স্টাফ রিপোর্টার:
গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের মামলা ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ মাথায় নিয়েও একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল-মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল-৪-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. তৈমুর আলমের বিরুদ্ধে
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় গণপূর্তের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার সাথে তার নাম আসার পরও কীভাবে তিনি পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান, তা নিয়ে খোদ প্রশাসনিক মহলেই তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে
সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির রাজত্ব:
অনুসন্ধানে জানা যায়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তৈমুর আলম নিজের ভাই ও শ্যালকসহ একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন তাদের কোম্পানির নাম Rowshan Elevators Ltd
Orchid Plaza
House No: 2, Road No: 28(Old), Dhaka 1209, Bangladesh.
কাগজে-কলমে উচ্চমান, বাস্তবে নিম্নমানের সামগ্রী:অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার ই/এম সার্কেলের অধীনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, হাসপাতাল ও ভিআইপি কোয়ার্টারে বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, লিফট, জেনারেটর এবং সেন্ট্রাল এসি সরবরাহের কাজ বরাদ্দ নেয় তৈমুর আলমের নিজস্ব সিন্ডিকেট। সরকারি স্পেসিফিকেশন (নকশা ও নিয়ম) অনুযায়ী উচ্চমানের বিদেশী ব্র্যান্ডের মালামাল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা ও বাজেট থাকলেও, এই সিন্ডিকেট অত্যন্ত সস্তা, রি-কন্ডিশন্ড এবং নিম্নমানের লোকাল সামগ্রী ব্যবহার করেছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্তের একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী জানান, "তৈমুর আলমের প্রভাবে নিম্নমানের কাজগুলোরও শতভাগ মানসম্মত হয়েছে মর্মে কাজের ছাড়পত্র বা টেস্ট রিপোর্ট দিতে বাধ্য করা হতো।
ফলে কাজ শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বিভিন্ন ভবনের এসি, লিফট ও জেনারেটরে বড় ধরণের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে, যা সরকারি বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।"ভুয়া বিল ও কোটি টাকার অর্থ আত্মসাৎ:প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই বা আংশিক কাজ করে ভুয়া কার্য-সমাপ্তি পত্র (Completion Certificate) তৈরি করার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কোনো কোনো প্রকল্পে মালামাল সরবরাহ না করেই শতভাগ বিল তুলে নিয়ে সরকারি তহবিল তছরুপ করা হয়েছে। এই ধরণের সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগে ইতোমধ্যে ঢাকার একটি আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা (সিআর মামলা নং-১১৮/২০২৫) দায়ের হয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।
বড় বড় সরকারি দরপত্র (টেন্ডার) নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নামমাত্র কাজ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে
ঢাকার ই/এম সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি তহবিল তছরুপ, প্রকল্প বরাদ্দ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে ইতোমধ্যে ঢাকার একটি আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা (সিআর মামলা নং-১১৮/২০২৫) দায়ের হয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন
মামলার আসামি হয়েও যেভাবে পদোন্নতি:দেশের বিদ্যমান সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা কিংবা গুরুতর অপরাধের তদন্ত চলমান থাকলে তার পদোন্নতি স্থগিত রাখার নিয়ম রয়েছে। তবে মো. তৈмур আলমের ক্ষেত্রে এই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই তাকে প্রাইজ পোস্টিং ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, বিগত পতিত সরকারের আমলের প্রভাবশালী মহল এবং শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের লবিংয়ের জোরেই তিনি আইনি জটিলতা এড়িয়ে পদোন্নতি পেতে সক্ষম হন
মনকি ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে পুরস্কৃত করায় ক্ষুব্ধ সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
বক্তব্য:
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী মো. তৈমুর আলমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, আদালতের নির্দেশনা বা মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট আদেশ ছাড়া কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বা পদোন্নতি আটকানোর ক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতা থাকে, তবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
স্টাফ রিপোর্টার: গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের মামলা ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ মাথায় নিয়েও একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল-মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল-৪-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. তৈমুর আলমের বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় গণপূর্তের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার সাথে তার নাম আসার পরও কীভাবে তিনি পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান, তা নিয়ে খোদ প্রশাসনিক মহলেই তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির রাজত্ব: অনুসন্ধানে জানা যায়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তৈমুর আলম নিজের ভাই ও শ্যালকসহ একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন তাদের কোম্পানির নাম Rowshan Elevators Ltd Orchid Plaza House No: 2, Road No: 28(Old), Dhaka 1209, Bangladesh. কাগজে-কলমে উচ্চমান, বাস্তবে নিম্নমানের সামগ্রী:অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার ই/এম সার্কেলের অধীনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, হাসপাতাল ও ভিআইপি কোয়ার্টারে বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, লিফট, জেনারেটর এবং সেন্ট্রাল এসি সরবরাহের কাজ বরাদ্দ নেয় তৈমুর আলমের নিজস্ব সিন্ডিকেট। সরকারি স্পেসিফিকেশন (নকশা ও নিয়ম) অনুযায়ী উচ্চমানের বিদেশী ব্র্যান্ডের মালামাল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা ও বাজেট থাকলেও, এই সিন্ডিকেট অত্যন্ত সস্তা, রি-কন্ডিশন্ড এবং নিম্নমানের লোকাল সামগ্রী ব্যবহার করেছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্তের একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী জানান, "তৈমুর আলমের প্রভাবে নিম্নমানের কাজগুলোরও শতভাগ মানসম্মত হয়েছে মর্মে কাজের ছাড়পত্র বা টেস্ট রিপোর্ট দিতে বাধ্য করা হতো। ফলে কাজ শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বিভিন্ন ভবনের এসি, লিফট ও জেনারেটরে বড় ধরণের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে, যা সরকারি বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।"ভুয়া বিল ও কোটি টাকার অর্থ আত্মসাৎ:প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই বা আংশিক কাজ করে ভুয়া কার্য-সমাপ্তি পত্র (Completion Certificate) তৈরি করার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কোনো কোনো প্রকল্পে মালামাল সরবরাহ না করেই শতভাগ বিল তুলে নিয়ে সরকারি তহবিল তছরুপ করা হয়েছে। এই ধরণের সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগে ইতোমধ্যে ঢাকার একটি আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা (সিআর মামলা নং-১১৮/২০২৫) দায়ের হয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন। বড় বড় সরকারি দরপত্র (টেন্ডার) নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নামমাত্র কাজ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে ঢাকার ই/এম সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি তহবিল তছরুপ, প্রকল্প বরাদ্দ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে ইতোমধ্যে ঢাকার একটি আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা (সিআর মামলা নং-১১৮/২০২৫) দায়ের হয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন মামলার আসামি হয়েও যেভাবে পদোন্নতি:দেশের বিদ্যমান সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা কিংবা গুরুতর অপরাধের তদন্ত চলমান থাকলে তার পদোন্নতি স্থগিত রাখার নিয়ম রয়েছে। তবে মো. তৈмур আলমের ক্ষেত্রে এই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই তাকে প্রাইজ পোস্টিং ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, বিগত পতিত সরকারের আমলের প্রভাবশালী মহল এবং শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের লবিংয়ের জোরেই তিনি আইনি জটিলতা এড়িয়ে পদোন্নতি পেতে সক্ষম হন মনকি ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে পুরস্কৃত করায় ক্ষুব্ধ সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। বক্তব্য: এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী মো. তৈমুর আলমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, আদালতের নির্দেশনা বা মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট আদেশ ছাড়া কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বা পদোন্নতি আটকানোর ক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতা থাকে, তবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একজন সাধারণ নিম্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে চাকরিতে যোগ দিলেও, বর্তমানে তিনি বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক। এলজিইডির এক কর্মকর্তার করা অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য, ভুয়া বিল উত্তোলন এবং বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কাজ না করেই বিল উত্তোলন ও দলীয় প্রভাব বিস্তার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের প্রভাবে বেলাল হোসেন প্রায় ৪০টি উন্নয়ন প্রকল্পের কোনো কাজ না করেই শতভাগ বিল উত্তোলন করে নেন। পরবর্তীতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) পদে থাকাকালে, সেই অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করতে পুনরায় সরকারি বরাদ্দ প্রদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়ের অনেক ব্রিজ ও কালভার্টের কাজ এখনো অসম্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্যে ‘স্বর্ণযুগ’ বেলাল হোসেন দীর্ঘ সময় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) পদে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়, সেই সময়ে তিনি দলীয় সুপারিশে প্রায় ১,১২৫ জন ছাত্রলীগ কর্মীকে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে এলজিইডিতে নিয়োগ দেন। জনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে: সার্ভেয়ার ও কার্য-সহকারীদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব, ভারপ্রাপ্ত ও অতিরিক্ত দায়িত্ব) পদে পদায়ন করেন। সারাদেশে প্রায় ৪১২ জনকে এভাবে অবৈধ পদোন্নতি দিয়ে তিনি প্রায় ৪০ থেকে ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অবৈধ বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়, বেলাল হোসেনের সময়ে এলজিইডির মাঠ পর্যায়ের দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করে। তার দপ্তরে আসা ঘুষ ও অনিয়মের কোনো অভিযোগের বিষয়ে তিনি বিভাগীয় ব্যবস্থা নেননি। ফলে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয় যে, দুদক বাধ্য হয়ে একযোগে ৩টি জেলায় অভিযান পরিচালনা করে। নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের পাহাড় অবৈধ আয়ের মাধ্যমে অর্জিত বেলাল হোসেনের স্থাবর সম্পত্তির একটি তালিকাও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: রাজধানীর মিরপুর-১০ এ: ২৬০০ বর্গফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। মিরপুর-২ এ: ১৫০০ বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাট। পূর্বাচলে: ৫ কাঠার প্লট। রংপুর (ধাপ এলাকা): ৬ কাঠা জমির ওপর দুই ইউনিটের ৫ তলা ভবন। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে: প্রায় ২১০ বিঘা কৃষিজমি। অভিযুক্তের বক্তব্য দুর্নীতির এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন লিখে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনে জালিয়াতি-দুর্নীতির খবর নতুন নয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিষ্ঠানে পবিত্র কোরআনুল কারীম মুদ্রণ ও কেনাকাটাতেও হয়েছে অনিয়ম-জালিয়াতি। কুরআন না ছাপিয়েও হাতিয়ে নেয়া হয়েছে টাকা। শুধু তাই নয়, প্রকৃত দরের চেয়ে কম মূল্যে কুরআন ও পুস্তক কিনে হিসাবের খাতায় বেশি দাম দেখায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হর্তা-কর্তারা। আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, কার্যাদেশ ছাড়াই কেনা হয়েছে সহজ কুরআন শিক্ষাসহ প্রাক-প্রাথমিকের বই। পবিত্র কুরআনের কপি ছাপানো নিয়ে জালিয়াতি; অবিশ্বাস্য এমন কাণ্ড ঘটেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে। মসজিদভিত্তিক প্রকল্পে পবিত্র কুরআনুল কারীম ও ধর্মীয় বই সরবরাহে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেসকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। যা ফাউন্ডেশনের নিজস্ব প্রেসে ছাপানো ও বাঁধাইয়ের বিধান রয়েছে। এ কাজে বেসরকারি প্রেসকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু, হাতে আসা অডিট রিপোর্ট বলছে, ২০১৩-২০১৪ থেকে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে পবিত্র কুরআনের মোট ২৩ লাখ ৩১ হাজার কপি কেনা হয়, বাইরের প্রেস থেকে। ফাউন্ডেশনের প্রেসের জন্য প্রতি কপির মূল্য ধরা হয়েছিল ১৯৫ টাকা। কিন্তু, বাইরে থেকে ওই দরের চেয়ে অনেক কমে কিনে পাঁচ বছরে লোপাট করা হয়, ১২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আর ১ লাখ কুরআন সরবরাহ না করেই লোপাট করা হয় প্রায় ২ কোটি টাকা। কম দামে নিম্নমানের কাগজে পবিত্র কুরআনের কপি সরবরাহ করায় সে সময় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মানযাচাইকারী কর্মকর্তা আব্দুর রশীদ আল মামুন ক্ষোভও প্রকাশ করেছিলেন। আব্দুর রশীদ আল মামুন বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, আল্লাহর দোহাই, নিম্নমানের দিয়েন না, যখনই মান খারাপ পেয়েছি তখনই রিপোর্ট দিয়েছি।’ কুরআনের এই কপিগুলো সরবরাহ করেছে ধলেশ্বরী ও দশদিশা প্রিন্টার্সসহ কয়েকটি ছাপাখানা। নিম্নমানের কপি কেন সরবরাহ করা হয়েছে; তা জানতে দশদিশা ছাপাখানায় যায় স্টার নিউজ। দশদিশা গ্রুপের চেয়ারম্যান আমীন হেলালী বলেন, ‘তাদের (ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেস) চাহিদার কথা তারা আমাকে জানিয়েছেন। যেভাবে দিতে বলা হয়েছে, আমি ঠিক সেভাবেই টেন্ডার করেছি।’ অনিয়মের এখানেই শেষ নয়। নথি বলছে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের জন্য সহজ কুরআন শিক্ষাসহ ৩টি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি ছাপানো হয় বাইরের প্রেস থেকে। অর্ধেক মূল্যে এ সব বই কিনে লোপাট হয়, প্রায় ২১ কোটি টাকা। প্রিয়াঙ্কা প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবিলকেশনের স্বত্বাধিকারী সামছুল হক বলেন, ‘২০১০ থেকে ২০১১ সাল থেকেই বাইরের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করানো হচ্ছে। তাদের কী নীতিমালা, সেটা তো আমরা জানি না। আমাদের কাছে প্রিন্ট করতে দেয়া হয়েছে, আমরা সেটাই করেছি। এটা করার নিয়ম নেই, আমরা কীভাবে বুঝব?’ ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও সহজ কুরআন শিক্ষাসহ নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ও অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। তবে, কমিটির রিপোর্ট আজও আলোর মুখ দেখেনি। এদিকে এসব অনিয়মের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেস শাখার ব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দীন মাহিন। তিনি বলেন, ‘এগুলো কর্তৃপক্ষকে বলেন, আমি তো আগেই বলেছি, আমি এই লাইনে অভিজ্ঞ নই।’ মো. মহিউদ্দীনের নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে এড়িয়ে যান তিনি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অডিট বিভাগের তথ্য বলছে, বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটিতে মুদ্রণ-বাঁধাই, কেনাকাটা, জালিয়াতির নিয়োগসহ নানান খাতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত নয়-ছয় হয়েছে, ২ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। বিষয়টিকে ‘অপ্রত্যাশিত’ ও ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সচিব শেখ মুর্শিদুল ইসলাম বলেন, ‘এটি নিয়ে কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। যে-ই জড়িত থাকুক, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সদ্য বিদায়ী মহাপরিচালক বলেন, ‘চোরও তো কুরআন শরীফ চুরি করে না। তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার পরই কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এখন প্রতিবেদনটি আবারও খতিয়ে দেখে অধিকতর তদন্ত করা হবে। এর আগে তদন্ত কমিটিকে অসহযোগিতা করায় প্রেসের সাবেক ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’ বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ। এমন ঘটনায় তিনি রীতিমতো হতভম্ব। তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় কাজে কোনো অর্থের ঘাটতি থাকলে অনেক সময় মানুষ নিজের পকেটের টাকা খরচ করে তা পূরণ করে দেন, কিংবা অন্যের কাছ থেকে সহযোগিতা নেন। অথচ সেখান থেকেই যদি ঘুষ ও দুর্নীতির মতো জালিয়াতির ঘটনা ঘটে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অডিট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মুদ্রণ-বাঁধাই, কেনাকাটা ও নিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫৩১ কোটি টাকার অনিয়মের বিষয়ে অডিট আপত্তি উঠেছে। যা এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। গেল বছর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বলছে, বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম আর দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ ইসলামিক ফাউন্ডেশন। তবে এসব বন্ধে কোনো সরকারের আমলেই নেয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা।