থাকা সম্পদের কতটুকু অর্জন সম্ভব?
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
মোঃ সোহেল রানা বিশেষ প্রতিবেদক বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ইউরোপের শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করতে সার্বিয়ার শ্রমবাজারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জনশক্তি রপ্তানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সার্বিয়ায় যেতে আগ্রহী কর্মীদের পাশাপাশি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের প্রত্যাশা, সরকার উদ্যোগী হলে দেশটিতে বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন বাংলাদেশ রিক্রুটিং এজেন্সি ফোরাম (বিআরএএফ)। সংশ্লিষ্টদের মতে, সার্বিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাব্য সুযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করে কাজে লাগাতে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। সার্বিয়ায় যেতে আগ্রহী কর্মীদের প্রত্যাশা সার্বিয়ায় কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশি কর্মীদের প্রত্যাশা, দেশটিতে বৈধভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। তাঁদের মতে, বিদেশে কাজের সুযোগ যেন স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাওয়া যায় এবং চাকরিপ্রত্যাশীরা যেন প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও অনিশ্চয়তার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য নিয়োগকর্তার পরিচয়, কাজের ধরন, বেতন, কর্মঘণ্টা, আবাসন, চাকরির চুক্তি এবং ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের বৈধতা যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়ে কর্মীদের সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সার্বিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত কর্মসংস্থানের সুযোগ চিহ্নিত করা হবে। এতে বাংলাদেশের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করার দাবি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের মতে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কোন দেশে কী ধরনের অনুমোদন প্রয়োজন, কী কী নথি জমা দিতে হবে এবং ছাড়পত্র পেতে কতগুলো ধাপ অনুসরণ করতে হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি। তাঁদের প্রত্যাশা, বিএমইটি ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। এতে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে পারবে এবং বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা কমবে। তবে নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, আর্থিক সক্ষমতা, প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং কর্মীদের জন্য প্রস্তাবিত চাকরির শর্ত যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সমন্বয়ই পারে বৈধ জনশক্তি রপ্তানিকে আরও গতিশীল করতে। বাংলাদেশে সার্বিয়ার দূতাবাস প্রতিষ্ঠার দাবি সার্বিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি সার্বীয় দূতাবাস প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশে সার্বিয়ার দূতাবাস প্রতিষ্ঠিত হলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ, শ্রমবাজারসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, কর্মীদের সহায়তা এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি ভিসা ও অন্যান্য কনস্যুলার সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক আলোচনা এবং বাস্তব চাহিদা মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ সংশ্লিষ্টদের সার্বিয়ার শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং বাংলাদেশে সার্বিয়ার দূতাবাস প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে সার্বিয়ার শ্রমবাজারের সম্ভাবনা যাচাই, বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেবেন। একই সঙ্গে সার্বিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতি জোরদারের সম্ভাবনা মূল্যায়ন এবং দেশটিতে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত তথ্য ও সহায়তা পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে নতুন নতুন দেশে বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ অনুসন্ধান, বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। সার্বিয়ার ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য শ্রমিকের চাহিদা যাচাই, নিয়োগকর্তার সক্ষমতা নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি অনুমোদনের সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার, বিএমইটি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং দায়িত্বশীল রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে সার্বিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বৈধ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। সার্বিয়ার শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা কাজে লাগানো, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশে সার্বিয়ার দূতাবাস প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা যাচাই—এই বিষয়গুলোতে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে, এমনটাই প্রত্যাশা সার্বিয়ায় যেতে আগ্রহী কর্মী ও জনশক্তি রপ্তানি খাতের সংশ্লিষ্টদের। মোঃ সোহেল রানা বিশেষ প্রতিবেদক
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৫ আন্তর্জাতিক হকি বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ ফুটবল প্রেমীদের মতো হকি প্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের কঠিন পর্ব অতিক্রম করে দুই দলই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য এই ফাইনাল ম্যাচে উভয় দল নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত। আর্জেন্টিনা দল এই টুর্নামেন্টে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। অধিনায়ক লুকাস মার্টিনেজ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছি। দলের সবাই একসঙ্গে কাজ করে ফাইনালে পৌঁছেছি। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট — বিশ্বকাপ জিততে হবে। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ বজায় রেখেছি এবং আগামী ম্যাচেও তা বজায় রাখব।” আর্জেন্টিনা দলের ফিজিক্যাল ট্রেনার জানান, দল খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য বিশেষ অনুশীলন চালাচ্ছে যাতে ফাইনালে তারা চাপ সামলাতে পারে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের কোচ মাইকেল ডি ইয়ং ফাইনালের আগের প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দল গত কয়েক মাস ধরে কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছে। খেলোয়াড়রা মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা চাই এই বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস গড়ে একটি শক্তিশালী ছাপ রেখে যেতে।” কোচ আরো বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র ফাইনালে উঠা নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়। আমরা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিজেদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।” বিশ্বের হকি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ফাইনাল ম্যাচটি গত দশকের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা হতে চলেছে। উভয় দলের কৌশল, বল নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুতগতির খেলায় যে মেধা প্রদর্শিত হয়েছে, তা ফুটবলের মতো অন্য কোনো খেলার ক্ষেত্রে বিরল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফাইনালে দলের মানসিক স্থিতিশীলতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা বিজয় নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে। মাঠে উভয় দলের খেলোয়াড়রা দ্রুতগতির পাস, শক্তিশালী ডিফেন্স এবং আক্রমণাত্মক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মাঠ মাতানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকারের গতিবেগ এবং নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডারদের কৌশলগত দক্ষতা ম্যাচে প্রধান আকর্ষণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও গোলরক্ষকদের প্রতিটি সেভ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াও ম্যাচের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশ্বজুড়ে লাখো হকি ভক্ত এই ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার দেখার জন্য অপেক্ষায় আছেন। অনলাইনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ম্যাচের লাইভ স্ট্রিমিং অনুষ্ঠিত হবে এবং অনেক দেশের টেলিভিশনও সরাসরি সম্প্রচার করবে। হকি প্রেমীরা এই ম্যাচ থেকে দারুণ উত্তেজনা, দক্ষতা এবং খেলা উপভোগ করার আশা করছে। মাঠের বাইরেও ভক্তদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ফ্যান জোন আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে খেলোয়াড় ও দর্শকরা একত্রে সময় কাটিয়ে খেলার আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। এছাড়াও টুর্নামেন্ট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে এবং খেলা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে দুই দলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে আগামী দিনে বিশ্ব হকির নতুন ধারার রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এই ম্যাচের ফলাফল আগামী দশক ধরে হকির কৌশলগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের হকি টুর্নামেন্ট হওয়ায় এর প্রতি ভক্তদের আগ্রহ ও উন্মাদনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সবাই আশা করছেন, আগামীকালের ফাইনাল হবে একটি স্মরণীয় খেলা, যেখানে স্পোর্টসম্যানশিপ, দক্ষতা ও উত্তেজনা থাকবে সর্বোচ্চ মাত্রায়।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়ন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও, গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল শাখার উপসহকারী বা সহকারী প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিনের পদায়ন ও কর্মকাণ্ড ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বনামে-বেনামে ঠিকাদারি পরিচালনা, অর্থ আত্মসাৎ এবং ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে বারবার নিজের অবস্থান ঢাকায় টিকিয়ে রাখার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তাকে কুমিল্লায় বদলি করা হলেও, মাত্র দেড় বছরের মাথায় তিনি পুনরায় ঢাকার একই প্রভাবশালী পদে ফিরে আসেন। এসব অভিযোগের পাশাপাশি তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়েও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বর্তমানে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা ডিভিশন-৬-এ কর্মরত থাকাকালে শামসুল আরেফিনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি সামনে আসে। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ওই ডিভিশনের একাধিক সরকারি প্রকল্পে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রকল্পের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট তৈরি থেকে শুরু করে কাজের তদারকি ও চূড়ান্ত বিল অনুমোদন—প্রতিটি পর্যায়েই তার একক আধিপত্য ছিল বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অনেকেই। ঠিকাদারদের অভিযোগ, বিল ছাড়ের বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হতো তাকে। দাবিমুক্ত অর্থ বা কমিশন না পেলে নথিপত্রে নানা জটিলতা তৈরি করে বিল আটকে রাখতেন তিনি। এ বিষয়ে এক ঠিকাদার বলেন, ‘কাজ পাওয়ার কথা বলে তিনি বারবার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করতেন। টাকা না দিলে বিল আটকে থাকত, তাই অনেকে বাধ্য হয়েই টাকা দিয়েছেন।’ অন্য এক ঠিকাদারের অভিযোগ, ‘তিনি বলতেন—উপরের লোকজন ঠিক আছে, শুধু টাকা দাও। পরবর্তীতে দেখা গেছে, কাজও হয়নি, আর সেই টাকাও ফেরত পাওয়া যায়নি।’ উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিন ‘পরে কথা বলব’ বলে মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন। পরবর্তীতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘কেউ যদি ঊর্ধ্বতন কারও নাম ভাঙিয়ে ঠিকাদারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে থাকেন, তবে তার দায় তাকেই নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কেউ কাউকে এ ধরনের অনৈতিক কাজের সুযোগ দেয় না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ প্রশাসনিক নীতি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলির বিধান রয়েছে। তবে শামসুল আরেফিন কর্মজীবনের সিংহভাগ সময়ই বিভিন্ন কৌশলে ঢাকায় কাটিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফেরানোর অংশ হিসেবে তাকে কুমিল্লায় বদলি করা হলেও মাত্র দেড় বছরের মাথায় তিনি আবার ঢাকার একই অফিসে সমমানের পদে ফিরে আসেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মহলে আলোচনা রয়েছে যে, রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে ম্যানেজ করে তিনি বারবার নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করেছেন। তবে বদলি ও পদায়নের এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে শতভাগ নিশ্চিত করা যায়নি। শামসুল আরেফিনের বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ অর্জনের তথ্যও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অভিজাত এলাকা এবং বিকাশমান আবাসন প্রকল্পে তার ও তার নিকটাত্মীয়দের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। সরকারি চাকুরির বেতনের সঙ্গে এসব স্থাবর সম্পত্তির মালিকানার বিস্তর ফারাক নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শামসুল আরেফিনের বিরুদ্ধে স্বনামে-বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কমিশনের হাতে রয়েছে। অভিযোগটি আমলে নিয়ে ইতিমধ্যে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে এবং এসংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র তলব করা হচ্ছে। অনুসন্ধানের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, ‘সরকারি প্রকৌশল বিভাগে সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার অপব্যবহার নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে বারবার একই ব্যক্তির ঢাকায় ফিরে আসা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। দুদকের এই অনুসন্ধানকে স্বাধীনভাবে এগোতে দিতে হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে পড়বে।’ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তর কোনো ব্যক্তিগত অনিয়ম বা দুর্নীতির দায় নেবে না। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। যেকোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে প্রশাসনিক তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মো. শামসুল আরেফিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং বদলি-সংক্রান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুদক স্বাধীনভাবে তদন্ত শুরু করেছে, আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় তথ্য ও দাপ্তরিক সহযোগিতা প্রদান করব।’ গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা সরকারি সেবা খাতে প্রকৃত স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এসব অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, অন্যথায় একই সিন্ডিকেট চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে। মো. শামসুল আরেফিনের দ্রুত ঢাকায় প্রত্যাবর্তন, তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া সিন্ডিকেটের নানা অভিযোগ এবং দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক উভয়েই অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। এখন এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রকৃত দায় নিরূপণে দুদকের চলমান অনুসন্ধান ও প্রশাসনিক তদন্তের প্রতিবেদনই নির্ধারণ করবে পরবর্তী দৃশ্যপট।
শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ এর ফরাস, ঝাড়ুদার ও সুইপারসহ সাধারণ কর্মচারীরা এক কর্মকর্তার খামখেয়ালি ও হুমকির মুখে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বদলিকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজ কর্তৃক কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করা এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে হয়রানির হুমকির খবর ছড়িয়ে পড়লে অফিসে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদের গোয়েন্দা সংস্থাও তৎপর হয়ে উঠেছে এবং পুরো বিষয়টি এখন নজরদারির আওতায় এনেছে। ভুক্তভোগী কর্মচারীরা জানান, তারা দীর্ঘ ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সাথে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনে ভিভিআইপি ও ভিআইপি সেবা প্রদান করে আসছেন। সংসদ অধিবেশন পরিচালনা ছাড়াও মাননীয় স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, হুইপ, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের সরকারি আবাসনে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা নিশ্চিতে কাজ করেন তারা। এমনকি পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার জামাত ব্যবস্থাপনা এবং কোনো সংসদ সদস্য মারা গেলে জানাজার আয়োজনের মতো সংবেদনশীল দায়িত্বও এই কর্মচারীরাই পালন করেন। ছুটির দিনেও অনেককে দায়িত্বে বহাল থাকতে হয়। অভিযোগ উঠেছে, সম্প্রতি বদলিকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কর্মচারীদের ওপর বেপরোয়া আচরণ শুরু করেন। তিনি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদের গোয়েন্দাদের কাছে মিথ্যা তথ্য পৌঁছে দেন এবং পুলিশ দিয়ে পেটানো ও আইডি কার্ড ছিনিয়ে নেওয়ার মতো হুমকি প্রদান করেন। নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজের এমন আচরণের কারণে কর্মচারীদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে অনেকেই ভয়ে কার্যালয়ে আসতে সাহস পাননি। এই পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার হলে ওই কর্মকর্তা নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেন। এদিকে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মচারী হুসাইন মাহমুদ মাহফুজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি অবিলম্বে নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। কর্মচারীদের মতে, সুষ্ঠু বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনা করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলীর আসল রূপ এবং থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। সাধারণ কর্মচারীরা এই রাহুর কবল থেকে স্থায়ী মুক্তি এবং কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। অভিযুক্ত প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডার জালিয়াতি ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। বিগত সরকারের প্রভাবশালী সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খোলস পালটে বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে আসীন রয়েছেন। কক্সবাজার থেকে রাজশাহী ও মুন্সিগঞ্জ—প্রতিটি কর্মস্থলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এক প্রাতিষ্ঠানিক জাল বিস্তার করেছেন তিনি। বর্তমানে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে মো. মনিরুজ্জামান কক্সবাজার সড়ক বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রাক্কলন বাড়িয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম করেন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে রাজশাহী জোনে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ৪-৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি ‘কোর সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন। সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, তাঁর সবুজ সংকেত ও কমিশন নিশ্চিত করা ছাড়া সেখানে কাজ পাওয়া ছিল অসম্ভব। পরবর্তীতে মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে সংস্কার কাজের নামে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করা হলেও কাজের মান ছিল নিম্নমানের, যার ফলে বর্ষার আগেই সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। রংপুর ও রাজশাহী জোনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী থাকাকালে ‘আমিনুল ইসলাম কনস্ট্রাকশন’সহ নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) লঙ্ঘন করে হাজার কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পরিকল্পনা উইংয়ে দায়িত্ব পালনকালে প্রতিটি প্রকল্পের কারিগরি অনুমোদনের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৮ শতাংশ কমিশন গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বর্তমানে অধিদপ্তরের জনবল নিয়ন্ত্রণ ও বদলি শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেকশন প্রশাসনে অদৃশ্য প্রভাব বজায় রেখে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জেলা উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ ও সুবিধাজনক স্থানে ট্রান্সফার পোস্টিং করছেন। সাধারণত যেকোনো সরকারের আমলে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত কর্মকর্তাদেরই এই প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা মনিরুজ্জামানের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলের সঙ্গে তার গভীর যোগসাজশের প্রমাণ বহন করে। প্রধান কার্যালয়ের এই প্রভাবশালী চেয়ারে বসে তিনি পুরো অধিদপ্তরের ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়া ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিকে সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে সওজ সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দেওয়া তথ্যে এক ভয়ংকর ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির খতিয়ান উঠে এসেছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক বলেন, “সওজের ক্রয় প্রক্রিয়ায় যে সিন্ডিকেট কাজ করছে, তা আমাদের গবেষণায় প্রমাণিত। রাজনৈতিক যোগসাজশ ছাড়া এককভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় সংস্কারের স্বার্থে অবিলম্বে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও দুদকীয় তদন্ত হওয়া উচিত।” সওজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মনিরুজ্জামানের মতো কর্মকর্তাদের কারণে অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি তলানিতে ঠেকেছে। তিনি নিজস্ব সিন্ডিকেট দিয়ে পুরো বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করায় সৎ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এদিকে অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে মন্ত্রণালয় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে। অতীতের পরিচয় বিবেচনা না করে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। টিআইবির সাম্প্রতিক গবেষণায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে গড়ে ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফরিদপুর জেলায় আদি বাড়ি থাকা এই প্রকৌশলী গত এক দশকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঢাকা, ফরিদপুর ও রাজশাহীতে অবৈধ সম্পদের এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তিনি ফরিদপুর সদরে এবং তাঁর গ্রামের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ কৃষি ও অকৃষি জমি, বাণিজ্যিক প্লট এবং স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করেছেন, যার বাজারমূল্য শতকোটি টাকার ওপরে। কেবল পৈতৃক অঞ্চলেই নয়, রাজশাহী জোনে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে তিনি নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনদের নামে-বেনামে একাধিক মূল্যবান বাণিজ্যিক প্লট ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর রাজউক ও অভিজাত এলাকাগুলোতে তাঁর সম্পদের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। ঢাকার অত্যন্ত ব্যয়বহুল এলাকা বনানী ও গুলশানের কনকর্ড টাওয়ারে তাঁর নামে আলিশান ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘ডি’ ব্লকে বহুতল ফ্ল্যাট এবং নিকেতন হাউজিং সোসাইটি এলাকায় প্রায় ১০ কাঠার একটি অতি মূল্যবান বাণিজ্যিক প্লট রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। তাঁর ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিপুল অঙ্কের এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের সন্ধান মিলেছে। একজন সরকারি বেতনভুক্ত গ্রেড-৩ বা গ্রেড-২ পদমর্যাদার কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে তাঁর এই বিলাসী জীবনযাত্রার মান এবং এই বিপুল বৈভবের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক লক্ষ্য করা গেছে। গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ রয়েছে, দেশের ভেতরে সম্পদ গড়ার পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে তিনি তাঁর এই অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও দুবাইতে পাচার করেছেন, যার আন্তর্জাতিক মানিলন্ডারিং আইনে সুষ্ঠু অনুসন্ধান হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। একজন সরকারি বেতনভুক্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার আয়ের সঙ্গে এই বিলাসী জীবনযাত্রার আকাশ-পাতাল ফারাক রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, এই অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও দুবাইতে পাচার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তাঁর ব্যাংক হিসাব, ফ্ল্যাট ও জমির দলিল যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে এবং খুব দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। যোগাযোগ ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মনিরুজ্জামানের মতো সিন্ডিকেটবাজ কর্মকর্তাদের দ্রুত জবাবদিহিতার আওতায় না আনলে দেশের সড়ক খাতের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা অসম্ভব। ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম কমিশন নেওয়ায় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, ফলে জাতীয় মহাসড়কগুলো এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। দুদকের উচিত তাঁর দেশ-বিদেশের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা এবং মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য একটি ফরেনসিক অডিট কমিটি গঠন করা। দেশের যোগাযোগ খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে এই বিতর্কিত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।