রহমত আরিফ ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁও শহরের ২৪ টিউবওয়েল এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালিয়ে মাদকসহ মো. আনোয়ার হোসেন খোকন (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে শহরের ২৪ টিউবওয়েল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার মো. আনোয়ার হোসেন খোকন পঞ্চগড়ের রামেরডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, নিয়মিত তল্লাশির অংশ হিসেবে ওই এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হচ্ছিল। এ সময় আনোয়ার হোসেন খোকনের কাছ থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হলে তাকে আটক করা হয়।
পরে তাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইমরান কবিরের ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাকে ৩ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা অর্থদণ্ড দেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আনোয়ার হোসেন খোকনকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রহমত আরিফ ঠাকুরগাঁও
০১৭৪০৮৬১০৮০
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা – দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, যখন দেশের প্রধান তিনটি বিরোধী দল—জাতীয় গণফ্রন্ট, উন্নয়ন পার্টি ও জননেতা পরিষদ—আজ এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ‘গণঐক্য জোট’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এই জোটের মুখ্য লক্ষ্য হলো আগাম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করা, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি এবং একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট আয়োজন নিশ্চিত করা। জাতীয় গণফ্রন্টের সভাপতি শহীদুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “দেশে এখন গণতন্ত্র নেই, জনগণের ভোটাধিকার নেই। তাই আমাদের এই ঐক্য—সত্যিকার অর্থে একটি গণআন্দোলনের সূচনা।” জোটের কর্মসূচি জোট নেতারা জানান, আগামী মাস থেকে সারা দেশে বিক্ষোভ, গণঅবস্থান, মানববন্ধন এবং জেলা পর্যায়ে গণসংলাপ কর্মসূচি শুরু হবে। তারা বলেছেন, এই জোট শুধুমাত্র সরকারবিরোধী নয়, বরং এটি একটি ভবিষ্যত রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবেও কাজ করবে। সরকারের প্রতিক্রিয়া সরকারি দলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে অঘোষিতভাবে কয়েকজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, “বিরোধীদের এই জোট জনভিত্তিহীন এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা।” বিশ্লেষকদের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব হাসান বলেন, “এই জোট নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে, যদি তারা মাঠে বাস্তব আন্দোলন ও বিকল্প নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে সরকার যেভাবে শক্ত হাতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখছে, তাতে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।” আগামী সপ্তাহে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জোটের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক মহল এই জোটকে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবেও দেখছে।
নিজের বদলি ঠেকাতে সেতু মন্ত্রীর স্বাক্ষরযুক্ত প্যাডে ডিও লেটার জালিয়াতি করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব। ঘটনাটি ওই সময়ে জানাজানি হওয়ার পর এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয় অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শামিম আখতারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে। যদিও জাল ডিও লেটারের বিষয়ে গণমাধ্যমে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছিলেন আন্দালিব। তার অস্বীকার করার পরে এই জাল ডিও লেটার কীভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এলো কিংবা কারা এই জালিয়াতির সাথে সম্পৃক্ত সেই বিষয়ে অদ্যবধি একটি তদন্ত কমিটি করার চিন্তাও করেননি সংশ্লিষ্টরা। যদিও সেতু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তখন এই বিষয়ে তদন্ত করার তাগিদ দেয়া হয়েছিল। সা’দ আন্দালিব নিজেকে বাঁচাতে ওই সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এই সমঝোতার দায়িত্বে ছিলেন লীগ সরকারের প্রিয় ও আস্থাভাজন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শামিম আখতার। এর বাইরে আন্দালিবের বিরুদ্ধে বেপরোয়াভাবে দুর্নীতি করার অভিযোগ রয়েছে। তিনি যখন যেখানে বদলি হয়ে গেছেন সেখানেই একটি করে ঠিকাদার সিন্ডিকেট তৈরি করে তাদের সাথে আঁতাত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন দুর্নীতির মাধ্যমে বলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থ বছরে নোয়াখালী গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে ডিপিপি ও আরডিপিপি'র অঙ্গ ভিত্তিক মূল্য অপেক্ষা অধিক ৩ কোটি ৯০ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের কার্যাদেশ প্রদান করেছেন। যা সম্পূর্ণ পিপিআর বা নিয়মবহির্ভূতভাবে করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কাজের চুক্তিমুল্যের উপর ঠিকাদারী ইনস্যুরেন্স না করায় ইনস্যুরেন্স বাবদ সরকারের মোটা অংকের ভ্যাট বা রাজস্ব সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিবের সাথে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন এসব কাজের সাথে জাড়িত ঠিকাদাররা। দরপত্র, চুক্তিপত্র, কার্যাদেশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব কাজের চুক্তিমূল্যের উপর বীমা না করায় প্রিমিয়ামের উপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট বাবদ বিপুল পরিমাণ টাকা রাজস্ব প্রাপ্তি হতে সরকার বঞ্চিত হয়েছে। চুক্তির শর্ত জিসিসি-৩৬.১, ৩৭ এবং পিপিআর,২০০৮ এর বিধি-৪, উপবিধি ৩(ট) অনুযায়ী চুক্তিমূল্যের উপর বীমা কাভারেজ করতে হয়। চুক্তির শর্ত জিসিসি-৩৬.১, ৩৭ এবং পিপিআর,২০০৮ এর বিধি-৪, উপবিধি ৩(ট) লক্ষন করে চুক্তিমুল্যের উপর ইনস্যুরেন্স না করায় ভ্যাট বাবদ সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বিপুল পরিমাণ টাকা। জানা গেছে, দুর্নীতির অভিযোগে গত ২০ মার্চ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে নোয়াখালী থেকে ফেনী গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হয় নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোহাম্মদ আন্দালিবকে। প্রজ্ঞাপন জারির পর বদলি ঠেকাতে নিজেকে লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা আন্দালিব তৎকালীন লীগ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী সচিবসহ বিভিন্ন মহলে তদবির শুরু করে সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব। সেই প্রেক্ষিতে গত ৪ এপ্রিল সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপির প্যাডে স্বাক্ষরযুক্ত একটি ভুয়া ডিও লেটার তৈরি করে তা গত ৮ এপ্রিল গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়ে বদলি ঠেকানোর চেষ্টা করেন। ডিও লেটারের কারণে ৮ এপ্রিল প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের স্বাক্ষরিত আরেকটি প্রজ্ঞাপনে তার ওই বদলির প্রজ্ঞাপনটি স্থগিত করে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ওই ডিও লেটারটি গত ১৫ এপ্রিল ভুয়া বলে প্রকাশ প্রায়। চিঠিতে দেখা যায় ৪ এপ্রিল প্রেরিত পত্রে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীকে বদলি সংক্রান্ত আদেশটি বাতিল করে তাকে স্বপদে বহাল রাখার জন্য সহযোগিতা কামনা করেছেন। পত্রে ডিও নম্বর ৩৫.০০.০০০০.০০১.৯৯.০০২.২৪-৯৭ উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনো স্মারক নাম্বার উল্লেখ করা হয়নি। পত্রে দেখা যায়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর ৮ এপ্রিল তারিখ উল্লেখ করে স্বাক্ষর রয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীর পদবি উল্লেখ করে জরুরি লিখে ওই পত্রে স্বাক্ষর করেছেন। গত ৪ এপ্রিল প্রেরিত পত্রে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীকে উদ্দেশ্যে করে লেখেন, প্রিয় সহকর্মী আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, জনাব সাদ মোহাম্মদ আন্দালিব নির্বাহী প্রকৌশলী নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগ, নোয়াখালী। তিনি একজন দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তা। আমার নির্বাচনি এলাকা নোয়াখালী জেলায় তিনি দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০.০৩.২০২৪ তারিখের ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১৯.১০১.২১.৩৬৯ সংখ্যক প্রজ্ঞাপনমূলে তাকে ফেনী গণপূর্ত বিভাগ ফেনীতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়েছে (কপি সংযুক্ত)। নোয়াখালী জেলার গণপূর্ত কাজসমূহ দক্ষতা ও গতিশীলতার সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের স্বার্থে জনাব সাদ মোহাম্মদ আন্দালিবকে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে তার চাকরি আরও কিছুদিন সময় চলমান রাখা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের বর্তমান গতিশীল কর্মধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে জনাব সাদ মোহাম্মদ আন্দালিব, নির্বাহী প্রকৌশলী, নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগ-এর বদলি সংক্রান্ত আদেশটি বাতিল করে তাকে স্বপদে বহাল রাখার জন্য আপনার সহযোগিতা কামনা করছি। ডিও লেটারে শেষে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের স্বাক্ষর রয়েছে। এ বিষয়ে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপির প্যাড ও স্বাক্ষরযুক্ত ডিও লেটার বিষয়ে সেতুমন্ত্রীর সাবেক পিএস-১ সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব গৌতম চন্দ্র পাল বলেন, বিষয়টি জানার পর আমরা বলেছি এই ধরনের ডিও লেটার কখনোই আমাদের স্যার দেন না। এটা স্যার দেয়নি। তারপর যখন কপি পেলাম তখন আমরা আরও ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে বললাম এটা আমাদের ডিও লেটার না। ভুয়া একটি ডিও লেটার। এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড কে বা কারা করেছে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। ভুয়া ডিও লেটারটি ফাঁস হলে সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিবকে গত ২৩ এপ্রিল প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে নোয়াখালী থেকে লালমনিরহাট গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে চার মাস পর গত ২০ অগাস্ট তাকে আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণপূর্তে বদলি করা হয়। সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিবের দুর্নীতি: সাবেক এমপির স্বাক্ষর জালিয়াতি ছাড়াও সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি নোয়াখালী গণপুর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় ২০২২-২৩ অর্থবছরের মেরামত ও সংরক্ষণ কাজের জন্য জেলার ৪৮টি স্থাপনার ৬৮টি কাজের জন্য পাঁচ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। যার মেয়াদ ২০২৩ সালের জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত ছিল। এর আগেই সব টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক কাজের কিছুই করা হয়নি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। আর করলেও নামমাত্র করে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পে নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্তূপ করে রাখা ময়লা অপসারণের খাতে ১৪ লাখ ১২ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় বাস্তবে এর কিছুই চোখে পড়েনি। ওই স্থানে তখনো ময়লার স্তূপ পড়ে ছিল। এমন প্রকল্পের খবর জেলা প্রশাসক নিজেও জানতেন না। নোয়াখালী গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনটি ২০১৯ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সরকার। তা সত্ত্বেও আরএপিপি প্রকল্পে ওই বাসভবনে ৩২ লাখ ৪৪ হাজার টাকার মেরামত ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর বাসভবনে ১৫ লাখ ৯৮ হাজার টাকা মেরামত কাজ দেখানো হয়েছিল। নোয়াখালী সার্কিট হাউজে ফুল বাগানের মাটি ভরাট, সেলুটিং ডায়াস, প্যারেড গ্রাউন্ড, ওয়াকওয়ে, রাস্তার পাশে ফুলের বেড উঁচুকরণ ও টাইলস স্থাপনে নামমাত্র কাজ করে ১৪ লাখ ২২ হাজার টাকা, গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২ এর অফিস কক্ষের ফ্লোর ও ওয়ালে টাইলসকরণ, দরজা-জানালার গ্রিল পরিবর্তনসহ থাইগ্লাস লাগানো ও রংকরণসহ স্যানিটারি কাজে ১৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের অধীন বিভিন্ন ভবন পরিষ্কার ও ধৌতকরণ কাজে ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা, নোয়াখালী চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে সিসিটিভি স্থাপনে ১৪ লাখ ৭৫ হাজার, একই স্থানে বিচারপ্রার্থীদের জন্য মাতৃদুগ্ধপান স্থাপন, অজুখানা নির্মাণ ও বিচারপতির আগমনে ভবন রংকরণে ২৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছিল ২০২২-২৩ অর্থ বছরে। এ ধরনের বিভিন্ন কাজ দেখিয়ে নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক কোটি ৪০ লাখ আট হাজার টাকা, গণপূর্ত বিভাগীয় কার্যালয়ে ৯১ লাখ ৬৮ হাজার, আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজে ৫২ লাখ ২৮ হাজার, জেনারেল হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে ১৬ লাখ ৭১ হাজার, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ৭৪ লাখ ৬৪ হাজার, জেলা কারাগার ও পাসপোর্ট কার্যালয়ে ৩৭ লাখ ৫৩ হাজার, সদর পৌর বাজার ও সুবর্ণচর ফায়ার সার্ভিসে ২৪ লাখ ২০ হাজার এবং জেলা চিফ জুড়িসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ে এক কোটি ২২ লাখ ৮৮ হাজার টাকার কাজের বিল তোলা হয়েছিল। একইভাবে জেলার স্বাস্থ্যখাতের মেরামতের (কোড-১৩৮) এক কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার টাকার কাজেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গত ১৮ জুন ২০২৩ প্রকল্পের ৯টি কাজের মেয়াদ শেষ হলেও যে কাজগুলো করা হয়েছে তাও নামমাত্র লোক দেখানো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক কোটি ২৮ লাখ টাকার কাজের মধ্যে রয়েছে নোয়াখালী সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্যানিটারি ও বিদ্যুতের কাজের সঙ্গে সম্মেলন কক্ষ মেরামতে ২০ লাখ, সীমানা প্রাচীর (বাকি কাজ) নির্মাণ ২০ লাখ, পার্কিংয়ে ফুটপাত টাইলস ও ভবন মেরামতে ১২ লাখ, ২৫০ শয্যার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক কোয়ার্টারের সীমানা প্রাচীর উঁচু করা ও কাঁটাতার স্থাপনে ২০ লাখ, এসি ও পাম্পের মোটর মেরামতে ১০ লাখ, ডিবি বোর্ডের সার্ভিসিং ও আইসোলেশন ভবনের সার্ভিস পরিবর্তনে ছয় লাখ ৮০ হাজার, আবাসিক কোয়ার্টারের টয়লেট, সেপটিক ট্যাঙ্ক ও স্যানিটারি মেরামতে ২০ লাখ, মর্গের পাশে মরদেহ সংরক্ষণ কক্ষ নির্মাণে ১০ লাখ এবং মাইজদী স্কুল হেলথ ক্লিনিকের টিনশেড গ্যারেজ সংস্কারে ১০ লাখ টাকা। এরমধ্যে জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক কোয়ার্টারের সীমানা প্রাচীর উঁচু করা ও কাঁটাতার স্থাপন কাজ এবং সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সীমানা প্রাচীর (বাকি কাজ) নির্মাণ এখনো শেষ হয়নি। জেনারেল হাসপাতালের মর্গের পাশে মরদেহ সংরক্ষণে ছোট্ট একটি কক্ষ নির্মাণ করা হলেও মাইজদী স্কুল হেলথ ক্লিনিকের টিনশেড গ্যারেজসহ অনেক প্রকল্প যেনতেনভাবে পড়ে আছে। প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের সাথে এই বিষয়ে কথা বলার জন্য সাক্ষাৎ চাইলে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সা'দ মোহাম্মদ আন্দালিবের সাথে তার মুঠোফনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুরের সহকারী কমিশনার মো. আইয়ুবের বিরুদ্ধে তিনটি সচল পাসপোর্ট ব্যবহার করে আট বছরে অন্তত ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ উঠেছে। এসব ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁর ঘন ঘন বিদেশযাত্রা, একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সঙ্গে অর্থপাচারের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়ে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। মো. আইয়ুব সরকারি চাকরিতে থাকা সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিগত পাসপোর্টে পেশা হিসেবে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দুদকে অভিযোগ দাখিলের কয়েক দিনের মধ্যেই মো. আইয়ুবকে তাঁর কর্মস্থল গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ (ওএসডি) হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মো. আইয়ুবের নামে তিনটি পাসপোর্ট ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে BP03795 নম্বরের পাসপোর্টটি সবচেয়ে পুরোনো। এই পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সাতবার ভারতে ভ্রমণের রেকর্ড রয়েছে। এরপর A033271 নম্বরের পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০টি বিদেশ ভ্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ A091834 নম্বরের পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত থাইল্যান্ড, চীন ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও আটটি বিদেশ ভ্রমণের রেকর্ড পাওয়া গেছে। তিনটি পাসপোর্টে মোট অন্তত ২৫টি বিদেশ ভ্রমণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মো. আইয়ুব ভারত, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), চীন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর—এই ছয় দেশে অন্তত ২৫ বার ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে ভারতে ১২ বার, থাইল্যান্ডে সাত বার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুই বার, চীনে দুই বার এবং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে একবার করে ভ্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, তাঁর বর্তমান পাসপোর্টটি ‘সাধারণ’ পাসপোর্ট হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। A091834 নম্বরের এই পাসপোর্টটি ১৩ নভেম্বর ২০২৪ ইস্যু করা হয় এবং এর মেয়াদ ১১ নভেম্বর ২০৩৪ পর্যন্ত। সম্প্রতি বিশ্ব মাস্টার্স অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে এনবিআরের অনুমোদনসংক্রান্ত চিঠিতেও তাঁর এই পাসপোর্ট নম্বর উল্লেখ করা হয়। ওই চিঠিতে আগের পাসপোর্ট নম্বর হিসেবে A033271-এর উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে BP03795 নম্বরের আরেকটি পাসপোর্ট ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের মনোনয়নে দক্ষিণ কোরিয়ার দেগুতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে এনবিআরের দুই সহকারী কমিশনারকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের একজন ছিলেন মো. আইয়ুব। রাজস্ব ভবন থেকে গত ৩ আগস্ট জারি করা এক চিঠিতে বলা হয়, ২০ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেগুতে অনুষ্ঠিতব্য ওই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে মো. আইয়ুব ও ঢাকা (দক্ষিণ) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের সহকারী কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে মো. আইয়ুবের বর্তমান পাসপোর্ট নম্বর A091834 উল্লেখ করা হয় এবং আগের পাসপোর্ট নম্বর হিসেবে A033271-এর তথ্য দেওয়া হয়। সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি, ছুটি এবং ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি আদেশের প্রয়োজন হয়। তবে দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মো. আইয়ুব তাঁর একাধিক বিদেশ ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় অনুমতি গ্রহণ করেননি। অভিযোগকারীর দাবি, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অনুমোদন ছাড়া একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব ভ্রমণের ব্যয় কীভাবে বহন করা হয়েছে এবং বিদেশে অবস্থানকালে কোনো আর্থিক লেনদেন বা সম্পদ অর্জনের ঘটনা ঘটেছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার আবেদন জানানো হয়েছে। বিশেষ করে একই ব্যক্তির নামে একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহারের বিষয়টি কীভাবে হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে পাসপোর্টে পেশাগত পরিচয়ের তথ্য কেন ভিন্ন ছিল এবং সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগের সত্যতা কতটা—এসব বিষয় যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. আইয়ুবের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৫-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, ঘুষ বাণিজ্য, ভূয়া বিলে অর্থ ছাড়, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অপরাধ ধামাচাঁপা দেওয়ার মতো লাগাতর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই প্রকৌশলী ২০১৩ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদানের পর থেকে বিগত ১৩ বছরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেন বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই ভূয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ ছাড় করেছেন। এছাড়াও, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট হারে উৎকোচ বা ‘পার্সেন্টেজ’ গ্রহণ করতেন। দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম ও কারচুপির মাধ্যমে তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। গত ২২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন বাকী বিল্লাহ নামের এক ব্যক্তি। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিভিন্ন সাংবাদিকের নাম ভাঙিয়ে ই/এম বিভাগ-৫ এর এই কর্মকর্তা প্রায় ৫০ লাখ টাকার চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। এ বিষয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হলেও তার বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর নৈতিক স্খলনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। গৃহকর্মী সুফিয়াকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এবং আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে তিনি প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করেন বলে তথ্যে উঠে এসেছে। ডিভিশনটির সদ্য সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিয়া সুলাতানাকে নিয়েও তামজীদের বিরুদ্ধে অসামাজিক কর্মকান্ডের অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কতিপয় শোষিত বঞ্চিত ঠিকাদার। এছাড়াও তামজীদের নিজস্ব কর্মচারী কাম ঠিকাদার ভুট্টোও তাকে বিভিন্ন সময়ে উঠতি বয়সের কলগার্ল সরবরাহ করে রেডিসান হোটেলসহ ঢাকার বিভিন্ন হোটেলে হ্যাপিএন্ডিং করিয়ে মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করে আসছেন বলেও নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। চাকরি জীবনের মাত্র ১৩ বছরে সৈয়দ তামজিদ হোসেন নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সহায়-সম্পদ অর্জন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সম্পদ হচ্ছে- ধানমন্ডি ২৭/১ (রবীন্দ্র সরোবর ৮ নম্বর ব্র্রিজের ঢালে) একটি বহুতল ভবনে আনুমানিক ৫ কোটি টাকা মূল্যের ৩৫০০ বর্গফুটের একটি স্টুডিও এপার্টমেন্ট ক্রয় করেছেন তিনি। মোহাম্মদপুর ২৭/১, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটির টেক রোড নম্বর ৭-এ শ্বশুর মোঃ জাহিদ মিয়ার সাথে যৌথ মালিকানায় একটি ৭তলা বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন তিনি। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। এছাড়াও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নিজ নামে ও বেনামে প্রায় ৩০ একর জমি ক্রয় করার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অপরাধের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৫-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজিদ হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর কোনো বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করা হবে।