বাংলাদেশে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে একটি মানচিত্র ও পতাকা পেয়েছিল কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতার দেখা পাননি এদেশের মানুষ। সেজন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে। শুধু অপেক্ষা নয়, বরং স্বাধীনতা যুদ্ধের পরও বারবার মানুষকে রাজপথে নামতে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে প্রকৃত মুক্তির লক্ষ্যে। প্রকৃত মুক্তি আর স্বাধীনতার জন্য শোষিত-বঞ্চিত মানুষ বারবার রাজপথে জীবন দিলেও প্রতিবারই কিছু শাসক ক্ষমতার জন্য দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে দ্বিধা করেনি। শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে তার মেয়ে শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশে ভারতের যে আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তা ছিল একটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের মুক্তির চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশকে ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্ত করে বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত স্বাধীন দেশ ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। আজ তার ছেলে তারেক রহমানের হাতে বাংলাদেশের শাসনভার। জিয়াউর রহমান দেশ শাসনের দায়িত্বভার গ্রহণের আগে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী দুঃশাসন ও ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য। রক্তাক্ত এক অধ্যায়ের মাধ্যমে সেই আওয়ামী দুঃশাসন ও ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্ত হয় দেশ। একইভাবে তারেক রহমানও ক্ষমতা লাভের আগে দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশে চেপে বসেছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মাফিয়া শাসনব্যবস্থা এবং ভারতের সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মাফিয়া শাসনব্যবস্থা ও ভারতীয় আধিপত্যের জাল ছিন্ন করতে আবার রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। আজ তারেক রহমানের সামনে আবার এক ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে পিতার পথ ধরে বাংলাদেশকে নতুন করে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে প্রতিষ্ঠা করার। প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে মালয়েশিয়া এবং চীনকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মূলত সেই পথে যাত্রার প্রথম কাজটি করলেন। এরপর ঢাকা-বেইজিং যৌথ ইশতেহার ও সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির নতুন ভিত্তি স্থাপন করল।
বর্তমান আধিপত্যকেন্দ্রিক বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশের প্রতি পরাশক্তিগুলোর আগ্রহের প্রেক্ষাপটে প্রথম সফর হিসেবে এক যাত্রায় মালয়েশিয়া ও চীন গমন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি এবং অবস্থানের বিষয়ে একটি কূটনৈতিক বার্তা। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির নতুন আরেক অধ্যায় রচিত হয়েছে। ঢাকা-বেইজিং যে যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে, তা চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে ভবিষ্যৎ পথচলায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। যৌথ ইশতেহারসহ দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা ও চুক্তির আলোকে সঠিকভাবে সামনে অগ্রসর হতে পারলে তা দুই দেশের সম্পর্ক যেমন নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, তেমনি বাংলাদেশ আবির্ভূত হবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার ও কেন্দ্র হিসেবে। যৌথ ইশতেহারে ঢাকা-বেইজিং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, তিস্তা পরিকল্পনায় চীনের অংশগ্রহণ, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর এবং এক চীননীতির প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সমর্থনের মাধ্যমে ঢাকা স্বাধীন ও সাহসী পররাষ্ট্রনীতির নতুন যুগের সূচনা করল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পাশে থাকার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, তা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের বিরোধিতার ক্ষেত্রে ভারতের সব মুখোশ খুলে পড়ে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটিয়ে শেখ হাসিনাকে আবার ফিরিয়ে আনার জন্য ভারত প্রকাশ্যে মরিয়া হয়ে মাঠে নামে। তবে তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হলেও এখনো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে থেমে নেই ভারতের গভীর ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, চাপে রাখা ও অস্থিরতা তৈরির জন্য একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নয়াদিল্লি। পুশইন তার সর্বশেষ উদাহরণ। বাংলাদেশের বুকে দাঁড়িয়ে ভারতের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশকে গ্রাস করে অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার ঔদ্ধত্য পর্যন্ত প্রকাশ করেছেন। ভারতের লেলিয়ে দেওয়া লোকজন প্রকাশ্যে করে চলছে দেশদ্রোহীমূলক কর্মকাণ্ড।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর ভারতের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। নয়াদিল্লি তা মেনে নিতে পারেনি। ড. ইউনূস সরকারের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে চীন, পাকিস্তান, তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ঘটনা একের পর এক বজ্রপাতের মতো আঘাত করে নয়াদিল্লির বুকে। শুধু তাই নয়, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক উন্নয়নের পদক্ষেপে সুদূর ওয়াশিংটন পর্যন্ত নড়েচড়ে বসে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক উন্নয়নের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খোলে ঢাকার ওয়াশিংটন দূতাবাস। এ বিষয়ে তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হয় ঢাকার ওপর। তবে এ ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান নিয়ে ঢাকার পাশে দাঁড়ায় বেইজিং। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময়ও বেইজিং স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বাংলাদেশে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ তারা প্রত্যাখ্যান করবে। চীন বাংলাদেশের পাশ থেকে সরে যাবে না।
নতুন নির্বাচিত সরকার ড. ইউনূসের রেখে যাওয়া স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারা কতটা বজায় রাখতে পারবে, তা নিয়ে নানা কারণে সংশয় দেখা দেয় । বিশেষ করে, চীন থেকে শক্তিশালী যুদ্ধবিমান ক্রয় ও বাণিজ্য বৃদ্ধি, চীনের মাধ্যমে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিষয়ে ইউনূস সরকার যে উদ্যোগ নেয়, তা বাস্তবে পরিণত করার বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি প্রকাশ্য চাপ সৃষ্টি করা হয় বিভিন্ন মহল থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লেখা এক চিঠিতে বাংলাদেশকে তার দেশ থেকে সমরাস্ত্রসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি বৃদ্ধির জন্য সরাসরি চাপ সৃষ্টি করেন। অন্যদিকে ভারত তার চিকেনস নেক করিডোরের মতো কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল স্থানের কাছে চীনের উপস্থিতিকে তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং তিস্তা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণের বিরোধিতা অব্যাহত রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ঢাকা-বেইজিং যেসব সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং যৌথ ইশতেহারে দ্ব্যর্থহীনভাবে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তা নয়াদিল্লির মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে, মোংলায় ভারতের জন্য বরাদ্দ করা অঞ্চলকে বাতিল করে সেখানে চীনকে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন গঠনসহ চট্টগ্রামেও চীনকে একই সুবিধা দেওয়ার ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন মহলে তোলপাড় চলছে।
অনুগত রেখে শোষণ করা ও শুধু নিজ স্বার্থ আদায় করা ছাড়া ভারত কোনো দিন বাংলাদেশের মঙ্গল চায়নি, ভবিষ্যতে চাইবে তারও কোনো লক্ষণ নেই। দেড় দশক ধরে ওয়াশিংটনের সমর্থনে নয়াদিল্লি বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মাফিয়া শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব হয়েছিল শেখ হাসিনার দুঃশাসন ও ভারতীয় আধিপত্যের অবসানের লক্ষ্যে। কোনো অবস্থাতেই এদেশের মানুষ আর ভারতীয় কোনো আধিপত্য মেনে নেবে না। তাই কারো কোনো রক্তচক্ষুর তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশকে তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিজ স্বার্থ রক্ষা করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারা বজায় রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশ ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে চীন বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সামরিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক তার ভিত্তি রচিত হয় ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের চীন সফরের মাধ্যমে। চীন বর্তমানে এমন একটি দেশ, যাদের বর্তমান বিশ্বের সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করে। চীনের উত্থান মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সব চেষ্টা একের পর এক ব্যর্থ করে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। সর্বশেষ চীনকে ঘায়েল করতে ওয়াশিংটনের শুল্কযুদ্ধের বিরুদ্ধে বেইজিং যেভাবে পাল্টা আঘাত করেছে, তাতে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে হোয়াইট হাউস। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সব শাখায় চীন আজ যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়; বরং সমরাস্ত্র প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রে চীন আজ ছাড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রকে। বিশেষ করে, হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তি। রাশিয়ার পর চীন অভেদ্য হাইপারসনিক মিসাইলের অধিকারী। অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, বিশ্ববাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে চীনের রাতারাতি উত্থান আজ পুরো বিশ্বের অন্যতম আলোচিত একটি বিষয়।
ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের সামনে যে সম্ভাবনা ও বিপদ, এর পরিপ্রেক্ষিতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা, বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে দিশাহীন জাতিকে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে দেশবাসীকে পথের দিশা দিয়েছিলেন। সেই জিয়াউর রহমানই আবার ১৯৭৫ সালের পর সামনে এগিয়ে এসেছিলেন ভারতের আধিপত্য থেকে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব উদ্ধারে।
ড. ইউনূসের দেড় বছর ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি মানে জাতীয়তাবাদী বিএনপির শাসনামল। দীর্ঘ আওয়ামী দুঃশাসন শেষে আবার সেই জাতীয়তাবাদী শক্তির হাতে বাংলাদেশের শাসনভার। আবার তাই বিএনপির সামনে সুযোগ এসেছে বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড় করানোর এবং অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর। ঐতিহাসিক এ দায়িত্ব পালন থেকে পিছু হটার সুযোগ নেই । চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাইওয়ান বিষয়ে বাংলাদেশ এক চীননীতির প্রতি যে দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেছে, তাকে সাহসী না বলে উপায় নেই।
চীনের পক্ষ থেকে করিডোরবিষয়ক যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা গেলে পূর্বদিগন্তে বাংলাদেশের জন্য নতুন সূর্যোদয় হবে। খুলে যাবে সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির নতুন এক দুয়ার। ভারতের ওপর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক-নির্ভরতা কমাতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০১ সালে চারদলীয় সরকারের সময় ‘লুক ইস্ট’ পলিসি গ্রহণ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বৃদ্ধি। এই লক্ষ্যে মিয়ানমারে যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ বিষয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ২০০৩ সালে চুক্তি হয় এবং কার্যক্রমও শুরু হয়। শুরু হয় বাংলাদেশ-মিয়ানমার ফ্রেন্ডশিপ রুট চালুর কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, ভারত তার নিজ স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ায় তখন মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বাংলাদেশের লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসার । ফলে ওখানেই থেমে যায় সম্ভাবনাময় সেই উদ্যোগ। এখন চীনের মাধ্যমে যেহেতু নতুন এই করিডোর প্রস্তাব এসেছে, তাই এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের ওপর অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তির চাপ প্রয়োগ বা মিয়ানমারের এ থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। বস্তুত চীন আজ যে করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছে, তা আরো বৃহত্তর পরিসরে বাংলাদেশই শুরু করছিল ২০০১ সালে। চীনের প্রস্তাবিত এ করিডোরের সঙ্গে বাংলাদেশের লুক ইস্টনীতির আওতায় দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা উচিত।
চীনের আমদানি-রপ্তানির ৯০ ভাগ হয়ে থাকে সমুদ্রপথে। আর তাদের সমুদ্রবাণিজ্যের ৮০ ভাগ হয়ে থাকে অতিশয় সরু মালাক্কা প্রণালির মাধ্যমে। মালাক্কা প্রণালির প্রবেশমুখে ভারতের আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য যুদ্ধে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বন্ধ করে দিতে পারে এ প্রণালি। চীন তাই পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরের মাধ্যমে আরব সাগরে প্রবেশের ব্যবস্থা করেছে। মালাক্কা ডিলেমা সংকট কাটাতে চীন-মিয়ানমার, মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ার ওপর দিয়ে বিভিন্ন বিকল্প পাইপলাইন ও পথ তৈরি করছে। বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত হতে পারলে চীন সরাসরি বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে প্রবেশ করতে পারবে। তাই প্রস্তাবিত এ করিডোরে রয়েছে চীনের অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক, কৌশলগতসহ অনেক বিষয়। প্রস্তবিত করিডোরে ঢাকা অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে চীনের বহুমুখী স্বার্থের বিপরীতে বাংলাদেশকেও সমান স্বার্থ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম। ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল হওয়া ও হত্যাচেষ্টা মামলায় তিনি অন্যতম প্রধান আসামি ছিলেন। এই ঘটনায় তার গাড়িচালক বাদী হয়ে মামলা করার পর পুলিশ মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল আঠারো বারের মত পিছিয়ে আগামী ২০ আগস্ট ধার্য করেছেন আদালত। বুধবার (১৫ জুলাই) তদন্ত সংস্থা ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো (পূর্ব) এর সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর কাদির ভূঁঞা প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় ঢাকার ঢাকার এডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এ দিন ধার্য করেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুকনুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেন। হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে গত ৬ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ। কিন্তু অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় ইনকিলাব মঞ্চ। গত ১২ জানুয়ারি মামলাটি শুনানির জন্য ছিল। আবদুল্লাহ আল জাবের সেদিন অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য দুই দিন সময় চান। আদালত তা মঞ্জুর করে ১৫ জানুয়ারি অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ধার্য করেন। ওইদিন ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে নারাজি দাখিল করেছেন মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। পরে আদালত মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় ডিবি পুলিশকে। তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)। তাদের মধ্যে ফয়সাল করিমসহ শেষের পাঁচজন পলাতক রয়েছেন। অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ বলেছেন, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদির দেয়া রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে বোঝা গেছে, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই’ হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘বাধাগ্রস্ত করতে’ এবং ভোটারদের মধ্যে ‘ভয়ভীতি তৈরি করতেই’ আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হাদির নির্বাচনি প্রচারে অনুপ্রবেশ করে বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়।
কক্সবাজারের বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে শুরু থেকেই সরকার রয়েছে এবং কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা হবে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। মঙ্গলবার সকালে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নে বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে বন্যা পরিস্থিতি, ত্রাণ কার্যক্রম ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের চাহিদা বিবেচনায় প্রতিটি উপজেলায় অতিরিক্ত ত্রাণ ও নগদ সহায়তা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবন দ্রুত ফিরিয়ে আনা। এজন্য ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত, সড়ক, সেতু-কালভার্ট, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করে পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এ সময় পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের ঝুঁকির বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ পাহাড় কাটা ও দখলের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে বলেও জানান তিনি।