ভারতের রাজস্থানের কোটায় দিল্লি-মুম্বাই এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ১৭ জন। আজ শনিবার ভোরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় বাসটিতে ২৭ জন যাত্রী ছিলেন।
বাসটি মধ্যপ্রদেশের ভোপাল থেকে রাজস্থানের খাতু শ্যাম মন্দিরের উদ্দেশে যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে কোটার এমবিএস হাসপাতাল ও নিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহত আটজনের মধ্যে পাঁচজন নারী। তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন অরুণা, বৈষ্ণবী, তৃষা, কৃষ্ণা, অনিতা, ওম, সূর্যবংশী ও রাজু।
এক কর্মকর্তা জানান, শনিবার সকালে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। আহতদের চিকিৎসা চলছে। তবে প্রাথমিকভাবে তাদের কারো অবস্থা আশঙ্কাজনক নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বাসচালক ঘুমিয়ে পড়ায় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপর বাসটি সড়কের পাশের রেলিং ভেঙে খাদে পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে চিৎকার ও হইচই শুরু হলে পুলিশ সেখানে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৫ আন্তর্জাতিক হকি বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ ফুটবল প্রেমীদের মতো হকি প্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের কঠিন পর্ব অতিক্রম করে দুই দলই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য এই ফাইনাল ম্যাচে উভয় দল নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত। আর্জেন্টিনা দল এই টুর্নামেন্টে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। অধিনায়ক লুকাস মার্টিনেজ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছি। দলের সবাই একসঙ্গে কাজ করে ফাইনালে পৌঁছেছি। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট — বিশ্বকাপ জিততে হবে। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ বজায় রেখেছি এবং আগামী ম্যাচেও তা বজায় রাখব।” আর্জেন্টিনা দলের ফিজিক্যাল ট্রেনার জানান, দল খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য বিশেষ অনুশীলন চালাচ্ছে যাতে ফাইনালে তারা চাপ সামলাতে পারে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের কোচ মাইকেল ডি ইয়ং ফাইনালের আগের প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দল গত কয়েক মাস ধরে কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছে। খেলোয়াড়রা মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা চাই এই বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস গড়ে একটি শক্তিশালী ছাপ রেখে যেতে।” কোচ আরো বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র ফাইনালে উঠা নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়। আমরা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিজেদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।” বিশ্বের হকি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ফাইনাল ম্যাচটি গত দশকের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা হতে চলেছে। উভয় দলের কৌশল, বল নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুতগতির খেলায় যে মেধা প্রদর্শিত হয়েছে, তা ফুটবলের মতো অন্য কোনো খেলার ক্ষেত্রে বিরল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফাইনালে দলের মানসিক স্থিতিশীলতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা বিজয় নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে। মাঠে উভয় দলের খেলোয়াড়রা দ্রুতগতির পাস, শক্তিশালী ডিফেন্স এবং আক্রমণাত্মক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মাঠ মাতানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকারের গতিবেগ এবং নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডারদের কৌশলগত দক্ষতা ম্যাচে প্রধান আকর্ষণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও গোলরক্ষকদের প্রতিটি সেভ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াও ম্যাচের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশ্বজুড়ে লাখো হকি ভক্ত এই ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার দেখার জন্য অপেক্ষায় আছেন। অনলাইনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ম্যাচের লাইভ স্ট্রিমিং অনুষ্ঠিত হবে এবং অনেক দেশের টেলিভিশনও সরাসরি সম্প্রচার করবে। হকি প্রেমীরা এই ম্যাচ থেকে দারুণ উত্তেজনা, দক্ষতা এবং খেলা উপভোগ করার আশা করছে। মাঠের বাইরেও ভক্তদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ফ্যান জোন আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে খেলোয়াড় ও দর্শকরা একত্রে সময় কাটিয়ে খেলার আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। এছাড়াও টুর্নামেন্ট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে এবং খেলা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে দুই দলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে আগামী দিনে বিশ্ব হকির নতুন ধারার রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এই ম্যাচের ফলাফল আগামী দশক ধরে হকির কৌশলগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের হকি টুর্নামেন্ট হওয়ায় এর প্রতি ভক্তদের আগ্রহ ও উন্মাদনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সবাই আশা করছেন, আগামীকালের ফাইনাল হবে একটি স্মরণীয় খেলা, যেখানে স্পোর্টসম্যানশিপ, দক্ষতা ও উত্তেজনা থাকবে সর্বোচ্চ মাত্রায়।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
পানামায় গত সপ্তাহে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ৭৪৬টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। পানামা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব জিওসায়েন্সেসের পরিচালক নেস্টর লুক বলেন, ‘তাত্ত্বিক ধারণা ও অতীতের তথ্য অনুযায়ী, এ মাত্রার ভূমিকম্পের পর এক থেকে দুই মাস পর্যন্ত আফটারশক চলতে পারে।’ তিনি জানান, ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটারেরও কম গভীরে। ভূমিকম্পে নির্গত শক্তির প্রভাবে ভূত্বকের টেকটোনিক ব্লকগুলো এখনো নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করছে। তবে ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, আফটারশকগুলোর মাত্রা ধীরে ধীরে কমছে। লুক আরো বলেন, চিরিকি ও বোকাস দেল তোরো এলাকায় রেকর্ড করা ভূমিকম্পগুলো পৃথক ফল্ট বা ভূচ্যুতি ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। সেগুলোর সঙ্গে গত ৯ অক্টোবরের ভূমিকম্পের সরাসরি যোগসূত্র থাকা আবশ্যক নয়। এদিকে পানামার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ভূমির পরিবর্তনের বিষয়ে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই করছেন গবেষকেরা। স্থানীয় বাসিন্দারা উপকূলের কিছু এলাকায় পাথর জেগে ওঠা এবং সমুদ্রের পানি সরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন বলে জানিয়েছেন। লুকের ব্যাখ্যা, ভূচ্যুতির কারণে উপকূলীয় ভূমি উঁচু হয়ে উঠতে পারে কিংবা নিচে দেবে যেতে পারে। এতে ভূপৃষ্ঠের আকৃতিতেও পরিবর্তন ঘটতে পারে। এসব পরিবর্তনের পেছনে ভূচ্যুতির ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে ভূতত্ত্ববিদেরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরীক্ষা করবেন। এছাড়া পানির রঙ পরিবর্তনের খবরও খতিয়ে দেখছেন গবেষকেরা। কয়েকটি এলাকায় পানির রং ধূসর হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। লুক বলেন, ভূমিকম্পের ফলে ভূগর্ভস্থ পানি বিভিন্ন খনিজ পদার্থের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারে। তবে এর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে পানির রাসায়নিক পরীক্ষা প্রয়োজন। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় লস সান্তোস প্রদেশের ইসলা কানাসের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর দ্বীপটি যেন দুই ভাগ হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে। এ বিষয়ে লুক বলেন, দ্বীপজুড়ে কোনো ফাটল তৈরি হয়েছে কি না এবং সেই ফাটল সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখবেন ভূতত্ত্ববিদেরা। এ ধরনের ফাটলের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে তা ভূচ্যুতির প্রমাণ হতে পারে। এদিকে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে প্রায় ১৫০টি যন্ত্র স্থাপন করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট অব জিওসায়েন্সেস। আর দেশব্যাপী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৭০০টি সেন্সর। সূত্র: আনাদোলু
ভারতের রাজস্থানের কোটায় দিল্লি-মুম্বাই এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ১৭ জন। আজ শনিবার ভোরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় বাসটিতে ২৭ জন যাত্রী ছিলেন। বাসটি মধ্যপ্রদেশের ভোপাল থেকে রাজস্থানের খাতু শ্যাম মন্দিরের উদ্দেশে যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে কোটার এমবিএস হাসপাতাল ও নিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত আটজনের মধ্যে পাঁচজন নারী। তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন অরুণা, বৈষ্ণবী, তৃষা, কৃষ্ণা, অনিতা, ওম, সূর্যবংশী ও রাজু। এক কর্মকর্তা জানান, শনিবার সকালে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। আহতদের চিকিৎসা চলছে। তবে প্রাথমিকভাবে তাদের কারো অবস্থা আশঙ্কাজনক নয় বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বাসচালক ঘুমিয়ে পড়ায় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপর বাসটি সড়কের পাশের রেলিং ভেঙে খাদে পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে চিৎকার ও হইচই শুরু হলে পুলিশ সেখানে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার ও নির্মাণসামগ্রীর চড়া মূল্যের কারণে বেড়েছে আবাসন খাতের নির্মাণব্যয়। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে কমেছে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা। এই দুইয়ের প্রভাবে বর্তমানে ক্রেতা সংকটে ধুঁকছে বিপুল সম্ভাবনার আবাসন খাত। এমন পরিস্থিতিতে ফ্ল্যাটের বেচাকেনা প্রায় ৬৫ শতাংশ কমে গেছে। ফ্ল্যাট ও প্লটের চাহিদা কমার পাশাপাশি উচ্চ নিবন্ধন ব্যয় এবং করের বোঝায় অনেক প্রকল্প অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরেই আবাসন খাত খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের নীতিসহায়তা জরুরি। তাদের মতে, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো, ডেভেলপারদের সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেওয়া এবং নিবন্ধন ব্যয় কমানোর মাধ্যমে বাজারে ক্রেতার চাহিদা ফেরানো সম্ভব। এতে শুধু আবাসন খাতেই নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত রড, সিমেন্ট, গ্লাস ও সিরামিকসহ ২৬৯টি সহায়ক শিল্পের কার্যক্রমেও গতি আসবে। একই সঙ্গে দেশের ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিরাপদ হবে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) দেওয়া তথ্যমতে, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) আবাসন খাতের অবদান আট শতাংশের বেশি। সংযোগ শিল্পসহ এই খাতের সামগ্রিক অবদান প্রায় ১৬ শতাংশ ২০২৫ সালে বাজারভিত্তিক একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট শিল্পের আকার ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বর্তমানে আবাসন নির্মাণ, ডেভেলপমেন্ট, প্রকৌশল, স্থাপত্য, ইন্টেরিয়র, নির্মাণশ্রমিকসহ প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতে। রিহ্যাবের ২০২৫ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অগ্রিম আয়কর (এআইটি), স্ট্যাম্প ডিউটি, নিবন্ধন ফি, গেইন ট্যাক্স ও অন্যান্য ফি বাবদ কেবল আবাসন খাত থেকেই সরকারের রাজস্ব আদায় হয় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি নির্মাণসংশ্লিষ্ট শিল্পগুলো থেকে রাষ্ট্র বছরে সরাসরি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা পেয়ে থাকে। রিহ্যাবের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩,০০০ রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মধ্যে সংগঠনটির সদস্য প্রায় ৯২৫টি। প্রতি বছর প্রায় এক লাখ নতুন অ্যাপার্টমেন্টের প্রয়োজন হলেও ডেভেলপাররা বর্তমানে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ শতাংশের মতো সরবরাহ করতে পারছেন। অর্থাৎ, আবাসনের বিপুল চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ অনেক কম। এ ছাড়া দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডিকেটর বাংলাদেশের ক্রয় সমক্ষমতা সূচক (পিএমআই)। গত বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ঢাকা এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথভাবে প্রকাশিত বাংলাদেশের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) অনুযায়ী, চলতি বছরের আট মাসের পাঁচটিতেই নির্মাণ খাতের স্বাভাবিক মান সংকোচন দেখা গেছে। এমনকি সর্বশেষ সেপ্টেম্বরেও এই খাতের পিএমআই তিন দশমিক আট পয়েন্ট কমে ৪৮ দশমিক পাঁচে নেমে গেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, আবাসন খাতে বর্তমান ক্রেতা সংকটের সূত্রপাত করোনার সময় থেকেই। মহামারির পর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষ দিকে অস্থিরতার মধ্যে স্থানীয় বেচাকেনা আরো কমে যায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ ফ্ল্যাট, প্লট বা সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে স্বস্তিতে ছিল না। সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আবাসন বাজারে ক্রেতার চাহিদা তৈরি হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদহার। আগে যারা ফ্ল্যাট বা জমি কিনতেন, তাদের তুলনামূলক কম সুদে ব্যাংকঋণ পাওয়ার সুযোগ ছিল। এখন সেই সুবিধা কমে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে ফ্ল্যাট কেনার মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে অনেকেই সরে আসছেন। খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ক্রেতার সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয়ও বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধির পর রড ও সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর দামও প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। পরে কর বাড়ানোর ফলে নির্মাণ ব্যয় আরো ১২ শতাংশ বেড়েছে। সব মিলিয়ে নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চুক্তির বাইরে গিয়ে ফ্ল্যাটের দাম বাড়ানোর সুযোগ না থাকায় ডেভেলপারদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। তারা বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ছোট ছোট অনেক কোম্পানির প্রকল্প অর্ধসমাপ্ত পড়ে আছে। কারণ, প্রকল্প শেষ করতে গেলে যে ব্যয় হবে, সেই ব্যয় ফ্ল্যাট বিক্রির টাকা থেকে উঠবে নাÑ এমন আশঙ্কায় অনেকে কাজ এগিয়ে নিতে পারছেন না। এ কারণে, আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগ ও নির্মাণ দুটোই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবাসন খাতে মন্দার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইস্পাত শিল্পেও। এ বিষয়ে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাসুদুল আলম (মাসুদ) আমার দেশকে বলেন, শিল্প খাত এমনিতেই দুর্বল অবস্থায় আছে। এর মধ্যে নতুন ট্যাক্স কাঠামো পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। তিনি বলেন, আগের অবস্থার তুলনায় আমাদের উৎপাদন প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। এতে চাহিদা ৩০ শতাংশে নেমে এসেছিল। সিজনাল কারণে (বাজেটের পরে) ডিমান্ড কিছুটা বেড়েছে, তবে সেটাকে ১০ শতাংশও বলা যাবে না। কারণ অনেক ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে যেগুলো চালু আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও চাহিদা এখনো আগের জায়গাতেই আছে— প্রায় ৩০ শতাংশের মধ্যে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) একজন নেতা সংশ্লিষ্ট খাতের পরিস্থিতি নিয়ে আমার দেশকে বলেন, আগস্ট পর্যন্ত গত আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে মাত্র এক দশমিক ২০ শতাংশ। এর কারণÑ চাহিদা কম, ইমপোর্ট বেজড শিল্প হওয়ায় আমদানি করা কাঁচামালের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে, ডলার রেটও হাই। আগে যেখানে ডলার ৮৪ থেকে ৮৬ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ১২০ থেকে ১২৩ টাকায় উঠে গেছে। এ ছাড়া রয়েছে অগ্রিম আয়কর (এআইটি)। বাজেটে আমাদের প্রত্যাশা থাকলেও কোনো ট্যাক্স মওকুফ হয়নি। বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মোনালিসা সিরামিকস (বিডি) লিমিটেডের পরিচালক মামুনুর রশিদ বলেন, মফস্বল থেকে যেভাবে মানুষ শহরের দিকে আসছে, সেই অনুযায়ী সিরামিকস শিল্পে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা হয়নি। একসময় যারা ফ্ল্যাট কিনত বা জমি কিনত, তাদের খুব সস্তায়, কম ইন্টারেস্টে লোন দেওয়া হতো। এগুলো এখন বন্ধ। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি আরেকটা বোঝা। তিনি বলেন, প্রাইভেট সেক্টরে যারা মিডল ক্লাস বা আপার-মিডল ক্লাস, তারা এই ফ্ল্যাটগুলো কেনে। কিন্তু এখন ব্যবসায়িক মন্দার কারণে তাদের ওইভাবে পারচেসিং পাওয়ারও বাড়েনি। ফলে রিয়েল এস্টেট সেক্টরেও ধস নেমেছে। রিয়েল এস্টেট সেক্টরের সঙ্গে যারা রিলেটেড— সিমেন্ট, টাইলস— সবকিছু মিলিয়ে মার্কেটের ডিমান্ড ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। আবাসন খাত ও সংযোগ শিল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জমির উচ্চব্যয়, অর্থায়ন সংকট ও নীতিগত জটিলতার কারণে এই খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মতে, বর্তমান সংকটে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— বিক্রি কমলেও ফ্ল্যাটের দাম কমেনি। কারণ, নির্মাণসামগ্রী, জমি, শ্রম, অর্থায়ন ও কর-নিবন্ধন ব্যয় এখনো বেশি। ফলে ডেভেলপারদের খরচ কমেনি। বরং ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিক্রি কমেছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, আবাসন খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অত্যন্ত বড়। কারণ বাংলাদেশে নগরায়ণ বাড়ছে, নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হচ্ছে এবং প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য নতুন আবাসনের প্রয়োজন হচ্ছে। সে কারণে, বর্তমান সংকট মূলত চাহিদার অভাব নয়; বরং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও আবাসনের দামের মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। আবাসন ব্যবসায়ীদের দাবি, প্লট-ফ্ল্যাটের যেটুকু বেচাকেনা হচ্ছে সেখানে আবার ক্রেতাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিবন্ধন ব্যয়। এলাকাভেদে নিবন্ধন খরচ ১১ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। এর সঙ্গে টেবিলের নিচ দিয়ে চালান করা খরচ যুক্ত হলে প্রকৃত ব্যয় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তাদের মতে, এ ধরনের উচ্চ নিবন্ধন ব্যয় ক্রেতাদের বৈধভাবে সম্পত্তি নিবন্ধনে নিরুৎসাহিত করছে। এর প্রভাব সরকারের রাজস্বেও পড়ছে বলে মনে করছেন তারা। কারণ, উচ্চ নিবন্ধন ব্যয়ের কারণে অনেক ক্রেতা ফ্ল্যাট নিবন্ধন করছেন না। কেউ আবার পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে সম্পত্তি রাখছেন, কেউ নিবন্ধন না করেই চুক্তির ভিত্তিতে বসবাস করছেন। ফলে উচ্চ করহার থাকা সত্ত্বেও সরকার প্রত্যাশিত রাজস্ব পাচ্ছে না। এছাড়া সরকারের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) ফ্লোর এরিয়া অনুপাত (ফার) ও ভবনের উচ্চতা/আয়তনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে ডেভেলপার ও জমির মালিকদের বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। নতুন ড্যাপের কারণে অনেক এলাকায় ভবনের নির্মাণযোগ্য আয়তন কমে গেছে। ফলে জমির মালিকরা আগের মতো ডেভেলপারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না এবং নতুন প্রকল্পও অনেক ক্ষেত্রে আটকে যাচ্ছে। আবাসনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল আমার দেশকে বলেন, এই খাতের বেচাকেনা এখন প্রায় ৬৫ শতাংশ কমে গেছে। আবাসন খাতের মূল দাবি ছিল— নিবন্ধন ব্যয়, কর ও ভ্যাটের চাপ কমানো, গৃহঋণের সুদহার হ্রাস এবং মধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ আবাসন অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। আমাদের প্রত্যাশা ছিল বাজেট আবাসন খাতকে রাজস্বের উৎস হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করবে। কিন্তু বাজেটে জমির মালিকদের ফ্ল্যাটের ওপরেও ১৫ শতাংশ কর বসানো হয়েছে। আমাদের দেশে রেজিস্ট্রেশন খরচ অস্বাভাবিক বেশি, এত বেশি ট্যাক্স সাউথ এশিয়ার কোনো দেশেই নেই। আলী আফজাল বলেন, সরকার যদি এই খাতেই সব ধরনের করারোপ করে, তাহলে এটি টিকবে না। এটা বন্ধ হলে রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, রাষ্ট্র এই খাত থেকে বছরে সরাসরি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা পায়। বিদেশ থেকে আসে ২০ থেকে ২১ শতাংশ অর্থ। জিডিপিতে সাপোর্ট ইন্ডাস্ট্রিসহ আবাসনের অবদান প্রায় ১৬ শতাংশÑ সরকার সেটা পাবে না। খাতটি বন্ধ হলে এখানে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়ে রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে ২৬৯টি সাপোর্ট ইন্ডাস্ট্রির প্রধান ক্রেতাও আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা। আবাসন বন্ধ হয়ে গেলে এসব সংযোগ শিল্পও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। সরকারের উদ্দেশে পরামর্শ তুলে ধরে আবাসন খাতের এই ব্যবসায়ী বলেন, খাতটির গতি ফেরাতে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের নীতি সহায়তা দিতে হবে। আবাসনকে একটা গুরুত্বপূর্ণ খাত মনে করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সিঙ্গেল ডিজিট ইন্টারেস্টে ঋণ দিতে হবে। অস্বাভাবিক রেজিস্ট্রেশন ব্যয় স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে হবে। নিবন্ধন ব্যয় ১৫ শতাংশের পরিবর্তে পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়বে। এতে রাজস্ব আয় বাড়বে। এভাবে করহার কমিয়ে লেনদেন ও নিবন্ধনের পরিমাণ বাড়ানো গেলে রাষ্ট্রের রাজস্ব এবং আবাসন বাজার— দুই দিকেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।