বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্পে বিধিবহির্ভূতভাবে আটটি প্যাকেজে ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল পরিশোধের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের অভিযানে অন্তত চারটি প্যাকেজের কাজের কোনো ভৌত অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কাজের অস্তিত্ব না থাকলেও বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষতিসাধনের সত্যতা মিলেছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ ও কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এমন তথ্য পেয়েছে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্প'–এর কাজের ক্ষেত্রে প্যাকেজ বিভাজনে অনিয়ম, ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি, কাজের অস্তিত্ব ছাড়া বিল পরিশোধ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে এনফোর্সমেন্ট টিম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে সংগৃহীত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিপিপি, আরডিপিপি কিংবা হেড অব প্রোকিউরমেন্টের অনুমোদন ছাড়াই একই খাতের কাজকে আটটি পৃথক প্যাকেজে বিভক্ত করে ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে এসব প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের অনুকূলে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দুদক জানায় ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য রেকর্ড ভবন নির্মাণ (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত মূল্য ২৭৯ কোটি ৫৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। প্রকল্পের মূলধন অংশের ‘অনাবাসিক ভবন’ খাতে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট প্রোকিউরমেন্ট কমিটি (সিসিজিপি) অনুমোদিত একমাত্র কাজ ছিল ডব্লিউ-১ প্যাকেজ। ডিপিপি ও আরডিপিপি অনুযায়ী, ওই একটি প্যাকেজের আওতায় কাজ করার অনুমোদন ছিল। এর কার্যাদেশ ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে (এনডিইএল) দেওয়া হয়। কার্যাদেশের মূল্য ছিল ১৫৫ কোটি ৭০ লাখ ৪ হাজার টাকা। কিন্তু ডিপিপি, আরডিপিপি কিংবা হেড অব প্রোকিউরমেন্টের অনুমোদন ছাড়াই একই খাতের কাজকে আরও আটটি পৃথক প্যাকেজে বিভক্ত করে ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে এসব প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের অনুকূলে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। দুদকের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, বিভাজিত আটটি প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পাশে নতুন বেকারি ও ক্যান্টিন নির্মাণ, রেকর্ড ভবনের তিনটি বেসমেন্ট ফ্লোর নির্মাণের জন্য অস্থায়ী ট্রিপল ওয়ার্ক স্থাপন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য ভেন্যু সংস্কার, ব্র্যান্ডিং ও ক্যাটারিং, গাইড ওয়াল-মাস্টার ড্রেন-র্যাম্প ও হাই-টেনশন কেবল লাইন অপসারণ, অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ, অস্থায়ী ড্রেন ও সিআই শিটের বেড়া নির্মাণ এবং বালু ভরাট, বৃষ্টির পানি অপসারণ ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ।
জাহিদুল আলম চিঠির পরও নড়েনি ডিপিডিসি! রাজধানীর ধলপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর আবাসিক স্টাফ কোয়ার্টারে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকা মিটারগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্নের জন্য লিখিতভাবে অনুরোধ জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি লিখিত চিঠিতে ওই কোয়ার্টারের ১৮০টি ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। চিঠিটি পাঠানো হয়েছে এনওসিএস মানিকনগর, ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে। ফলে লিখিতভাবে বিষয়টি অবহিত হওয়ার পরও যদি বকেয়া সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি রাজস্ব আদায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা কী ছিল? চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ নম্বর আবাসিক স্টাফ কোয়ার্টারে মোট ১৮০টি ফ্ল্যাট রয়েছে এবং প্রতিটি ফ্ল্যাটের বিপরীতে ডিপিডিসি কর্তৃক বৈদ্যুতিক মিটার স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল আদায়ের স্বার্থে যেসব মিটারের বিপরীতে বকেয়া রয়েছে, সেসব মিটারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব ফ্ল্যাটে বৈদ্যুতিক মিটার নেই, সেসব স্থানেও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন রয়েছে। লিখিত চিঠিই যখন প্রমাণ এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি মৌখিকভাবে নয়, লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। এরপরও যদি সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়ে থাকে, তাহলে এর কারণ কী? চিঠিতে স্পষ্টভাবে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল এবং সংযোগ বিচ্ছিন্নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি চিঠিতে বলা হয়েছে, এর আগে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য ডিপিডিসির কাছে পত্র পাঠানো হয়েছিল। অর্থাৎ, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা ছিল—এমন দাবি করার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। তাহলে ব্যবস্থা কোথায়? এনওসিএস মানিকনগরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিমের দায়িত্বাধীন এলাকায় এই চিঠি পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—এখন সেটিই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। কতটি মিটার পরিদর্শন করা হয়েছে? কতটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে? কত টাকা বকেয়া রয়েছে? বকেয়া আদায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? আর কোনো সংযোগ অবৈধভাবে চালু থাকলে তা বন্ধ করা হয়নি কেন? এসব প্রশ্নের জবাব এখন প্রয়োজন। ‘লাইন কাটতে গেলে চড়াও হতে পারে’—তাহলে প্রশাসনিক সহায়তা নেওয়া হলো না কেন? এর আগে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এনওসিএস মানিকনগরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সেখানে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে সংশ্লিষ্টরা ডিপিডিসির লোকজনের ওপর চড়াও হতে পারে। নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা থাকলে সেটি অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা চেয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না? সরকারি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে প্রশাসনের সহায়তা নেওয়াই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রশাসনিক সহায়তা চাওয়া হয়ে থাকলে তার প্রমাণ কোথায়, আর না চাওয়া হয়ে থাকলে কেন চাওয়া হয়নি—সেটিও তদন্তের বিষয়। দুই সংস্থার চিঠি চালাচালি, ক্ষতি সরকারি কোষাগারের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বজলুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ডিপিডিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ডিপিডিসির সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী ওহিদুজ্জামান বলেছেন, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সহযোগিতা করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সহজ হবে। দুই সংস্থার বক্তব্যে সহযোগিতার ঘাটতির বিষয়টি সামনে এলেও ১৮০টি ফ্ল্যাটের বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারি রাজস্বের ওপরই পড়ছে। অনুসন্ধানের দাবি চিঠির ভিত্তিতে এখন ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করলেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র— ১৮০টি মিটারের মধ্যে কতটি মিটারে বকেয়া? মোট বকেয়ার পরিমাণ কত? কতদিন ধরে বকেয়া? কোন কোন মিটার এখনো চালু? চিঠি পাওয়ার পর কতটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে? কোনো সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে থাকলে তার লিখিত কারণ কী? এ বিষয়ে ডিপিডিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে এনওসিএস মানিকনগরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিমের দপ্তরে চিঠি পাওয়ার পর কী কার্যক্রম নেওয়া হয়েছিল, তার নথিও প্রকাশ্যে আনা উচিত। নথি বলছে: ধলপুর ১০ নম্বর আবাসিক স্টাফ কোয়ার্টারের ১৮০টি ফ্ল্যাটের বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে ডিপিডিসিকে লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
আওয়ামী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পর উপদেষ্টা আদিলুরের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হয়ে প্রভাব-বাণিজ্যের অভিযোগ, নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় । সরকারের যতগুলো প্রতিষ্ঠান-মন্ত্রণালয় দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে দুর্নীতির মহোৎসবে পরিণত হয়েছিলো তার মধ্যে অন্যতম গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়। হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির খবরের পাশাপাশি এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিদেশে টাকা পাচারের হাজারো অভিযোগ নিয়ে অসংখ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে 'দ্য ফিন্যান্স টুডে'। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমানের ভিত্তিতে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন একদিকে যেমন সমাজের নানা স্তরে দুর্নীতি-অনিয়মের নিত্যনতুন কৌশল উন্মোচিত করেছে ঠিক তেমনি অসংখ্য দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর রাতের ঘুমও হারাম করেছে। তবে, আজ চিরাচরিত পন্থার বিপরীতে ভিন্নধর্মী একটি প্রতিবেদন এফটি পরিবারের সম্মানিত পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো। গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের অসাধারণ সৌভাগ্যবান একজন কর্মকর্তা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ৫ আগষ্ট পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বিতর্কিত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানেরও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের যে কোন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা গনঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের পরও গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকের 'ব্যক্তিগত কর্মকর্তা'র মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল পদে বহাল থাকার বিরল এক দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়। গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে যখন সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা'র প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তখন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. সোহেল মিয়াকে ঘিরে উঠেছে নানা গুরুতর অভিযোগ। পদায়ন, বদলি, টেন্ডার, প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দ, জমি ও বাড়ি দখলসহ বিভিন্ন বিষয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইল উপদেষ্টার দপ্তরে উপস্থাপনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন সোহেল। বিনিময়ে বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তার অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন নিয়ে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক বছরের সরকারি চাকরির সময়ে তার পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে উঠেছে। এসব সম্পদের বড় অংশই বাবা, ভাই ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নামে করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। রিকশাচালক বাবার নামে ফ্ল্যাট-গাড়ি অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মিরপুর-১৬ নম্বর সেকশনের ১ হাজার ৩৫৮ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট সংরক্ষিত প্রতিমন্ত্রী কোটায় সোহেল মিয়ার বাবা মো. ফজলুল হকের নামে বরাদ্দ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফজলুল হক দীর্ঘদিন রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। এমন একজন ব্যক্তির নামে রাজধানীর মিরপুরে সংরক্ষিত কোটায় ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এরপর ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর ফজলুল হকের নামে ১ হাজার ৫০০ সিসির একটি জাপানি টয়োটা ব্র্যান্ডের সাদা প্রাইভেট কার কেনা হয়। গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ঢাকা মেট্রো ঘ-২৯-১৩৬৫। সোহেলের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, এর বাইরে আরও একটি দামি গাড়ি রয়েছে তার। চাকরির এক বছরের মধ্যেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সোহেল মিয়া ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এর মাত্র এক বছরের মাথায়, ২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌরসভা থেকে ‘মেসার্স নেক্সাস এন্টারপ্রাইজ’ নামে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে নাম রয়েছে সোহেলের বাবা মো. ফজলুল হকের। প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্স নম্বর ০০৭৫১ এবং লাইসেন্স আইডি ০৫-০০৫-০০৭৫১। ফজলুল হকের টিআইএন নম্বর ৮৫২৮৫২৬২১৪৮৫ এবং প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর ০০২২৩৪৯০৪-০৪০৬। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর কালিহাতীর একটি বেসরকারি ব্যাংকে নেক্সাস এন্টারপ্রাইজের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। ওই হিসাবে ২০২০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৫২৪ টাকা ব্যালেন্স ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার! বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও একটি প্রশ্ন। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ২০২১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নেক্সাস এন্টারপ্রাইজকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। কালিহাতীতে জমি, মার্কেট ও বিলাসবহুল বাড়ি সোহেল মিয়ার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌর এলাকায়। স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে এফটি টীম তার পরিবারের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য পেয়েছে। হাসপাতাল রোডে সোনালী ব্যাংকের পাশে প্রায় ৬ শতাংশ জমি তার বাবার নামে কেনা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী প্রতি শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে একটি মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মার্কেট নির্মাণে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে এই ব্যয়ের পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কালিহাতীর ফকিরবাড়ি রোডের কাছে সোহেলের ছোট ভাই আনোয়ারের জন্য একটি ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। এর কাছেই রয়েছে একটি বিলাসবহুল বাড়ি। বাড়িটির নাম ‘ফজলুল হক ভিলা’। ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—হোল্ডিং-৩৮৫, রোড নম্বর-৫, সাতুটিয়া পূর্বপাড়া, কালিহাতী, টাঙ্গাইল। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, চাকরিতে যোগদানের পরপরই সোহেল মিয়ার পরিবারের আর্থিক অবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন জায়গায় জমি কেনার পাশাপাশি বাবা, ভাই, শ্বশুর, সম্বন্ধী ও স্ত্রীর নামে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। ভুয়া সনদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ সোহেল মিয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি কালিহাতী আরএস পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে এসএসসি, ২০০৬ সালে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করেন। এরপর ২০১৬ সালের জানুয়ারি-জুন সেশনে টাঙ্গাইলের একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে ছয় মাস মেয়াদি কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন কোর্স এবং একই সময়ে বগুড়ার ইনস্টিটিউট অব আইসিটির অধীনে ছয় মাস মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মাল্টিল্যাংগুয়াল সেক্রেটারিয়াল সায়েন্স কোর্স সম্পন্ন করার সনদ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে এসআইটি ফাউন্ডেশনের অফিস রেজিস্টারে সোহেল মিয়ার নামে সংশ্লিষ্ট সনদের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। সনদে ব্যবহৃত স্বাক্ষরের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য সনদের স্বাক্ষরের মিল নেই বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি একই সময়ে টাঙ্গাইল ও বগুড়া—দুই জায়গায় ছয় মাস মেয়াদি কোর্স করার বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আরও অভিযোগ, টাঙ্গাইলের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ভর্তি রেজিস্টারেও তার নাম পাওয়া যায়নি; যদিও অনলাইনে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের ওয়েবসাইটে তার মার্কশিট দেখা গেছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। এই কারণে প্রশ্ন উঠেছে—চাকরিতে নিয়োগের সময় সোহেল মিয়া যে সনদ ব্যবহার করেছিলেন, সেটি আদৌ বৈধ ও প্রকৃত কি না? এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নথি পরীক্ষা করে বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন। ছয় বছরে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, এরপর প্রভাবের বিস্তার? সোহেল মিয়া ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এরপর ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে তাকে প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে পদায়ন করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর থেকেই তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। টেন্ডার, বদলি, প্লট, ফ্ল্যাট—সবখানেই কি সোহেলের প্রভাব? মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে উপদেষ্টার দপ্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে সোহেল মিয়া অবগত থাকতেন। বিশেষ করে—গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন, রাজউকের প্লট ও ফ্ল্যাট সংক্রান্ত বিষয়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বড় অঙ্কের টেন্ডার, ঠিকাদারি কাজ, প্রকল্প অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট ফাইল নিয়ে তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব কাজে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুবিধা আদায়ের একটি চক্র তৈরি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। বেতনের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে কি? সোহেল মিয়া যখন সরকারি চাকরিতে যোগ দেন, তখন তার পদ ছিল সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর। ওই পদের বেতন স্কেল ছিল ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার ৫৯০ টাকা। প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চাকরির প্রথম কয়েক বছরে তার সরকারি বেতন ও সুযোগ-সুবিধার মোট পরিমাণ আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে হতে পারে। অন্যদিকে, তার পরিবারের নামে মিরপুরের ফ্ল্যাট, গাড়ি, কালিহাতীতে জমি, মার্কেট, বাড়িসহ বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সরকারি চাকরির আয় দিয়ে এত অল্প সময়ে এসব সম্পদ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে কীভাবে? সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের আয়-ব্যয়ের তথ্য যাচাই করলেই এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব। সম্পদের মালিক বাবা-ভাই, নিয়ন্ত্রণ কার? অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো—সোহেল মিয়ার পরিবারের নামে থাকা সম্পদের একটি বড় অংশ তার বাবা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নামে রয়েছে বলে অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রিকশা-ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা ফজলুল হকের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে বর্তমান সম্পদের পরিমাণের কোনো সামঞ্জস্য নেই। একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার প্রশ্ন—“ফজলুল হক তো রিকশা চালাতেন। ছেলে চাকরি পাওয়ার পর এত সম্পদের মালিক কীভাবে হলেন?” এই প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন সম্পদের মালিকদের আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, জমির দলিল এবং অর্থের উৎস যাচাই। অভিযোগের বিষয়ে সোহেলের বক্তব্য কী? এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. সোহেল মিয়ার বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বক্তব্য দিলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে। প্রশাসন কি নীরব দর্শক? একজন সরকারি কর্মচারী মাত্র কয়েক বছরের চাকরিতে কীভাবে তার পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুললো, তার অর্থের উৎস কী, সরকারি চাকরির পাশাপাশি পরিবারের নামে ঠিকাদারি ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হলো, নিয়োগের সময় ব্যবহৃত শিক্ষাগত সনদ কতটা বৈধ—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি। একইসঙ্গে টেন্ডার, বদলি, পদায়ন, প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, রাজউক, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং শিক্ষা বোর্ডের সমন্বিত তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্য। গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে যখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হলো, তখন একজন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা এতগুলো অভিযোগ দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—কার ছত্রছায়ায় সোহেলের এই উত্থান? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন—রিকশাচালকের ছেলে সোহেল মিয়ার বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস কী?
মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিশেষ অভিযানে ৩৫০ গ্রাম গাঁজাসহ মো. ইসমাইল হক (৩৮) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। আজ সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুর ১২টার দিকে সদর থানাধীন কালিনগর ইংলিশ মোড় এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। আটককৃত মো. ইসমাইল হক ওই এলাকার মৃত আবদুল লতিফের ছেলে।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপ-পরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই যৌথ অভিযানে পুলিশ, র্যাব ও কাস্টমসের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আসামীর বসতবাড়ীতে তল্লাশি চালিয়ে ৩৫০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারসহ তাকে হাতেনাতে আটক করা হয়। অভিযান শেষে উপ-পরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান বলেন, "মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।" পাশাপাশি তিনি মাদক নির্মূলে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য সর্বস্তরের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে আটক আসামীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করেছেন।
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চারজনের ফাঁসি দাবি করেছেন ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদারের স্ত্রী সুমা আক্তার। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চে জবানবন্দি শেষে তিনি এ বিচার চান। এ মামলায় ২০ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। জবানবন্দির একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুমা আক্তার বলেন, আমার দুটি মেয়ে রয়েছে। স্বামী হত্যাকাণ্ডের সময় তারা খুব ছোট ছিল। দেশে যেন এমন কোনো ঘটনা আর না ঘটে, সেজন্য নিজে ও সন্তানদের পক্ষে আমি বরিশাল-১ আসনের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) একেএম এহসান উল্লাহসহ গ্রেপ্তার যে দুই পুলিশ সদস্য আমার স্বামীকে ক্রসফায়ারে হত্যা হত্যা করেছে, তাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়ার প্রার্থনা করছি। এসব কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সাক্ষী। টিপু আগৈলঝাড়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার অপরজন হলেন একই উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা। এদিন সকালে এ মামলায় গ্রেপ্তার উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের উপস্থিতিতেই জবানবন্দি দেন টিপুর স্ত্রী। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। এর আগে, ২০ মে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২ প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, টিপু ও কবির ছিলেন আবুল হাসানাতের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এজন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করেন তিনি। এ কাজ বাস্তবায়ন করতে তৎকালীন এসপি একেএম এহসান উল্লাহকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর মিথ্যা মামলায় ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দুজনকে গ্রেপ্তার করে উজিরপুর থানা পুলিশ। এরপর মাহাবুল ও জসিমকে দিয়ে গৌরনদী-গোপালগঞ্জ হাইওয়ের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের পাশে টিপু ও কবিরকে ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের খুলনা জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিগত আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকারের আমলে প্রভাব বিস্তার করে ঢাকা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে পোস্টিং বাগিয়ে নিয়ে বেনামী ঠিকাদারি ব্যবসাসহ ব্যাপক দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি সরকারি বরাদ্দের বড় একটি অংশ পকেটে পুরেছেন বলে তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইঞ্জিনিয়ার সাইফুর রহমান সবচেয়ে বেশি অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়ে তিনি আজিমপুর বিভাগে নিজস্ব ঠিকাদারি সিন্ডিকেট প্রথা চালু করেন, যা এখনো বলবৎ রয়েছে। একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিটি ফাইলে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ কমিশন না দিলে সাইফুর রহমান কোনো বিলে স্বাক্ষর করতেন না। এছাড়াও আজিমপুরে অবস্থানকালে এক নারী হিসাব সহকারীকে ঘিরেও তার বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের নানা মুখরোচক আলোচনার সৃষ্টি হয়। অভিযোগের তালিকায় আরো রয়েছে কুখ্যাত ঠিকাদার জিকে শামীম ও গোল্ডেন মনিরের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি। এমনকি গুলশানের রেডিসন ও ওয়েস্টিন হোটেলে তাদের অর্থায়নে আয়োজিত বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত গণহত্যায় আওয়ামী লীগের পক্ষে নেপথ্যে তিনি অর্থ যোগান দিয়েছিলেন বলেও জোরালো গুঞ্জন রয়েছে। নামে-বেনামে রূপকথার মতো সম্পদের পাহাড়: সরকারি চাকরির সুবাদে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও ঘুষ-কমিশনের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে সাইফুর রহমান দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছেন সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য। প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী তার উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে: রাজধানীতে আবাসন: ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে দুটি বিলাসবহুল বহুতল বাড়ি এবং পূর্বাচল নতুন শহরে মূল্যবান প্লট। টাঙ্গাইলে বিশাল সাম্রাজ্য: টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে সুবিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ি, বাজার রোডে ৩ তলা বাণিজ্যিক মার্কেট (যাকে তিনি ভাইদের সম্পদ বলে দাবি করেন), ঘাটাইলে সালাউদ্দিন সেনানিবাস মোড়ে পূর্বে স্থাপিত এলপিজি ফিলিং স্টেশন (যা বর্তমানে ভেঙ্গে সোনার তরী পার্ক তৈরি করা হয়েছে) এবং এর কাছেই কোটি টাকা মূল্যের জমিতে গড়ে তোলা কাঠবাদাম রেস্টুরেন্ট। বিদেশে অঢেল সম্পদ: যুক্তরাষ্ট্রে তার মেয়ের নামে কেনা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে তার বর্তমান স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের আনুমানিক মূল্য অর্ধশতাধিক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রকৌশলী সাইফুর রহমানকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। জনস্বার্থে এই কর্মকর্তার সার্বিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের বিস্তারিত অনুসন্ধানী তথ্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
গুরুতর অপরাধ, মানবপাচার, ব্যাগেজ জালিয়াতি ও নজিরবিহীন প্রশাসনিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কুয়েত স্টেশনের ম্যানেজার মো. শাহজাহান (পি-৩৬৪৮৯)। বিগত আওয়ামী শাসনামলে ১৫ বছর শ্রমিক লীগের রাজনীতি করে দফায় দফায় ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বাগিয়ে নেওয়া এই কর্মকর্তা এখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নতুন রূপ ধারণ করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কুয়েত স্টেশন থেকে দেওয়া স্ট্যান্ড রিলিজ ও মুভমেন্ট অর্ডার ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে রহস্যজনকভাবে বাতিল করে প্রশাসনিক নাটকের জন্ম দিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ। প্রাপ্ত তথ্য ও দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, গত ২ সেপ্টেম্বর বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিসেস বিভাগ থেকে এক আদেশে কুয়েত স্টেশনের ম্যানেজার মো. শাহজাহানকে স্ট্যান্ড রিলিজ ও দ্রুত ঢাকা প্রত্যাবর্তনের নির্দেশনা (মুভমেন্ট অর্ডার) দেওয়া হয়। কিন্তু অদৃশ্য কোনো এক ক্ষমতার প্রভাবে পরদিনই (৩ সেপ্টেম্বর) বিমানের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (গ্রাউন্ড সার্ভিসেস) ফারহানা আক্তারের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে (স্মারক নং-৩০.৩৪.০০০০.০১৯.১৪.০০৫.২৬) সেই আদেশ বাতিল করা হয়। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই মাত্র এক দিনের ব্যবধানে এমন নাটকীয় সিদ্ধান্ত বদল বিমান প্রশাসনে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি কুয়েত থেকে ঢাকাগামী বিজি-৩৪৪ ফ্লাইটে বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপকের (ডিজিএম) ঝটিকা তল্লাশিতে কুয়েত স্টেশনের ভয়াবহ জালিয়াতি ধরা পড়ে। দৈবচয়ন ভিত্তিতে তল্লাশি করা ১৪ জন যাত্রীর মধ্যে ১২ জনের কাছেই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যাগেজ পাওয়া যায়। নিয়ম অনুযায়ী কোনো সরকারি ফি আদায় কিংবা রসিদ না দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সেই রাজস্ব নিজস্ব পকেটে পুরে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শাহজাহান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এছাড়া নির্ধারিত ওজনসীমা না মেনে বিমানে লাগেজ বহনের ঘটনাটি ফ্লাইট নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। বিমানের ইতিহাসে বিরল নজির গড়ে মো. শাহজাহান তাঁর স্ত্রী শামীমা পারভীনকেও একই কুয়েত স্টেশনে পদায়ন করিয়ে নিয়েছেন। গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে আলোচিত বিমানের সাবেক এক এমডির আমলে জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও শামীমা পারভীনকে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাকে স্বামীর সাথে একই ফরেন স্টেশনে যুক্ত করা হয়। বিমানের ভেতরের অনুসন্ধানে জানা যায়, তাদের বিরুদ্ধে অতীতে গঠিত একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোনো কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করার পরদিন আবার তা প্রত্যাহার করা স্পষ্টতই দুর্নীতির আশ্রয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। কোনো অদৃশ্য রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবে এই সিদ্ধান্ত বদল করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন এবং অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।” বিমানের সংশ্লিষ্ট সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের দাবি, বিগত সরকারের আমলের সুবিধাভোগী একটি সিন্ডিকেট এখনও প্রশাসনে সক্রিয় থেকে শাহজাহান-শামীমা দম্পতিকে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। অবিলম্বে এই কুয়েত স্টেশন কেলেঙ্কারির নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৫ এর পরিচালক মোঃ হামিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে নোটিশ বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা এবং নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করতে যাওয়া এক অভিযোগের নথিপত্র থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল করিম জনস্বার্থে এই অভিযোগটি দুদকে জমা দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালের ৫ ডিসেম্বর সহকারী সচিব পদে রাজউকে যোগদান করেন দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হামিদুল ইসলাম। ২০১৬ সালে উপ-পরিচালক এবং ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। আগামী ২০৩৬ সালের ২৪ নভেম্বর তার অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০ এপ্রিল এবং ২০ আগস্ট তার বিরুদ্ধে দুদকে পৃথক অভিযোগ জমা পড়েছিল। নোটিশ ও বদলি বাণিজ্য: অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, পরিচালক হামিদুল ইসলাম তার অধীনস্থ ইমারত পরিদর্শকদের এরিয়া বণ্টনের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে এলাকা ঠিক করে দিতেন এবং পরবর্তীতে মাসিক পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতেন। তার নির্দেশে পরিদর্শকরা নিয়মবহির্ভূত ভবনের মালিকদের নোটিশ দিয়ে ভয় দেখাতেন এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেসব নোটিশ গায়েব করে দিতেন। নিউ এলিফ্যান্ট রোডের হোল্ডিং-১১০, ১১১ ও ১১২ নম্বরের মালিক কামরুল হাসানের ভবনে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পর ২০ লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে হোল্ডিং-৮২ নম্বরের মালিকের কাছে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে অনিয়ম চাপা দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জোন-৪ (গুলশান) এ বদলি হওয়ার জন্য জোরালো লবিং চালাচ্ছেন। চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ: অভিযোগে আরো বলা হয়, ২০১৬-১৭ সালে রাজউকে ড্রাইভার পদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কেরানীগঞ্জের শাহীন ও আব্দুল্লাহপুরের মতিনসহ কয়েকজনের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেন তিনি। শাহীন পৈতৃক জমি বিক্রি করে এবং মতিন স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে এই টাকা দিলেও তারা চাকরি পাননি, এমনকি টাকাও ফেরত পাননি। অঢেল অবৈধ সম্পদ: রংপুরের মিঠাপুকুর থানার রূপসা গ্রামের সন্তান হামিদুল ইসলামের ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকে তিনি গ্রামের বাড়ি রংপুর ও শ্বশুরবাড়ির এলাকায় বিপুল পরিমাণ কৃষি ও অকৃষি জমি ক্রয় করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, যার বৈধ উৎস তিনি প্রদর্শন করতে পারবেন না। রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম জানান, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত কমিটি গঠন করে খতিয়ে দেখা হবে এবং দোষী প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের বিষয়ে মতামত জানার জন্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিচালক মোঃ হামিদুল ইসলামের টেলিফোনে চেষ্টা করেও সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
বদলি থেকে টেন্ডার, পদোন্নতি থেকে প্রকল্প—গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব সিদ্ধান্তেই প্রভাব বিস্তার করেন প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ তিন প্রকৌশলী। গণপূর্ত অধিদপ্তরের এ তিন কর্মকর্তার পরিচিতি ‘তিন পাণ্ডব’ নামে। তারা হলেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে সদ্য বদলিকৃত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, এ বলয়ের মাধ্যমেই বদলি-বাণিজ্য, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, টেন্ডার কমিশন আদায় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ গণপূর্তে আনতে প্রকৌশলীদের কাছ থেকে কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করা হয় এ তিন পাণ্ডবের নেতৃত্বে। অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত হওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বদরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই: তথ্য বলছে, মন্ত্রীদের সরকারি বাংলো দ্রুত মেরামতের কথা বলে টেন্ডার ছাড়াই পরিচিত ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে পরে অর্থ ভাগাভাগি, পছন্দের ঠিকাদারকে বড় প্রকল্প পাইয়ে দেওয়া এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারে সম্পৃক্ততা রয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের। প্রকল্পের অর্থছাড়ে অনিয়ম এবং সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কাজে অনিয়ম, সম্পদ অর্জন ও নারীঘটিত বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসে মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাকে বদলি করে রিজার্ভে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। জানা গেছে, সাভার সার্কেলে দায়িত্ব পালনের পর নিজের আস্থাভাজন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেজবুল কবিরকে গাজীপুরে দায়িত্ব দিয়ে তার মাধ্যমে ঠিকাদারদের সঙ্গে বিভিন্ন কাজের সমন্বয় এবং পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দিতেন বদরুল। সরকারি চাকরির পাশাপাশি ডেভেলপার ব্যবসা ও বিভিন্ন সম্পদের মালিকানা নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর উত্তর বাসাবো, উত্তরা ও বাড্ডায় সম্পত্তি এবং গাজীপুরে জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব সম্পদের কিছু তার ভাইবোনদের নামে থাকলেও নেপথ্যে রয়েছেন বদরুলই। গাজীপুরে তার দায়িত্বকালীন বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ৫ কোটি টাকার কৃষি বিপণন ভবন, ১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকার বিএসটিআই সিভিল, ২০ কোটি ২৪ লাখ টাকার মেট্রোপলিটন সদর থানা, ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার সদর উপজেলা মডেল মসজিদ, প্রায় ১০ কোটি টাকার কালিয়াকৈর থানা, ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকার পুবাইল থানা এবং প্রায় ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার কোনাবাড়ী থানা নির্মাণ প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বদরুলের বিরুদ্ধে। গাজীপুরের তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম নির্মাণে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর নির্দেশনা উপেক্ষা করে অন্য খাতের অর্থ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে বদরুলের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের ঠিকাদারকে প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। কাজ শেষ করতে আরও ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। মিরপুরের পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্প ও পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের ভাসানটেক থানার কাজেও কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ময়মনসিংহে ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগে তাকে ওএসডি করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও বেশি কাজ গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে করানোর জন্য তহবিল সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে বদরুলের বিরুদ্ধে। এর পাশাপাশি বদরুলের বিরুদ্ধে নারীঘটিত বিষয় ব্যবহার করে প্রকৌশলীদের ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলী। তাদের দাবি, পরিচিত নারীদের মাধ্যমে প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার পর বিভিন্নভাবে ফাঁদে ফেলা হতো এবং পরে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হতো। বিষয়টি জটিল হলে বদরুল সমাধানের উদ্যোগ নিতেন বলে অভিযোগ তাদের। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন কাজে অনিয়ম এবং নারীঘটিত বিষয় নিয়ে বিতর্কের কারণে সম্প্রতি তাকে ওএসডি করেছে মন্ত্রণালয়। খুলনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে এক নারী তাকে ফোন করে বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করেন। ওই নারীর সঙ্গে বদরুল আলমের পরিচয় রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। পরে বিষয়টি সমাধান করার জন্য বদরুল তাকে বলেছিলেন। আতিকুলের দাবি, এ ঘটনায় প্রথমে তাকে দায়িত্ব থেকে ক্লোজ করা হয় এবং প্রায় ছয় মাস পর খুলনায় বদলি করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খানকে একাধিকবার ফোন করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হয়। তবে তার সাড়া মেলেনি। বদলি বাণিজ্যের কলকাঠি নাড়েন সারোয়ার জাহান: প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের ঘনিষ্ঠ আরেকজন প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান। তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) হিসেবে কাজ করেন। তথ্য বলছে, সম্প্রতি বদলি বাণিজ্য ঠেকাতে মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে বদলি শুরু করেছে। তবে লটারির আগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সিভিলের ঢাকা জেলার বাক্সে ৪১ জনের নাম যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে সারোয়ারের বিরুদ্ধে। জানা যায়, গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকার সিকিউরিটি মানির পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়নের অভিযোগ ওঠে সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে। ঠিকাদারের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় বলে জানা গেছে। তবে পরে শাস্তির বদলে তিনি পদোন্নতি পেয়ে অধিদপ্তরের প্রভাবশালী সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পাওয়ার পর গত ৩ মার্চ এক দিনে ৫০ জনেরও বেশি প্রকৌশলীকে বদলি করার ঘটনায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বদলি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে এই আদেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ‘বদলি-বাণিজ্য’ হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ওই গণবদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। এর আগে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বেশ কয়েকজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। এ-সংক্রান্ত অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে গেলে মো. হাসানুজ্জামান, মো. খাইরুল ইসলাম ও মো. এরশাদুল হকের বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান বলেন, বদলির সব বিষয় মন্ত্রণালয় জানে। উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের লটারির বাক্সে আগে থেকেই নাম লিখে রাখার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব কিছু জানি না। মন্ত্রণালয় বদলি করেছে, তারাই সব জানে। প্রধান প্রকৌশলীর পরামর্শক আবু নাসের চৌধুরী: ঢাকা সার্কেল-২ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীও বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। অন্য প্রকৌশলীদের দাবি, নিজেদের অবস্থান সুসংহত রাখতে আবু নাসের চৌধুরী পরামর্শকের ভূমিকায় থাকেন। কাজের অগ্রগতির চেয়ে বেশি বিল প্রদান, অতিরিক্ত ব্যয়, পরিচিত ঠিকাদারকে কাজ দিতে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে খারাপ আচরণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সরকারি অর্থ অপচয়সহ নানা বিষয়ে তার সার্কেলের বিভিন্ন কাজে শতাধিক অডিট আপত্তি রয়েছে। ঢাকা সার্কেল-২ একটি গুরুত্বপূর্ণ এরিয়া। সচিবালয়, হাইকোর্ট ও আশপাশের সরকারি হাসপাতালের দায়িত্বে তিনি। এসব জায়গায় তিনি মেরামত থেকে শুরু করে সব কাজই পরিচিত ঠিকাদারকে দেওয়ার নির্দেশনা দেন নির্বাহী প্রকৌশলীদের। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে মেরামত কাজের বিল দ্বিগুণ করা হয় এবং উপবিভাগীয় ও সহকারী প্রকৌশলী মিলে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিতে কাজ করান। এসব অনিয়ম জেনেও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি আবু নাসের চৌধুরী। এ ছাড়া বগুড়ায় থাকতে টেন্ডার জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তর সার্কেল-২ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাছের চৌধুরী বলেন, স্যার আমাকে বগুড়া থেকে ঢাকা নিয়ে এসেছেন; কিন্তু কোনো সিন্ডিকেট-অনিয়মের সঙ্গে আমি জড়িত না। যা বলছেন সচিব: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, প্রধান প্রকৌশলীর সিন্ডিকেটের কথা ও তাদের বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ শুনছি। এ নিয়ে বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করায় তার মধ্যে একজনকে ওএসডি করা হয়েছে। প্রমাণ পেলে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের মূল প্রতিষ্ঠাতা ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরীর আদি জন্মস্থান ও দেশের বাড়ি হলো সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁও গ্রামে। মাত্র ১১ বছর বয়সে সিলেট থেকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানো এই তাসবিরুল লন্ডনের ‘ফোর্ট লোটন হাই স্কুল’ ও ‘হ্যাকনি কলেজ’ থেকে এ-লেভেল শেষ করে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ‘অক্সফোর্ড এভিয়েশন’ থেকে বিমান চালনার প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউকের সিভিল এভিয়েশন থেকে কমার্শিয়াল লাইসেন্স পেয়ে তিনি আমেরিকার আকাশে এবং দেশে ফিরে বেক্সিমকোর জিএমজি এয়ারলাইনসের প্রধান পাইলট হিসেবে দাপটের সাথে বিমান চালানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও লাইসেন্স নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম ‘ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ’ ব্যবসাটি চালু করা হয়েছিল।. পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাসবিরুল সিন্ডিকেট রাতারাতি খোলস বদলে ওবায়দুল কাদের ও সালমান এফ রহমানদের প্রভাবশালী এভিয়েশন সিন্ডিকেটের সাথে হাত মেলায়। . সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর প্রভাবশালী মন্ত্রীদের পেছনে মোটা অঙ্কের নগদ ঘুষ ঢেলে শেয়ার বাজারে এই মহাজালিয়াতি সফল করতে তাসবিরুলকে সরাসরি বুদ্ধি ও ছক দিয়ে সাহায্য করেছিলেন তাঁর স্ত্রী, সিলেটেরই আরেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশী খন্দকার তাসলিমা চৌধুরী। . সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও ক্ষোভের আসল জায়গা হলো এই দুই চোরের ঠিকানা; বাংলাদেশে থাকাকালীন এই তাসবিরুল দম্পতির রাজকীয় আস্তানা ছিল রাজধানী ঢাকার অতি অভিজাত উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ২০ নম্বর রোডের ৪ নম্বর বাড়িতে (৫ম তলা)।. দেশের অর্থনীতিকে দেউলিয়া বানাতে এবং নিজেদের সিলেট অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে এক পারিবারিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তারা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শত শত কোটি টাকা ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে নিজেদের পকেটে ভরে নেন। . দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিমানের ভুয়া পার্টস ও খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয়ের ভুয়া খরচ দেখিয়ে এই তাসবিরুল দম্পতি হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করে মধ্যপ্রাচ্যের অতি বিলাসী দেশ দুবাইয়ের জুমেইরাহ ভিলেজ সার্কেল এলাকায় নিজের নামে ৭টি আলিশান অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। . আজ দেশের সাধারণ মানুষ যখন একবেলা খাবারের জন্য হাহাকার করছে, তখন এই শীর্ষ অর্থ পাচারকারী ও চরম বেইমান তাসবিরুল বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে সুদূর যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন। . যুক্তরাজ্যের ল্যান্ড রেজিস্ট্রি এবং কোম্পানি হাউজের অফিশিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি লন্ডনের হ্যাকনি বরোর অভিজাত আবাসিক এলাকা ‘স্টোক নিউইংটন’ (N16 7SL)-এর বিলাসভহুল ফ্ল্যাটে সস্ত্রীক নিরাপদ আশ্রয় বানিয়েছেন। . কালো টাকা সাদা করার আড়ালে লন্ডনে তাঁর গড়া সুগন্ধি ব্যবসা "TAC PERFUMES & COSMETICS (UK) LTD" (মূল শোরুম: 12 Railway Street, Chatham) এখনও সেখানে সম্পূর্ণ সচল ও লাভজনকভাবে চালানো হচ্ছে। . এই সুগন্ধি ব্র্যান্ডের আড়ালেই সেন্ট্রাল লন্ডনের অতি দামী কমার্শিয়াল জোন ‘সিটি রোড’ (128 City Road)-এর আলিশান দপ্তরে বসে তিনি আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন এবং বাংলাদেশের আইনি চোখ ফাঁকি দিচ্ছেন। . অন্যদিকে, এই চোরের ফেলে যাওয়া কয়েকশ কোটি টাকার ১১টি পরিত্যক্ত বিমান বছরের পর বছর ধরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ দখল করে আছে। . এই বিশাল লোহার কঙ্কালগুলো সরাতে এবং স্ক্র্যাপ হিসেবে আন্তর্জাতিক নিলাম করতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিপুল পরিমাণ আইনি ব্যয় ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই মেগা ডাকাতির পেছনে থাকা সাবেক পরিচালনা pর্ষদের অন্যতম হোতারা হলেন তাঁর আপন ভাই তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী ও শ্যালক খন্দকার মাহফুজুর রহমান, যারা সাধারণ মানুষের শেয়ারের টাকা লুটে এখন আত্মগোপনে আছেন। আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মূল্যে পুরোনো উড়োজাহাজ কেনা ও শেয়ার জালিয়াতির অকাট্য অভিযোগে ২০১৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই তাসবিরুল ও তাঁর দোসরদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি অনুসন্ধান ও তলবি নোটিশ জারি করেছিল।. কেবল শেয়ার বাজারই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়ে তা সম্পূর্ণ খেলাপি করে দেশের শীর্ষ ৩০০ মেগা ঋণখেলাপির তালিকায় অফিশিয়ালি নাম লিখিয়েছেন এই তাসবিরুল দম্পতি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন দেশে অস্থিরতা চলছে, ঠিক সেই সময়ে চাঁদপুর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল নিয়ে শুরু হয় লুটপাটের কাজ। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে টেন্ডার ছাড়াই প্রকল্প, কোথাও কাজ না করে—কোথাও নামমাত্র কাজ করে পুরো কাজের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে মাত্র দুই দিনে ২১টি চেকের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওসমান গণি পাটোয়ারী অপসারণের ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট বিভিন্ন প্রকল্পের নামে ইস্যু করা হয় ১৭টি চেক; এসব চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর চার দিন আগে ১৪ আগস্ট চারটি প্রকল্পের বিপরীতে আরও ১৬ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ ১৪ ও ১৮ আগস্টের নথিতে থাকা অঙ্ক যোগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। যদিও জেলা পরিষদ প্রশাসকের বক্তব্যে এই দুই দিনের উত্তোলনের পরিমাণ ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বলা হয়েছে। নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও জেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রকল্পে কাজ হয়নি। আবার কোথাও আংশিক কাজ হলেও পুরো কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল দেওয়া হয়েছে। আবার কোনও কোনও ঠিকাদার দাবি করেছেন, তাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ ও বিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও প্রকল্প সম্পর্কে তারা কিছুই জানতেন না। অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট চাঁদপুর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে চারটি প্রকল্পের বিপরীতে ১৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর চেয়ারম্যান অপসারণের আগের দিন ১৮ আগস্ট বিভিন্ন প্রকল্পের নামে ইস্যু করা হয় আরও ১৭টি চেক। এসব চেকের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। অর্থাৎ মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড়ের ঘটনা ঘটে। এই ১৭টি চেকের মধ্যে চেয়ারম্যানের আত্মীয় ঠিকাদার শেখ নজরুল ইসলামের নামে একদিনেই সাতটি প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৭০ লাখ টাকার বিল দেওয়ার তথ্যও রয়েছে। হলরুমের কাজে প্রায় ১৬ লাখ টাকা বিলের প্রশ্ন নথিতে থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে জেলা পরিষদের হলরুমের ওয়াল টাইলসকরণ এবং ভবন সংস্কার ও রংকরণ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। মেসার্স শরীফ অ্যান্ড ব্রাদার্স ও মেসার্স আরিফুল ইসলাম এন্টারপ্রাইজের নামে নেওয়া এই দুটি প্রকল্পের মূল্য প্রায় ১৬ লাখ টাকা। অনুসন্ধান দেখা গেছে, বাস্তবে কোনও কাজ না করেই প্রকল্প দুটির বিপরীতে পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। যা বলছেন ঠিকাদার মেসার্স শরীফ অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী শরীফ মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, “জেলা পরিষদের হলরুমের কোনও কাজ আমি করিনি—এটি শতভাগ নিশ্চিত। তবে আমার লাইসেন্সে অন্যরা দুই-তিনটি কাজ করেছে। ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রে একজনের লাইসেন্সে আরেকজন কাজ করে, এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এ কাজটি কে করেছে, এ বিষয়ে আসলে আমার খোঁজ নিতে হবে।” তবে এর একদিন পর নিজের আগের বক্তব্য পরিবর্তন করে তিনি বলেন, “আমার লাইসেন্সে কাজ করেছি বলেই আমার নামে বিল হয়েছে। আমরাই কাজ করেছি।” অন্যদিকে হলরুমের ওয়াল টাইলসকরণ প্রকল্পের ঠিকাদার আরিফুল ইসলাম বলেন, “এ দুটি কাজ সম্পর্কে আমি জানি না। কাজগুলো কী ছিল, তাও বলতে পারবো না। প্রকল্প পাসের প্রক্রিয়াও আমার জানা নেই।” তার অভিযোগ, জেলা পরিষদের প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাকে ফোন করে সকালে চেক নিয়ে যেতে বলেন এবং বিকালে টাকা ফেরত নেওয়ার কথা জানান। আরিফুল ইসলাম বলেন, “টাকা উত্তোলনের পর ওই দিন বিকালেই প্রায় ১৮ লাখ টাকা ইঞ্জিনিয়ার আমার কাছ থেকে নিয়ে যান।” তিনি আরও বলেন, “আমি সহজ-সরলভাবেই আমার লাইসেন্সে কাজ করার অনুমতি দিয়েছিলাম। ঠিকাদারি সেক্টরে এটি প্রায়ই হয়ে থাকে। তবে প্রকল্প সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। যদি কাজ না করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে থাকে, তাহলে আমি এর বিচার দাবি করছি।” একদিনেই ঠিকাদার নজরুলের নামে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ১৮ আগস্ট ইস্যু করা চেকগুলোর মধ্যে চেয়ারম্যানের আত্মীয় ঠিকাদার শেখ নজরুল ইসলামের নামে সাতটি প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৭০ লাখ টাকার চূড়ান্ত বিল দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব প্রকল্পের কয়েকটির কাজ তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এর মধ্যে বাবুরহাট মার্কেটের সাইট প্রস্তুত ও বালু ভরাটের দুটি কাজের বিপরীতে প্রায় ২৭ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। তবে শেখ নজরুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি যে কাজ করেছেন শুধু সেই কাজেরই বিল নিয়েছেন। একদিনে ৭০ লাখ টাকা উত্তোলনের কথা শুনে প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমি যে কাজ করেছি, তারই বিল নিয়েছি। কাজের বাইরে কোনও বিল নিইনি। অফিস বা ইঞ্জিনিয়ারকে জিজ্ঞেস করুন। তারা জানেন।” তিনি বলেন, “মার্কেটের সাইট প্রস্তুতকরণের জন্য অবকাঠামো অপসারণের কাজের জন্য ভেকু ইঞ্জিনিয়ার ও নির্বাহী কর্মকর্তা কন্টাক্ট করেছেন। তারা বলতে পারবেন কত টাকা ব্যয় হয়েছে। আমার লাইসেন্স ব্যবহার করে আমাকে দিয়ে টাকা উঠিয়ে তারা লেনদেন করেছেন।” বালু ভরাটের বিষয়ে তিনি বলেন, “বাবুরহাট বাজারের মসজিদের সামনে খাল ভরাট করা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার আর নির্বাহী কি কাজ না দেখে আমাকে বিল দিয়েছেন? আমি কাজ করা ছাড়া কোনও টাকা নিইনি।” তবে বাবুরহাট বাজারের ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, উচ্ছেদ অভিযানের পর জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সেখানে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ১০০ গাড়ি বালু ফেলা হয়েছিল। ব্যবসায়ীরাও নিজেদের উদ্যোগে কিছু জায়গায় বালু ফেলেছেন। এরপরও পুরো জায়গা ভরাট হয়নি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, ওই সময়ের বালুর মূল্য হতে পারে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। আরও ৩৪ লাখের পাঁচ চেক নথিতে আরও পাঁচটি চেকের তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে চেয়ারম্যান অপসারিত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অর্থ উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে জেলা পরিষদের হিসাবরক্ষক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান স্যারের অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফাইলগুলো আমার কাছে এসেছে। নিয়ম অনুযায়ী সেই ফাইলগুলোর জন্য আমি চেক লিখে চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করি। চেকগুলোতে চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করেন। তবে পরবর্তীতে কী কারণে নির্বাহী স্যার চেকগুলো বাতিল করেছেন, তা তিনি বলতে পারবেন।” ভুয়া প্রজেক্ট তৈরি করে ৩৪ লাখ টাকার চেক তৈরি তবে জেলা পরিষদের প্রশাসক সেলিম উল্লাহ সেলিম বলেন, “এই পাঁচটি চেকের বিপরীতে কোনও ফাইল নেই, প্রজেক্ট নেই। নির্বাহী কর্মকর্তা কেন স্বাক্ষর করলেন? তিনি স্বাক্ষর করা মানে প্রজেক্ট সম্পন্ন হওয়া। সম্পূর্ণ ভুয়া প্রজেক্ট তৈরি করে ৩৪ লাখ টাকার পাঁচটি চেক তৈরি করেন।” কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি—‘দু-একটি কাজ মোটেই হয়নি’ জেলা পরিষদের উচ্চমান সহকারী আব্দুল কুদ্দুস ভাটও কয়েকটি প্রকল্পের কাজ না হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার জানামতে যেসব প্রকল্পের কথা বলে বিল নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অফিসের ভেতর কোনও কাজ হয়নি। অন্যান্য কাজ আংশিক হয়েছে। কয়েকটি কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে। সব অনিয়ম হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়; আবার সব যে ঠিকঠাক হয়েছে, তাও নয়।” তার বক্তব্য অনুযায়ী, কাজের সাইট পরিদর্শন ও তদারকির দায়িত্ব প্রকৌশলীর। প্রকৌশলী কাজের পরিমাণ ও বাস্তবায়ন যাচাই করে সার্টিফাই করলে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, “নথি পর্যালোচনা করে দেখেছি, কোনও ফাইলে সার্টিফাই লেখা আছে, আবার কোনোটিতে নেই। তবে তিনিই বিল প্রস্তুত করেছেন, স্বাক্ষর দিয়েছেন—সে অনুযায়ী সমস্ত প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়।” প্রশাসক বলছেন, প্রজেক্ট নেই, কাজ হয়নি চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সেলিম উল্লাহ সেলিম বলেন, “সকল ফাইল স্বাক্ষর করতে হবে জেলা পরিষদের অফিসে বসে। কিন্তু তিনি অফিসে না বসলেও চার দিনের ব্যবধানে এক কোটি ৭৫ লাখ টাকার বিল অনুমোদন হয়ে গেলো। এগুলো আমি যাচাই-বাছাই করে দেখেছি—প্রজেক্ট নেই, কাজ হয়নি। সম্পূর্ণ ভুয়া প্রজেক্ট দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।” তার বক্তব্য অনুযায়ী, জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় প্রকল্পের বাস্তবতা ও কাজের অগ্রগতি যাচাই করা হয়নি। সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন ভুল করে লেখা হয়েছিল চেক বাতিলের বিষয়ে জেলা পরিষদের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, “চেকগুলো কীভাবে হয়েছে, তা জানার পরই সেগুলো বাতিল করা হয়।” তিনি বলেন, “যতদূর মনে পড়ে, ওই ফাইলগুলো সঠিক ছিল না। ভুল করে লেখা হয়েছিল।” তার দাবি, প্রকৌশলীর প্রত্যয়ন ছাড়া কোনও বিল দেওয়া হয় না। তিনি আরও বলেন, “বরং অনেকে ঠিকঠাক কাজ না করা, ব্যক্তি স্বার্থের প্রকল্প—এ ধরনের কয়েকটি প্রকল্প ৫ আগস্টের পর বাতিল করেছি।” ঠিকাদারদের লাইসেন্স ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “এসব প্রতিষ্ঠান অনেকটা ওয়ান ম্যান শো। এসব প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান-ইঞ্জিনিয়ারের পছন্দের লোকজন বেশির ভাগ জায়গায় এনলিস্টেড হয়। ঘুরেফিরে ওইসব ঠিকাদারই কাজ পায়। আমরা শুধু নিয়ম-কানুনগুলো দেখে দিই। আমাদের এখানে কোনও ব্যক্তি স্বার্থ নেই।” ঠিকাদারদের অভিযোগ সম্পর্কে তার প্রশ্ন, “বিল তো তাদের কাছেই গিয়েছে। তিনি না জানলে বিলের জন্য আবেদন করলো কে?” প্রকৌশলী বললেন কাজ হওয়ার পরই বিল দিয়েছি জেলা পরিষদের সাবেক প্রকৌশলী ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন প্রকল্পকে পুরোপুরি বাস্তবায়িত দেখিয়ে কাজ বুঝে নেওয়ার সার্টিফিকেট দিয়েছেন। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “কাজ হওয়ার পরই বিল দিয়েছি, কাজ ছাড়া তো বিল দেওয়ার কথা না। চেকগুলো সম্ভবত আগের চেয়ারম্যান স্যার স্বাক্ষর করেছেন।” ঠিকাদারদের লাইসেন্সে কারা কাজ করলো? অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কাজের প্রকল্প, বাস্তবায়ন এবং অর্থ উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। একাধিক ঠিকাদার বলেছেন, তাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের ধরন, কাজের পরিমাণ কিংবা বাস্তবায়নের স্থান সম্পর্কে তারা বিস্তারিত জানতেন না বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে জেলা পরিষদের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, বিল ঠিকাদারদের কাছেই গেছে এবং তারা না জানলে বিলের জন্য আবেদন করলো কে—এ প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন। ফলে কোন ঠিকাদারের লাইসেন্সে কোন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে কাজ কে করেছেন, কে সাইট পরিদর্শন করেছেন, কে কাজ সম্পন্নের প্রত্যয়ন দিয়েছেন এবং উত্তোলিত অর্থ শেষ পর্যন্ত কার হাতে গেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্তে দুদক এসব অভিযোগ সামনে এলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বা অন্য কারও বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পরিষদের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন সরদার। তিনি বলেন, “আমি এখানে যোগদানের পরে সম্প্রতি আমরা দুদক থেকে একটি চিঠি পেয়েছি। এ বিষয়ে তারা তথ্য চেয়েছে। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে দুদকের চিঠি পাওয়ার পর। এখন যেহেতু বিষয়টি দুদক তদন্ত করছে, তাদের আমরা যতটুকু সম্ভব তথ্য দেবো। আমাদের আলাদা করে তদন্ত করার বিষয় থাকবে না।” নথিতে পাওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন, কাজ না হওয়ার অভিযোগ, ঠিকাদারদের লাইসেন্স ব্যবহারের দাবি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রত্যয়ন নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য—সব মিলিয়ে চাঁদপুর জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এখন দুদকের তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে, প্রকল্পগুলোর বাস্তব কাজ কতটুকু হয়েছিল এবং উত্তোলিত অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে।
বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন আর সনদ জালিয়াতি নিয়ে যেন অনিয়মের এক রাজত্ব গড়ে উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরে। এ রাজত্বের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের বিতর্কিত প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার, জ্যেষ্ঠতার নিয়ম ভেঙে পদ বাগানো ও বেইলি রোডের ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় বিতর্কিত ভবন গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকার পরও তিনি রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলীর গুরু দায়িত্বে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি অধিদপ্তরে শক্ত এক সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে চালানো হয় বদলির খেলা। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে লটারির মাধ্যমে বদলির নিয়ম করা হলেও বাক্সে আগে থেকেই পছন্দের প্রার্থীর নাম রাখা এবং স্বজনপ্রীতি ও কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে প্রকৌশলীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ আনা ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ঠেকানোর নামেও ফান্ড সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। এক প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজ দেখিয়ে বাড়তি বিল উত্তোলন এবং নানা বিতর্কিত কাণ্ডের পাশাপাশি সাজানো মামলায় সহকর্মীদের ফাঁসানো ও অস্ট্রেলিয়ায় ১১ বছর প্রবাস জীবন কাটিয়েও পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করে প্রধান প্রকৌশলী নিজের অপরাধের পাহাড় আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তথ্য বলছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে প্রশ্ন ওঠে সেই স্বচ্ছতা নিয়েই। বিশেষ করে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ কেন্দ্র করে প্রকৌশলীরা তিন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে একটি গ্রুপে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলীরা, যারা লটারির মাধ্যমে বদলি চান না। আরেকটি গ্রুপে আছেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীরা, যাদের স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য সৃষ্টি করে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয় গ্রুপটিতে রয়েছেন সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীরা, যে গ্রুপের সবাইকে বদলি করা হয়েছে ঢাকার বাইরে। বিশেষ করে যেসব প্রকৌশলী মাত্র কয়েক মাস আগে বদলি হয়েছেন ও দীর্ঘদিন পর ঢাকায় যোগদান করেছিলেন, কয়েক মাসের মাথায় তাদের আবার ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হয়েছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। ৫ আগস্টের পর বাগিয়ে নেন প্রধান প্রকৌশলীর পদ, গড়েন সিন্ডিকেট: জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব নেন মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। এরপরই নিজের পছন্দের লোকজন নিয়ে গড়ে তোলেন সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি, টেন্ডার কমিশন আদায় ও ভাগবাটোয়ারা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ আনতে ফান্ড সংগ্রহ ও ঘুষ আদান-প্রদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সিন্ডিকেটের সদস্যরা হলেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে সদ্য বদলিকৃত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী। তথ্য বলছে, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলি শেষেই নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি হওয়ার কথা এবং প্রধান প্রকৌশলী নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত বদলি করতে পারবেন। কিন্তু সেই ক্ষমতাবলে নির্বাহী প্রকৌশলীদের তিনি বদলি করতে চাচ্ছেন না, যা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। এ ছাড়া অনেক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এক প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজ দেখিয়ে কাজের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা বিল উত্তোলন, কাজ না করে বিল প্রদান, বিতর্কিত নারীঘটিত ঘটনা, ব্ল্যাক মেইল, দলীয় কারণ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না প্রধান প্রকৌশলী; বরং এসব ঘটনার কারণে যারা সাময়িক চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তাদের বহালে নানা কৌশল করেছেন তিনি। বদলির লটারিতে স্বজনপ্রীতি-বৈষম্য: বদলির লটারিতে বৈষম্যের শিকার প্রকৌশলীরা বলছেন, লটারির বদলির কার্যক্রম শুরুর আগেই পরিচিত ও তদবির করা অনেকের নাম রাখা হয় ঢাকার বাক্সে। স্বজনপ্রীতিতে নিজ জেলায় স্বপদে রাখতেও করা হয় আর্থিক লেনদেন। এ ছাড়া আরও সাতজনকে কোনো লটারির আওতায় আনা হয়নি, যাদের মধ্যে তিনজন সিভিল ও চারজন ই/এম বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, আবু তাহের মোহাম্মদ খাইরুল বাশারকে রংপুর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ উপবিভাগে; গোলাম রাব্বিকে লালমনিরহাট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ ও ছাইফুল ইসলামকে নারায়ণগঞ্জ থেকে হাইকোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বদলি করা হয়েছে। এ এস এম সাখওয়াত ইসলাম ও রেজাউল করিম মিঠু ফের ঢাকায় পদায়ন পান। এ এস এম সাখওয়াত ইসলাম এর আগে রাজারবাগ গণপূর্ত উপবিভাগ-১, গণপূর্ত রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগ, শেরে-বাংলা উপবিভাগে ছিলেন; কিন্তু তাকে মিরপুর উপবিভাগে বদলি করা হয়েছে, অথচ তার বাড়ি বগুড়া। ফরিদপুরের রেজাউল করিম মিঠু মতিঝিল গণপূর্ত উপবিভাগ, শেরে-বাংলা উপবিভাগ-৩, মহাখালী উপবিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৭ হয়ে পদায়ন পেয়েছেন ঢাকা সম্পদ উপবিভাগে। উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জয় চৌধুরীর নাম চট্টগ্রাম রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে উঠলেও নিজ জেলার অজুহাত দিয়ে তাকে লটারি পরিবর্তন করে অন্যত্র বদলি করা হয়। অথচ ঢাকা নিজ জেলা হওয়া সত্ত্বেও মো. মেহবুবুর রহমান ও মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামকে যথাক্রমে পিলখানা গণপূর্ত উপবিভাগ ও রমনা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩-এ পদায়ন করা হয়। এর আগে মেহবুবুর রহমান ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেন। অথচ প্রকৌশলী বরকত মজুমদার ও শেখ মোহাম্মদ এনামুল হকের নিজ জেলা ঢাকা বিভাগে হওয়া সত্ত্বেও তাদের যথাক্রমে চুয়াডাঙ্গা ও চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে, ময়মনসিংহের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার হোসাইনের নাম একই সঙ্গে লটারিতে ফরিদপুর ও নরসিংদী জেলায় ওঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ফরিদপুর জেলায় পদায়ন করে বদলি আদেশ জারি করা হয়। চাকরি জীবনে কখনোই ঢাকার বাইরে চাকরি করেননি প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান সাদ। উত্তরা উপবিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৬ (হাইকোর্ট) থেকে তেজগাঁও উপবিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। মো. মামুনুর রশিদের নিজ জেলা রংপুর হলেও তিনি পাঁচ বছরের অধিককাল সময় সাভার গণপূর্ত উপবিভাগে কর্মরত ছিলেন। মাঝে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হলেও বছর না ঘুরতেই তিনি গাজীপুর উপবিভাগে পদায়ন পান। লটারিতে অনিয়মের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবার ঢাকার উপবিভাগ পদায়ন হয় তার। নেত্রকোনার ইজাজ আহমেদ খানের লটারি ময়মনসিংহ বিভাগের আওতায় হওয়ার কথা থাকলেও লটারির আগে তাকে ঢাকার বাক্সে স্থানান্তর করা হয় এবং শেরেবাংলা নগর উপবিভাগ-৯ থেকে ধানমন্ডিতে পদায়ন পান। এ বিষয়ে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বদলির নানা অভিযোগ তুলে স্মারকলিপি দেন কিছু প্রকৌশলী। লটারি স্বচ্ছ না হওয়ার পাশাপাশি অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগও আনা হয় স্মারকলিপিতে। এ প্রকৌশলীদের অভিযোগ, উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পর্যন্ত বদলির ক্ষেত্রে নিজ জেলা বাদ দিয়ে নিজ নিজ প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে লটারির মাধ্যমে পদায়নের কথা। কোনো বিভাগে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি হলে অতিরিক্ত কর্মকর্তাকে অপেক্ষাকৃত কম কর্মকর্তা থাকা বিভাগে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে ঢাকায় পোস্টিং এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘অতিরিক্ত কর্মকর্তা’ দেখিয়ে লটারিতে আগে থেকেই নির্দিষ্ট প্রকৌশলীদের নাম ঢাকা জেলার বাক্সে ঢোকানো হয়। পরে ওই বাক্স থেকে তাদের নাম উঠিয়ে পোস্টিং দেওয়া হয় ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে। অভিযোগকারী এক প্রকৌশলীর ভাষ্য, পছন্দের পোস্টিং পাইয়ে দিতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, বদলি প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিভাগের জন্য দুটি লটারির বাক্স রাখা হয় ‘ঢাকা জেলা’ ও ‘ঢাকা বিভাগ’ নামে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ঢাকা জেলার বাক্সে শুধু ঢাকা জেলার বা সংশ্লিষ্ট যোগ্য কর্মকর্তাদের থাকার কথা হলেও সেখানে দেশের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের নাম কীভাবে এলো। লটারির আগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সিভিলের ঢাকা জেলার বাক্সে ৪১ জনের নাম যুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে। বদলি বা পদায়নের বিপরীতে অর্থ লেনদেন: তথ্য বলছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬৫ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি বা পদায়নের সুযোগ করে দিতে ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। এসব লেনদেনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। চলতি বছরের ৩ মার্চ পৃথক কয়েকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এক দিনেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। এত বড় পরিসরে বদলি-পদায়নের আগে মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করার অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলীকে বদলির সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা ও প্রক্রিয়াগত নিয়ম যথাযথ অনুসরণ করা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পরে খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে তলব করে গণপূর্তমন্ত্রী এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চান বলে জানা গেছে। তবে প্রধান প্রকৌশলীর ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে আগের গণবদলির অধিকাংশই বাতিল করা হয় বলে জানা গেছে। এরপরও ছোট পরিসরে বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে। খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছে। ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার: নথি বলছে, ভুয়া পিএইচডি সনদ দেখিয়ে উচ্চতর শিক্ষা ছুটিতে প্রেষণ ভোগের ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। বিভাগীয় তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি দোষ স্বীকার করলেও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য প্রয়াত সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর (যাকে তিনি ফুফু ডাকতেন) প্রভাবে নামমাত্র শাস্তি দেন তৎকালীন গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার। লঘুদণ্ড বদলে এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধের সাজা দেওয়া হয়। এর তিন বছরের মধ্যে খালেকুজ্জামান হন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং তার পর মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে বনে যান তিনি। এর মধ্য দিয়ে এক বছরে দুটি পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। পরে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে গোপালগঞ্জ গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। তবে ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টে বনে যান জামায়াতের বিশ্বস্ত সদস্য। সাবেক গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের হাত ধরে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে জামায়াতপন্থি হিসেবে পুরস্কার পান প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন দায়িত্ব) দায়িত্ব। এ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে এবং স্থবিরতা দেখা দেয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজে। মন্ত্রণালয়ের নথি বলছে, জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকার শীর্ষে মো. খালেকুজ্জামান নিজের নাম দেন। বাকি জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী ভেবে তাদের বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার সাজানো মামলার তথ্য জমা দেওয়া হয় সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি)। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের গ্রামে এসব মামলার নথি পাঠানো হয়, যাতে মামলার বিষয়টি সামনে আসে। এ ছাড়া ১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে খালেকুজ্জামান প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন। এর মধ্যে পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলেই দেশে ফিরে আসেন। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিভাগীয় মামলা হলেও সাজেদা চৌধুরীর লিখিত সুপারিশে তিন বছরের মধ্যেই শাস্তির বদলে একই বছরে পান দুই দফায় পদোন্নতি। সাজানো মামলায় সহকর্মীদের ফাঁসানোর অভিযোগ: পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, প্রতিযোগী মনে করে তালিকা থেকে সিনিয়রদের স্থায়ীভাবে বাদ দিতে জুলাই অভ্যুত্থানের পর রামপুরা থানার একটি মামলার আসামির তালিকায় কৌশলে ৪৭ প্রকৌশলীর নাম ঢোকানো হয় এবং মামলার নথি এসএসবি কমিটিতে জমা দেওয়া হয়। গত ৬ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নামে তালিকা। অধিদপ্তরের দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের (ঢাকা জোন) ও উৎফল কুমার দের থাকলেও তিন নম্বরে থাকা খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিজের নাম তালিকার ১ নম্বরে দেন। মো. শহিদুল আলম (স্বাস্থ্য উইং) এবং ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দার (প্রেষণে মহাপরিচালক, এইচআরআই) নামও তালিকায় দেওয়া হয়। গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনে সম্পৃক্ততা: রাজধানীর বেইলি রোডে ২০২৪ সালের শুরুতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় গ্রিন কোজি কটেজ। সাততলার এ বাণিজ্যিক ভবনে ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছিল ৪৬ জন; দগ্ধ ও আহত হয় আরও ১৩ জন। প্রাণহানির ঘটনা পর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে ভবনটি নকশার অনুমোদন নিয়ে। পরবর্তীকালে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে ২০১১ সালে এ ভবনের নকশার অনুমোদন দিয়েছিলেন রাজউকের তৎকালীন অথরাইজড অফিসার মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীসহ কয়েকজন। কিন্তু ওই রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের বছর না পেরোতেই ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদ বাগিয়ে নেন সেই খালেকুজ্জামান। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, গ্রিন কোজি কটেজে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করতেন, তবে ভবনটিতে কোনো জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি ভবনে চলাচলের সিঁড়িও ছিল না। জরুরি নির্গমন পথ থাকলে বা সিঁড়িটা প্রশস্ত হলে এত প্রাণহানি হতো না। অভিযোগ আছে, তদন্ত প্রতিবেদনে যেন তাকে জড়ানো না হয়, এজন্য বিভিন্নভাবে তদবির করেন তিনি। যদিও অথরাইজড অফিসার হিসেবে এ ভবনের অনুমোদনের পুরো দায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। কোনো অনিয়ম হয়নি, দাবি খালেকুজ্জামানের: নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলিতে কোনো অনিয়ম হয়নি। বিষয়টি মন্ত্রণালয় জানে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারিতে বদলি করা হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পূর্ত অধিদপ্তরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নির্বাহী প্রকৌশলীরা। লটারি নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বদলি হবে। অন্য সিনিয়র প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী ভেবে ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয় পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আমার কোনো প্রতিযোগী নেই। যা বলছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলিতে অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করা হবে না, এ কথা বলার দায়িত্ব প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়নি। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে যারা রয়েছেন, তাদের প্রতিযোগী ভেবে তাদের বিরুদ্ধে হওয়া ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এবং বিভিন্নভাবে তাদের হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সচিব বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে লাগে। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। খালেকুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী হয়েছেন গত বছর। তালিকা অনুযায়ী তিনি তিন নম্বরে আছেন। তার সিনিয়র রয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য গ্রেড-ওয়ান হওয়ার বিষয়ে যাচাই-বাছাই করার জন্য এসএসবিতে পাঠানো হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী যিনি থাকবেন, তাকেই বানানো হবে।
স্টাফ রিপোর্টার: গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) গুলনাহারের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরিতে বহাল থাকা অবস্থায় কথিত ডেভেলপার ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের উৎস, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা এবং আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অনুসন্ধানের আবেদন করা হয়েছে। দুদকে দেওয়া আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় গুলনাহার তাঁর স্বামী ও নিকটাত্মীয়দের মাধ্যমে বেসরকারি ডেভেলপার ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। বিশেষ করে ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে বিষয়টি যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রিসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে গুলনাহার বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের মালিকানা, অংশীদারিত্ব, বিনিয়োগ কিংবা আর্থিক স্বার্থ রয়েছে কি না—তা অনুসন্ধান প্রয়োজন। দুদকে দেওয়া আবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি চাকরিতে বহাল থেকে কোনো লাভজনক ব্যবসা বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে গুলনাহার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে থাকলে সেটি প্রযোজ্য সরকারি চাকরির বিধি ও আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীর দাবি, গুলনাহারের সরকারি বেতন-ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয়ের সঙ্গে তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। এ জন্য গুলনাহার, তাঁর স্বামী ও সংশ্লিষ্ট নিকটাত্মীয়দের ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনার আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী এবং চাকরিতে যোগদানের পর থেকে সম্পদ বৃদ্ধির তথ্য যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ডেভেলপার ব্যবসার মাধ্যমে ফ্ল্যাট বিক্রি, জমি উন্নয়ন বা অন্যান্য বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত অর্থের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা—তা অনুসন্ধান করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা সরকারি নির্মাণকাজের কারিগরি মূল্যায়ন, তদারকি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাই পরিবারের ডেভেলপার ব্যবসার সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক সম্পর্ক থাকলে সরকারি দায়িত্ব পালনে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। দুদকের কাছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিবন্ধনসংক্রান্ত কাগজপত্র, পরিচালক ও মালিকানার তথ্য, জমি ও ভবনের দলিল, ফ্ল্যাট বিক্রির নথি, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর নথি এবং সম্পদ বিবরণী পরীক্ষা করার আবেদন করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে গুলনাহারের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে। দুদকের অনুসন্ধানেই অভিযোগগুলোর সত্যতা বা অসত্যতা নিশ্চিত হবে।
একটা সময় সরকারি যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সাজসজ্জা কিংবা ভিআইপি অনুষ্ঠানের কাজে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো ‘প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’কে। গত দেড় যুগ ধরে এমন অঘোষিত সংস্কৃতি ছিলো সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিগত সময়ের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত প্যারাডাইম সাময়িকভাবে হোঁচট খায়। কিন্তু এ সংকট কাটিয়ে ‘বীরদর্পে’ ফিরতে খুব বেশি সময় লাগেনি প্রতিষ্ঠানটির। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনেকটা হাঁকডাক দিয়ে প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সংক্রান্ত নথিপত্র বস্তাবন্দি অবস্থায় পূর্ত ভবনের প্রশাসন বিভাগে পড়ে আছে বলে জানা যায়। আর নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিও গত দুই বছরে সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সেতু ভবন, মন্ত্রিপাড়া, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, এনবিআর ভবন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগ অডিট প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ আঁতাতের মাধ্যমে কাজ পেয়ে যাচ্ছে। এসব অভিযোগ যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’ গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ইতোপূর্বে সাবেক এক গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসিরের আশীর্বাদ বন্ধ হলেও সেখানে নতুন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে দাড়িঁয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) ড. আবু নাসের চৌধুরী। ঢাকা সার্কেল-২ এর দায়িত্বে থাকা এ প্রকৌশলী বর্তমানে সার্কেল-১ এর অতিরিক্ত দায়িত্বও বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুটি সার্কেলের অধীনে থাকা সব কাজ প্রচলিত বাজার দর থেকে উচ্চমূল্যে প্যারাডাইমের ঝুড়িতে জমা পড়ছে। সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাবেক গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্যারাডাইমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। তার চাহিদামত সব ডিভিশন থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এরপর নথিপত্র সংগ্রহ করলেও তা পূর্ত ভবনের সংস্থাপন শাখায় বস্তাবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আবু নাসেরের এখতিয়ারাধীন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সার্কেল-২ এর আওতায় রয়েছে- গণপূর্ত ভবন, হাইকোর্ট, ইডেন গণপূর্ত বিভাগ (সচিবালয়), তেজগাঁও, বিটিভি, ওয়ারী, কেরানীগঞ্জ কারাগার এবং ঢাকার বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ। সরকারি ভবন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের বড় অংশই এই সার্কেলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। সেখানে প্যারাডাইমের কাজই বেশি। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৭১ পুরানা পল্টন ভবনে সিটিজেন সার্ভিস সেন্টার স্থাপনের জন্য ৩৮ লাখ টাকার সংস্কারকাজ পায় প্যারাডাইম। এরপর সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনের বিভিন্ন কক্ষ সংস্কারের ৬১ লাখ টাকার কাজ, একই ভবনের ১৪/ক নম্বর কক্ষ আধুনিকায়নের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ভিভিআইপি কনফারেন্স রুমসংলগ্ন নতুন টয়লেট নির্মাণ ও অন্যান্য সংস্কারকাজে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশও যায় প্রতিষ্ঠানটির হাতে। এছাড়া সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে ৫৫ লাখ টাকা, ৪ নম্বর ভবনে ৭৪ লাখ টাকা এবং ডে-কেয়ার সেন্টার সংস্কারে ৪৪ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে তারা। একই সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তর্জাতিক কনফারেন্স রুম নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজে ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশ, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির দেয়াল সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ৫৭ লাখ টাকার কাজ এবং সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইসিটি রুম, টয়লেট ও শেড নির্মাণসহ নানাবিধ উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কার্যাদেশও পেয়েছে প্যারাডাইম। শুধু সচিবালয়ই নয়, গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য সরকারি স্থাপনাতেও বিস্তৃত হয়েছে প্যারাডাইমের কার্যক্রম। শেরেবাংলা নগরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪২ লাখ টাকার সংস্কারকাজ, আগারগাঁওয়ের এসএমআরসি ভবনের প্রায় ১৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া ও বিভিন্ন হলের নির্মাণ, পরিবর্তন ও সম্প্রসারণসংক্রান্ত দুটি প্রকল্পে মোট ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সময়ে বনানীতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সেতু ভবন সংস্কার, রেট্রোফিটিং ও পুনর্নির্মাণসংক্রান্ত তিনটি পৃথক প্যাকেজে প্রায় ১১ কোটি টাকার কার্যাদেশও পায় প্যারাডাইম। পাশাপাশি এনবিআর ভবনের ৪৯ লাখ টাকার কাজও বাগিয়ে নেয় তারা। স্বাস্থ্যখাতেও সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। পূর্ত অধিদপ্তরের ডেলিগেটেড কাজ হিসেবে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার গ্লাস কার্টেইন ওয়াল স্থাপন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শহীদ ডা. মিলন অডিটোরিয়ামের ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার সংস্কার এবং অডিটোরিয়াম চত্বরের রাস্তা মেরামতের ৩৭ লাখ টাকার কাজও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে প্যারাডাইমের কার্যাদেশ বাড়ার সময়ই প্রশাসনিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসেন আবু নাসের চৌধুরী। গত ১৩ আগস্ট নারীঘটিত বিষয়সহ বিভিন্ন অভিযোগে সার্কেল-১ এর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলমকে সরিয়ে দেওয়া হলে সেই দায়িত্বও পান তিনি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলগুলোর একটি ‘সার্কেল-১’। এর আওতায় রয়েছে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২, নগর গণপূর্ত বিভাগ এবং আরবরিকালচার বিভাগ। এই সার্কেলের অধীনেই রয়েছে বঙ্গভবন, মন্ত্রীপাড়া, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, জুলাই জাদুঘর (সাবেক গণভবন), ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, রমনা পার্ক এলেনবাড়ি, জাজেস কমপ্লেক্স, মতিঝিল এবং কাকরাইল থানাসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা। ফলে বর্তমানে রাজধানীর সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিপুল অঙ্কের পরিচালন বাজেট তদারকির দায়িত্ব রয়েছে আবু নাসেরের হাতে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন ব্যয়ের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সার্কেল-২ এর আওতাধীন ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগের জন্য ২৫ কোটি টাকা, মেডিকেল গণপূর্ত বিভাগ ঢাকার জন্য ১৫ কোটি টাকা, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর জন্য ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর জন্য ২৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সার্কেল-১ এর আওতাধীন নগর গণপূর্ত বিভাগের জন্য ৩০ কোটি টাকা, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর জন্য ১১ কোটি ৭৫ লাখ, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এর জন্য ২৩ কোটি এবং আরবরিকালচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এলেনবাড়ীতে বঙ্গবন্ধু কর্ণার করে আলোচনায় থাকা আবু নাসের সরকার পরিবর্তনের পর প্রভাব যেন আরও বেড়েছে। এ প্রকৌশলীর ছোঁয়ায় বড় পরিসরে কাজ পেতে শুরু করেছে প্যারাডাইম। একপর্যায়ে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুরের সচিবালয়ের কার্যালয়ের সাজসজ্জার দায়িত্বও দেওয়া হয় প্যারাডাইমকে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করবো না।’ অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইম আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফয়সাল মোহাম্মদ বলেন, ‘সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকারের সঙ্গে আমাদের ফার্মের কোনো সম্পর্ক নেই। আর সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির অবসরে যাওয়ার পর আমাদের ফার্মে শুধু পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।’ প্যারাডাইমের বিষয়ে গঠিত তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কমিটি গঠন হয়েছে কি না তা আমরা জানি না। আমাদের কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি।’ প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাজ পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সচিবালয়ে কোনো কাজ করিনি। প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর সার্কেলের অধীনেও কোনো প্রকল্পে কাজ করিনি।’
“ নিজস্ব প্রতিনিধি: সাধারণ কর্মচারী” থেকে “অবৈধ সম্পদের পাহাড়”—ইউপি সচিব মীর আব্দুল বারেককে ঘিরে নানা প্রশ্ন একসময় ১৪তম গ্রেডের ইউনিয়ন পরিষদের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। অথচ এক দশকের ব্যবধানে জীবনযাত্রায় এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। বহুতল ভবন, জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাভার উপজেলার পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মীর আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, তার ঘোষিত ও বৈধ আয়ের সঙ্গে কথিত সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। তেতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সচিব এবং বর্তমানে পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত মীর আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি অর্থের অপচয় বা আত্মসাতের অভিযোগ করে আসছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও সরকারি তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। এক দশকের দায়িত্ব, নানা অনিয়মের অভিযোগ স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, তেতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সরকারি বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল-ভাউচার, ঠিকাদারি কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগকারীদের দাবি, দায়িত্বশীল পদে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন। যদিও এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল এবং ব্যাংক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন। সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তেতুলঝোড়া এলাকায় মীর আব্দুল বারেকের নামে একটি পাঁচতলা ভবন রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। একই এলাকায় তার নামে-বেনামে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতক জমি থাকার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর কল্যাণপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট বা বাড়ি রয়েছে বলেও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। এসব সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস কী—তা যাচাই করা হলে অভিযোগের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। সাংগঠনিক পদ নিয়েও প্রশ্ন ইউপি সচিবদের একটি সংগঠনের ঢাকা জেলার সভাপতির দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করেও তার প্রভাব বিস্তার নিয়ে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাংগঠনিক পরিচয় ও প্রশাসনিক পদমর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে তিনি স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। স্থানীয়দের প্রশ্ন—একজন ১৪তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয়, চাকরির মেয়াদ এবং পারিবারিক আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে কথিত বিপুল সম্পদের হিসাব কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? তদন্তের দাবি অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, মীর আব্দুল বারেকের নামে ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, জমি, ফ্ল্যাট, ভবন, ব্যাংক হিসাব এবং আয়কর নথি যাচাই করা হলে প্রকৃত সম্পদের চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। এ বিষয়ে মীর আব্দুল বারেকের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ইউপি কর্তৃপক্ষ, উপজেলা প্রশাসন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অবস্থান পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন। [প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানীভাবে প্রকাশের আগে জমি/ফ্ল্যাটের দলিল, সম্পদ বিবরণী, প্রকল্পের নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য দিয়ে অভিযোগগুলো যাচাই করা জরুরি।]
আঃজলিল,স্টাফ রিপোর্টার:--- যশোরের শার্শায় থানা পুলিশের এক বিশেষ অভিযানে ৪০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ মোঃ রেজাউল ইসলাম (৪৫) নামের এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আজ বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) সকাল ৯:৪৫ ঘটিকার সময় শার্শা থানার এসআই (নিঃ) শ্রীকান্ত বিশ্বাসের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস টিম টেংরা এলাকায় মাদকবিরোধী চেকপোস্ট পরিচালনা করে। এ সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে টেংরা পশ্চিমপাড়া সাকিনস্থ ছবেদা গাছতলা মোছার ব্যাক মোড় থেকে রেজাউলকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেহ তল্লাশি করে ৪০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত রেজাউল ইসলাম যশোর জেলার বেনাপোল পোর্ট থানার গাতিপাড়া গ্রামের মোঃ মিজানুর রহমানের ছেলে। এ ঘটনায় উদ্ধারকৃত আলামতসহ ধৃত রেজাউল এবং তার এক অজ্ঞাতনামা সহযোগীর বিরুদ্ধে শার্শা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণের প্রক্রিয়া চলছে এবং পলাতক অজ্ঞাতনামা আসামিকে সনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আঃজলিল স্টাফ রিপোর্টার
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম জোনের দায়িত্ব পেতে কোটি টাকা দিয়ে একটি চিঠি কিনেছেন আরেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর খান। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী এই চিঠি দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে। অথচ এর আগে অন্য এক কর্মকর্তাকে এ পদে পদোন্নতি দিতে চিঠি দিয়েছিলেন তিনি। গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই অধিদপ্তরের ইএম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক আগামী ৩১ আগস্ট অবসরে যাচ্ছেন। তার শূন্য পদ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের জন্য প্রায় ১ মাস আগে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিলেন প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। যে চিঠিতে তিনি বিসিএস ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মাহাবুবুল হক চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু আচমকা আরেকটি চিঠি পাঠানোয় এ নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়। বলা হয়, বড় অঙ্কের বিনিময়ে তিনি এই চিঠি দিয়েছেন। এমনিতেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বদলি ও পদোন্নতির অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিস্ট প্রমাণ থাকায় গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন লটারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কর্মকর্তাদের বদলি ব্যবস্থা চালু করেন। ইতিমধ্যে প্রায় ১ হাজার উপ-সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী বদলি করেছেন। গণপূর্ত ইএম পিএন্ডডি জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর খান দীর্ঘদিন ইএম জোনের দায়িত্বে ছিলেন। আবারও তিনি এই পদে নিয়োগ পেতে উঠে-পড়ে লেগেছেন। এ জন্য তিনি প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ম্যানেজ করে চিঠি নিয়েছেন। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের সচিব ওই চিঠির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছেন। তবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি মন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে। রোববার অথবা সোমবারের মধ্যে আশ্রাফুল হকের শূন্য পদে নিয়োগ দিতে হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়া গেলে রোববারই এ সম্পর্কিত প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে। আশ্রাফুল হককে অবসর প্রদান করে ইতিমধ্যেই মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ ও মহাসড়কে ব্যারিকেডের পর এবার সীতাকুণ্ডে আলোচনার কেন্দ্রে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে কয়েকজন যুবককে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা গেছে। সংঘাতের ঘটনায় দিনভর উত্তেজনার পর এসব ভিডিও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করলেও ঘটনার একদিন পরও থানায় কোনো মামলা হয়নি। পুলিশ বলছে, ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে অস্ত্রধারীদের পরিচয় ও ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে। মঙ্গলবার বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সীতাকুণ্ড উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের কর্মসূচিকে ঘিরে দলটির দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক আসলাম চৌধুরীর অনুসারী এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দীনের অনুসারীরা পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করায় সকাল থেকেই এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। দুপুরে পৌর এলাকার হাসান গোমস্তা মসজিদসংলগ্ন মাইক্রো স্টেশন এলাকায় দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা মুখোমুখি হলে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। একপর্যায়ে পরপর ককটেল বিস্ফোরণে সীতাকুণ্ড সদরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসায়ী ও পথচারীদের অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যান। পরে সংঘাতের প্রভাব পড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও। বাঁশবাড়িয়া এলাকায় ব্যারিকেড দেওয়ায় প্রায় আধা ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ শত শত যানবাহন আটকা পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা। খবর পেয়ে হাইওয়ে পুলিশ, সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ, জেলা পুলিশ ও র্যাব-৭-এর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সংঘর্ষের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে কয়েকজন যুবককে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অবস্থান করতে দেখা যায়। ভিডিওগুলো সত্যতা ও স্থান-কাল যাচাই করা না হলেও প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের দৃশ্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সীতাকুণ্ড থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে। বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর দাবিতে থাকা দুই অস্ত্রধারীসহ সংশ্লিষ্টদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মহাসড়কে ব্যারিকেড, গাড়ি ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনায় এখনো থানায় কোনো মামলা হয়নি বলেও জানান তিনি।
একসময় ছিলেন সামান্য বেকার যুবক। রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার বলয়কে কাজে লাগিয়ে গত প্রায় ১৬ বছরে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন ৮ তলা বিশিষ্ট বিশাল আলীশান বাড়ী এবং সিরামিস এর ব্যবসা যা বিভিন্ন ভাবে চাঁদার টাকায় এই অবৈধ সম্পদের মালিক —এমন অভিযোগ উঠেছে মো. জুয়েলের বিরুদ্ধে। স্থানীয়ভাবে তিনি প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সোনাপুর এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন জুয়েল। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে জোরপূর্বক টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নিজের একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছেন জুয়েল। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হতো। কেউ টাকা দিতে আপত্তি করলে তাকে নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হতো বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এসব অভিযোগ অনেকটা আড়ালেই থেকে গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে জুয়েলের আর্থিক অবস্থা ছিল সাধারণ। কিন্তু গত ১৬ বছরে তার জীবনযাপন ও সম্পদে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কীভাবে এবং কোন উৎস থেকে এই বিপুল সম্পদ অর্জিত হয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে জুয়েলের নামে থাকা সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক লেনদেন এবং আয়কর সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে কেউ যদি অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন কিংবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করে থাকেন, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামগামী আন্তঃনগর ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ ট্রেনে এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় ট্রেনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা চার পুলিশ সদস্যেকে দায়িত্বে অবহেলা ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে চার পুলিশ সদস্যেকে প্রত্যাহার করে পাকশী রেলওয়ে জেলা পুলিশ লাইনে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় ক্যান্টিনবয় আবু বক্কর সিদ্দিককে গ্রেপ্তার করে বগুড়ার আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রত্যাহার হওয়া চার পুলিশ সদস্য হলেন এটিএসআই খোকন ইসলাম (৩৫), কনস্টেবল ফজলে রাব্বি (৩৪), গোলাম মোস্তফা (৩৬) ও আশিকুল রহমান (৩০)। ঘটনাটি রেলওয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ট্রেনটি চলন্ত অবস্থায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশ সদস্য তল্লাশির কথা বলে ওই নারীকে খাবার কারোজে নিয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে তার সঙ্গে অসদাচরণ ও টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরে ক্যান্টিনবয় আবু বক্কর সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেন ওই নারী। ঘটনার পর ভুক্তভোগী জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ট্রেনটির অবস্থান শনাক্ত করে। পরে সান্তাহার রেলওয়ে জংশন স্টেশনে ওই নারীকে উদ্ধার এবং ক্যান্টিনবয়কে আটক করা হয়। এ ঘটনায় সান্তাহার রেলওয়ে থানায় ভুক্তভোগী নিজেই বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। এ বিষয়ে সান্তাহার রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল উদ্দীন বলেন, মামলায় অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যের সংশ্লিষ্টতা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে ঘটনার দিন ওই চার পুলিশ সদস্যের ট্রেনে দায়িত্ব থাকায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাদের পুলিশ লাইনে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা ও দোষীদের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক গুম-খুনের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন ট্রলার মাঝি আব্বাস মল্লিক। এ সময় তিনি ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেছেন জিয়াউল আহসানের লোমহর্ষক কর্মকাণ্ডের বর্ণনা। ট্রাইব্যুনালকে তিনি জানিয়েছেন, জিয়াউল আহসান মাঝরাতে বন্দি নিয়ে সুন্দরবনসংলগ্ন চরদুয়ানি বাজারে আসতেন। বন্দিদের গুলি করে পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। অনেক বন্দিকে সুন্দরবনে গুলি করে হত্যা করা হতো, পরে সাংবাদিক ডেকে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজানো হতো। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মামলাটির দশম সাক্ষী হিসেবে হাজির হয়ে ট্রলার মাঝি আব্বাস মল্লিক এসব কথা বলেন। তিনি জানান, কীভাবে ২০১০ এবং ২০১১ সালে র্যাবের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান বন্দিদের গুলি করে হত্যা করতেন এবং লাশ গুম করতে পেট কেটে ও সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দিতেন। মাঝরাতে বন্দি নিয়ে আসত র্যাব সাক্ষ্যে আব্বাস মল্লিক জানান, যেদিন এলাকায় অভিযান হতো, সেদিন বিকালে সাদা পোশাকে দুইজন র্যাব সদস্য এসে স্থানীয় দোকানদারদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ রাখতে এবং বাতি নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতেন। এরপর রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র্যাবের ৪ খেকে ৫টি মাইক্রোবাস বরফ মিলের সামনে এসে থামত। ঢাকা থেকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় বন্দিদের নিয়ে এসে ট্রলারে তোলা হতো। বোট ছাড়ার সময় র্যাব সদস্যরা সঙ্গে করে রশি ও সিমেন্টের বস্তা নিতেন। আব্বাস মল্লিকের জবানবন্দি অনুযায়ী, বন্দিদের নিয়ে ট্রলারটি বলেশ্বর নদী হয়ে গভীর পানির দিকে নিয়ে যাওয়া হতো। গভীর পানিতে যাওয়ার পর ট্রলারের গতি কমিয়ে দেয়া হতো এবং ট্রলারের ভেতর থেকে চোখ-হাত বাঁধা বন্দিদের বের করে আনা হতো। ট্রলারের দুই পাশে থাকা সাপোর্ট নামের অংশে বন্দিকে দুইজন র্যাব সদস্য চেপে ধরে রাখতেন। এরপর জিয়াউল আহসান নিজে এসে ওই বন্দির মাথায়, কানে অথবা বুকে গুলি করতেন। পেট চিরে ও বস্তা বেঁধে নদীতে লাশ গুম গুলির পর মৃতদেহের গলায় অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। লাশ যেন পানিতে ভেসে না ওঠে, সে জন্য লাশ নদীতে ফেলার আগে পেট কেটে ফেলা হতো। এরপর সুন্দরবনে নিয়ে অন্য বন্দিদের বোট থেকে নামিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো এবং সাংবাদিকদের ডেকে থানায় লাশ হস্তান্তর করা হতো। হত্যাকাণ্ড শেষে বরফ মিলে ফিরে আসার পর মাঝিদের খামে করে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন আব্বাস মল্লিক। নিখোঁজ ছোট ভাই আলকাছ প্রত্যক্ষদর্শী এই মাঝি ট্রাইব্যুনালে তার ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, আলকাছের দুটি ট্রলার ছিল এবং তিনি র্যাবের সঙ্গে কাজ করতেন। কিন্তু র্যাবের এই বর্বর কর্মকাণ্ডের কথা আলকাছ বাজারে আলোচনা করায় স্থানীয় অন্য বোটের মালিকরা তাকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, র্যাব তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। পরে ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে একদিন দুপুরের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে বের হন আলকাছ, কারণ র্যাব থেকে তাকে ফোন করে জানানো হয়েছিল যে, ‘জিয়া স্যার’ তাকে বটতলা মানিকখালীতে ডেকেছেন। ওইদিন সন্ধ্যা থেকেই আলকাছের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং আজ পর্যন্ত তার আর কোনো সন্ধান মেলেনি। ঘটনার পর খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল এবং ঢাকার র্যাব কার্যালয়ে ঘুরেও ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি আব্বাস মল্লিক। পাথরঘাটা থানায় জিডি করতে গেলেও পুলিশ সেখানে জিয়াউল আহসান ও র্যাবের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানায় বলে সাক্ষ্যে উঠে আসে। সাক্ষ্যের শেষ পর্যায়ে কাঠগড়ায় উপস্থিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে সরাসরি শনাক্ত করে আব্বাস মল্লিক ট্রাইব্যুনালের কাছে তার ছোট ভাই নিখোঁজের বিচার দাবি করেন।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা – দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, যখন দেশের প্রধান তিনটি বিরোধী দল—জাতীয় গণফ্রন্ট, উন্নয়ন পার্টি ও জননেতা পরিষদ—আজ এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ‘গণঐক্য জোট’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এই জোটের মুখ্য লক্ষ্য হলো আগাম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করা, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি এবং একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট আয়োজন নিশ্চিত করা। জাতীয় গণফ্রন্টের সভাপতি শহীদুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “দেশে এখন গণতন্ত্র নেই, জনগণের ভোটাধিকার নেই। তাই আমাদের এই ঐক্য—সত্যিকার অর্থে একটি গণআন্দোলনের সূচনা।” জোটের কর্মসূচি জোট নেতারা জানান, আগামী মাস থেকে সারা দেশে বিক্ষোভ, গণঅবস্থান, মানববন্ধন এবং জেলা পর্যায়ে গণসংলাপ কর্মসূচি শুরু হবে। তারা বলেছেন, এই জোট শুধুমাত্র সরকারবিরোধী নয়, বরং এটি একটি ভবিষ্যত রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবেও কাজ করবে। সরকারের প্রতিক্রিয়া সরকারি দলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে অঘোষিতভাবে কয়েকজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, “বিরোধীদের এই জোট জনভিত্তিহীন এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা।” বিশ্লেষকদের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব হাসান বলেন, “এই জোট নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে, যদি তারা মাঠে বাস্তব আন্দোলন ও বিকল্প নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে সরকার যেভাবে শক্ত হাতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখছে, তাতে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।” আগামী সপ্তাহে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জোটের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক মহল এই জোটকে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবেও দেখছে।