ক্ষমতা ও দম্ভের যুগে বসে যিনি একসময় পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে হাতের পুতুল ভাবতেন, সেই প্রতাপশালী সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের পতন আজ ইতিহাসের নির্মম পরিহাস। ২০২৬ সালের ১২ জুন দুবাইয়ে ইন্টারপোলের রেড নোটিসে গ্রেপ্তার হন তিনি। সাধারণ মানুষ আজ তার দুর্নীতির পাহাড় দেখে চমকে উঠলেও, পর্দার আড়ালে কীভাবে এক সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ‘সুরক্ষাকবচ’ ভেঙে এই দানব তৈরি করা হয়েছিল, তা এখনো এক অপ্রকাশিত অধ্যায়। অথচ এই বিপর্যয়ের পূর্বাভাস অনেক আগেই সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো চিঠিতে নথিবদ্ধ ছিল। সেই নীতিগত প্রস্তাবনা মানলে আজ এই কলঙ্কজনক অধ্যায় এড়ানো যেত। নিয়মের সেই ব্যত্যয় কীভাবে একটি এলিট ফোর্সকে পথভ্রষ্ট করে ক্ষমতার মোহে অন্ধ এক ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ তৈরি করল, তা জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে এর জন্মলগ্নে।
২০০৩-০৪ সালের দিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন চরম অবক্ষয়ের তলানিতে, তখন রাজনৈতিক চাপ ও নৈতিক স্খলনের কারণে তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় প্রথাবদ্ধ পুলিশ বাহিনী। এই সংকটকালে, শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘কালা ফারুক’ হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর একটি বিশেষায়িত ফোর্স গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন। এর প্রথম প্রয়াস ‘র্যাট’ (RAT) পুলিশের কর্মকর্তাদের শারীরিক অযোগ্যতার কারণে ব্যর্থ প্রজেক্টে পরিণত হয়। এই ব্যর্থতার পটভূমিতেই সেনাবাহিনীর কঠোর শৃঙ্খলা ও রণকৌশলকে কাজে লাগিয়ে জন্ম নেয় এলিট ফোর্স ‘র্যাব’, যার নেপথ্য আইন ও নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এনএসআই ও ডিজিএফআই।
তবে শুরু থেকেই র্যাবে সামরিক বাহিনীর এই আধিপত্যকে পুলিশ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আত্মসম্মানে আঘাত হিসেবে দেখে, যার ফলে শীর্ষ স্তর থেকে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক অসহযোগিতা শুরু হয়। এনএসআইয়ের সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তখন সরকার একটি কৌশলগত পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করে। সেই সমীকরণ অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে মহাপরিচালকের পদটি সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত থাকলেও, পুলিশের ক্ষোভ প্রশমনে তা অতিরিক্ত আইজিপি আনোয়ার ইকবালকে দেওয়া হয়। তবে বাহিনীর মূল অপারেশনাল মেরুদণ্ড ও কঠোর সামরিক চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ADG-Operations) পদটি সম্পূর্ণভাবে সেনাবাহিনীর (তৎকালীন কর্নেল মিল্লাত) হাতেই ন্যস্ত রাখা হয়।
‘২ বছরের প্রেষণ নীতি’ : ফাইলে নিশ্চিত করা সেই অমোঘ সুরক্ষাকবচ
র্যাব সফলভাবে কার্যক্রম শুরু করার পর বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সততা ও পেশাদারিত্ব আজীবন অক্ষুণ্ণ রাখতে এনএসআই একটি বিশেষ নীতিগত প্রস্তাবনা তৈরি করে, যা সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছিল। সেই ফাইলে একটি অমোঘ সুরক্ষাকবচ যুক্ত ছিল, তা হলো, র্যাবে প্রেষণে আসা কোনো কর্মকর্তা বা জোয়ানের কাজের মেয়াদ কোনোভাবেই যেন ‘২ বছর’-এর বেশি না হয়।
সাধারণত সব বাহিনীতে পোস্টিংয়ের মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর হলেও, র্যাবের ক্ষেত্রে তা কঠোরভাবে ‘২ বছর’ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর একমাত্র কারণ ছিল, কোনো সংবেদনশীল পদে দীর্ঘদিন থাকলে কর্মকর্তারা যেন স্থানীয় অপরাধী চক্র, রাজনীতি বা দুর্নীতির সিন্ডিকেটে জড়াতে না পারেন। দুই বছর পর মূল বাহিনীতে ফিরে গেলে কোনো স্থায়ী কায়েমি স্বার্থ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে না।
জিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রেষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক পঙ্গুত্ব
চেইন অব কমান্ড ভেঙে জিয়াকে র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের ডিরেক্টর, এডিজি অপারেশনস ও ভারপ্রাপ্ত ডিজির দাপুটে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর এনএসআই এবং পরে এনটিএমসির মহাপরিচালক হিসেবে ২০২৪ সালের পতন পর্যন্ত তিনি চেয়ার আঁকড়ে রাখেন। সামরিক বাহিনীর বাইরে একটানা ১৫ বছর প্রেষণে কাটানোর এ ঘটনা সামরিক ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন রেকর্ড।
সামরিক মানদণ্ডে জিয়া যে অত্যন্ত সাধারণ মানের অফিসার ছিলেন, তা ট্রাইব্যুনালে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সাক্ষ্যেই প্রমাণিত। তিনি জানান, জিয়া স্টাফ কলেজ সম্পন্ন করার যোগ্যতাই অর্জন করেননি, যা লে. কর্নেল পদের জন্য আবশ্যক; এমনকি তিনি কোনো ব্যাটালিয়নও কমান্ড করেননি, যা কর্নেল পদের পূর্বশর্ত। সাবেক সেনাপ্রধানের মতে, পদোন্নতি বোর্ডের অনেক সদস্য তখন নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বার্থের কথা চিন্তা করে জিয়ার এই মারাত্মক প্রাতিষ্ঠানিক অযোগ্যতা ও নিয়মের ব্যত্যয়কে চোখ বুজে সায় দিয়েছিলেন। নিজের মূল বাহিনীর কোনো প্রথাগত ফর্মেশন কমান্ড না করেই জিয়ার এই উল্কাগতির উত্থান সশস্ত্র বাহিনীর চৌকস ও পেশাদার অফিসারদের মধ্যে চরম হতাশা এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, যা স্পষ্ট প্রমাণ করে কীভাবে রাজনৈতিক অপশক্তি দ্বারা সামরিক বাহিনীর নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন এবং পেশাদার মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে পঙ্গু ও কুক্ষিগত করা হয়েছিল।
বেনজীরের আগমন ও সেনাবাহিনীর অপারেশনাল ডমিনেশন ছিনতাই
জিয়া যখন র্যাবের ভেতর তার শিকড় শক্ত করছিলেন, ঠিক সেই সময়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেন বেনজীর আহমেদ। চতুর বেনজীর র্যাবে এসেই এই রাজনৈতিক সমীকরণের পূর্ণ সুযোগ নেন এবং পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পদ আঁকড়ে ধরে রাজত্ব করেন।
র্যাবের জন্মলগ্ন থেকে ক্ষমতার যে একটি অলিখিত ভারসাম্য (Balance of Power) ছিল, যেখানে সেনাবাহিনী থেকে আসা এডিজি এবং তার টিমের অপারেশনাল ও ফিল্ড ডমিনেশন অক্ষুণ্ণ থাকার কথা ছিল, বেনজীর এসে সেই নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিজের মুঠোয় ছিনতাই করে নেন। তিনি এডিজির চেইন অব কমান্ডকে কার্যত অকেজো ও ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করেন।
সেনাবাহিনী থেকে আসা চৌকস অফিসারদের সুকৌশলে সাইডলাইন করে, তিনি জিয়ার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান ও শক্তিশালী রাজনৈতিক কানেকশনকে নিজের স্বার্থে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। বেনজীর এবং জিয়ার এই যৌথ ছত্রছায়ায় র্যাবে এক ভয়ংকর ও কলঙ্কিত চেইন অব কমান্ড তৈরি হয়, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে পরবর্তী বছরগুলোয় শত শত মানুষের গুম ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে।
ক্ষমতার মোহে অন্ধত্ব : রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়েও ‘পরিচিত’ হওয়ার দম্ভ
ক্ষমতার মোহে বেনজীর আহমেদ এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক মহলে একটি কথা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল, রাষ্ট্রের যেকোনো বড় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের চেয়ে মাঠপর্যায়ে তার কথাই ছিল বেশি প্রভাবশালী। রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র, গণমাধ্যম ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে তিনি এই কৃত্রিম দম্ভোক্তিপূর্ণ পরিচিতি তৈরি করেছিলেন।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রোটোকল ব্যবস্থা তখন এতটাই নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল, উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একজন পুলিশপ্রধানের উপস্থিতিতে কিছু কিছু মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিরাও সসম্ভ্রমে দাঁড়িয়ে যেতেন, যা প্রথাগত প্রশাসনিক রীতিনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। একজন প্রজাতন্ত্রের সাধারণ কর্মচারীর সামনে জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রীদের এই নতজানু অবস্থা প্রমাণ করে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে গিয়ে বেনজীরকে আইনের ঊর্ধ্বে এমন এক দানবীয় জায়গায় বসিয়েছিলেন, যেখানে তিনি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখানোর সাহস পেয়েছিলেন।
সামরিক ঐতিহ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি : আইজিপি বনাম সেনাপ্রধানের বিতর্কিত যৌথ বিবৃতি
বেনজীরের এই ক্ষমতার দম্ভ শুধু বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা সরাসরি আঘাত করেছিল দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও শৃঙ্খলার ওপর। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধান ১২ নম্বর আর্টিকেলে উচ্চতর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ভোগ করেন, যেখানে পুলিশের আইজিপি অবস্থান করেন ১৬ নম্বরে। পাশের দেশ ভারতেও সামরিক প্রধানরা প্রতিমন্ত্রীর সমতুল্য মর্যাদা পান, যা বেসামরিক প্রশাসনের চেয়ে জাতীয় প্রতিরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অতি-ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে বেনজীর নিজেকে সব নিয়মের ঊর্ধ্বে নিয়ে যান, যা সশস্ত্র বাহিনীর চিরাচরিত মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ছিল।
এর চূড়ান্ত ও বিতর্কিত রূপ দেখা যায় ২০২০ সালে টেকনাফে পুলিশের ওসি প্রদীপের হাতে সাবেক মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর। এই নির্মম ঘটনায় সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়। সেই পটভূমিতে, প্রোটোকল অনুযায়ী যেখানে আইজিপির সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ একজন মেজর জেনারেলের যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে বেনজীর নিজের অবস্থানকে সেনাপ্রধানের সমকক্ষ জাহির করার সুযোগ নেন। সংবাদ সম্মেলনে স্বয়ং সেনাপ্রধানকে পাশে বসিয়ে বেনজীর এমন জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন। একটি সাধারণ অভ্যন্তরীণ বিভাগের প্রধান হয়েও বেনজীরের এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ সমকক্ষতা জাহির করার চেষ্টা এবং সেনাপ্রধানকে সেই প্রোটোকল সংকটে ফেলা সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদার অফিসারদের গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট করেছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্যুতির খতিয়ান : ভাঙা সুরক্ষাকবচ ও প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা
ইন্টেলিজেন্স ফিল্ডের বাস্তব অভিজ্ঞতা শেষে আমি যখন আবার নৌবাহিনীতে ফিরে আসি, তখনই নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, কোনো চরম ব্যতিক্রমী বা বিশেষ কৌশলগত প্রয়োজন ছাড়া কোনো কর্মকর্তাকে যেন দুই বছরের বেশি র্যাবে প্রেষণে রাখা না হয়। জুনিয়র অফিসাররা র্যাবের অ্যাডভেঞ্চারাস পজিশন সাময়িকভাবে উপভোগ করলেও, দীর্ঘ মেয়াদে তা তাদের মূল পেশাদারিত্ব ও ক্যারিয়ার গঠনে মারাত্মক ক্ষতি করে। সামরিক বাহিনীর মতো একটি উচ্চ-সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের নৈতিক মানদণ্ড এবং পেশাদার শৃঙ্খলা ধরে রাখতে এই দুই বছরের সময়সীমা কঠোরভাবে বজায় রাখা অপরিহার্য ছিল।
এনএসআইয়ের পক্ষ থেকে এই দূরদর্শী প্রেষণনীতিটি আমার হাত ধরেই আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন ও ইনিশিয়েট করা হয়েছিল। সেদিন ফাইলের সেই ‘২ বছরের সুরক্ষাকবচকে’ বিন্দুমাত্র সম্মান জানানো হলে আজ ইতিহাস এতটা কলঙ্কিত হতো না এবং কোনো কর্মকর্তা দানব হওয়ার সুযোগ পেত না। এই একটিমাত্র পলিসি লেটার অনুসরণ করলে রাষ্ট্র এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পেত। আগ্রহী পাঠকরা এই নীতির সুগভীর গুরুত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনীয়তার বিবরণ আমার ‘জাতীয় দিশা’ গ্রন্থের ‘র্যাব কি পথ হারিয়েছে’ এবং ‘পুলিশ শুধু ঘুস খায় না, দেয়ও’ প্রভৃতি প্রবন্ধগুলো থেকে বিস্তারিত জানতে পারবেন। নীতিনির্ধারকদের এখন উচিত আন্তর্জাতিক উদাহরণ অনুসরণ করে একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করা, যা নিয়মিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কাজ করবে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য শিক্ষার ক্রান্তিকাল এবং তিন স্তম্ভের প্রতি নির্দেশনা
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় কর্মের দাগ থেকে যায় আজীবন। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ভাঙার চড়া মূল্য রাষ্ট্রকে কীভাবে দিতে হয়, বেনজীর ও জিয়ার পতন আজ তার জীবন্ত প্রমাণ। এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য শুধু সমালোচনা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ভালো উদাহরণগুলো অনুসরণ করে আমাদের নীতিনির্ধারক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।
এই অধ্যায় থেকে আমাদের রাজনীতিবিদ, সামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক আমলাতন্ত্র, তিনটি স্তম্ভেরই গভীর নীতিগত শিক্ষা নেওয়া জরুরি। প্রথমত, রাজনীতিবিদদের বুঝতে হবে যে সাময়িক ফায়দা বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য পেশাদার কর্মকর্তাদের আইনের ঊর্ধ্বে তোলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাকবচ (Policy Letters) ভাঙার পরিণতি কত বিধ্বংসী হতে পারে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে যাদের ক্ষমতার শীর্ষে বসানো হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তারাই পুরো ব্যবস্থাটিকে গ্রাস করেছিল। ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস যে, খোদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল শুধু সেই প্রাজ্ঞ নীতিগত চিঠি এবং প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ডকে অগ্রাহ্য করার কারণে। অন্য কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও, নিয়মের এমন আত্মঘাতী লঙ্ঘন চিন্তাই করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, সামরিক বাহিনীর জন্য নির্দেশনা হলো, জুনিয়র অফিসারদের সাময়িক রোমাঞ্চের চেয়ে বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি নৈতিকতা, ঐতিহ্য এবং কোর পেশাদারিত্ব রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রেষণনীতির সুরক্ষাকবচ কঠোরভাবে ধরে না রাখলে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং তৃতীয়ত, সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের আগামী প্রজন্মের কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে, আইনের শাসন, পেশাদারিত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে মেরুদণ্ড সোজা রেখে সততার পথে চলাই একমাত্র মূলমন্ত্র। পদপদবি বা ক্ষমতার দম্ভ সময়ের স্রোতে একসময় বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু নিয়মের আত্মঘাতী লঙ্ঘনের যে বিচার ইতিহাস করে তা এড়ানো অসম্ভব। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় আজ আমাদের গভীরভাবে শিক্ষা নিতেই হবে এই ‘বেনজীরের নজির’ থেকে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
পর্ষদে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আদালতের রায় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা বারবার অমান্য করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ও ঋণসংক্রান্ত অনিয়মের পুনরাবৃত্তি; সব মিলিয়ে দেশের সবচেয়ে পুরোনো বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান পূবালী ব্যাংকের সুশাসন গভীর প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনুসন্ধানে ব্যাংকটিতে গুরুতর অনিয়ম বের হলেও তদন্ত স্থগিত হয়ে যাওয়া এবং যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এটা প্রমাণ হয় যে, পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও দুর্বল তদারকি পূবালী ব্যাংককে ঠেলে দিয়েছে কাঠামোগত সংকটের দিকে। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে ধারাবাহিক অনিয়ম। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বারবার এসব সমস্যা চিহ্নিত করলেও শেষ পর্যন্ত সমাধান করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টের (এফআইাসিএসডি) আংশিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, পূবালী ব্যাংকের কয়েকটি শাখা ডলার বিনিময়ের ক্ষেত্রে ঘোষিত বাজারদরের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করেছে। এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে না গিয়ে অন্য এক গ্রাহকের হিসাবে জমা হয়েছে ; যা ব্যাংকিং আইন ও বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে টাইমস অব বাংলাদেশ এই অনুসন্ধান প্রতিবেদনটি পেয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৈরি করা অসম্পূর্ণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বরিশাল বাজার রোড শাখার গ্রাহক মোহাম্মদী ইলেকট্রিক ওয়্যার অ্যান্ড মাল্টি প্রোডাক্টস লিমিটেড ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ডলারের একটি আমদানি এলসি খোলে। এলসির দায় নিষ্পত্তির সময় ব্যাংকটি বাজারদরের তুলনায় প্রতি ডলারে প্রায় ৬ দশমিক ৫ টাকা বেশি নেয়। ওই অতিরিক্ত অর্থ সবমিলিয়ে হয় প্রায় ১৪ দশমিক ৫ লাখ টাকা। যা একই দিনে মতিঝিল করপোরেট শাখার গ্রাহক রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেডের হিসাবে জমা করা হয়। রিফাত গার্মেন্টস হা-মীম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান দ্যাটস ইট ফ্যাশনস লিমিটেড পূবালী ব্যাংকের বড় শেয়ারহোল্ডার। দ্যাটস ইট ফ্যাশনসের প্রতিনিধি আবদুর রাজ্জাক মন্ডল ব্যাংকটির পর্ষদের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তদন্তকারীরা দেখেছেন, এই অতিরিক্তি দরে ডলার লেনদেন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই বছরে সিলেট শাখায় মেসার্স হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্সের খোলা চারটি আমদানি এলসিতেও একই নমুনা পাওয়া গেছে, যেখানে ঘোষিত ডলারদরের বাইরে অতিরিক্ত ৮ দশমিক ৮০ লাখ টাকা আদায় করে রিফাত গার্মেন্টসের চলতি হিসাবে জমা করেছে পূবালী ব্যাংক। এফআইসিএসডি’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একাধিক শাখা ও গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রতি ডলারে ৬ দশমিক ৫ টাকা থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই উদ্বৃত্ত অর্থ রিফাত গার্মেন্টসের হিসাবে জমা হয়েছে। এই অর্থপ্রবাহের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান দলকে জানিয়েছে, এলসি খোলা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রিফাত গার্মেন্টসের ব্যবসায়িক লেনদেন রয়েছে। তবে বৈধ লেনদেন প্রমাণে ভ্যাট চালান বা অন্য নথি চাইলে ব্যাংক তা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ঘোষিত দরের বাইরে অর্থ আদায় করে তা তৃতীয় পক্ষের হিসাবে স্থানান্তর করা অত্যন্ত উচ্চঝুঁকির মানি লন্ডারিং। কারণ এসব অর্থের কোনো বৈধ উৎস বা করসংক্রান্ত নথি শনাক্ত করা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশন ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা আলাদাভাবে একে বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তদন্তকারীরা জানান, প্রায় ৫০টি এলসিতে একই ধরনের অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। তবু মাত্র পাঁচটি এলসি বিশ্লেষণের পরই এফআইসিএসডি’র অনুসন্ধান থামিয়ে দেওয়া হয়। আংশিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা প্রতিবেদনটি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দপ্তরে পড়ে রয়েছে। এতে চিহ্নিত আইন-লঙ্ঘনের অপরাধে কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে এ ধরনের অনিয়ম পূবালী ব্যাংকের জন্য নতুন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এর আগের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত একটি শাখা সরকারি নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে ডলার কিনে প্রায় ২১১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। একই সময়ে সরকারি প্রণোদনা তহবিল থেকে ৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা অপচয়ের তথ্যও উঠে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকরা সতর্ক করেছিলেন, একটি শাখায় এ ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে অন্যান্য অনুমোদিত ডিলার (এডি) শাখা পরিদর্শনে আরও বড় পরিসরের সমস্যা ধরা পড়তে পারে। তবে ওই অনুসন্ধানও আর এগোয়নি। এদিকে পূবালী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে খাত সংশ্লিষ্টদের মাঝে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিএফআইইউ’র নথি অনুযায়ী, রিফাত গার্মেন্টস, ক্রিয়েটিভ ফ্যাশন, করিম গ্রুপ, বন্দর স্টিল, হক গ্রুপ, রানু এগ্রো, তামিম এগ্রোসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ওই ঋণের অর্থ অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে, যা তহবিল স্থানান্তর ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পূবালী ব্যাংকের গুরুতর ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। এই ঋণসংক্রান্ত অনিয়মের ধারাবাহিকতার পরিপ্রেক্ষিতেই দুদক ও বিএফআইইউ আলাদা তদন্ত শুরু করেছে। বড় শেয়ারহোল্ডারদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বাধীন একটি গোষ্ঠীর ক্ষমতা ও ব্যাংকের সম্পদ অপব্যবহারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে সংস্থা দুটি। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান টাইমসকে বলেন, কমিশন বর্তমানে পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে তিনটি আলাদা অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। অভিযোগগুলো বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনিয়ম, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিধি লঙ্ঘন এবং ১৩টি প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণের অনিয়মের সঙ্গে সম্পর্কিত। তদন্তের অগ্রগতি জানাতে তিনি বলেন, ডলারের অতিরিক্ত দর নিয়ে একটি নির্দিষ্ট গ্রাহকের হিসাবে অর্থ জমা হওয়ার বিষয়টি অনুসন্ধানে এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে, আর বাকি অভিযোগগুলোর তদন্ত চলমান। তিনি আরও জানান, পূবালী ব্যাংক বিদ্যমান আইনের লঙ্ঘন করেছে কি না, এর সঙ্গে কে কে জড়িত, তা যাচাই করা হচ্ছে। ‘তদন্তের অংশ হিসেবে আমরা ৭০টি নিয়োগসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করেছি, পাশাপাশি ঋণসংক্রান্ত নথিও নেওয়া হয়েছে। সংগৃহীত প্রমাণ বিশ্লেষণের কাজ চলছে।’ এই তদন্তগুলোর পাশাপাশি পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলীর পুনর্নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি হতে ন্যূনতম ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, যেখানে আলীর অভিজ্ঞতা ১৬ বছরের। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলছে, এ বিধানটি পূর্বপ্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমসকে বলেন, নতুন নীতিমালা চালুর আগে যাদের নিয়োগ হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ২০ বছরের শর্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে না। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে যারা এমডি পদে আছেন কিন্তু ২০ বছর পূর্ণ হয়নি, তাদের পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়টি এক্সেপশনাল কেস হিসেবে বিবেচনা করা হবে।’ ব্যাংকের সংকট ও অভিযোগগুলোর বিষয়ে মন্তব্য জানতে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে ফোন ও মেসেজে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও এই প্রতিবেদন দাখিলের সময় পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বোর্ডে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পূবালী ব্যাংকের পর্ষদের ভেতরের দ্বন্দ্বটি আদালতের রায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ এবং ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সকেন্দ্রিক একটি ক্ষমতার বলয়ে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার প্রতিফলন। ২০০৮ সাল থেকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও এর সহযোগী প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিদের হাতেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে। এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ব্যাংকটির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করেছে এবং তদারকি দুর্বল করেছে। পূবালী ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগ এমপি হাফিজ আহমেদ মজুমদার, যিনি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সময়ের সঙ্গে চেয়ারম্যান বদলালেও নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র বদলায়নি। ২০২০ সালে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রতিনিধি মনজুরুর রহমান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন এবং এরপর থেকে ওই পদে বহাল রয়েছেন। রহমান চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে মজুমদার ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বড় শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে আসছে এবং তাদেরকে পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব থেকে পদ্ধতিগতভাবে বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। ২০১৩–১৪ সালে ব্যাংকটিতে এক আইনি সংকট তৈরি হয়েছিল, যখন পূবালী ব্যাংকের নির্বাচন কমিশন ন্যূনতম শেয়ারধারণের শর্ত পূরণ না করায় মজুমদারসহ আট পরিচালককে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট ওই পদগুলো শূন্য ঘোষণা করেন এবং আপিলে সেই রায় বহাল থাকে, যদিও পর্ষদের কাঠামো বলতে গেলে অপরিবর্তিতই থাকে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) ও পরিচালক পুনর্নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক বাড়ে। দুদকের নথি অনুযায়ী, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় এবং বহু প্রবাসী শেয়ারহোল্ডার অনুপস্থিত থাকার সময় এজিএম সভা আয়োজন করে প্রক্সি ভোটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করে ওই মহল। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৫ সালে ১০ জন পরিচালক অপসারণের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য চেয়ারম্যান বদলালেও ২০২০ সালে নিয়ন্ত্রণ আবার ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রতিনিধির হাতেই ফিরে যায়। তবে ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্তও ওই একই সিন্ডিকেটের হাতে পর্ষদ কুক্ষিগত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন সংস্থায়। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, একক ক্ষমতাকেন্দ্রের দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্য করপোরেট প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি দুর্বল করে। আর পুনরাবৃত্ত অনিয়ম ও মাঝপথে থেমে যাওয়া তদারকির প্রেক্ষাপটে খাত সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ সময়ের সঙ্গে আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
রাঙ্গামাটি জেলা প্রতিনিধি:মোঃ কামরুল ইসলাম, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পাহাড় ধ্বস এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রাঙ্গামাটি সদর জোন। আজ ১১ জুলাই সকালে রাঙ্গামাটি সদর ও কাউখালী উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া ৮০টি পরিবারের মাঝে প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। শনিবার সকালে রাঙ্গামাটি সদর জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ একরামুল রাহাত, পিএসসি রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্র ও সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ আশ্রয় কেন্দ্র এবং কাউখালী উপজেলার আর টি এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ঘাগড়া আশ্রয় কেন্দ্র) পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে অবস্থানরত ভুক্তভোগী মানুষের সাথে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন।পরিদর্শন শেষে জোন কমান্ডার উক্ত আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর ৮০টি পরিবারের সর্বমোট ২০৪ জন সদস্যের হাতে প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী তুলে দেন।ত্রাণ বিতরণকালে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প ও ঘাগড়া আর্মি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডারগণ, সাপছড়ি ও ঘাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।রাঙ্গামাটি সদর জোন সূত্রে জানানো হয়েছে, চলমান দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে উদ্ধার, নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর এবং ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের পাশে সেনা সদস্যরা সর্বদা নিয়োজিত রয়েছেন।
চট্টগ্রামে টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে রেললাইনে পানি উঠে যাওয়ায় কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনটির যাত্রা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে চট্টগ্রামের ষোলশহর স্টেশন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুর দেড়টার দিকে ট্রেনটি ষোলশহর স্টেশন এলাকা অতিক্রম করছিল। এ সময় ভারী বৃষ্টির ফলে রেললাইনের ওপর পানি জমে যায়। ইঞ্জিনে পানি প্রবেশ করে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে চালক ট্রেনটি থামিয়ে দেন। এরপর থেকেই ট্রেনটি ওই এলাকায় আটকা পড়ে আছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে রেলওয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই ট্রেনটি বর্তমানে থামিয়ে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। রেলওয়ে কন্ট্রোল রুম থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ট্রেন চলাচল আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আরেকটি ইঞ্জিন এনে ট্রেনটিকে আবার পেছনে টেনে চট্টগ্রামে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। হঠাৎ ট্রেন থামিয়ে দেওয়ার ফলে কক্সবাজারগামী যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিয়ে অনেকে আতঙ্কে রয়েছেন। তবে রেলওয়ে জানিয়েছে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।