অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি ক্রয়, অর্থপাচারসহ দেশ-বিদেশে থাকা সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্য ও নথি চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. জাহেদ কালামের সই করা চিঠির সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুদকের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ঢাকাপোস্টকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা – দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, যখন দেশের প্রধান তিনটি বিরোধী দল—জাতীয় গণফ্রন্ট, উন্নয়ন পার্টি ও জননেতা পরিষদ—আজ এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ‘গণঐক্য জোট’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এই জোটের মুখ্য লক্ষ্য হলো আগাম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করা, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি এবং একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট আয়োজন নিশ্চিত করা। জাতীয় গণফ্রন্টের সভাপতি শহীদুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “দেশে এখন গণতন্ত্র নেই, জনগণের ভোটাধিকার নেই। তাই আমাদের এই ঐক্য—সত্যিকার অর্থে একটি গণআন্দোলনের সূচনা।” জোটের কর্মসূচি জোট নেতারা জানান, আগামী মাস থেকে সারা দেশে বিক্ষোভ, গণঅবস্থান, মানববন্ধন এবং জেলা পর্যায়ে গণসংলাপ কর্মসূচি শুরু হবে। তারা বলেছেন, এই জোট শুধুমাত্র সরকারবিরোধী নয়, বরং এটি একটি ভবিষ্যত রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবেও কাজ করবে। সরকারের প্রতিক্রিয়া সরকারি দলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে অঘোষিতভাবে কয়েকজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, “বিরোধীদের এই জোট জনভিত্তিহীন এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা।” বিশ্লেষকদের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব হাসান বলেন, “এই জোট নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে, যদি তারা মাঠে বাস্তব আন্দোলন ও বিকল্প নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে সরকার যেভাবে শক্ত হাতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখছে, তাতে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।” আগামী সপ্তাহে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জোটের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক মহল এই জোটকে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবেও দেখছে।
মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি) শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট সীমান্তে সফল অভিযান পরিচালনা করে তিন কোটি টাকারও বেশি মূল্যের বিপুল পরিমাণ চোরাচালানী পণ্য জব্দ করেছে।১ম অভিযান: সোনামসজিদ বিওপি গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ৮:৪৫ ঘটিকায়, মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি) এর ভারপ্রাপ্ত কোয়ার্টার মাস্টার এডি সেখ মনোয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে সোনামসজিদ বিওপির একটি চৌকস টহলদল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালায়। টহল দলটি সীমান্ত পিলার ১৮৪/২-এস হতে আনুমানিক ৩ কি.মি. বাংলাদেশের অভ্যন্তরে, শিবগঞ্জ উপজেলার শাহাবাজপুর ইউনিয়নের মুসলিমপুর গ্রামস্থ শাহাবাজপুর কলেজের সম্মুখস্থ পাকা রাস্তায় একটি মালিকবিহীন ভারতীয় ট্রাক (রেজিঃ নম্বরবিহীন) তল্লাশী করে। এসময় ট্রাকে রক্ষিত পাথরের মধ্যে অত্যন্ত সুকৌশলে লুকায়িত অবস্থায় ৭০৮ পিস ভারতীয় ট্রাকের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং ৫টি বেনারসি শাড়ী উদ্ধার করা হয়। জব্দকৃত ভারতীয় ট্রাক এবং চোরাচালানী পণ্যগুলোর সর্বমোট আনুমানিক মূল্য ২,৫৭,৭৯,০০০ (দুই কোটি সাতান্ন লক্ষ ঊনআশি হাজার) টাকা। ২য় অভিযান: খড়কপুর বিওপি পরের দিন, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ আনুমানিক সকাল ৮:৪০ ঘটিকায়, খড়কপুর বিওপি’র একটি বিশেষ টহলদল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানটি সীমান্ত পিলার ২০১/৮৩-এস হতে আনুমানিক ১ কি.মি. বাংলাদেশের অভ্যন্তরে, ভোলাহাট উপজেলার ভোলাহাট ইউনিয়নের আলীমোড় গ্রামস্থ পাকা রাস্তায় চালানো হয়। টহলদলটি ১৩৫টি ভারতীয় বিভিন্ন মডেলের চোরাই মোবাইল ফোন উদ্ধার করে এবং ১টি ইজিবাইক জব্দ করে। জব্দকৃত মালামাল এবং ইজিবাইকটির মোট আনুমানিক মূল্য ৪৯,১৫,০০০ (ঊনপঞ্চাশ লক্ষ পনের হাজার) টাকা। বিজিবি’র উপস্থিতি টের পেয়ে ইজিবাইকের চালক ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। বিজিবি'র প্রতিক্রিয়া: জব্দকৃত চোরাচালানী পণ্যের বিষয়ে বিজিবি’র পক্ষ হতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি) এর অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী, এসজিপি, বিএফএম, পিএসসি বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, "বিজিবি সকল প্রকার চোরাচালানের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে এবং দেশের স্বার্থে এ ধরনের অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।"
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজের জ্বালানি তেল চুরি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং ঠিকাদারি অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে পরিচালিত এই দুর্নীতির কেন্দ্রে রয়েছেন চাঁদপুর নদী বন্দরের টাগবোট ‘দুর্দান্ত’-এর মাস্টার নজরুল ইসলাম এবং নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের চাঁদপুর কার্যালয়ের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ সবুর খান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গত ১৬ মার্চ বিআইডব্লিউটিএ'র চেয়ারম্যান সরাসরি সরকারি ডিপো থেকে ডিজেল ও লুব-অয়েল সংগ্রহের নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের ভিত্তিতে ১৮ মার্চ থেকে চার দফায় চাঁদপুর ডিপো থেকে মোট ৪৪ হাজার লিটার ডিজেল ও লুব-অয়েল সংগ্রহ করা হয়। কাগজে-কলমে এই জ্বালানি বিভিন্ন নৌযানে সরবরাহ করা হয়েছে বলে দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে অনুসন্ধানে প্রমাণ পাওয়া গেছে। হিসাব অনুযায়ী উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তমের নামে ৮ হাজার লিটার, ওয়ার্কবোট কপোত ও আড়িয়াল খাঁর নামে যথাক্রমে ৩ হাজার ও ৫ হাজার লিটার, টাগবোট দুর্দান্তের নামে ২৬ হাজার লিটার এবং এসএমবি-৩ মার্কিং বোটের নামে ২ হাজার লিটার ডিজেল বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই সময়ে উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম বা টাগবোট দুর্দান্ত কোনো উদ্ধার অভিযানেই অংশ নেয়নি। এমনকি এসএমবি-৩ বোটটি অলস বসিয়ে রেখে ভাড়া করা সাধারণ নৌকা দিয়ে মার্কিংয়ের কাজ চালানো হয়, যার আড়ালে গত তিন মাসে অতিরিক্ত ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকার ভাড়া বিল দেখানো হয়েছে। মূলত প্রতি লিটার ৯৫ টাকা দরে মোট ৪১ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের পুরো ৪৪ হাজার লিটার তেলই একটি চোরচক্রের মাধ্যমে খোলাবাজারে বিক্রি করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। গোপন সিসিটিভি ফুটেজ ও অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মে গভীর রাতে টাগবোট দুর্দান্তের মাস্টার নজরুল ইসলাম নিজে দাঁড়িয়ে পাহারা দিয়ে পাম্প মেশিনের সাহায্যে সরকারি ডিজেল সরাসরি চাঁদপুরের তেল ব্যবসায়ী সুমনের ট্যাংকারে স্থানান্তর করেন। নিয়ম অনুযায়ী ইঞ্জিন রুম ও জ্বালানির দায়িত্ব ড্রাইভারের হলেও মাস্টার নজরুল বেআইনিভাবে এই পাচার কার্যক্রমে সরাসরি নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ। জাহাজের কর্মচারীরা এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করে ফেললে তাঁদের ১১ লাখ টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হয় এবং পরে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় ক্যাডারের মাধ্যমে তাঁদের চাকরিচ্যুত ও বদলির হুমকিও দেওয়া হয়। সরকারি সম্পত্তি ও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল চুরির এই ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার নির্দিষ্ট অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাঁদপুর নদী বন্দরের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ সবুর খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ও বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে অভিযুক্ত মাস্টার নজরুল ইসলাম তেল চুরির অভিযোগ অস্বীকার করলেও ঘটনার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান, যা পরোক্ষভাবে ঘটনার বাস্তবতাকে ইঙ্গিত করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ৩৮১ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের আওতায় গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বিআইডব্লিউটিএ'র মতো একটি স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানে এত বড় পরিসরে জ্বালানি চুরির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কঠোর আইনি পদক্ষেপ দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা ও সচেতন নাগরিক সমাজের সদস্যরা। তাঁদের আশঙ্কা, এখনই ব্যবস্থা না নিলে এই ধরনের সিন্ডিকেট আরও বিস্তৃত হয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের পরিধি বাড়াতে পারে।
আনুমানিক ৩৯ হাজার টাকা বেতনে কর্মরত একজন সরকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ১২ বছরে সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা আয় করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তুহিন চৌধুরীর শত কোটি টাকার বিপুল সম্পদের উৎস কি? ⇔ নেত্রকোনার বারহাট্রায় কয়েক একর জমি ⇔ একাধিক মাছের ঘের ⇔ বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ী ⇔ রাজধানীর গুলশান এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ⇔ মা, ভাই-বোনের নামে কয়েক কোটি টাকার জমি, বাড়ী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃনমুল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত-এমন অভিযোগ এখন হরহামেশাই শোনা যাচ্ছে লোকমুখে। মুখে সুশাসনের কথা বললেও আদতে তারা সকলেই নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। এর উজ্জ্বল উদাহরণ কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের রাজস্ব কর্মকর্তা তুহিন চৌধুরী। একটি আপাদমস্তক শিক্ষক পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে তুহিন চৌধুরী আজ নামে বেনামে শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন। একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে নেত্রকোনায় ছুটে । সরেজমিন পরিদর্শনকালে এফটি টীম তুহিন চৌধুরীর নামে কোটি টাকা মূল্যের ডুপ্লেক্স বাড়ি, গোয়েলা রোডে বিশ শতক জমিতে তিনটি ঘরসহ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি, গোয়েলা রোড থেকে দশ মাদ যাওয়ার পথে এক একর জমির উপর একটি মাছের ঘের, বাড়ির পাশে আর একটি ঘের, প্রায় ১৫/২০ একর জমির সন্ধান পেয়েছে যার আনুমানিক বাজার মূল্য ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা। এছাড়া, রাজধানীর গুলশান ও এর আশেপাশে একাধিক বিলাসবহুল ফ্লাট রয়েছে তুহিন চৌধুরীর। সূত্র মতে, রাজধানী গুলশানে যে ফ্লাটে তিনি বসবাস করেন তার আনুমানিক বাজার মূল্য ৯/১০ কোটি টাকা। তুহিন চৌধুরীর নামে বেনামে কয়েক কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স, এফডিআর রয়েছে। এখানেই শেষ নয়, নীতি-নৈতিকতার ধার না ধরে শিক্ষকতার ন্যায় মহান পেশাকে কলংকিত করে তুহিন চৌধুরীর আশীর্বাদে তার পরিবারের ৫ জন সদস্যই হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক। গ্রামের বাসিন্দারাও অবাক তাদের এই সম্পদ অর্জনে। প্রাথমিক আলাপচারিতায় তারা বলেন, বারোঘর গ্রামের প্রতিটি মৌজায় এই পরিবারের বিপুল পরিমান জমি রয়েছে। অধিকাংশ জমিই স্থানীয় দালালদের সাথে যোগসাজশ করে উচ্চ মূল্যে ক্রয় করা হয়েছে। একটি শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের এত বিপুল সম্পদ আহরণের উৎস নিয়ে তারা সন্দিহান। আনুমানিক ৩৯ হাজার টাকা বেতনে কর্মরত একজন সরকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ১২ বছরে সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা আয় করতে পারেন। তুহিন চৌধুরী এই বিপুল পরিমান সম্পদের মালিক কোন জাদুর কাঠির সংস্পর্শে বনে গেলেন; এই প্রশ্নের উত্তর কে দিবে? সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে ১২ বছরের কর্মজীবনে দুর্নীতি অনিয়মের মাধ্যমে আজ তিনি যে অঢেল সম্পদের সম্পদের মালিক হয়েছেন তার দায় বিভিন্ন সময়ে তুহিন চৌধুরীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কখনোই এড়াতে পারেন না। একজন তুহিন চৌধুরীর আজকের এই অবস্থানে আসার নেপথ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল। বর্তমানে রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের অধীনে হিলি স্থল কাস্টমস স্টেশনে কর্মরত তুহিন চৌধুরীকে গত ১৬ জুলাই রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার মোহাম্মদ সফিউর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বুড়িমারী স্থল কাস্টমস স্টেশনে বদলি করা হয়েছে। কর্মস্থল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার সম্পদও বৃদ্ধি হয়েছে লাগামহীনভাবে। যশোর, ঢাকা বন্ড কমিশনারেট, তামাবিল ও চট্টগ্রাম কাস্টমস—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলকে ঘিরেই তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। শিক্ষক পরিবার থেকে রাজস্ব কর্মকর্তা নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বারোঘর গ্রামে বাড়ি তুহিন চৌধুরীর। সম্প্রতি, সরেজমিনে তুহিন চৌধুরীর গ্রামের বাড়ী পরিদর্শন করে একটি বিশেষ অনুসন্ধানী টীম। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার বাবা চন্দন চৌধুরী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে মারা যান। তুহিনের মায়ের নাম নিলিমা দেবনাথ। তিনি প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তুহিন চৌধুরীরা ৩ ভাই ১ বোন। বড় ভাই তুষার চৌধুরী ও বড় বোন বাণী চৌধুরী। তারা দুজনই প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মেঝ ভাই শিশির চৌধুরী স্থানীয় সরকারি একটি কলেজের শিক্ষক। আর তুহিন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে চাকরি কর্মরত। গোটা পরিবার শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত হলেও তুহিন পরিবারের সবার নামেই গ্রামে বিপুল সম্পদ করেছেন। প্রত্যেকের নামেই গ্রামে ১০-১৫ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টে রয়েছে ডিপিএস এবং এফডিআর। গ্রামের বাসিন্দারাও অবাক তাদের এই সম্পদ অর্জনে। প্রাথমিক আলাপচারিতায় তারা বলেন, বারোঘর গ্রামের প্রতিটি মৌজায় এই পরিবারের বিপুল পরিমান জমি রয়েছে। অধিকাংশ জমিই স্থানীয় দালালদের সাথে যোগসাজশ করে উচ্চ মূল্যে ক্রয় করা হয়েছে। একটি শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের এত বিপুল সম্পদ আহরণের উৎস নিয়ে তারা সন্দিহান বলেও মত প্রকাশ করেছেন এফটি টীমের কাছে। ২০১৪ সালে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর মাত্র এক যুগের ব্যবধানে তুহিন চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে গড়ে ওঠা এই বিশাল সাম্রাজ্যের উৎস কি—এমন প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। এছাড়াও প্রশ্ন উঠেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের নেতৃত্ব নিয়েও। কারণ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক হওয়া সত্বেও এমন বিতর্কিত একজন রাজস্ব কর্মকর্তার বিপুল সম্পদ আহরণের বিষয়ে তিনি কি অবগত ছিলেন না? এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের কাজ কি শুধু সাধারণ মানুষের বাড়তি সম্পদ নিয়েই অনুসন্ধান করা? তাদের সম্পদের অনুসন্ধান করবে কে? এমন প্রশ্ন এখন পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানের সামনে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মস্থলে ঘুষ, মাসোহারা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। এনিয়ে বিস্তারিত আজকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো। যশোরেই হাতেখড়ি মাসোহারার ২০১৪ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তুহিন চৌধুরীর প্রথম কর্মস্থল ছিল যশোর ভ্যাট কমিশনারেট। সেখানে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ভ্যাট-সংক্রান্ত অজুহাতে যশোরের নামকরা সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই অর্থ আদায় করা হতো। বন্ড কমিশনারেটে ‘প্রভাব’ ও সম্পদ বৃদ্ধি ২০১৬ সালে তাঁর বদলি হয় তৎকালীন ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট নামে পরিচিত হয়। একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ করে তিনি বন্ডে পদায়ন নেন। আর এই বন্ড থেকেই তিনি হয়ে উঠেন কোটি কোটি টাকার মালিক। বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে বেপরোয়া হয়ে উঠেন তুহিন চৌধুরী। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রাখা, ছাড়পত্র দিতে ঘুষ দাবি এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছিলো তার বিরুদ্ধে। এক পর্যায়ে কমিশনার তাকে ৬ মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্তও করেন। সেসময় টাকা আর ক্ষমতার গরম দেখিয়ে তিনি কমিশনারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন এবং বিষয়টি তখনকার কমিশনার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে পর্যন্ত অবহিত করেন। কিন্তু এই বিষয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর কালক্ষেপন তুহিন চৌধুরীকে আরও আগ্রাসী করে তোলে। সাসপেন্ড থেকে ফিরে এসে তিনি বীরদর্পে ফাইল ধরে ধরে দুর্নীতি করেছেন। তামাবিলে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য পরবর্তী সময়ে সিলেটের তামাবিল শুল্ক স্টেশনে দায়িত্ব পালন করেন তুহিন। তামাবিলে থাকাকালীন তিনি এমন কোন দুর্নীতি নেই যা তিনি করেননি। ট্রাক ধরে ধরে ৫০ হাজার করে টাকা নিতেন। প্রতিদিন এই তামাবিল থেকে তিনি ১০ লাখ টাকা তখন আয় করতেন। এসময়ে তিনি যুক্ত হয়ে যান মাদকের সঙ্গে। সিলেটের তামাবিলে পোস্টিং থাকার সময় বিজিবির হাতে মদ নিয়ে তিনি আটক হন। তখন এই কর্মকর্তাকে নিয়ে বিজিবি সংবাদ সম্মেলন করে এমনকি অধিকাংশ জাতীয় গণমাধ্যমে তার ছবিসহ প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ম্যানেজ করে তিনি পার পেয়ে যান। তুহিন চৌধুরী সিলেটে থাকাকালীন মদের ব্যবসাও করতেন। সিলেটের একাধিক সূত্র এফটি টীমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে সিলেটে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা ৪০ লাখ টাকা তার গ্রামের এক মুদি দোকানের ব্যবসায়ীর একাউন্টে জমা করেছিলেন। পরবর্তীতে এটি জানাজানি হলে সেই মুদি দোকানদারকে তিনি ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ করেন। চট্টগ্রাম কাস্টমসে ‘সিন্ডিকেট’! চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে দায়িত্ব পালনকালে তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগ ওঠে। এছাড়াও চট্টগ্রাম কাস্টমসে দায়িত্ব পালনকালে একটি বড় রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় তুহিন চৌধুরীর নাম সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসে। সূত্র মতে, ২০২৪ সালে একটি আমদানি চালানের শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে তুহিন চৌধুরী দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে শুল্ক গোয়েন্দার পরীক্ষায় উক্ত চালানে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য পাওয়া যায় এবং অতিরিক্ত শুল্ককর ও জরিমানাসহ কয়েক কোটি টাকা আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে সেই ঘটনায় তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে অবৈধ অর্থ গ্রহণের উঠলেও উর্ধতন কর্তৃপক্ষ এবারও কোন বিভাগীয় পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কাজ করা একাধিক সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২ বছর চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত থাকাকালীন তুহিন চৌধুরী কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেন। তিনি পুরো চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন। সেই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো - কোন পণ্য কখন খালাস হবে, কোন ফাইল আগে নিষ্পত্তি হবে এবং কোন আমদানিকারকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে। এমনকি তুহিন চৌধুরী রাজস্ব বোর্ডের উচ্চ মহলে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে নিজের পছন্দসই কর্মকর্তাদের পোস্টিং করাতেন এবং নিজেও কমিশনারের নাম ভাঙ্গিয়ে পোর্টে পণ্য দেখার নামে পণ্য ধরে ধরে ঘুষ নিতেন। দুই মাসে এস এ পরিবহনে কোটি টাকা প্রেরণ চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত থাকা অবস্থায় মাত্র দুই মাসে ৫৪ লক্ষাধিক টাকা ও মূল্যবান ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ কোটি টাকা এস,এ পরিবহনে নিজ বাড়ি নেত্রকোনায় পাঠিয়েছেন। তুহিন চৌধুরীর এই অকল্পনীয় লেনদেন জনমনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে । কাস্টম সংশ্লিষ্ট অনেকেই এই বিষয়কে অকল্পনীয় কাণ্ড হিসেবে অবহিত করেছেন। হতবাক হয়েছেন অনেকেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমসে কর্মরত অনেকেই বলেন, গত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে অর্থাৎ ৫ আগস্টের আগে তুহিন টাকার পাহাড় করেছেন শুনেছি। তবে এতো টাকা কামিয়েছে তা ভাবিনি। ২ মাসে যদি কোটি টাকা বাড়িতে পাঠায় তাহলে দুই বছরে কতো টাকা কামিয়েছে তা ভাববার বিষয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র দুই মাসের মধ্যে এস এ পরিবহনের মাধ্যমে ১৩টি চালানে মোট ৫৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা তার (তুহিন) এর গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় জনৈক রতন নামের এক ব্যক্তির কাছে পাঠানো হয়েছে। অপর এক চালানে শিশির চৌধুরীর নামে ৯ পদের প্রায় ৭ লক্ষ টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিক মালামাল পাঠানো হয়েছে । জানা গেছে জনৈক শিশির চৌধুরী তুহিন চৌধুরীর ভাই। শিশির চৌধুরী একটি বেসরকারি কলেজের প্রভাষক বলে সুত্র জানিয়েছে। উল্লেখিত ১৩ টি চালানের মধ্যে ১২টি চালানের প্রেরক একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি, যিনি তুহিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ জন বলে পরিচিত। অপর একটি চালান খোদ তুহিন চৌধুরীর নামে। এই চালানের ৫ লক্ষ টাকা পাঠানো হয় ঢাকায় আর আমিন নামক জনৈক ব্যক্তির কাছে। বাকি টাকা চট্টগ্রাম থেকে নেত্রকোনায় পাঠানো হয়েছে, যেখানেই তুহিন চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি। নেত্রকোনা যে রতনের কাছে টাকা পাঠানো হয়েছে চালানে উল্লেখিত মোবাইল নাম্বারে ফোন করে জানতে চাইলে তিনি (রতন) বলেন, এইসব টাকা তুহিন স্যার পাঠিয়েছেন। আমি এস,এ পরিবহন থেকে গ্রহণ করে যাকে দিতে বলেছেন তাকে দিয়েছি। এক প্রশ্নের জবাবে রতন বলেন, তুহিন স্যার অনেক জায়গা-জমি ক্রয় ও বন্ধক নিয়েছেন। নৈতিক স্থলন রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের বিতর্কিত রাজস্ব কর্মকর্তা তুহিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনও নানা স্ক্যান্ডালের সাথে জড়িয়ে আছে। অভিযোগ রয়েছে, তুহিন চৌধুরী ২০১২ সালে প্রথম বিয়ে করেন। তবে পরবর্তীতে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে চাকরির আবেদনের উদ্দেশ্যে তিনি তার বিয়ের তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখেন। পরবর্তীতে, প্রথম স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় থাকা অবস্থাতেই তিনি অন্য এক বিবাহিত নারীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে প্রথম স্ত্রীকে প্রতারিত করে তিনি ওই নারীকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং তাকে নিয়েই বর্তমানে রাজধানীর গুলশানে ১০ কোটি টাকা দিয়ে কেনা আলিশান এক ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন। এসব বিষয়ে জানতে কাস্টম ও ভ্যাট কর্মকর্তা তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, কাস্টমস ও ভ্যাটে কর্মরত অনেকেরই অবৈধ সম্পদ রয়েছে। কারও কম কারও বেশি। এত সম্পদ কিভাবে করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটা কি আপনাকে বলতে হবে? এসব বিষয়ে দেখার জন্য দুদক আছে, সিআইসি আছে, আরও সংস্থা আছে। তারা দেখবে, আপনি দেখার কে? এই কথা বলে উত্তেজিত হয়ে তিনি ফোনটি কেটে দেন। একটি শিক্ষক পরিবার থেকে উঠে আসা তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নিজের ও পরিবারের সকল সদস্যদের নামে থাকা বিপুল জমি, বাড়ি, এফডিআর, ডিপিএসসহ বিভিন্ন সম্পদই মূলত প্রশ্ন তুলেছে—একটি শিক্ষক পরিবার এবং একজন সরকারি চাকরিজীবী সদস্যের বৈধ আয় দিয়ে নিজের ও পরিবারের নামে থাকা সম্পদের কতটুকু অর্জন সম্ভব?