চলমান পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মিলেছে বিস্ময়কর অনিয়ম-দুর্নীতির একাধিক উদাহরণ। যার ফলে আর্থিক ক্ষতি, তহবিল তসরুপ ও অপচয় হয়েছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। এসব প্রকল্প ঘিরে রয়েছে ১০৮টি অডিট আপত্তি, যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র সাতটির। সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আইএমইডির প্রতিবেদনগুলো কার্যকর করার বিষয়ে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে অডিট আপত্তিসহ যেকোনো অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। এসব বিষয়ে আমরা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’
আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন প্রকল্পে রয়েছে ৩৬টি অডিট আপত্তি। এগুলোর মধ্যে মাত্র ৩টির নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া দেশের ৩০ পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পে রয়েছে ২৯টি আপত্তি, যেগুলোর একটিরও নিষ্পত্তি হয়নি। ঢাকা-সিলেট চার লেন প্রকল্পে রয়েছে ১৯টি অডিট আপত্তি। এগুলোর মধ্যে ৪টির নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকিগুলোর ব্রডশিটে জবাব দেওয়া হলেও এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রিপাওয়ারিং প্রকল্পে ১৪ আপত্তির একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পে রয়েছে ১০টি অডিট আপত্তি, যেগুলোর কোনোটিই নিষ্পন্ন হয়নি।
ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন প্রকল্প
আইএমইডি সূত্র জানায়, ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন প্রকল্পটি দেশের সব উপজেলায় বাস্তবায়ন হচ্ছে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৮৮৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৫০৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ৩ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা চীনের ঋণ থেকে পাওয়ার কথা। পরে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে খরচ বাড়িয়ে মোট ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৯২৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
এই প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। পরে তা এক বছর বাড়ানো হয়। এখন দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে চীনের ঋণ বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় কমিয়ে ২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা ধরা হচ্ছে। সেই সঙ্গে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত করা হচ্ছে। চীনের প্রতিশ্রুত ঋণ পাওয়া না গেলেও সরকারি অংশের অর্থ ব্যয়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ১৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। এটি বাস্তবায়ন করছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।
প্রকল্পটিতে বহিরাগত নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ (এক্সটারনাল অডিট) আপত্তিগুলো হলোÑ সরকারি ক্রয় আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত অর্থ খরচ, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সরবরাহ ছাড়াই অপটিক্যাল ফাইবার কেবলের জন্য ৯২ কোটি টাকা পরিশোধ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে অতিরিক্ত হারে অফিস ভাড়া দেওয়া। এছাড়া রয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত অফিস সংস্কার খরচ, প্রশিক্ষণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, পণ্য সরবরাহ ছাড়াই পরিশোধ এবং অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত টাকায় চুক্তি করে খরচ। আরও আছেÑ ভিন্ন প্যাকেজে একই ধরনের ওয়াইফাই রাউটার বিভিন্ন দামে কেনা, ১০ লাখ ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনে ইচ্ছেমতো প্রাক্কলন করে আর্থিক ক্ষতি এবং অতিরিক্ত প্যাচ কর্ড (ছোট দূরত্বের তার) দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার অনিয়মিত চুক্তি।
পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন
দেশের বিভিন্ন পৌরসভার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিলের ৭৯ কোটি ৫০ লাখ এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে খরচ করা হচ্ছে ১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা। পরে দ্বিতীয় সংশোধনীতে এসে ১৫৪ কোটি টাকা কমিয়ে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এখনও প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৮৩ এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯৫ শতাংশ।
প্রকল্পটিতে অডিট আপত্তি রয়েছে ২৯টি। এ প্রকল্পে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বহিঃস্থ নিরীক্ষায় (এক্সটারনাল অডিট) উঠে আসা অনিয়মের মধ্যে রয়েছে সরকারি আইন ভঙ্গ, কাজের পরিধি কমিয়ে উচ্চ দরে পুনরায় দরপত্র আহ্বান, যোগাসাজশ করে পরামর্শককে কার্যাদেশ দেওয়া এবং আবাসিক প্রকৌশলীর পারিশ্রমিক থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ আপত্তি। আরও আছে, নন-রেসপনসিভ দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া, ঠিকাদারকে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, নকশার বাইরে টাকা খরচ করা। আইএমইডি বলছে, নন-রেসপনসিভ ঠিকাদারকে ১৮ কোটি ৮৩ লাখ ৫১ হাজার ১৪১ টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনুমোদিত বিওকিউ ড্রয়িং, ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশনের বাইরে বিভিন্ন আইটেম বাবদ ঠিকাদারকে অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৭ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। একইভাবে ভুল হিসাবের কারণে ঠিকাদারকে ৩ লাখ ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। নকশার বাইরে ট্রান্সমিশন পাইপলাইনের জন্য ব্যয় করা হয়েছে অতিরিক্ত ৫৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। প্রতিস্থাপনের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির অনুমোদন ছাড়াই কি-এক্সপার্টকে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে ৮২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অন্যদিকে সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘন করে ঠিকাদারের বিল থেকে জামানত বাবদ কাটা হয়নি ১১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এছাড়া পূর্বপরিমাপ ছাড়াই ভূমি ভরাটের জন্য ঠিকাদারকে দেড় কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অনুমোদিত নকশা ছাড়া এবং নন-টেন্ডার আইটেম হওয়ার পরও মাটি ভরাটের জন্য ঠিকাদারকে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অগ্রিম প্রদানের ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা টাকা অগ্রিম সমন্বয় বা আদায় না করায় এবং সয়েল টেস্ট রিপোর্টের সুপারিশ ছাড়াই ‘স্যান্ড কম্প্যাকশন পাইল’ দেখিয়ে সরকারের ২৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা ক্ষতি করা হয়েছে। এছাড়া ডিটেনশন এবং পোর্ট চার্জ (গুদাম ভাড়া) বাবদ ৪৭ লাখ ৫১ হাজার টাকার অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয়, ডিপিএইচই সার্কেল অফিস স্থাপন না করেই সরকারের ৫৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকার ক্ষতি এবং অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে আইটি সরঞ্জাম কেনার ফলে সরকারের ১৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতির ঘটনা বাংলাদেশের যেন স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখনকার সরকার অবশ্য এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অডিট আপত্তি বলে অবহেলার সুযোগ নেই। কেননা এমনি এমনি তো অডিটররা আপত্তি দেননি। এখানে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে বলেই আপত্তি এসেছে। এসব বিষয়ে আরও ভালোভাবে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
ঢাকা-সিলেট করিডোর উন্নয়ন
সরকারের সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর উন্নয়ন (চার লেন) প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় করা হচ্ছে ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত এপ্রিল পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ইতোমধ্যে মূল মেয়াদের ৮৯ শতাংশ শেষ হলেও প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া প্রধান নির্মাণকাজের মধ্যে মূল সড়কের বাস্তবায়ন হয়েছে সাড়ে ১১ শতাংশ, সার্ভিস লেনের ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সেতুর কাজ ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং কালভার্টের হয়েছে ৫৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আইএমইডি বলছে, এই অগ্রগতি কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। প্রকল্পটিতে রয়েছে ১৯টি অডিট আপত্তি। এগুলো মধ্যে ৪টির নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রধান আপত্তিগুলো হলোÑ আর্থিক অনিয়ম, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ঠিকাদারকে মূল সমন্বয়ের নামে টাকা দেওয়া। এতে ক্ষতি হয়েছে ২৫ লাখ ৮৮ হাজার ৮৯৬ টাকা। প্রকৌশলীদের আবাসন নির্মাণে কোনো কাজ না করলেও ঠিকাদারকে বিল দেওয়ায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার। মোট অনিয়ম হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ১৭ হাজার টাকার। এছাড়া ঠিকাদারের বিল থেকে রিটেনশন মানি কাটা হলেও ভ্যাট ও আয়কর বাবদ প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা আদায় করা হয়নি। সঞ্চিত ব্যয় সুদ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। ভ্যারিয়েশন অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত কাজের জন্য ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত ভেঙে বীমা কাভারেজ করা হয়নি। আরও আছে প্রাপ্য নয়Ñ এমন চার্জ অ্যালাউন্স গ্রহণ এবং প্রকৃত ব্যয়ের পরিবর্তে চুক্তি ভেঙে আন্তর্জাতিক বিমানভাড়ার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আইএমইডি বলেছে, উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আপত্তি দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তি হয়নি। একাধিক আপত্তি পুনর্জবাব পর্যায়ে থাকায় সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অধিক কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ, সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যÑ অধিকাংশ অডিট আপত্তিরই ব্রডশিটে জবাব দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুত এসব নিষ্পত্তি হবে।
ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্প
ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৯৫৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এটি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়। মেয়াদ ২০২৬ সালের অক্টোবর। কিন্তু গত মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯৭ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৭৭ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ প্রকল্পে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের দেওয়া অডিট আপত্তি রয়েছে ১৪টি। কিন্তু একটিরও নিষ্পত্তি হয়নি। উল্লেখযোগ্য আপত্তিগুলো হলোÑ অপ্রয়োজনীয় ঋণের ফি বাবদ ক্ষতি হয়েছে ১৬ কোটি ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এছাড়া অনুমোদন ছাড়াই অনিয়মিতভাবে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করে ও চুক্তির ভ্যারিয়েশন বাড়িয়ে আর্থিক ক্ষতি, ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া, ভ্যাট থেকে অর্থ না কাটায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি।
মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ
উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৮৫৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন মেয়াদে এটি বাস্তবায়ন করছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। প্রকল্পটির অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এছাড়া এতে রয়েছে ১০টি অডিট আপত্তি। এগুলোর একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। প্রধান আপত্তিগুলো হলোÑ ঠিকাদারের দাখিল করা দরের চেয়ে বেশি দরে ভ্যারিয়েশন করা আইটেমে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে ঠিকাদারের দাখিল করা উদ্ধৃত দরের চেয়ে বেশি দরে বিল পরিশোধ, রোডের পরিমাণ বেশি দেখিয়ে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত বিল দেওয়া এবং ঠিকাদারকে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আইএমইডির সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিবেদনগুলোতে তুলে ধরেছি। প্রতিবেদনগুলো ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এখন সবগুলো প্রতিবেদন গ্রন্থিত করে বই আকারে প্রস্তুত করা হচ্ছে।’
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
চলমান পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মিলেছে বিস্ময়কর অনিয়ম-দুর্নীতির একাধিক উদাহরণ। যার ফলে আর্থিক ক্ষতি, তহবিল তসরুপ ও অপচয় হয়েছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। এসব প্রকল্প ঘিরে রয়েছে ১০৮টি অডিট আপত্তি, যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র সাতটির। সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আইএমইডির প্রতিবেদনগুলো কার্যকর করার বিষয়ে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে অডিট আপত্তিসহ যেকোনো অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। এসব বিষয়ে আমরা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’ আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন প্রকল্পে রয়েছে ৩৬টি অডিট আপত্তি। এগুলোর মধ্যে মাত্র ৩টির নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া দেশের ৩০ পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পে রয়েছে ২৯টি আপত্তি, যেগুলোর একটিরও নিষ্পত্তি হয়নি। ঢাকা-সিলেট চার লেন প্রকল্পে রয়েছে ১৯টি অডিট আপত্তি। এগুলোর মধ্যে ৪টির নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকিগুলোর ব্রডশিটে জবাব দেওয়া হলেও এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রিপাওয়ারিং প্রকল্পে ১৪ আপত্তির একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পে রয়েছে ১০টি অডিট আপত্তি, যেগুলোর কোনোটিই নিষ্পন্ন হয়নি। ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন প্রকল্প আইএমইডি সূত্র জানায়, ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন প্রকল্পটি দেশের সব উপজেলায় বাস্তবায়ন হচ্ছে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৮৮৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৫০৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ৩ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা চীনের ঋণ থেকে পাওয়ার কথা। পরে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে খরচ বাড়িয়ে মোট ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৯২৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এই প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। পরে তা এক বছর বাড়ানো হয়। এখন দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে চীনের ঋণ বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় কমিয়ে ২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা ধরা হচ্ছে। সেই সঙ্গে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত করা হচ্ছে। চীনের প্রতিশ্রুত ঋণ পাওয়া না গেলেও সরকারি অংশের অর্থ ব্যয়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ১৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। এটি বাস্তবায়ন করছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। প্রকল্পটিতে বহিরাগত নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ (এক্সটারনাল অডিট) আপত্তিগুলো হলোÑ সরকারি ক্রয় আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত অর্থ খরচ, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সরবরাহ ছাড়াই অপটিক্যাল ফাইবার কেবলের জন্য ৯২ কোটি টাকা পরিশোধ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে অতিরিক্ত হারে অফিস ভাড়া দেওয়া। এছাড়া রয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত অফিস সংস্কার খরচ, প্রশিক্ষণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, পণ্য সরবরাহ ছাড়াই পরিশোধ এবং অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত টাকায় চুক্তি করে খরচ। আরও আছেÑ ভিন্ন প্যাকেজে একই ধরনের ওয়াইফাই রাউটার বিভিন্ন দামে কেনা, ১০ লাখ ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনে ইচ্ছেমতো প্রাক্কলন করে আর্থিক ক্ষতি এবং অতিরিক্ত প্যাচ কর্ড (ছোট দূরত্বের তার) দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার অনিয়মিত চুক্তি। পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন দেশের বিভিন্ন পৌরসভার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিলের ৭৯ কোটি ৫০ লাখ এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে খরচ করা হচ্ছে ১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা। পরে দ্বিতীয় সংশোধনীতে এসে ১৫৪ কোটি টাকা কমিয়ে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এখনও প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৮৩ এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯৫ শতাংশ। প্রকল্পটিতে অডিট আপত্তি রয়েছে ২৯টি। এ প্রকল্পে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বহিঃস্থ নিরীক্ষায় (এক্সটারনাল অডিট) উঠে আসা অনিয়মের মধ্যে রয়েছে সরকারি আইন ভঙ্গ, কাজের পরিধি কমিয়ে উচ্চ দরে পুনরায় দরপত্র আহ্বান, যোগাসাজশ করে পরামর্শককে কার্যাদেশ দেওয়া এবং আবাসিক প্রকৌশলীর পারিশ্রমিক থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ আপত্তি। আরও আছে, নন-রেসপনসিভ দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া, ঠিকাদারকে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, নকশার বাইরে টাকা খরচ করা। আইএমইডি বলছে, নন-রেসপনসিভ ঠিকাদারকে ১৮ কোটি ৮৩ লাখ ৫১ হাজার ১৪১ টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনুমোদিত বিওকিউ ড্রয়িং, ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশনের বাইরে বিভিন্ন আইটেম বাবদ ঠিকাদারকে অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৭ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। একইভাবে ভুল হিসাবের কারণে ঠিকাদারকে ৩ লাখ ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। নকশার বাইরে ট্রান্সমিশন পাইপলাইনের জন্য ব্যয় করা হয়েছে অতিরিক্ত ৫৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। প্রতিস্থাপনের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির অনুমোদন ছাড়াই কি-এক্সপার্টকে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে ৮২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অন্যদিকে সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘন করে ঠিকাদারের বিল থেকে জামানত বাবদ কাটা হয়নি ১১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এছাড়া পূর্বপরিমাপ ছাড়াই ভূমি ভরাটের জন্য ঠিকাদারকে দেড় কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অনুমোদিত নকশা ছাড়া এবং নন-টেন্ডার আইটেম হওয়ার পরও মাটি ভরাটের জন্য ঠিকাদারকে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অগ্রিম প্রদানের ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা টাকা অগ্রিম সমন্বয় বা আদায় না করায় এবং সয়েল টেস্ট রিপোর্টের সুপারিশ ছাড়াই ‘স্যান্ড কম্প্যাকশন পাইল’ দেখিয়ে সরকারের ২৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা ক্ষতি করা হয়েছে। এছাড়া ডিটেনশন এবং পোর্ট চার্জ (গুদাম ভাড়া) বাবদ ৪৭ লাখ ৫১ হাজার টাকার অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয়, ডিপিএইচই সার্কেল অফিস স্থাপন না করেই সরকারের ৫৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকার ক্ষতি এবং অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে আইটি সরঞ্জাম কেনার ফলে সরকারের ১৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতির ঘটনা বাংলাদেশের যেন স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখনকার সরকার অবশ্য এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অডিট আপত্তি বলে অবহেলার সুযোগ নেই। কেননা এমনি এমনি তো অডিটররা আপত্তি দেননি। এখানে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে বলেই আপত্তি এসেছে। এসব বিষয়ে আরও ভালোভাবে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ ঢাকা-সিলেট করিডোর উন্নয়ন সরকারের সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর উন্নয়ন (চার লেন) প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় করা হচ্ছে ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত এপ্রিল পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ইতোমধ্যে মূল মেয়াদের ৮৯ শতাংশ শেষ হলেও প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া প্রধান নির্মাণকাজের মধ্যে মূল সড়কের বাস্তবায়ন হয়েছে সাড়ে ১১ শতাংশ, সার্ভিস লেনের ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সেতুর কাজ ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং কালভার্টের হয়েছে ৫৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আইএমইডি বলছে, এই অগ্রগতি কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। প্রকল্পটিতে রয়েছে ১৯টি অডিট আপত্তি। এগুলো মধ্যে ৪টির নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রধান আপত্তিগুলো হলোÑ আর্থিক অনিয়ম, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ঠিকাদারকে মূল সমন্বয়ের নামে টাকা দেওয়া। এতে ক্ষতি হয়েছে ২৫ লাখ ৮৮ হাজার ৮৯৬ টাকা। প্রকৌশলীদের আবাসন নির্মাণে কোনো কাজ না করলেও ঠিকাদারকে বিল দেওয়ায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার। মোট অনিয়ম হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ১৭ হাজার টাকার। এছাড়া ঠিকাদারের বিল থেকে রিটেনশন মানি কাটা হলেও ভ্যাট ও আয়কর বাবদ প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা আদায় করা হয়নি। সঞ্চিত ব্যয় সুদ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। ভ্যারিয়েশন অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত কাজের জন্য ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত ভেঙে বীমা কাভারেজ করা হয়নি। আরও আছে প্রাপ্য নয়Ñ এমন চার্জ অ্যালাউন্স গ্রহণ এবং প্রকৃত ব্যয়ের পরিবর্তে চুক্তি ভেঙে আন্তর্জাতিক বিমানভাড়ার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আইএমইডি বলেছে, উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আপত্তি দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তি হয়নি। একাধিক আপত্তি পুনর্জবাব পর্যায়ে থাকায় সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অধিক কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ, সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যÑ অধিকাংশ অডিট আপত্তিরই ব্রডশিটে জবাব দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুত এসব নিষ্পত্তি হবে। ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্প ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৯৫৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এটি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়। মেয়াদ ২০২৬ সালের অক্টোবর। কিন্তু গত মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯৭ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৭৭ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ প্রকল্পে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের দেওয়া অডিট আপত্তি রয়েছে ১৪টি। কিন্তু একটিরও নিষ্পত্তি হয়নি। উল্লেখযোগ্য আপত্তিগুলো হলোÑ অপ্রয়োজনীয় ঋণের ফি বাবদ ক্ষতি হয়েছে ১৬ কোটি ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এছাড়া অনুমোদন ছাড়াই অনিয়মিতভাবে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করে ও চুক্তির ভ্যারিয়েশন বাড়িয়ে আর্থিক ক্ষতি, ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া, ভ্যাট থেকে অর্থ না কাটায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি। মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৮৫৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন মেয়াদে এটি বাস্তবায়ন করছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। প্রকল্পটির অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এছাড়া এতে রয়েছে ১০টি অডিট আপত্তি। এগুলোর একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। প্রধান আপত্তিগুলো হলোÑ ঠিকাদারের দাখিল করা দরের চেয়ে বেশি দরে ভ্যারিয়েশন করা আইটেমে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে ঠিকাদারের দাখিল করা উদ্ধৃত দরের চেয়ে বেশি দরে বিল পরিশোধ, রোডের পরিমাণ বেশি দেখিয়ে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত বিল দেওয়া এবং ঠিকাদারকে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইএমইডির সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিবেদনগুলোতে তুলে ধরেছি। প্রতিবেদনগুলো ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এখন সবগুলো প্রতিবেদন গ্রন্থিত করে বই আকারে প্রস্তুত করা হচ্ছে।’
২০২৪ সালের ৯ মে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কাছে ৮ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার দর ১১০ টাকা। অন্যদিকে, এ দিনে বাংলাদেশ ব্যাংক ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার ক্রয় করে। তবে এ কেনার ক্ষেত্রে দর ধরা হয়েছে ১১৬ টাকা ৪৬ পয়সা। এ কেনাবেচার দিনেই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ডলার কেনাবেচায় ক্রলিং পেগ ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিভুক্ত এ দুই দরের লেনদেনেই রাষ্ট্রের প্রায় ৫৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। আর এ ক্ষতির পেছনের মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশ ব্যাংকেরই একজন অতিরিক্ত পরিচালক। ওই সময় তিনি ছিলেন যুগ্ম পরিচালক। তবে এ ক্ষতির আড়ালে বর্তমান এ অতিরিক্ত পরিচালক দুই হাত ভরে নিয়েছেন। অবৈধভাবে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এমনকি অনৈতিক সুবিধা দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকেও নেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। এখানেই শেষ নয়। ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে প্রতি মাসে ২ লাখ ৬৮ হাজার ২৫৬ টাকার মেডিকেল বিল নেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেই বলছে যা অস্বাভাবিক। এ ছাড়া পূর্ণ বেতন-ভাতায় নেওয়া পিএইচডি প্রেষণ শেষ হওয়ার আগেই দেশে ফিরে আসেন। নিয়মানুযায়ী পূর্ণভাতায় শিক্ষা ছুটিতে গেলে পড়াশোনা শেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। তবে তার কোনোটাই তিনি করেননি, উল্টো পড়াশোনা শেষ না করে দেশে ফিরে আবার যোগদান করেছেন চাকরিতে। এ ছাড়া প্রেষণে থাকার সময় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনস্টিটিউশনাল ইনভেস্টর’-এর বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইলের পরিবর্তে ব্যক্তিগত জিমেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছেন, যা গুরুতর অপরাধ। এতসব অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের সাবেক যুগ্ম পরিচালক ও বর্তমান অতিরিক্ত পরিচালক শাহনেওয়াজ সুমনের বিরুদ্ধে। খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেই এসব অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। সেই তদন্ত প্রতিবেদনের কপি রয়েছে কালবেলার হাতে। এমন নানা প্রমাণিত দুর্নীতির পরেও বিশাল ক্ষমতাধর সেই যুগ্ম পরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বরং জুটেছে পুরস্কার। গতকাল দুর্নীতির পুরস্কারস্বরূপ মিলেছে তার পদোন্নতি। পেয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৯ মে, যেদিন দেশে প্রথম ‘ক্রলি পেগ’ পদ্ধতি চালু করা হয়। সেদিন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সঙ্গে ব্যাক-ডেটেড রেট ব্যবহার করে ডলার কেনাবেচার চারটি চুক্তি সম্পন্ন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দাপ্তরিক নোটিং থেকে জানা যায়, ওই দিন ইসলামী ব্যাংকের কাছে ১১০ টাকা দরে ৮ কোটি ২০ লাখ (৮২ মিলিয়ন) ডলার বিক্রি দেখানো হয়; কিন্তু একই ভ্যালুডেটে আবার ১১৬.৪৬ টাকা দরে ৮ কোটি ৫০ লাখ (৮৫ মিলিয়ন) ডলার ক্রয় করা হয়। একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন বিনিময় হার ব্যবহার করে অনৈতিকভাবে ইসলামী ব্যাংককে সুবিধা দেওয়ার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ৫৪ কোটি ৯১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। এ প্রক্রিয়ায় রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট অপারেশন ম্যানুয়াল ভঙ্গ করে ডিলস্লিপ ও ঊর্ধ্বতনদের যথাযথ স্বাক্ষর ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে লেনদেনগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের (ডিভিশন-২) মিডল অফিস শাখা থেকে প্রস্তুতকৃত বিবেচ্যপত্রে ইসলামী ব্যাংক পিএলসির সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ে সংঘটিত অনিয়ম ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের ৯ মে রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট শাখা (ফ্রন্ট অফিস) ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে দুটি ডলার ক্রয় এবং দুটি ডলার বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন করে। যদিও দুটি বিক্রয় চুক্তির তারিখ ৮ মে ২০২৪ দেখানো হয়েছিল, তবে নথিপত্র ও ই-মেইল কনফার্মেশন থেকে দেখা যায় যে, মূলত ৯ মে ২০২৪ তারিখেই অধিক মূল্যে ডলার ক্রয় করে পরবর্তীতে কম মূল্যে বিক্রি করা হয়। একই ভ্যালুডেটের এই ক্রয়-বিক্রয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিনিময় হার ব্যবহার করার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫৪ কোটি ৯১ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। উক্ত লেনদেনগুলোর অনুমোদনের জন্য ৯ মে ২০২৪ তারিখ সন্ধ্যায় মিডল অফিসে পাঠানো হলে, আগের দিনের ডিল ডেট থাকা সত্ত্বেও কেন দেরিতে পাঠানো হলো—সে বিষয়ে ফ্রন্ট অফিস কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। তা ছাড়া ডিলের বিবরণীতে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত পরিচালক ও পরিচালকের স্বাক্ষর ছিল না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ডিল দুটি অনুমোদন করে ব্যাক অফিসে পাঠানো হলেও সেখানে কোনো কর্মকর্তার উপস্থিতি না থাকায় মোবাইল ফোনে বিষয়টি অবহিত করা হয়। নথিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ‘রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট অপারেশন ম্যানুয়াল’ অনুযায়ী প্রতিদিনের ডিল স্লিপ, ফরম্যাট ও বিবরণী নিয়মিত মিডল ও ব্যাক অফিসে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিগত ১ এপ্রিল ২০২৪ তারিখের পর থেকে হেড অব ট্রেজারি বরাবর উপস্থাপিত বিবরণী মিডল অফিসে প্রেরণ করা হয়নি। ১-২ সপ্তাহ পর পর বা অনিয়মিতভাবে নথিপত্র পাঠানোর কারণে ম্যানুয়ালের চরম ব্যত্যয় ঘটে এবং আন্তঃনিরীক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করে বলা হয়, ভবিষ্যতে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা এড়াতে ম্যানুয়াল অনুসারে নির্ধারিত দিনে সব বিবরণী নিয়মিত মিডল ও ব্যাক অফিসে প্রেরণের প্রস্তাব করলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, তৎকালীন একজন ডেপুটি গভর্নর এবং যুগ্ম পরিচালক শাহনেওয়াজ সুমনের যোগসাজশে এই অনিয়ম ঘটে, যার বিনিময়ে তারা ইসলামী ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে অনৈতিক সুবিধা নেন। এ ছাড়াও ডেপুটি গভর্নরের মেয়েকে ইসলামী ব্যাংকের আইটি শাখায় জুনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি দেওয়া হয়। এ ছাড়াও শাহনেওয়াজ সুমন শিক্ষাছুটিতে থাকাকালে প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত জিমেইল আইডি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেন এবং রিজার্ভ-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য অননুমোদিতভাবে বাইরে সরবরাহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা গুরুতর অপরাধ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, শাহনেওয়াজ সুমন মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়তে অর্থনীতিতে পিএইচডি করার জন্য ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর একটি আদেশ দেওয়া হয়। সেই আদেশে তাকে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ২৭ জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত পূর্ণ বেতন-ভাতায় প্রেষণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শাহনেওয়াজ সুমন পিএইচডি সম্পন্ন না করেই ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট দেশে ফিরে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগদান করেন। প্রেষণের শর্ত অনুযায়ী শিক্ষাক্রম অসমাপ্ত রেখে ফিরে এলে প্রেষণকালে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে তিনি তা দেননি এবং এখন পর্যন্ত তার পড়াশোনা-সংক্রান্ত কোনো প্রমাণও ব্যাংকে জমা দেননি। এদিকে, ২০২৫ সালের ৪ মে শাহনেওয়াজ সুমনের অনুকূলে সকল প্রকার চিকিৎসা ওষুধ (সিলিং ঊর্ধ্ব ওষুধ সুবিধাসহ) যাচাই করতে ৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির প্রতিবেদনে সুমনের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর আর্থিক অপরাধের প্রমাণ মিলেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে তার মেডিকেল বিল জালিয়াতির তথ্য উঠে আসে। তিনি ক্যানসার রোগী হিসেবে প্রতি মাসে ২ লাখ ৬৪ হাজার ২৫৬ টাকা আর্থিক সুবিধা নেন। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, চিকিৎসকের পরামর্শের চরম ব্যত্যয় ঘটিয়ে এবং এআই বা চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে অসম্ভবমাত্রার অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ট্যাবলেট সেবনের হিসাব দেখানো হয়। কম্পিউটারে মেমো দেওয়ার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ফার্মেসি থেকে হাতে লেখা ভুয়া ম্যানুয়াল ভাউচার জমা দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটি সুমনের মেডিকেল ফাইলে সংরক্ষিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও ক্রয়কৃত ওষুধের ভাউচারের কপি সংগ্রহ করে তা যাচাইয়ের জন্য ২০ মে ২০২৫ তারিখে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের চেম্বারে যান এবং সেই সঙ্গে ভাউচারের যথার্থতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ওষুধের দোকানে যোগাযোগ করেন। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মো. মোখলেছ উদ্দিন কমিটিকে জানান, তিনি মূলত একজন রেডিওথেরাপিস্ট। ডাক্তার মোখলেছ তার ব্যবস্থাপত্রে মূলত ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ (সিএমসি), ভেলোর, ভারতের ব্যবস্থাপত্রের আলোকে এবং সুমনের অনুরোধের ওই ওষুধ লিপিবদ্ধ করেন। কমিটি সুমনের ওষুধ সেবনের ডোজ সম্পর্কিত বিষয়ে চ্যাটজিপিটি ও এআই সফটওয়্যারের আলোকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের মতামত জানতে চাইলে তিনি জানান যে, অ্যান্টি ফাঙ্গাল ওষুধসমূহ মূলত চার সপ্তাহের কোর্স এবং প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রাম হতে সর্বোচ্চ ৪০০ মিলিগ্রাম ওষুধ ব্যবহার করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ বাংকের অতিরিক্ত পরিচালক সুমন প্রতিদিন ১৮০০ মিলিগ্রাম Xpos ট্যাবলেট ও ১২০০ মিলিগ্রাম Dasanix ট্যাবলেট সেবন করেন, যা প্রকৃতপক্ষে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ছাড়া, ক্রয় করা ওষুধের ভাউচারের কপি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ওষুধের দোকানে যোগাযোগ করা হলে তারা এসব ওষুধ বিক্রি করেন না বলে কমিটিকে নিশ্চিত করেন। তবে অর্ডারের মাধ্যমে ক্যাশ টাকার বিনিময়ে এ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ওষুধের দোকানে কম্পিউটারাইজড ভাউচারের মাধ্যমে ওষুধ বিক্রির ব্যবস্থা থাকলেও সুমনের উপস্থাপিত বিলের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল ভাউচার ব্যবহার করা হয়েছে। বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় অভিযুক্ত অতিরিক্ত পরিচালক শাহনেওয়াজ সুমনের সঙ্গে। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে এ ধরনের লেনদেন বা নীতিগত সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রচলিত নীতিমালা, বাজার পরিস্থিতি এবং যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের ভিত্তিতেই বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। সে সময় ক্রলিং পেগ বিনিময় হার ব্যবস্থা চালুর ফলে রেট পুনর্নির্ধারিত হয়। এসব লেনদেন কোনো ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত পরিচালক, পরিচালক এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমেই ডিলগুলো সম্পন্ন হয়েছে।’ কিন্তু ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ‘ফরওয়ার্ডিংয়ে অতিরিক্ত পরিচালক ও পরিচালকের স্বাক্ষর ছিল না’- এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্বাক্ষর ছিল। আমার বক্তব্য এটাই। আপনি নিউজ করলে করতে পারেন।’ পড়াশোনা শেষ না করে দেশে ফেরার বিষয়ে শাহনেওয়াজ সুমন বলেন, ‘ধরেন কেউ পড়াশোনা করতে গিয়ে কোনো কারণে সেটা শেষ করতে পারেনি। তা হলে কি সে দেশে ফিরতে পারবে না।’ ফিরতে পারবে। কিন্তু তা হলে তো সে শিক্ষা ছুটির সুবিধা পাবে না— এমন প্রশ্ন করলে শাহনেওয়াজ সুমন বলেন, ‘পাবে। এটা নিয়ম আছে।’ আরও বলেন, ‘আমি থিসিস জমা দিয়ে এসেছি। সেখানে আমার ভাইবা বাকি আছে। আমি প্রয়োজনে ভাইবার জন্য আবার যাব।’ তিনি আরও বলেন, ‘মেডিকেল বিলের বিষয়টি সেটেলড। আমাকে তারা ডেকেছিল। আমি ব্যাখ্যা দিয়েছি।’ ইসলামী ব্যাংকের সিএসআর ফান্ডের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমি একজন ক্যানসারের রোগী। এটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসারেই নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে ডলার সম্পর্কিত লেনদেনের কোনো সম্পর্কও নেই।’ গ্রামের বাড়িতে আলিশান বাড়ির বিষয়ে বলেন, ‘এটি আমার এক ভাইয়ের বাড়ি।’ সহোদর ভাই কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘হ্যাঁ, আপন ভাই। ওই বাড়ি আমার ভাই বানিয়েছে।’ ওই ভাই কী করেন জানেত চাইলে বলেন, ‘ব্যবসা করেন।’ কীসের ব্যবসা করেন জানতে চাইলে তিনি সেটা না বলে বলেন, ‘এটা তো বিষয় না। এটা আমার ভাইয়ের বাড়ি। উনি এটা বানিয়েছেন।’ এসব বিষয়ে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘এটা তো বহুমুখী জ্বালিয়াতি ও প্রতারণা। এখানে অন্তত তিন ধরনের জ্বালিয়াতি ও প্রতারণা ঘটেছে। ডলার কারসাজির সঙ্গে ব্যাংকের আরও কর্মকর্তারা জড়িত আছে। এই কর্মকর্তার পাশাপাশি তাদেরকেও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়াও মেডিকেল বিলের নামে অর্থ আত্মসাতের যে বিষয়টি সেটি দুর্নীতির পাশাপাশি নৈতিকভাবে খুবই জঘন্য একটি কাজ। এসব অভিযোগ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণের পরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার মানে হলো— দুর্নীতি যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে এটি তারই প্রমাণ।’ ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বিগত সরকারের সময় লুটপাটের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্ত্রীয় ব্যাংকের এখানে সবচেয়ে বেশি দায়। যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আস্থার সংকটে আছে। বর্তমান সরকার সেখান থেকে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করছে— এর মধ্যে যদি ব্যাংকের ভেতরে এই ধরনের অনাচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি থেকে থাকে তা হলে এটা কোনোভাবেই আস্থায় ফেরানো সম্ভব হবে না। তাই এই সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে ওই ব্যক্তির পাশাপাশি যোগসাজশে যারাই জড়িত ছিল তাদের সবাইকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ বদরুল আলম খানকে ঘিরে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সরকারি দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে একদিকে যেমন প্রথম স্ত্রীর পারিবারিক অবহেলা, দ্বিতীয় বিয়ে ও একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বদলি বাণিজ্য, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অনুসন্ধানের আবেদনের মাধ্যমে উত্থাপিত হয়েছে। বদরুল আলম খানের প্রথম স্ত্রী মিসেস জেসমিন অভিযোগ করেন, ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি স্বামীর কাছ থেকে চরম অবহেলার শিকার হয়েছেন। তাঁদের সংসারে তিন কন্যা সন্তান রয়েছে। তাঁর দাবি, দীর্ঘ সংসারজীবনে বদরুল আলম খান পরিবারের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। বাবার এমন আচরণের কারণে তাঁদের ছোট মেয়ে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মিসেস জেসমিনের নামে ঢাকার হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি ডিসচার্জ সার্টিফিকেট প্রকাশ করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, তিনি ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান। প্রতিবেদনের দাবিতে বলা হয়, অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও তিনি স্বামীর অপেক্ষায় ছিলেন, অথচ বদরুল আলম খান অন্যত্র অবস্থান করছিলেন। একই প্রতিবেদনে বদরুল আলম খানের দ্বিতীয় বিয়ে এবং অন্য এক নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগও তোলা হয়েছে। বিভিন্ন ছবি প্রকাশ করে দাবি করা হয়েছে, প্রথম স্ত্রীকে অবহেলা করে তিনি অন্য এক নারীর সঙ্গে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। এছাড়া তাঁর একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কের অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য নথিপত্র থাকার দাবিও করা হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনের এসব অভিযোগের পাশাপাশি সরকারি দায়িত্ব পালনেও তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি নির্মাণকাজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে পরিবর্তনের পর বদরুল আলম খানের প্রশাসনিক প্রভাব আরও বেড়ে যায়। কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এবং ভোলায় কর্মরত অবস্থায় সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে টেন্ডার, বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তিনি নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার কয়েকজন ঠিকাদারকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। কুমিল্লার একটি দরপত্রে ভুয়া সনদধারী ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চাপ প্রয়োগ এবং “আসিফ” নামের এক ঠিকাদারকে পুলিশের বিভিন্ন থানা ভবন নির্মাণসহ একাধিক সরকারি প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য তদবিরের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মিরপুর পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্পের আরবরিকালচার কাজ বিধিবহির্ভূতভাবে অন্য বিভাগের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ভাষানটেক থানার ভবন নির্মাণের কাজও পছন্দের ঠিকাদারকে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, বদরুল আলম খান, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা বিপুল সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল স্থাপনা, খামারবাড়ি, ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভাই-বোনদের নামে সম্পদ স্থানান্তর, ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততা এবং আয়কর নথিতে প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগও তদন্তের দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বদলি বাণিজ্য এবং বিভিন্ন প্রকল্প থেকে কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে গত কয়েক মাসে প্রায় ১২২ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করা হয়েছে। এই অর্থ নিজের নামে না রেখে আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে স্থানান্তর ও গোপন করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বদলি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ ফেব্রুয়ারি সাভার সার্কেল থেকে ঢাকা গণপূর্ত-১ সার্কেলে বদলির ক্ষেত্রে অন্য কর্মকর্তার নাম সুপারিশ থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে নিজের পছন্দের পদায়ন নিশ্চিত করেন তিনি। বদলির পরও অধিদপ্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব অব্যাহত রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, অতীতে ময়মনসিংহে কর্মরত অবস্থায় ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছিল। এই বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য গণপূর্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খানের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি বিধায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।