আঃজলিল,স্টাফ রিপোর্টারঃ----
যে ঘরে নতুন প্রাণের আগমনে আনন্দধ্বনি ওঠার কথা, সেই ঘরটিই আজ শোকে স্তব্ধ। যে বাবা সন্তানের মুখ দেখে বুকে জড়িয়ে ধরার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। বাবার মৃত্যুর মাত্র ১৫ মিনিট আগে পৃথিবীর আলো দেখা নবজাতক ও স্বজন হারানোর এই নির্মম পরিহাসে শোকে মুহ্যমান একটি পরিবার।
মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশি ইউনিয়নের কন্যাদাহ গ্রামে। নিহত হাবিবুর রহমান (২৫) ওই গ্রামের হযরত আলীর ছেলে এবং তাঁর স্ত্রী মিম খাতুন (১৭) পার্শ্ববর্তী সেতাই গ্রামের ফারুক হোসেনের মেয়ে। হাবিবুর বেনাপোল বন্দরে শ্রমিকের কাজ করতেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ অক্টোবর তীব্র জ্বর ও শারীরিক জটিলতা নিয়ে হাবিবুর বাগআঁচড়ার একটি স্থানীয় ক্লিনিকে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। রাজধানীর মগবাজারের রাজমনু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
এদিকে স্বামীর সুস্থ হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মিম প্রসববেদনায় কাতর হয়ে তখন ভর্তি ছিলেন বাগআঁচড়া নার্সিং হোম ক্লিনিকে। স্বামীর মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর ঠিক ১৫ মিনিট আগে তিনি এক পুত্রসন্তান জন্ম দেন।
একদিকে মায়ের কোলে নবজাতকের প্রথম কান্না, অন্যদিকে স্বজনদের চোখে প্রিয় মানুষকে হারানোর অশ্রু। যে সন্তানের জন্মসংবাদ শুনে বাবার মুখে হাসি ফোটার কথা, সেই সন্তান জন্মের মুহূর্তেই হারাল পিতৃস্নেহ।
প্রসূতির শারীরিক অবস্থা ও মানসিক আঘাতের কথা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ জানানো হয়নি। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সংবাদটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে হাবিবুরের বাবা হযরত আলীসহ স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। শোকের এমন কঠিন বাস্তবতায় দিশেহারা পুরো পরিবার।
ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়া বাবা হযরত আলী বলেন, “আমার বুকজুড়ে আজ শুধু শূন্যতা। একদিকে আমার আদরের ছেলেটা চলে গেল, অন্যদিকে ঘরে এল নতুন প্রাণ। কোনটাকে কীভাবে মেনে নেব, বুঝতে পারছি না। আমার এতিম নাতিটার দিকে তাকালেই বুক ফেটে কান্না আসে।”
যে শিশুর জন্ম ঘিরে থাকার কথা ছিল বাবার উচ্ছ্বাস ও আত্মীয়স্বজনের আনন্দ, সেই শিশুকে এখন সামলাতে হবে স্বামী হারানোর শোক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হাবিবুরের আকস্মিক মৃত্যু ও এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্থানীয়রা শোকাহত পরিবারটির প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং নবজাতকটির সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করেছেন।
পরে সোমবার সকাল ১১টায় জানাজা শেষে নিহত হাবিবুর রহমানকে স্থানীয় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
প্রেরক,
আঃজলিল
স্টাফ রিপোর্টার
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৫ আন্তর্জাতিক হকি বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ ফুটবল প্রেমীদের মতো হকি প্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের কঠিন পর্ব অতিক্রম করে দুই দলই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য এই ফাইনাল ম্যাচে উভয় দল নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত। আর্জেন্টিনা দল এই টুর্নামেন্টে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। অধিনায়ক লুকাস মার্টিনেজ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছি। দলের সবাই একসঙ্গে কাজ করে ফাইনালে পৌঁছেছি। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট — বিশ্বকাপ জিততে হবে। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ বজায় রেখেছি এবং আগামী ম্যাচেও তা বজায় রাখব।” আর্জেন্টিনা দলের ফিজিক্যাল ট্রেনার জানান, দল খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য বিশেষ অনুশীলন চালাচ্ছে যাতে ফাইনালে তারা চাপ সামলাতে পারে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের কোচ মাইকেল ডি ইয়ং ফাইনালের আগের প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দল গত কয়েক মাস ধরে কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছে। খেলোয়াড়রা মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা চাই এই বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস গড়ে একটি শক্তিশালী ছাপ রেখে যেতে।” কোচ আরো বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র ফাইনালে উঠা নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়। আমরা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিজেদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।” বিশ্বের হকি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ফাইনাল ম্যাচটি গত দশকের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা হতে চলেছে। উভয় দলের কৌশল, বল নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুতগতির খেলায় যে মেধা প্রদর্শিত হয়েছে, তা ফুটবলের মতো অন্য কোনো খেলার ক্ষেত্রে বিরল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফাইনালে দলের মানসিক স্থিতিশীলতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা বিজয় নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে। মাঠে উভয় দলের খেলোয়াড়রা দ্রুতগতির পাস, শক্তিশালী ডিফেন্স এবং আক্রমণাত্মক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মাঠ মাতানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকারের গতিবেগ এবং নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডারদের কৌশলগত দক্ষতা ম্যাচে প্রধান আকর্ষণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও গোলরক্ষকদের প্রতিটি সেভ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াও ম্যাচের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশ্বজুড়ে লাখো হকি ভক্ত এই ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার দেখার জন্য অপেক্ষায় আছেন। অনলাইনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ম্যাচের লাইভ স্ট্রিমিং অনুষ্ঠিত হবে এবং অনেক দেশের টেলিভিশনও সরাসরি সম্প্রচার করবে। হকি প্রেমীরা এই ম্যাচ থেকে দারুণ উত্তেজনা, দক্ষতা এবং খেলা উপভোগ করার আশা করছে। মাঠের বাইরেও ভক্তদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ফ্যান জোন আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে খেলোয়াড় ও দর্শকরা একত্রে সময় কাটিয়ে খেলার আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। এছাড়াও টুর্নামেন্ট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে এবং খেলা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে দুই দলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে আগামী দিনে বিশ্ব হকির নতুন ধারার রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এই ম্যাচের ফলাফল আগামী দশক ধরে হকির কৌশলগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের হকি টুর্নামেন্ট হওয়ায় এর প্রতি ভক্তদের আগ্রহ ও উন্মাদনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সবাই আশা করছেন, আগামীকালের ফাইনাল হবে একটি স্মরণীয় খেলা, যেখানে স্পোর্টসম্যানশিপ, দক্ষতা ও উত্তেজনা থাকবে সর্বোচ্চ মাত্রায়।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকিকে তার নিজ কার্যালয়ে ঢুকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে আইইডিসিআর পরিচালকের কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। হামলার শিকার অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকি অভিযোগ করেন, ড্যাবের কর্মীরা সংঘবদ্ধভাবে তার কক্ষে ঢুকে মব সৃষ্টি করে তাকে মারধর করেছেন। ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নিজের কক্ষে কয়েকজনের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন আইইডিসিআর পরিচালক। এ সময় আট থেকে নয়জন ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে তারা কাজী আহমেদকে চেয়ার থেকে টেনে তুলে মারধর শুরু করেন। এদিকে, ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশিদ। তবে পরিচালকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে হারুন আল রশিদ বলেন, ‘ওর (কাজী আহমেদ) ও তো কিছু দোষ আছে।’ কী ধরনের দোষ জানতে চাইলে মুঠোফোনে থাকা একটি ছবি দেখিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, বর্তমান সরকারের আমলে কাজী আহমেদ কীভাবে জনস্বাস্থ্যবিদ মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার সঙ্গে নিজের কার্যালয়ে বৈঠক করেন। মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইইডিসিআরের পরিচালকসহ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। করোনা মহামারির সময় নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পান। পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন। হামলার সময় পরিচালকের কক্ষে উপস্থিত এক জনস্বাস্থ্যবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের তিনি আগে কখনো আইইডিসিআরে দেখেননি। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালককে তার নিজ কক্ষে মারধরের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রসঙ্গত, আইইডিসিআর দেশের রোগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সতর্কবার্তা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনসহ (সিডিসি) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকিকে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সম্প্রতি তিনি হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়েও গবেষণা করেছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে উসকানি ও প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় তিন সাংবাদিককে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আজ রোববার (২৫ অক্টোবর) দিন ধার্য রয়েছে। সকালে কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।তিন সাংবাদিক হলেন- জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু এবং একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা। এর আগে গত ২৪ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৫ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে কয়েকজন সাংবাদিকের বক্তব্য ও প্রশ্নের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া হয়েছিল। ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে মন্তব্য করেন।রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এ ধরনের উসকানি ও প্ররোচনার ধারাবাহিকতায় জুলাই-আগস্টে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। এ ঘটনায় তিন সাংবাদিকের সংশ্লিষ্টতা তদন্ত করছে তদন্ত সংস্থা।
রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সিংহভাগ ভবনেরই নকশার অনুমোদন নেই। প্রায় শতভাগ প্রতিষ্ঠানই চলছে ভবন ব্যবহারের বৈধ সনদ ছাড়া। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার চরম ঘাটতি, জরুরি নির্গমন পথ না থাকা এবং কলাম-বিমে ফাটলসহ নানা কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়েই চলছে এসব হাসপাতালের কার্যক্রম। জানা গেছে, ৭৩ শতাংশ হাসপাতালই ভবন ব্যবহারের সনদ ছাড়াই চিকিৎসা কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে এবং ৫৯ শতাংশ ভবনের নেই অনুমোদিত নকশা। পাশাপাশি ৭০ থেকে ৮২ শতাংশ হাসপাতালে ফায়ার অ্যালার্ম, ফায়ার ডোর ও স্মোক ডিটেক্টরের মতো প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি। তবে রাজউক জানিয়েছে, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। সম্প্রতি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে দুর্ঘটনায় ৬ নবজাতক শিশুর মৃত্যুর পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন ঢাকার ১৯৪টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরিচালিত এক অনুসন্ধানী পরিদর্শনে এসব ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এলাকাভিত্তিক পরিদর্শনের তথ্য রাজউকের পরিদর্শক দল গাজীপুর, টঙ্গী ও পূর্বাচল সংলগ্ন জোন-১ এলাকায় সর্বমোট ৩৪টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র তদারকি করে। এর মধ্যে জোন ১/১-এ ২৭টি, জোন ১/২-এ ৪টি এবং জোন ১/৩-এ রয়েছে ৩টি হাসপাতাল। উত্তরা, উত্তরখান ও দক্ষিণখান নিয়ে গঠিত জোন-২ এলাকায় ২৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জোন ২/১ থেকে ২০টি এবং জোন ২/২ থেকে ৭টি হাসপাতালে অভিযান চালানো হয়। আর মিরপুর, পল্লবী ও ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন জোন-৩ এলাকার ২৭টি হাসপাতালের চিত্র উঠে এসেছে; যেখানে জোন ৩/১-এ ৭টি, জোন ৩/২-এ ৮টি এবং জোন ৩/৩-এ ১২টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক তদারকি করা হয়। অন্যদিকে গুলশান, বনানী, মহাখালী ও বাড্ডা এলাকা নিয়ে গঠিত জোন-৪-এর মোট ১০টি হাসপাতালের নথিপত্র ও কাঠামো পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে জোন ৪/১-এ ৬টি এবং জোন ৪/২-এ ৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও লালবাগ সংলগ্ন জোন-৫ এলাকায় ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জোন ৫/১-এ ৮টি, জোন ৫/২-এ ১৬টি এবং জোন ৫/৩ এলাকায় ৯টি হাসপাতাল পরিদর্শনের আওতায় আসে। এ ছাড়া মতিঝিল, মগবাজার ও পুরান ঢাকা নিয়ে গঠিত জোন-৬-এ সর্বোচ্চ ৪৭টি প্রতিষ্ঠানে তদারকি চালানো হয়; যেখানে জোন ৬/১-এ ২০টি, জোন ৬/২-এ ২০টি এবং জোন ৬/৩-এ ৭টি হাসপাতাল রয়েছে। আর কেরানীগঞ্জ, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ সংলগ্ন জোন-৭ এলাকার ১৬টি হাসপাতালের মধ্যে জোন ৭/১ থেকে ১০টি, জোন ৭/২ থেকে ৫টি এবং জোন ৭/৩ এলাকা থেকে ১টি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে রাজউকের দল। ৭৩ শতাংশেরই নেই ভবন ব্যবহারের ছাড়পত্র পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৪টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ ভবনকে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক ছাড়পত্র নিয়েছে। বাকি ৯৯ শতাংশের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ছাড়পত্রের ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ভবন ব্যবহারের সনদ ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে। আর ২৬ শতাংশ ভবনের নথিপত্র পর্যালোচনা করে সনদসংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম। পরিদর্শনে ৫৯ শতাংশ ভবনের অনুমোদিত নকশা পাওয়া যায়নি। বাকি ৪১ শতাংশ ভবনের অবশ্য রাজউক অনুমোদিত নকশা রয়েছে। শুধু অনুমোদনসংক্রান্ত নথিপত্রেই অনিয়ম সীমাবদ্ধ নয়, ভবনের ব্যবহারেও রয়েছে বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৫ শতাংশ হাসপাতাল ভবন ব্যবহারের অনুমোদিত নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। ২২ শতাংশ ভবনে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা বা ‘ভয়েড এরিয়া’ রাখা হয়নি। ১৮ শতাংশ হাসপাতালের ক্ষেত্রে সামনের রাস্তার প্রস্থ নিয়ম অনুযায়ী পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ৫২ শতাংশ ভবনে ইমারত নির্মাণের ‘সেটব্যাক’ বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তায় ভয়াবহ চিত্র হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও পরিদর্শনে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিদর্শিত ভবনগুলোর ৭০ শতাংশে ফায়ার অ্যালার্ম নেই। ৮১ শতাংশে ফায়ার ডোর এবং ৮২ শতাংশে স্মোক ডিটেক্টর পাওয়া যায়নি। ৭২ শতাংশ ভবনে ছিল না জরুরি নির্গমন পথের কোনো নির্দেশক। জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বের হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আলোর ব্যবস্থাও সীমিত। মাত্র ২৭ শতাংশ ভবনে জরুরি আলোর ব্যবস্থা পাওয়া গেছে। ফায়ার হাইড্রেন্ট রয়েছে ২৫ শতাংশ ভবনে। সাধারণ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা ফায়ার এক্সটিংগুইশারের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি ২০ শতাংশ ভবনে। এসব ঘাটতির কারণে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে রোগী, স্বজন ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে হাসপাতালে শয্যাশায়ী ও চলাচলে অক্ষম রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইচ্ছেমাফিক সম্প্রসারণ, ছাদে ভারী কাঠামো পরিদর্শনে কয়েকটি হাসপাতাল ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্রও উঠে এসেছে। দুটি হাসপাতালের বিম ও কলামে ফাটল দেখা গেছে। ছয়টি ভবনের ভেতরের রডে মরিচা ধরে কংক্রিট খসে পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ৪৬টি হাসপাতাল ভবনে অতিরিক্ত সম্প্রসারিত অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের ভবনের ছাদ বা ওপরের অংশে অননুমোদিত ভারী কাঠামো নির্মাণ করে অতিরিক্ত ভার চাপানো হয়েছে। এসব অনিয়ম ভবনের স্থিতিশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কারণ, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বড় একটি অংশের জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ভবন থেকে বের হওয়ার সক্ষমতা থাকে না। নেই পার্কিং, বাস্তবে দোকান-গুদাম হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত পার্কিং সুবিধা রাখার বিধান থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই তা মানছে না। রাজউকের পরিদর্শনে ১৯৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২০টিতে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পার্কিং সুবিধা পাওয়া গেছে। বাকি ১৭৪টি প্রতিষ্ঠানের পার্কিংয়ের জায়গা নানা কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে ছোট-বড় দোকান, গুদাম, অফিস, আবাসন ইউনিট ও ব্যাংকের শাখা। এতে হাসপাতালের নিজস্ব পার্কিং সুবিধা সংকুচিত হয়েছে। যার প্রভাবে কোনো কোনো হাসপাতালের সামনে প্রায়ই জ্যাম লেগে থাকে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী পরিবহন এবং অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। ১৯৪টির মধ্যে মাত্র ৪টিতে অভিযান আইন অমান্য করে হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা করা এসব প্রতিষ্ঠানের মাত্র ২২টিকে নোটিশ দিয়েছে রাজউক এবং মাত্র ৪টি ভবনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) মো. মনিরুল হক সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার যেহেতু স্পর্শকাতর সেবামূলক জায়গা, তাই চাইলেই হুট করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। আমরা ইতোমধ্যে হাসপাতালগুলোকে নোটিশ দিয়েছি। এ নিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারা এসব নির্দেশনা অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রে আলাদা বিল্ডিং কোড ও মানদণ্ড রয়েছে। এসব ভবনের জন্য বিশেষায়িত নকশা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো এ বিষয়টি মানে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবনকে হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, চাহিদা থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও রাজউক কেন শুরু থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদারকি করেনি। তার মতে, শুরু থেকেই যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করা গেলে মানুষ নিরাপদ পরিবেশে চিকিৎসাসেবা পেত এবং এই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হতো না।