একসময় রাজধানীর ৮৪ নয়াপল্টনের একটি মেসে থাকতেন হামিদুল্লাহ। সময়ের ব্যবধানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে পল্টনে চারটি, মুগদায় একটি এবং রামপুরার বনশ্রীতে দুটি বাড়ি রয়েছে তাঁর। নয়াপল্টনের চায়না টাওয়ারে তাঁর মালিকানাধীন ১৫টি দোকান ও সাতটি অফিস রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাঁচ কাঠা জমির ওপর ৩৫ পুরানা পল্টন লেনে এবং আট কাঠা জমির ওপর ৪৩/৩ শান্তিনগরে তিনি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেছেন। এসব সম্পদের উৎস নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, জনশক্তি রপ্তানি খাতে ‘ইস্তেমা’, ‘মাসুদ জামিল’, ‘বাংলাদেশ রিক্রুটিং’, ‘রাজমুকুট’ ও ‘সুফি আব্দুল্লাহ’ নামে বিএমইটির (জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) লাইসেন্স নিয়েছেন হামিদুল্লাহ। পাশাপাশি স্ত্রী, নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে আরও ৩২টি লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব লাইসেন্সের মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানি খাতে তিনি একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছেন।
সরকার পরিবর্তন হলেও সিন্ডিকেট বহাল থাকার অভিযোগ
বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পাঠানোর সরকারি দায়িত্ব পালন করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তন হলেও এই দপ্তরের কার্যক্রমে আগের প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা হামিদুল্লাহসহ চারটি রিক্রুটিং এজেন্সির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রবাসী ভবন ও ব্যুরো অফিস পরিচালিত হতো। চিহ্নিত বিতর্কিত এই চারটি এজেন্সির বিরুদ্ধেই মানব পাচার, মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এসব বিষয় সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। যুবলীগের সাবেক নেতা নুরুন্নবী শাওন ও মহিউদ্দিন মহির সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সম্রাট, শাওন, মহিসহ ফেনী-২ আসনের সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ নাসিমসহ কয়েকজন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকে নিয়মিত অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছেন হামিদুল্লাহ। জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় যুবলীগ নেতাদের আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি মতিঝিলের হিরাঝিল হোটেল থেকে খাবার সংগ্রহ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের সময় যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে হামিদুল্লাহর ঘনিষ্ঠতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
বিএমইটিতে প্রভাব বহাল থাকার অভিযোগ
বর্তমান পরিস্থিতিতেও বিএমইটিতে হামিদুল্লাহর একচ্ছত্র প্রভাব বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, সম্প্রতি তিনি দিনের বেলায় বিএমইটি কার্যালয়ে না গিয়ে তাঁর কর্মচারী সোলেমানের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন রাত ৯টার পর তিনি বিএমইটি ভবনে আসেন বলেও ওই সূত্রের দাবি।
এদিকে, তাঁর নিকটজনদের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এক শীর্ষ নেতা তাঁকে রাজনৈতিকভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। পল্টন থানা যুবদলের এক নেতা এবং ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের এক নেতার বিরুদ্ধেও তাঁকে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রের দাবি, ৫ আগস্টের পর প্রায় তিন মাস আত্মগোপনে থাকার পর হামিদুল্লাহ ওই মহানগর বিএনপি নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। চলতি মাসের ৩ তারিখেও তাঁর সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দুদকে ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রায় ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্ত চলছে বলে দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। তবে তদন্তের বর্তমান অবস্থা এবং অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ
মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি নিয়েও হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। আসন্ন জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রমে তাঁর প্রতিষ্ঠান মাসুদ জামিল এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এসি রোহনীর আস্থাভাজন ছিলেন বলেও হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এডিসি মেহেদী হাসান, ডিবির মতিঝিল বিভাগের তৎকালীন ডিসি আসাদুজ্জামান এবং সর্বশেষ ডিবি ডিসি রাজিব আল মাসুদের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে তিনি নিজের, স্ত্রীর ও অন্যদের নামে নেওয়া লাইসেন্সের মাধ্যমে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বর্তমানে হামিদুল্লাহ কোথায় রাতযাপন করেন, তা তাঁর ঘনিষ্ঠ অনেকের কাছেও অজানা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাসভবনে অবস্থান করছেন।
বিএমইটির ঠিকাদারের অভিযোগ
বিএমইটির এক ঠিকাদার জানান, এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী ছিল যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও সেখানে প্রবেশ করতে পারতেন না। তাঁর দাবি, হামিদুল্লাহ ছাড়াও ইফতি ওভারসিজের রুবেল, প্রবীর বণিক, হামিদসহ আরও কয়েকজন এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের কাছে পুরো বিএমইটি এখনো জিম্মি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিএমইটির এক কর্মকর্তা জানান, এই সিন্ডিকেট সার্ভার জালিয়াতি এবং ভুয়া চালান, পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর দাবি, জনশক্তি রপ্তানিতে তারা একটি নির্দিষ্ট রেট বেঁধে দিয়ে অন্য কাউকে টেন্ডার ড্রপ করতে দিত না।
ওই কর্মকর্তা জানান, হুমায়ুন কবির জনশক্তি রপ্তানি মহাপরিচালক (ডিজি) থাকা অবস্থায় সিন্ডিকেট করে দুই মাস কাতারে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছিল। একজন শ্রমিককে বিদেশে পাঠাতে বিএমইটির খরচ যেখানে ছিল ৫ হাজার টাকা, সেখানে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু রেখেই প্রতি কর্মীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা করে আদায় করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া, কঙ্গো, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, ইরাক, কুয়েত, জাপান ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানো হতো এবং জনপ্রতি প্রায় ২০ হাজার টাকা নেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পরে রেট বাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, কর্মসংস্থান ও বহির্গমন সেক্টরে সিন্ডিকেটের প্রত্যেক সদস্যের ৮ থেকে ১০ জন করে কর্মচারী বিএমইটিতে অবস্থান করতেন, যদিও সেখানে তাঁদের নিজস্ব কোনো অফিস ছিল না।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চতুর হামিদুল্লাহ বলেন, “আমি সেই হামিদুল্লাহ নই। রং নাম্বারে কল দিয়েছেন।”
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৫ আন্তর্জাতিক হকি বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ ফুটবল প্রেমীদের মতো হকি প্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের কঠিন পর্ব অতিক্রম করে দুই দলই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য এই ফাইনাল ম্যাচে উভয় দল নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত। আর্জেন্টিনা দল এই টুর্নামেন্টে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। অধিনায়ক লুকাস মার্টিনেজ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছি। দলের সবাই একসঙ্গে কাজ করে ফাইনালে পৌঁছেছি। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট — বিশ্বকাপ জিততে হবে। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ বজায় রেখেছি এবং আগামী ম্যাচেও তা বজায় রাখব।” আর্জেন্টিনা দলের ফিজিক্যাল ট্রেনার জানান, দল খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য বিশেষ অনুশীলন চালাচ্ছে যাতে ফাইনালে তারা চাপ সামলাতে পারে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের কোচ মাইকেল ডি ইয়ং ফাইনালের আগের প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দল গত কয়েক মাস ধরে কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছে। খেলোয়াড়রা মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা চাই এই বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস গড়ে একটি শক্তিশালী ছাপ রেখে যেতে।” কোচ আরো বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র ফাইনালে উঠা নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়। আমরা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিজেদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।” বিশ্বের হকি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ফাইনাল ম্যাচটি গত দশকের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা হতে চলেছে। উভয় দলের কৌশল, বল নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুতগতির খেলায় যে মেধা প্রদর্শিত হয়েছে, তা ফুটবলের মতো অন্য কোনো খেলার ক্ষেত্রে বিরল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফাইনালে দলের মানসিক স্থিতিশীলতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা বিজয় নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে। মাঠে উভয় দলের খেলোয়াড়রা দ্রুতগতির পাস, শক্তিশালী ডিফেন্স এবং আক্রমণাত্মক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মাঠ মাতানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকারের গতিবেগ এবং নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডারদের কৌশলগত দক্ষতা ম্যাচে প্রধান আকর্ষণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও গোলরক্ষকদের প্রতিটি সেভ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াও ম্যাচের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশ্বজুড়ে লাখো হকি ভক্ত এই ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার দেখার জন্য অপেক্ষায় আছেন। অনলাইনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ম্যাচের লাইভ স্ট্রিমিং অনুষ্ঠিত হবে এবং অনেক দেশের টেলিভিশনও সরাসরি সম্প্রচার করবে। হকি প্রেমীরা এই ম্যাচ থেকে দারুণ উত্তেজনা, দক্ষতা এবং খেলা উপভোগ করার আশা করছে। মাঠের বাইরেও ভক্তদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ফ্যান জোন আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে খেলোয়াড় ও দর্শকরা একত্রে সময় কাটিয়ে খেলার আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। এছাড়াও টুর্নামেন্ট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে এবং খেলা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে দুই দলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে আগামী দিনে বিশ্ব হকির নতুন ধারার রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এই ম্যাচের ফলাফল আগামী দশক ধরে হকির কৌশলগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের হকি টুর্নামেন্ট হওয়ায় এর প্রতি ভক্তদের আগ্রহ ও উন্মাদনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সবাই আশা করছেন, আগামীকালের ফাইনাল হবে একটি স্মরণীয় খেলা, যেখানে স্পোর্টসম্যানশিপ, দক্ষতা ও উত্তেজনা থাকবে সর্বোচ্চ মাত্রায়।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিচালক মোঃ রেজাউল বারীর বিরুদ্ধে ৬০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ এবং ২৪ মাসে সার্ভিস চার্জসহ ১৬৮ কোটি টাকা পরিশোধের কথিত চুক্তি ও পদায়নে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের আবেদন জানিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত অভিযোগ ও নথিপত্র অনুযায়ী, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজউকের পরিচালক রেজাউল বারীকে ঘিরে একটি আর্থিক চুক্তির তথ্য উঠে আসে। নথিতে দেখা যায়, তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ৬০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। উক্ত চুক্তিতে ২৪ মাসের মধ্যে ৪০% সার্ভিস চার্জসহ মোট টাকার দ্বিগুণ অর্থাৎ সর্বমোট ১৬৮ কোটি টাকা কাজের মাধ্যমে পরিশোধের সম্মতি প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে সোনালী ব্যাংকের কয়েকটি ব্ল্যাঙ্ক চেক প্রদানের অভিযোগও তোলা হয়েছে। এছাড়া অভিযোগপত্রে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—উক্ত আর্থিক চুক্তির সাথে তার রাজউকের পরিচালক পদে পদায়নের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না। দুদকে জমা দেওয়া আবেদনে যেসব বিষয়ে অনুসন্ধানের অনুরোধ জানানো হয়েছে: কথিত ঋণচুক্তি ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা যাচাই। ঋণের অর্থের উৎস, লেনদেনের প্রকৃতি এবং সার্ভিস চার্জের যৌক্তিকতা পরীক্ষা। চুক্তির বিপরীতে ব্যাংকের ব্ল্যাঙ্ক চেক দেওয়ার অভিযোগ যাচাই। রাজউকে পদায়ন প্রক্রিয়ার সাথে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র আছে কি না তা অনুসন্ধান। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ। জনস্বার্থে আবেদনের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য দুদক চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
আট বছরের প্রবাস জীবনের ক্লান্তি ভুলে আপন ঘরে স্বজনদের সঙ্গে একটু স্বস্তিতে দিন কাটানোর আশায় দেশে ফিরেছিলেন নজরুল ইসলাম রাব্বি। কিন্তু দেশে ফিরে নিজের আশ্রয়ের শেষ ঠিকানা পরিবারেই ঠাঁই হয়নি তার। বাবার বাধার মুখে গত এক সপ্তাহ ধরে ঘরের বাইরে রাত কাটাচ্ছেন এই প্রবাসী যুবক। এ নিয়ে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে ফেনী মডেল থানার ওসির কক্ষে মীমাংসা বৈঠক হয়। সেখানেও উপস্থিত বাবা-ছেলে মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। পরে পুলিশ তাদের পারিবারিক এসব বিষয় আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার জন্য অনুরোধ জানান। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নের দক্ষিণ খানে বাড়ি এলাকার জামাল উদ্দিনের ছেলে নজরুল ইসলাম রাব্বি গত ২৮ সেপ্টেম্বর ৮ বছর পর সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন। বাড়ি গিয়ে দেখেন বাবার ঘরে তালা ঝুলছে এবং পাশের ঘরটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে, যাতে তিনি কোনোভাবেই প্রবেশ করতে না পারেন। রাব্বির অভিযোগ, তার বাবা জামাল উদ্দিন তাকে ঘরে ঢুকতে দিচ্ছেন না এবং এখন তাকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এমনকি তার বোনকেও নিজের সন্তান বলে মানছেন না বাবা। রাব্বি বলেন, প্রবাসে থেকে পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করেছি। বাবা ও আমি মিলেমিশে জায়গা কিনে এই ঘর তৈরি করেছি। এখন ২৯ বছর বয়সে এসে শুনতে হচ্ছে আমি নাকি তার ছেলেই না! উনি আমার মাকে ২০২৩ সালের দিকে ডিভোর্স দিয়েছেন, তা তিনি দিতেই পারেন। কিন্তু সন্তান হিসেবে আমাদের ওপর কেন এই অবিচার? আমার অনুরোধ থাকবে, প্রশাসন যেন বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে আমার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেয়। তবে ছেলের সব অভিযোগ অস্বীকার করে বাবা জামাল উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ও আমার ছেলে না। আড়াই বছর আগে তার মায়ের সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। আমি নিজেও এক সময় প্রবাসী ছিলাম। কুমিল্লার ভিটেমাটি বিক্রি করে নতুন করে ১৬ শতক জায়গা কিনে নিজস্ব উপার্জনে ১০ বছর আগে এই দোতলা ঘর করেছি, কারও এক টাকাও নেইনি। বর্তমানে আমি ডায়বেটিসহ নানা রোগে ভুগছি। কেউ আমার কোনো খবর রাখেনি। ছেলেকে বেপরোয়া উল্লেখ করে জামাল উদ্দিন আরও অভিযোগ করে বলেন, প্রথমে ওকে কুয়েত পাঠিয়েছিলাম। সেখানে কাজ না করে অনলাইনে বন্ধুদের আড্ডায় পড়ে জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে। পরে হোটেল ব্যবসা দিয়েও লস খায়। দেশে এনে আবার আত্মীয়স্বজনদের সহযোগিতায় সৌদি পাঠানো হয়। সে আমাকে বিভিন্ন সময় মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে এবং আমাকে ‘মানসিক রোগী’ বলে অপপ্রচার চালিয়েছে। এর আগে সে আমাকে আট মাস ঘরে ঢুকতে দেয়নি। উল্টো আমার ভাড়াটিয়াদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেছে। বাধ্য হয়ে আমি তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক অভিযোগ দায়ের করেছি। এই অভিযোগ অস্বীকার করে ছেলে রাব্বি বলেন, মাকে এত বছরের সংসারের পর তালাক দিয়েছে। তখন সাময়িক রাগারাগি থেকে কিছু বলেছিলাম। তাই বলে আমাকে তো তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। অন্যদিকে, জামাল উদ্দিনের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে তদন্তে যাওয়া ফেনী মডেল থানার (এসআই) আবু হাসনাত মিশু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে খারাপ আচরণের বিষয়ে জামাল উদ্দিনের অভিযোগ পেয়ে সোমবার আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ছেলেসহ সবার সঙ্গে কথা বলেছি। যতটুকু বুঝতে পারছি এটি একটি পারিবারিক কলহ। যার কারণে বাবা ছেলের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে ছেলেটি ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শর্শদি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তারেক ইকবাল মনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, এটি আসলে দীর্ঘ দিনের পারিবারিক কলহ। স্থানীয়রা বহুবার চেষ্টা করেও সমাধান করতে পারেনি। এর কারণে এলাকার বদনাম হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত এ বিবাদের মিমাংসা হোক। ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এটি আসলে একটি পারিবারিক কলহের ঘটনা। এ বিষয়ে মীমাংসার জন্য আমরা মঙ্গলবার সকালে বাবা ছেলে দুইজনকেই থানায় ডেকেছিলাম। তারা এলাকার লোকসহ থানায় এসেছিলেন। আমরা উভয় পক্ষের বিস্তারিত আলোচনা শুনে সমঝোতার প্রস্তাব দিলে কোনো পক্ষই আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। পরে এই বিষয়ে তাদের আদালতে যাওয়ার পরামর্শ প্রদান করে আমরা বৈঠক শেষ করেছি।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজের অফিস সহকারী ইব্রাহীম হোসেন বাবুলের হাজিরা খাতায় টানা ২৬ মাস কোনো স্বাক্ষর নেই। তিনি সীতাকুণ্ড পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি। কলেজসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর থেকে তিনি কর্মস্থলে অনিয়মিত। অথচ একই সময়ে তার নামে নিয়মিত বেতন-ভাতা ব্যাংক হিসাবে জমা ও উত্তোলন হয়েছে। দীর্ঘ অনুপস্থিতির পরও কীভাবে তার বেতন বিল প্রস্তুত, যাচাই ও অনুমোদন হয়েছে—খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন বলেন, গত ২১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক ও আর্থিক নথি পর্যালোচনা করতে গিয়ে এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি আমার নজরে আসে। ঘটনাটি সামনে আসার পরই তাৎক্ষণিকভাবে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কলেজ সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে কেবল হাজিরা খাতা নয়, সংশ্লিষ্ট সময়ের ছুটির আবেদন ও অনুমোদনপত্র, চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র, মাসভিত্তিক বেতন বিল ও ক্যাশবুকসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক নথি নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মস্থলে উপস্থিতির রেকর্ড না থাকা সত্ত্বেও কোন নথির ভিত্তিতে তার নামে বেতন বিল প্রস্তুত করা হয়েছে, কারা এই বিল তৈরি ও যাচাই করেছেন এবং কার প্রত্যয়ন ও অনুমোদনের পর অর্থ ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়েছে— এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুসা জানান, কারণ দর্শানোর জবাবে অফিস সহকারী বাবুল তার শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার জন্য তার ছুটি যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত ছিল কিনা এবং অসুস্থতার দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত বৈধ নথি রয়েছে কিনা, তা তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখছে। কলেজ পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য মো. জহিরুল ইসলাম নাছির বলেন, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও কীভাবে দীর্ঘ সময় ব্যাংক থেকে বেতন উত্তোলন করা হলো, বিষয়টি তিনি সম্প্রতি কলেজ পরিচালনা কমিটির একটি সভায় উত্থাপন করেছিলেন। তবে সভায় বিষয়টি তোলার পরও তিনি এ সংক্রান্ত কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাননি। নাছির আরো দাবি করেন, ইব্রাহীম হোসেন বাবুল বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। তৎকালীন স্থানীয় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁর এই নিয়োগ হয়েছিল এদিকে অভিযুক্ত কেরানি ইব্রাহীম হোসেন বাবুলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।