আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন দেশে অস্থিরতা চলছে, ঠিক সেই সময়ে চাঁদপুর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল নিয়ে শুরু হয় লুটপাটের কাজ। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে টেন্ডার ছাড়াই প্রকল্প, কোথাও কাজ না করে—কোথাও নামমাত্র কাজ করে পুরো কাজের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে মাত্র দুই দিনে ২১টি চেকের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওসমান গণি পাটোয়ারী অপসারণের ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট বিভিন্ন প্রকল্পের নামে ইস্যু করা হয় ১৭টি চেক; এসব চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর চার দিন আগে ১৪ আগস্ট চারটি প্রকল্পের বিপরীতে আরও ১৬ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ ১৪ ও ১৮ আগস্টের নথিতে থাকা অঙ্ক যোগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। যদিও জেলা পরিষদ প্রশাসকের বক্তব্যে এই দুই দিনের উত্তোলনের পরিমাণ ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বলা হয়েছে।
নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও জেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রকল্পে কাজ হয়নি। আবার কোথাও আংশিক কাজ হলেও পুরো কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল দেওয়া হয়েছে। আবার কোনও কোনও ঠিকাদার দাবি করেছেন, তাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ ও বিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও প্রকল্প সম্পর্কে তারা কিছুই জানতেন না।
অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট চাঁদপুর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে চারটি প্রকল্পের বিপরীতে ১৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর চেয়ারম্যান অপসারণের আগের দিন ১৮ আগস্ট বিভিন্ন প্রকল্পের নামে ইস্যু করা হয় আরও ১৭টি চেক। এসব চেকের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। অর্থাৎ মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড়ের ঘটনা ঘটে। এই ১৭টি চেকের মধ্যে চেয়ারম্যানের আত্মীয় ঠিকাদার শেখ নজরুল ইসলামের নামে একদিনেই সাতটি প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৭০ লাখ টাকার বিল দেওয়ার তথ্যও রয়েছে।
হলরুমের কাজে প্রায় ১৬ লাখ টাকা বিলের প্রশ্ন
নথিতে থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে জেলা পরিষদের হলরুমের ওয়াল টাইলসকরণ এবং ভবন সংস্কার ও রংকরণ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। মেসার্স শরীফ অ্যান্ড ব্রাদার্স ও মেসার্স আরিফুল ইসলাম এন্টারপ্রাইজের নামে নেওয়া এই দুটি প্রকল্পের মূল্য প্রায় ১৬ লাখ টাকা। অনুসন্ধান দেখা গেছে, বাস্তবে কোনও কাজ না করেই প্রকল্প দুটির বিপরীতে পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
যা বলছেন ঠিকাদার
মেসার্স শরীফ অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী শরীফ মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, “জেলা পরিষদের হলরুমের কোনও কাজ আমি করিনি—এটি শতভাগ নিশ্চিত। তবে আমার লাইসেন্সে অন্যরা দুই-তিনটি কাজ করেছে। ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রে একজনের লাইসেন্সে আরেকজন কাজ করে, এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এ কাজটি কে করেছে, এ বিষয়ে আসলে আমার খোঁজ নিতে হবে।”
তবে এর একদিন পর নিজের আগের বক্তব্য পরিবর্তন করে তিনি বলেন, “আমার লাইসেন্সে কাজ করেছি বলেই আমার নামে বিল হয়েছে। আমরাই কাজ করেছি।”
অন্যদিকে হলরুমের ওয়াল টাইলসকরণ প্রকল্পের ঠিকাদার আরিফুল ইসলাম বলেন, “এ দুটি কাজ সম্পর্কে আমি জানি না। কাজগুলো কী ছিল, তাও বলতে পারবো না। প্রকল্প পাসের প্রক্রিয়াও আমার জানা নেই।”
তার অভিযোগ, জেলা পরিষদের প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাকে ফোন করে সকালে চেক নিয়ে যেতে বলেন এবং বিকালে টাকা ফেরত নেওয়ার কথা জানান। আরিফুল ইসলাম বলেন, “টাকা উত্তোলনের পর ওই দিন বিকালেই প্রায় ১৮ লাখ টাকা ইঞ্জিনিয়ার আমার কাছ থেকে নিয়ে যান।”
তিনি আরও বলেন, “আমি সহজ-সরলভাবেই আমার লাইসেন্সে কাজ করার অনুমতি দিয়েছিলাম। ঠিকাদারি সেক্টরে এটি প্রায়ই হয়ে থাকে। তবে প্রকল্প সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। যদি কাজ না করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে থাকে, তাহলে আমি এর বিচার দাবি করছি।”
একদিনেই ঠিকাদার নজরুলের নামে প্রায় ৭০ লাখ টাকা
১৮ আগস্ট ইস্যু করা চেকগুলোর মধ্যে চেয়ারম্যানের আত্মীয় ঠিকাদার শেখ নজরুল ইসলামের নামে সাতটি প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৭০ লাখ টাকার চূড়ান্ত বিল দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব প্রকল্পের কয়েকটির কাজ তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এর মধ্যে বাবুরহাট মার্কেটের সাইট প্রস্তুত ও বালু ভরাটের দুটি কাজের বিপরীতে প্রায় ২৭ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। তবে শেখ নজরুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি যে কাজ করেছেন শুধু সেই কাজেরই বিল নিয়েছেন।
একদিনে ৭০ লাখ টাকা উত্তোলনের কথা শুনে প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমি যে কাজ করেছি, তারই বিল নিয়েছি। কাজের বাইরে কোনও বিল নিইনি। অফিস বা ইঞ্জিনিয়ারকে জিজ্ঞেস করুন। তারা জানেন।”
তিনি বলেন, “মার্কেটের সাইট প্রস্তুতকরণের জন্য অবকাঠামো অপসারণের কাজের জন্য ভেকু ইঞ্জিনিয়ার ও নির্বাহী কর্মকর্তা কন্টাক্ট করেছেন। তারা বলতে পারবেন কত টাকা ব্যয় হয়েছে। আমার লাইসেন্স ব্যবহার করে আমাকে দিয়ে টাকা উঠিয়ে তারা লেনদেন করেছেন।”
বালু ভরাটের বিষয়ে তিনি বলেন, “বাবুরহাট বাজারের মসজিদের সামনে খাল ভরাট করা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার আর নির্বাহী কি কাজ না দেখে আমাকে বিল দিয়েছেন? আমি কাজ করা ছাড়া কোনও টাকা নিইনি।”
তবে বাবুরহাট বাজারের ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, উচ্ছেদ অভিযানের পর জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সেখানে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ১০০ গাড়ি বালু ফেলা হয়েছিল। ব্যবসায়ীরাও নিজেদের উদ্যোগে কিছু জায়গায় বালু ফেলেছেন। এরপরও পুরো জায়গা ভরাট হয়নি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, ওই সময়ের বালুর মূল্য হতে পারে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা।
আরও ৩৪ লাখের পাঁচ চেক
নথিতে আরও পাঁচটি চেকের তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে চেয়ারম্যান অপসারিত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অর্থ উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে জেলা পরিষদের হিসাবরক্ষক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান স্যারের অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফাইলগুলো আমার কাছে এসেছে। নিয়ম অনুযায়ী সেই ফাইলগুলোর জন্য আমি চেক লিখে চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করি। চেকগুলোতে চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করেন। তবে পরবর্তীতে কী কারণে নির্বাহী স্যার চেকগুলো বাতিল করেছেন, তা তিনি বলতে পারবেন।”
ভুয়া প্রজেক্ট তৈরি করে ৩৪ লাখ টাকার চেক তৈরি
তবে জেলা পরিষদের প্রশাসক সেলিম উল্লাহ সেলিম বলেন, “এই পাঁচটি চেকের বিপরীতে কোনও ফাইল নেই, প্রজেক্ট নেই। নির্বাহী কর্মকর্তা কেন স্বাক্ষর করলেন? তিনি স্বাক্ষর করা মানে প্রজেক্ট সম্পন্ন হওয়া। সম্পূর্ণ ভুয়া প্রজেক্ট তৈরি করে ৩৪ লাখ টাকার পাঁচটি চেক তৈরি করেন।”
কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি—‘দু-একটি কাজ মোটেই হয়নি’
জেলা পরিষদের উচ্চমান সহকারী আব্দুল কুদ্দুস ভাটও কয়েকটি প্রকল্পের কাজ না হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার জানামতে যেসব প্রকল্পের কথা বলে বিল নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অফিসের ভেতর কোনও কাজ হয়নি। অন্যান্য কাজ আংশিক হয়েছে। কয়েকটি কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে। সব অনিয়ম হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়; আবার সব যে ঠিকঠাক হয়েছে, তাও নয়।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, কাজের সাইট পরিদর্শন ও তদারকির দায়িত্ব প্রকৌশলীর। প্রকৌশলী কাজের পরিমাণ ও বাস্তবায়ন যাচাই করে সার্টিফাই করলে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “নথি পর্যালোচনা করে দেখেছি, কোনও ফাইলে সার্টিফাই লেখা আছে, আবার কোনোটিতে নেই। তবে তিনিই বিল প্রস্তুত করেছেন, স্বাক্ষর দিয়েছেন—সে অনুযায়ী সমস্ত প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়।”
প্রশাসক বলছেন, প্রজেক্ট নেই, কাজ হয়নি
চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সেলিম উল্লাহ সেলিম বলেন, “সকল ফাইল স্বাক্ষর করতে হবে জেলা পরিষদের অফিসে বসে। কিন্তু তিনি অফিসে না বসলেও চার দিনের ব্যবধানে এক কোটি ৭৫ লাখ টাকার বিল অনুমোদন হয়ে গেলো। এগুলো আমি যাচাই-বাছাই করে দেখেছি—প্রজেক্ট নেই, কাজ হয়নি। সম্পূর্ণ ভুয়া প্রজেক্ট দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় প্রকল্পের বাস্তবতা ও কাজের অগ্রগতি যাচাই করা হয়নি।
সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন ভুল করে লেখা হয়েছিল
চেক বাতিলের বিষয়ে জেলা পরিষদের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, “চেকগুলো কীভাবে হয়েছে, তা জানার পরই সেগুলো বাতিল করা হয়।” তিনি বলেন, “যতদূর মনে পড়ে, ওই ফাইলগুলো সঠিক ছিল না। ভুল করে লেখা হয়েছিল।”
তার দাবি, প্রকৌশলীর প্রত্যয়ন ছাড়া কোনও বিল দেওয়া হয় না। তিনি আরও বলেন, “বরং অনেকে ঠিকঠাক কাজ না করা, ব্যক্তি স্বার্থের প্রকল্প—এ ধরনের কয়েকটি প্রকল্প ৫ আগস্টের পর বাতিল করেছি।”
ঠিকাদারদের লাইসেন্স ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “এসব প্রতিষ্ঠান অনেকটা ওয়ান ম্যান শো। এসব প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান-ইঞ্জিনিয়ারের পছন্দের লোকজন বেশির ভাগ জায়গায় এনলিস্টেড হয়। ঘুরেফিরে ওইসব ঠিকাদারই কাজ পায়। আমরা শুধু নিয়ম-কানুনগুলো দেখে দিই। আমাদের এখানে কোনও ব্যক্তি স্বার্থ নেই।”
ঠিকাদারদের অভিযোগ সম্পর্কে তার প্রশ্ন, “বিল তো তাদের কাছেই গিয়েছে। তিনি না জানলে বিলের জন্য আবেদন করলো কে?”
প্রকৌশলী বললেন কাজ হওয়ার পরই বিল দিয়েছি
জেলা পরিষদের সাবেক প্রকৌশলী ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন প্রকল্পকে পুরোপুরি বাস্তবায়িত দেখিয়ে কাজ বুঝে নেওয়ার সার্টিফিকেট দিয়েছেন।
তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “কাজ হওয়ার পরই বিল দিয়েছি, কাজ ছাড়া তো বিল দেওয়ার কথা না। চেকগুলো সম্ভবত আগের চেয়ারম্যান স্যার স্বাক্ষর করেছেন।”
ঠিকাদারদের লাইসেন্সে কারা কাজ করলো?
অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কাজের প্রকল্প, বাস্তবায়ন এবং অর্থ উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য।
একাধিক ঠিকাদার বলেছেন, তাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের ধরন, কাজের পরিমাণ কিংবা বাস্তবায়নের স্থান সম্পর্কে তারা বিস্তারিত জানতেন না বলে দাবি করেছেন।
অন্যদিকে জেলা পরিষদের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, বিল ঠিকাদারদের কাছেই গেছে এবং তারা না জানলে বিলের জন্য আবেদন করলো কে—এ প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
ফলে কোন ঠিকাদারের লাইসেন্সে কোন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে কাজ কে করেছেন, কে সাইট পরিদর্শন করেছেন, কে কাজ সম্পন্নের প্রত্যয়ন দিয়েছেন এবং উত্তোলিত অর্থ শেষ পর্যন্ত কার হাতে গেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদন্তে দুদক
এসব অভিযোগ সামনে এলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বা অন্য কারও বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পরিষদের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন সরদার।
তিনি বলেন, “আমি এখানে যোগদানের পরে সম্প্রতি আমরা দুদক থেকে একটি চিঠি পেয়েছি। এ বিষয়ে তারা তথ্য চেয়েছে। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে দুদকের চিঠি পাওয়ার পর। এখন যেহেতু বিষয়টি দুদক তদন্ত করছে, তাদের আমরা যতটুকু সম্ভব তথ্য দেবো। আমাদের আলাদা করে তদন্ত করার বিষয় থাকবে না।”
নথিতে পাওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন, কাজ না হওয়ার অভিযোগ, ঠিকাদারদের লাইসেন্স ব্যবহারের দাবি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রত্যয়ন নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য—সব মিলিয়ে চাঁদপুর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এখন দুদকের তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে, প্রকল্পগুলোর বাস্তব কাজ কতটুকু হয়েছিল এবং উত্তোলিত অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিশেষ অভিযানে ৩৫০ গ্রাম গাঁজাসহ মো. ইসমাইল হক (৩৮) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। আজ সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুর ১২টার দিকে সদর থানাধীন কালিনগর ইংলিশ মোড় এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। আটককৃত মো. ইসমাইল হক ওই এলাকার মৃত আবদুল লতিফের ছেলে।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপ-পরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই যৌথ অভিযানে পুলিশ, র্যাব ও কাস্টমসের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আসামীর বসতবাড়ীতে তল্লাশি চালিয়ে ৩৫০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারসহ তাকে হাতেনাতে আটক করা হয়। অভিযান শেষে উপ-পরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান বলেন, "মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।" পাশাপাশি তিনি মাদক নির্মূলে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য সর্বস্তরের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে আটক আসামীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করেছেন।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৫ এর পরিচালক মোঃ হামিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে নোটিশ বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা এবং নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করতে যাওয়া এক অভিযোগের নথিপত্র থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল করিম জনস্বার্থে এই অভিযোগটি দুদকে জমা দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালের ৫ ডিসেম্বর সহকারী সচিব পদে রাজউকে যোগদান করেন দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হামিদুল ইসলাম। ২০১৬ সালে উপ-পরিচালক এবং ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। আগামী ২০৩৬ সালের ২৪ নভেম্বর তার অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০ এপ্রিল এবং ২০ আগস্ট তার বিরুদ্ধে দুদকে পৃথক অভিযোগ জমা পড়েছিল। নোটিশ ও বদলি বাণিজ্য: অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, পরিচালক হামিদুল ইসলাম তার অধীনস্থ ইমারত পরিদর্শকদের এরিয়া বণ্টনের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে এলাকা ঠিক করে দিতেন এবং পরবর্তীতে মাসিক পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতেন। তার নির্দেশে পরিদর্শকরা নিয়মবহির্ভূত ভবনের মালিকদের নোটিশ দিয়ে ভয় দেখাতেন এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেসব নোটিশ গায়েব করে দিতেন। নিউ এলিফ্যান্ট রোডের হোল্ডিং-১১০, ১১১ ও ১১২ নম্বরের মালিক কামরুল হাসানের ভবনে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পর ২০ লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে হোল্ডিং-৮২ নম্বরের মালিকের কাছে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে অনিয়ম চাপা দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জোন-৪ (গুলশান) এ বদলি হওয়ার জন্য জোরালো লবিং চালাচ্ছেন। চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ: অভিযোগে আরো বলা হয়, ২০১৬-১৭ সালে রাজউকে ড্রাইভার পদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কেরানীগঞ্জের শাহীন ও আব্দুল্লাহপুরের মতিনসহ কয়েকজনের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেন তিনি। শাহীন পৈতৃক জমি বিক্রি করে এবং মতিন স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে এই টাকা দিলেও তারা চাকরি পাননি, এমনকি টাকাও ফেরত পাননি। অঢেল অবৈধ সম্পদ: রংপুরের মিঠাপুকুর থানার রূপসা গ্রামের সন্তান হামিদুল ইসলামের ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকে তিনি গ্রামের বাড়ি রংপুর ও শ্বশুরবাড়ির এলাকায় বিপুল পরিমাণ কৃষি ও অকৃষি জমি ক্রয় করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, যার বৈধ উৎস তিনি প্রদর্শন করতে পারবেন না। রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম জানান, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত কমিটি গঠন করে খতিয়ে দেখা হবে এবং দোষী প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের বিষয়ে মতামত জানার জন্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিচালক মোঃ হামিদুল ইসলামের টেলিফোনে চেষ্টা করেও সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন আর সনদ জালিয়াতি নিয়ে যেন অনিয়মের এক রাজত্ব গড়ে উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরে। এ রাজত্বের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের বিতর্কিত প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার, জ্যেষ্ঠতার নিয়ম ভেঙে পদ বাগানো ও বেইলি রোডের ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় বিতর্কিত ভবন গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকার পরও তিনি রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলীর গুরু দায়িত্বে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি অধিদপ্তরে শক্ত এক সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে চালানো হয় বদলির খেলা। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে লটারির মাধ্যমে বদলির নিয়ম করা হলেও বাক্সে আগে থেকেই পছন্দের প্রার্থীর নাম রাখা এবং স্বজনপ্রীতি ও কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে প্রকৌশলীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ আনা ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ঠেকানোর নামেও ফান্ড সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। এক প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজ দেখিয়ে বাড়তি বিল উত্তোলন এবং নানা বিতর্কিত কাণ্ডের পাশাপাশি সাজানো মামলায় সহকর্মীদের ফাঁসানো ও অস্ট্রেলিয়ায় ১১ বছর প্রবাস জীবন কাটিয়েও পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করে প্রধান প্রকৌশলী নিজের অপরাধের পাহাড় আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তথ্য বলছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে প্রশ্ন ওঠে সেই স্বচ্ছতা নিয়েই। বিশেষ করে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ কেন্দ্র করে প্রকৌশলীরা তিন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে একটি গ্রুপে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলীরা, যারা লটারির মাধ্যমে বদলি চান না। আরেকটি গ্রুপে আছেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীরা, যাদের স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য সৃষ্টি করে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয় গ্রুপটিতে রয়েছেন সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীরা, যে গ্রুপের সবাইকে বদলি করা হয়েছে ঢাকার বাইরে। বিশেষ করে যেসব প্রকৌশলী মাত্র কয়েক মাস আগে বদলি হয়েছেন ও দীর্ঘদিন পর ঢাকায় যোগদান করেছিলেন, কয়েক মাসের মাথায় তাদের আবার ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হয়েছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। ৫ আগস্টের পর বাগিয়ে নেন প্রধান প্রকৌশলীর পদ, গড়েন সিন্ডিকেট: জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব নেন মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। এরপরই নিজের পছন্দের লোকজন নিয়ে গড়ে তোলেন সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি, টেন্ডার কমিশন আদায় ও ভাগবাটোয়ারা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ আনতে ফান্ড সংগ্রহ ও ঘুষ আদান-প্রদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সিন্ডিকেটের সদস্যরা হলেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে সদ্য বদলিকৃত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী। তথ্য বলছে, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলি শেষেই নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি হওয়ার কথা এবং প্রধান প্রকৌশলী নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত বদলি করতে পারবেন। কিন্তু সেই ক্ষমতাবলে নির্বাহী প্রকৌশলীদের তিনি বদলি করতে চাচ্ছেন না, যা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। এ ছাড়া অনেক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এক প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজ দেখিয়ে কাজের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা বিল উত্তোলন, কাজ না করে বিল প্রদান, বিতর্কিত নারীঘটিত ঘটনা, ব্ল্যাক মেইল, দলীয় কারণ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না প্রধান প্রকৌশলী; বরং এসব ঘটনার কারণে যারা সাময়িক চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তাদের বহালে নানা কৌশল করেছেন তিনি। বদলির লটারিতে স্বজনপ্রীতি-বৈষম্য: বদলির লটারিতে বৈষম্যের শিকার প্রকৌশলীরা বলছেন, লটারির বদলির কার্যক্রম শুরুর আগেই পরিচিত ও তদবির করা অনেকের নাম রাখা হয় ঢাকার বাক্সে। স্বজনপ্রীতিতে নিজ জেলায় স্বপদে রাখতেও করা হয় আর্থিক লেনদেন। এ ছাড়া আরও সাতজনকে কোনো লটারির আওতায় আনা হয়নি, যাদের মধ্যে তিনজন সিভিল ও চারজন ই/এম বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, আবু তাহের মোহাম্মদ খাইরুল বাশারকে রংপুর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ উপবিভাগে; গোলাম রাব্বিকে লালমনিরহাট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ ও ছাইফুল ইসলামকে নারায়ণগঞ্জ থেকে হাইকোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বদলি করা হয়েছে। এ এস এম সাখওয়াত ইসলাম ও রেজাউল করিম মিঠু ফের ঢাকায় পদায়ন পান। এ এস এম সাখওয়াত ইসলাম এর আগে রাজারবাগ গণপূর্ত উপবিভাগ-১, গণপূর্ত রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগ, শেরে-বাংলা উপবিভাগে ছিলেন; কিন্তু তাকে মিরপুর উপবিভাগে বদলি করা হয়েছে, অথচ তার বাড়ি বগুড়া। ফরিদপুরের রেজাউল করিম মিঠু মতিঝিল গণপূর্ত উপবিভাগ, শেরে-বাংলা উপবিভাগ-৩, মহাখালী উপবিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৭ হয়ে পদায়ন পেয়েছেন ঢাকা সম্পদ উপবিভাগে। উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জয় চৌধুরীর নাম চট্টগ্রাম রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে উঠলেও নিজ জেলার অজুহাত দিয়ে তাকে লটারি পরিবর্তন করে অন্যত্র বদলি করা হয়। অথচ ঢাকা নিজ জেলা হওয়া সত্ত্বেও মো. মেহবুবুর রহমান ও মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামকে যথাক্রমে পিলখানা গণপূর্ত উপবিভাগ ও রমনা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩-এ পদায়ন করা হয়। এর আগে মেহবুবুর রহমান ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেন। অথচ প্রকৌশলী বরকত মজুমদার ও শেখ মোহাম্মদ এনামুল হকের নিজ জেলা ঢাকা বিভাগে হওয়া সত্ত্বেও তাদের যথাক্রমে চুয়াডাঙ্গা ও চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে, ময়মনসিংহের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার হোসাইনের নাম একই সঙ্গে লটারিতে ফরিদপুর ও নরসিংদী জেলায় ওঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ফরিদপুর জেলায় পদায়ন করে বদলি আদেশ জারি করা হয়। চাকরি জীবনে কখনোই ঢাকার বাইরে চাকরি করেননি প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান সাদ। উত্তরা উপবিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৬ (হাইকোর্ট) থেকে তেজগাঁও উপবিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। মো. মামুনুর রশিদের নিজ জেলা রংপুর হলেও তিনি পাঁচ বছরের অধিককাল সময় সাভার গণপূর্ত উপবিভাগে কর্মরত ছিলেন। মাঝে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হলেও বছর না ঘুরতেই তিনি গাজীপুর উপবিভাগে পদায়ন পান। লটারিতে অনিয়মের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবার ঢাকার উপবিভাগ পদায়ন হয় তার। নেত্রকোনার ইজাজ আহমেদ খানের লটারি ময়মনসিংহ বিভাগের আওতায় হওয়ার কথা থাকলেও লটারির আগে তাকে ঢাকার বাক্সে স্থানান্তর করা হয় এবং শেরেবাংলা নগর উপবিভাগ-৯ থেকে ধানমন্ডিতে পদায়ন পান। এ বিষয়ে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বদলির নানা অভিযোগ তুলে স্মারকলিপি দেন কিছু প্রকৌশলী। লটারি স্বচ্ছ না হওয়ার পাশাপাশি অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগও আনা হয় স্মারকলিপিতে। এ প্রকৌশলীদের অভিযোগ, উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পর্যন্ত বদলির ক্ষেত্রে নিজ জেলা বাদ দিয়ে নিজ নিজ প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে লটারির মাধ্যমে পদায়নের কথা। কোনো বিভাগে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি হলে অতিরিক্ত কর্মকর্তাকে অপেক্ষাকৃত কম কর্মকর্তা থাকা বিভাগে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে ঢাকায় পোস্টিং এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘অতিরিক্ত কর্মকর্তা’ দেখিয়ে লটারিতে আগে থেকেই নির্দিষ্ট প্রকৌশলীদের নাম ঢাকা জেলার বাক্সে ঢোকানো হয়। পরে ওই বাক্স থেকে তাদের নাম উঠিয়ে পোস্টিং দেওয়া হয় ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে। অভিযোগকারী এক প্রকৌশলীর ভাষ্য, পছন্দের পোস্টিং পাইয়ে দিতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, বদলি প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিভাগের জন্য দুটি লটারির বাক্স রাখা হয় ‘ঢাকা জেলা’ ও ‘ঢাকা বিভাগ’ নামে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ঢাকা জেলার বাক্সে শুধু ঢাকা জেলার বা সংশ্লিষ্ট যোগ্য কর্মকর্তাদের থাকার কথা হলেও সেখানে দেশের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের নাম কীভাবে এলো। লটারির আগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সিভিলের ঢাকা জেলার বাক্সে ৪১ জনের নাম যুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে। বদলি বা পদায়নের বিপরীতে অর্থ লেনদেন: তথ্য বলছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬৫ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি বা পদায়নের সুযোগ করে দিতে ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। এসব লেনদেনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। চলতি বছরের ৩ মার্চ পৃথক কয়েকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এক দিনেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। এত বড় পরিসরে বদলি-পদায়নের আগে মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করার অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলীকে বদলির সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা ও প্রক্রিয়াগত নিয়ম যথাযথ অনুসরণ করা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পরে খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে তলব করে গণপূর্তমন্ত্রী এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চান বলে জানা গেছে। তবে প্রধান প্রকৌশলীর ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে আগের গণবদলির অধিকাংশই বাতিল করা হয় বলে জানা গেছে। এরপরও ছোট পরিসরে বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে। খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছে। ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার: নথি বলছে, ভুয়া পিএইচডি সনদ দেখিয়ে উচ্চতর শিক্ষা ছুটিতে প্রেষণ ভোগের ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। বিভাগীয় তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি দোষ স্বীকার করলেও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য প্রয়াত সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর (যাকে তিনি ফুফু ডাকতেন) প্রভাবে নামমাত্র শাস্তি দেন তৎকালীন গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার। লঘুদণ্ড বদলে এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধের সাজা দেওয়া হয়। এর তিন বছরের মধ্যে খালেকুজ্জামান হন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং তার পর মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে বনে যান তিনি। এর মধ্য দিয়ে এক বছরে দুটি পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। পরে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে গোপালগঞ্জ গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। তবে ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টে বনে যান জামায়াতের বিশ্বস্ত সদস্য। সাবেক গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের হাত ধরে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে জামায়াতপন্থি হিসেবে পুরস্কার পান প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন দায়িত্ব) দায়িত্ব। এ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে এবং স্থবিরতা দেখা দেয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজে। মন্ত্রণালয়ের নথি বলছে, জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকার শীর্ষে মো. খালেকুজ্জামান নিজের নাম দেন। বাকি জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী ভেবে তাদের বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার সাজানো মামলার তথ্য জমা দেওয়া হয় সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি)। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের গ্রামে এসব মামলার নথি পাঠানো হয়, যাতে মামলার বিষয়টি সামনে আসে। এ ছাড়া ১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে খালেকুজ্জামান প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন। এর মধ্যে পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলেই দেশে ফিরে আসেন। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিভাগীয় মামলা হলেও সাজেদা চৌধুরীর লিখিত সুপারিশে তিন বছরের মধ্যেই শাস্তির বদলে একই বছরে পান দুই দফায় পদোন্নতি। সাজানো মামলায় সহকর্মীদের ফাঁসানোর অভিযোগ: পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, প্রতিযোগী মনে করে তালিকা থেকে সিনিয়রদের স্থায়ীভাবে বাদ দিতে জুলাই অভ্যুত্থানের পর রামপুরা থানার একটি মামলার আসামির তালিকায় কৌশলে ৪৭ প্রকৌশলীর নাম ঢোকানো হয় এবং মামলার নথি এসএসবি কমিটিতে জমা দেওয়া হয়। গত ৬ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নামে তালিকা। অধিদপ্তরের দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের (ঢাকা জোন) ও উৎফল কুমার দের থাকলেও তিন নম্বরে থাকা খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিজের নাম তালিকার ১ নম্বরে দেন। মো. শহিদুল আলম (স্বাস্থ্য উইং) এবং ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দার (প্রেষণে মহাপরিচালক, এইচআরআই) নামও তালিকায় দেওয়া হয়। গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনে সম্পৃক্ততা: রাজধানীর বেইলি রোডে ২০২৪ সালের শুরুতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় গ্রিন কোজি কটেজ। সাততলার এ বাণিজ্যিক ভবনে ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছিল ৪৬ জন; দগ্ধ ও আহত হয় আরও ১৩ জন। প্রাণহানির ঘটনা পর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে ভবনটি নকশার অনুমোদন নিয়ে। পরবর্তীকালে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে ২০১১ সালে এ ভবনের নকশার অনুমোদন দিয়েছিলেন রাজউকের তৎকালীন অথরাইজড অফিসার মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীসহ কয়েকজন। কিন্তু ওই রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের বছর না পেরোতেই ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদ বাগিয়ে নেন সেই খালেকুজ্জামান। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, গ্রিন কোজি কটেজে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করতেন, তবে ভবনটিতে কোনো জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি ভবনে চলাচলের সিঁড়িও ছিল না। জরুরি নির্গমন পথ থাকলে বা সিঁড়িটা প্রশস্ত হলে এত প্রাণহানি হতো না। অভিযোগ আছে, তদন্ত প্রতিবেদনে যেন তাকে জড়ানো না হয়, এজন্য বিভিন্নভাবে তদবির করেন তিনি। যদিও অথরাইজড অফিসার হিসেবে এ ভবনের অনুমোদনের পুরো দায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। কোনো অনিয়ম হয়নি, দাবি খালেকুজ্জামানের: নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলিতে কোনো অনিয়ম হয়নি। বিষয়টি মন্ত্রণালয় জানে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারিতে বদলি করা হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পূর্ত অধিদপ্তরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নির্বাহী প্রকৌশলীরা। লটারি নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বদলি হবে। অন্য সিনিয়র প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী ভেবে ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয় পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আমার কোনো প্রতিযোগী নেই। যা বলছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলিতে অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করা হবে না, এ কথা বলার দায়িত্ব প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়নি। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে যারা রয়েছেন, তাদের প্রতিযোগী ভেবে তাদের বিরুদ্ধে হওয়া ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এবং বিভিন্নভাবে তাদের হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সচিব বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে লাগে। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। খালেকুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী হয়েছেন গত বছর। তালিকা অনুযায়ী তিনি তিন নম্বরে আছেন। তার সিনিয়র রয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য গ্রেড-ওয়ান হওয়ার বিষয়ে যাচাই-বাছাই করার জন্য এসএসবিতে পাঠানো হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী যিনি থাকবেন, তাকেই বানানো হবে।