রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সচল যন্ত্রপাতি বিকল দেখিয়ে মেরামতের নামে লোপাট করা হয়েছে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা। এ ঘটনায় হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও এক স্টোরকিপারের নাম সামনে এসেছে। অথচ হাসপাতালটিতে অচল পড়ে আছে ১০০ কোটি টাকার তিন শতাধিক জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র।
রাজধানীসহ সারা দেশের লাখ লাখ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ চিকিৎসা নেয় এই হাসপাতালে। অথচ ৩২০টি অতি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র বছরের পর বছর ধরে বিকল থাকায় ব্যাহত হচ্ছে সেবা কার্যক্রম। এর মধ্যেই সচল যন্ত্র নষ্ট দেখিয়ে অর্থ লোপাটের বিষয়টি সামনে এসেছে।
বাঁ থেকে সাবেক পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমান, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা এবং স্টোরকিপার মো. রফিকুল ইসলাম।
এ ঘটনায় হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমান, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা এবং স্টোরকিপার মো. রফিকুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
নষ্ট না হওয়া যন্ত্র মেরামত হলো যেভাবে
২০২৪-২৫ অর্থবছরে যন্ত্র মেরামতের বরাদ্দ ছিল ৪০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে খরচ দেখানো হয় ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা।২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৫ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে খরচ দেখানো হয় ১৫ লাখ ২১ হাজার টাকা। পেশেন্ট মনিটর, ইসিজি মেশিন, ওটি টেবিল ও ডায়াথার্মি মেশিন মেরামতের নামে সাতটি কোটেশনের মাধ্যমে তোলা হয় এই অর্থ।
দুই অর্থবছর মিলিয়ে মেরামতের নামে মোট তোলা হয়েছে ৪৭ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিটি বিলে তৎকালীন পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমানের স্বাক্ষর থাকলেও এতে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারদের কোনো সম্মতি ছিল না বলে জানা গেছে।
বিষয়টি জানতে পেরে বিস্ময় প্রকাশ করেন হাসপাতালের প্রধান বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদুদ জামান। তিনি বলেন, ‘এসব যন্ত্র তো নষ্টই হয়নি, মেরামত হবে কীভাবে? নষ্ট হলে সবার আগে আমাদের বায়োমেডিকেল টিমের জানার কথা। আমরা কিছুই জানি না, অথচ কাগজপত্রে নাকি মেরামত সম্পন্ন করে বিলও তোলা শেষ! পুরোটাই ভুয়া কোটেশন বানিয়ে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়েছে।’
মোহাম্মদ তৌহিদুদ জামান বলেন, ‘বিষয়টি সম্প্রতি জানতে পেরেছি। এটি নিয়ে তৎকালীন পরিচালক শফিউর রহমানের বিরুদ্ধে অডিট আপত্তিও এসেছে। তিনি কয়েক দিন পরপর মীমাংসার জন্য হাসপাতালে আসেন। এই টাকা স্টোরকিপার রফিক ও পরিচালক সিন্ডিকেটের পেটে গেছে।’
কাজ পায় স্টোরকিপারের স্ত্রীর ভুয়া প্রতিষ্ঠান
হাসপাতালের বিভিন্ন মেরামত ও মালামাল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ‘এম/এস এস.আর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। দরপত্রে ঠিকানা দেখানো হয় মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ৩১৪-৩১৫ নম্বর বাসা (ফ্ল্যাট ৪/বি)। তবে দরপত্রে উল্লিখিত ঠিকানা অনুযায়ী সেখানে গিয়ে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
দরপত্রে কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা দেখানো হয় রাজধানীর মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার এই ভবনে। তবে সেখানে গিয়ে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব
ওই ভবনের বাসিন্দা ও স্থানীয়রা জানান, ভবনটির পুরোটাই আবাসিক। সেখানে কোনো অফিস বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নেই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল হাসপাতালের স্টোরকিপার মো. রফিকুল ইসলামের স্ত্রীর নামে খোলা একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান।
সরকারি চাকরিতে থেকে স্ত্রীর নামে কাল্পনিক প্রতিষ্ঠান খুলে জালিয়াতির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রফিক বলেন, ‘স্ত্রী স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারেন।’
বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারদের স্বাক্ষর ছাড়া এবং মালামাল না বুঝে পেয়ে কীভাবে বিল পাস হলো? এমন প্রশ্ন করা হলে নামাজের অজুহাতে নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান তিনি। ভালো যন্ত্র নষ্ট দেখিয়ে ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে রফিক বলেন, ‘ক্যাশ থেকে টাকা নিয়ে কাজ করা হয়েছিল। সেই টাকা সমন্বয়ের জন্য পরিচালকের নির্দেশে বিল করা হয়েছে।’
অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত গ্লাভস ফের ওটিতে
অনুসন্ধানে উঠে আসে, অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত সার্জিক্যাল প্রসিডিউর গ্লাভস নতুন করে প্যাকেটজাত করে হাসপাতালের স্টোরে সরবরাহ করতেন স্টোরকিপার রফিক। জালিয়াতি চাপা দিতে নার্সদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল, ব্যবহৃত গ্লাভস যেন কেটে ফেলা না হয়।
হাসপাতালটিতে বছরে অন্তত ১০ হাজার জোড়া সার্জিক্যাল প্রসিডিউর গ্লাভসের প্রয়োজন হয়। প্রতি জোড়ার দাম অন্তত ১৫০ টাকা। সে হিসাবে বছরে শুধু গ্লাভসের পেছনেই খরচ হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নার্স ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংক্রমিত গ্লাভস পুনরায় ওটিতে ব্যবহার করা রোগীর জীবন নিয়ে তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই ধরনের গ্লাভস সরবরাহ করা হয়েছে। পরে চিকিৎসকদের আপত্তির মুখে গত বছর থেকে উন্নতমানের গ্লাভস সরবরাহ শুরু হয়।
এদিকে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হলেও স্টোরকিপার রফিকের রয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি ও চালক। ১৯৯২ সালে যোগদান করা রফিক চাকরির সুবাদে আগারগাঁওয়ে সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার (বি-১৪, জি-১০) বরাদ্দ পেলেও বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ১৭ বছর ধরে নিজে না থেকে অন্যকে ভাড়া দিয়ে আদায় করেছেন ৮১ লাখ টাকার বেশি।
রফিকের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিমের নাম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তবে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এখনও বিকল তিন শতাধিক যন্ত্র
একদিকে সচল যন্ত্রের ভুয়া মেরামত দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা লোপাট হচ্ছে। অন্যদিকে অতি জরুরি তিন শতাধিক ছোট-বড় জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম বছরের পর বছর ধরে বিকল পড়ে আছে।২০২২ সালে হাসপাতাল থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকার অক্সিজেন পাইপলাইন চুরির ঘটনায় তদন্ত কমিটি হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়নি। ফলে এর সঙ্গে জড়িতদের কারও গায়েও আঁচড় লাগেনি। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্টোরকিপার রফিক বলেন, ‘এই চুরি সম্পর্কে ওয়ার্ড মাস্টাররা জানে, আমি কিছু জানি না।’
নষ্ট যন্ত্রপাতির তালিকায় রয়েছে ভেন্টিলেটর, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্সরে, এন্ডোস্কপি, কলোনস্কোপি, পেশেন্ট মনিটর, আল্ট্রাসাউন্ড, অক্সিজেন জেনারেটরের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ও জীবনরক্ষাকারী নানা সরঞ্জাম। এগুলোর মোট মূল্য অন্তত ১০০ কোটি টাকা।
২০১৬ সালে ১৮ কোটি টাকায় কেনা একমাত্র এমআরআই যন্ত্রটি বছর দু-এক যেতেই বিকল হয়ে পড়ে। পরে সেটি আর ঠিক করা হয়নি। ফলে প্রতি মাসে শত শত রোগী এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
দুটি সিটি স্ক্যানের মধ্যে একটি নষ্ট পড়ে আছে পাঁচ বছর ধরে। চার কোটি টাকায় কেনা এই যন্ত্রটি সচল করার কোনো উদ্যোগ নেই।
এ ছাড়া ৪০টি ভেন্টিলেটর পড়ে আছে। এগুলোর একেকটির দাম প্রায় ৩০ লাখ টাকা। সে হিসাবে শুধু ভেন্টিলেটরই পড়ে আছে ১২ কোটি টাকার।
পূর্ণাঙ্গ সেটআপসহ দুটি পোর্টেবল এক্সরে মেশিন পড়ে আছে, যার দাম ৬ কোটি টাকা। এন্ডোস্কপি ও কোলনোস্কোপি পড়ে আছে সাতটি। এগুলোর প্রতিটির দাম অন্তত এক কোটি টাকা হিসাবে সবকটির মোট দাম কমপক্ষে সাত কোটি টাকা।
দেড় কোটি টাকা মূল্যের পেশেন্ট মনিটর পড়ে আছে ৩০টির বেশি। ৭ কোটি ২ লাখ টাকার আল্ট্রাসাউন্ড পড়ে আছে ১৪টি, ৮০ লাখ টাকার দুটি ইকো মেশিন, এক কোটি টাকার একটি এক্সরে ম্যামোগ্রাফি, চার কোটি টাকার দুটি অক্সিজেন ও দুটি এয়ার জেনারেটর পড়ে আছে অকেজো অবস্থায়।
বিকলের তালিকায় আছে ল্যাপারোস্কোপিও, যার প্রতিটির মূল্য অন্তত ৮০ লাখ টাকা। সেক্ষেত্রে ১০টি ল্যাপারোস্কোপির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে হাসপাতালটিতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার যন্ত্র অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
সিন্ডিকেটের পকেটে রাজস্বের কোটি টাকা
রোগ নির্ণয় ফি, ওষুধ বিক্রি, বেড ভাড়াসহ হাসপাতালের বিভিন্ন খাত থেকে আসা রাজস্ব আয়ে স্বচ্ছতা আনতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে অটোমেশন চালু করেন সম্প্রতি পরিচালক থেকে ওএসডি হওয়া ডা. সেহাব উদ্দিন। এতে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দুই কোটি টাকা বেশি আয় হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, রাজস্ব আয়ের এই তহবিল আগে যেত কোথায়।
অটোমেশনের আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে হাসপাতালের রাজস্ব আয় ছিল পাঁচ কোটি ২ লাখ ৪১ হাজার ৭৭৫ টাকা। সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (২৬ জুন পর্যন্ত) আয় হয়েছে ছয় কোটি ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার ১৫০ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধান ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪৩ হাজার ৩৭৫ টাকা। একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, এই পুরো টাকা গেছে নন্দ দুলাল ও রফিকের পেটে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর হাসপাতালে পরিচালক পরিবর্তন হলেও বহাল তবিয়তে থেকে যান উপপরিচালক নন্দ দুলাল সাহা। তিনি ও স্টোরকিপার রফিক প্রতিষ্ঠানের সব কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা প্রথমে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে বলেন। পরে টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক পরিচালক ডা. শফিউর রহমান বলেন, ‘এই বিষয়ে কোনো কথা হবে না। ওখানে দেখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আছে। সরকারের আরও দেখার অনেক বিভাগ আছে, তারা সবাই দেখছে। আমার শাসনামলে কোনো কাগজপত্রে কোথাও কোনো গরমিল নেই।’
তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম হলো, একটা মেশিন নষ্ট হলে ডিপার্টমেন্ট থেকে রিকুইজিশন দেয়। বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা যাচাই-বাছাই করে কোটেশনের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি কেনে। যার মেশিন ঠিক হয়েছে, ব্যবহারকারীরা সঠিক বললে তবেই বিল স্টোর অ্যাকাউন্টস হয়ে আমার কাছে আসে। এখানে দুই নম্বরি করার সুযোগ নেই। তৌহিদ এবং বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে দলাদলি থাকার কারণে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করে পরিচালকের পেছনে লাগে। এটা (ভুল তথ্য দিয়ে বিল তোলা) সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস স্বাস্থ্য বিভাগের
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমী বলেন, ‘বিষয়টি আমলে নেওয়া হলো। সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠান খুলে একই প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদারির সুযোগ নেই। তাই বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ কমিটি দিয়ে তদন্ত করা হবে। তাতেও না হলে অধিদপ্তর করবে। সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি আমার সময়ের না, তবে তদন্ত করে দেখা হবে। অনিয়মের বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৫ আন্তর্জাতিক হকি বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ ফুটবল প্রেমীদের মতো হকি প্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের কঠিন পর্ব অতিক্রম করে দুই দলই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য এই ফাইনাল ম্যাচে উভয় দল নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত। আর্জেন্টিনা দল এই টুর্নামেন্টে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। অধিনায়ক লুকাস মার্টিনেজ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছি। দলের সবাই একসঙ্গে কাজ করে ফাইনালে পৌঁছেছি। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট — বিশ্বকাপ জিততে হবে। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ বজায় রেখেছি এবং আগামী ম্যাচেও তা বজায় রাখব।” আর্জেন্টিনা দলের ফিজিক্যাল ট্রেনার জানান, দল খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য বিশেষ অনুশীলন চালাচ্ছে যাতে ফাইনালে তারা চাপ সামলাতে পারে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের কোচ মাইকেল ডি ইয়ং ফাইনালের আগের প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দল গত কয়েক মাস ধরে কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছে। খেলোয়াড়রা মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা চাই এই বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস গড়ে একটি শক্তিশালী ছাপ রেখে যেতে।” কোচ আরো বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র ফাইনালে উঠা নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়। আমরা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিজেদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।” বিশ্বের হকি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ফাইনাল ম্যাচটি গত দশকের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা হতে চলেছে। উভয় দলের কৌশল, বল নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুতগতির খেলায় যে মেধা প্রদর্শিত হয়েছে, তা ফুটবলের মতো অন্য কোনো খেলার ক্ষেত্রে বিরল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফাইনালে দলের মানসিক স্থিতিশীলতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা বিজয় নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে। মাঠে উভয় দলের খেলোয়াড়রা দ্রুতগতির পাস, শক্তিশালী ডিফেন্স এবং আক্রমণাত্মক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মাঠ মাতানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকারের গতিবেগ এবং নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডারদের কৌশলগত দক্ষতা ম্যাচে প্রধান আকর্ষণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও গোলরক্ষকদের প্রতিটি সেভ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াও ম্যাচের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশ্বজুড়ে লাখো হকি ভক্ত এই ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার দেখার জন্য অপেক্ষায় আছেন। অনলাইনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ম্যাচের লাইভ স্ট্রিমিং অনুষ্ঠিত হবে এবং অনেক দেশের টেলিভিশনও সরাসরি সম্প্রচার করবে। হকি প্রেমীরা এই ম্যাচ থেকে দারুণ উত্তেজনা, দক্ষতা এবং খেলা উপভোগ করার আশা করছে। মাঠের বাইরেও ভক্তদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ফ্যান জোন আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে খেলোয়াড় ও দর্শকরা একত্রে সময় কাটিয়ে খেলার আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। এছাড়াও টুর্নামেন্ট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে এবং খেলা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে দুই দলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে আগামী দিনে বিশ্ব হকির নতুন ধারার রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এই ম্যাচের ফলাফল আগামী দশক ধরে হকির কৌশলগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের হকি টুর্নামেন্ট হওয়ায় এর প্রতি ভক্তদের আগ্রহ ও উন্মাদনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সবাই আশা করছেন, আগামীকালের ফাইনাল হবে একটি স্মরণীয় খেলা, যেখানে স্পোর্টসম্যানশিপ, দক্ষতা ও উত্তেজনা থাকবে সর্বোচ্চ মাত্রায়।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায় ৫০০ সাধারণ কর্মী (জেনারেল ওয়ার্কার) পাঠানোর একটি প্রক্রিয়া ঘিরে বড় ধরনের নথি জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে। সার্বিয়ার একটি অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের নামে তৈরি করা চাহিদাপত্রে স্পষ্ট জালিয়াতি এবং আদালতের সিলের তারিখে দুই বছরের গরমিল থাকার পরও কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাতে সরকারি সত্যায়ন (অ্যাটেস্টেশন) দিয়েছে ইতালির রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সার্বিয়ার যে প্রতিষ্ঠানটি ৫০০ কর্মী নেওয়ার চাহিদাপত্র পাঠিয়েছে, তাদের সারা বছরের পরিচালন আয়ের অঙ্ক দিয়ে কর্মীদের এক দিনের বেতন দেওয়াও সম্ভব নয়। অন্যদিকে ঢাকায় দূতাবাস সত্যায়িত চাহিদাপত্র দেখিয়ে কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার তোড়জোড় চললেও কর্মীদের ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভিন্ন শর্ত ও কম বেতনের চুক্তিপত্র। এমনকি চাহিদাপত্র ও আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) যে রিক্রুটিং এজেন্সির নামে এসেছিল, তাদের বাদ দিয়ে অন্য একটি এজেন্সি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে কর্মী পাঠানোর সরকারি অনুমোদনও বের করে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অস্তিত্বহীন ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে কর্মী পাঠানোর এই প্রক্রিয়া মূলত বলকান রুট দিয়ে ইউরোপে মানবপাচারের একটি বড় ফাঁদ। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে সার্বিয়ায় যাওয়া শত শত কর্মী চরম বিপদে পড়বেন। আবাসিক ফ্ল্যাটে অফিস, বাৎসরিক আয়ে এক দিনের বেতনও অসম্ভব নথিপত্র অনুযায়ী, সার্বিয়ার ভোজভোদিনা অঞ্চলের সোমবোর (Sombor) শহরের ‘ইন্টারস্টাফ সার্ভিস ডিওও সোমবোর’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫০০ কর্মীর চাহিদাপত্র তৈরি করা হয়েছে। সার্বিয়ার করপোরেট ও অর্থনৈতিক তথ্যভান্ডার (কোম্পানিওয়াল বিজনেস সার্বিয়া) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এটি মূলত একটি অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান (মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজ)। সরকারি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় দেখানো হয়েছে সোমবোরের ‘প্রোতে মাতেয়ে নেনাদোভিচা ২৪’ ভবনের ৫ নম্বর আবাসিক ফ্ল্যাটে। প্রতিষ্ঠানটি ‘অস্থায়ী কর্মসংস্থান সংস্থা’ (কোড: ৭৮.২০) হিসেবে নিবন্ধিত। এর অর্থ হলো, তাদের নিজস্ব কোনো কারখানা বা শিল্প প্রকল্প নেই, এরা মূলত বাইরে থেকে শ্রমিক এনে স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দিনমজুর বা সাব-কন্ট্রাক্টে ভাড়া দেয়। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ঘেঁটে দেখা যায়, পুরো বছরে তাদের মোট পরিচালন আয় ছিল মাত্র ৯ লাখ ৪৫ হাজার সার্বিয়ান দিনার (আরএসডি), যা বাংলাদেশি মুদ্রায় পৌনে ৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ (প্রায় ৮ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার)। অথচ কর্মীদের চাহিদাপত্রে প্রতি মাসে মূল বেতন ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার দিনার। ৫০০ কর্মীকে এই বেতন দিতে গেলে প্রতি মাসে প্রয়োজন পড়বে ৩ কোটি ৭৫ লাখ দিনার। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির সারা বছরের যে মোট আয়, তা দিয়ে ৫০০ কর্মীর এক দিনের বেতন দেওয়াও সম্ভব নয়। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কর্মীদের বিনা খরচে আবাসন, খাবার, উড়োজাহাজের টিকিট ও চিকিৎসা বিমা দেওয়ার অঙ্গীকার পুরোটাই কাগুজে প্রতারণা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ২০২৪ সালের নোটারি সিলে ২০২৬ সালের তথ্য প্রত্যয়ন! নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রধান আইনি দলিল হলো সার্বিয়ান ভাষায় করা আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি)। এই নথিতে পাওয়া গেছে জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ। অনূদিত দলিলের ৩ নম্বর পৃষ্ঠায় দেখা যায়, সার্বিয়ার নোভি সাদ মৌলিক আদালতের পাবলিক নোটারির কার্যালয়ের সই ও সিলমোহর রয়েছে ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখের। অথচ সেই একই নোটারি প্রত্যয়নে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির তথ্য যাচাই করা হয়েছে সার্বিয়ার বিজনেস রেজিস্ট্রি এজেন্সির (এপিআর) ৭ জুন ২০২৬ তারিখের তথ্য অনুযায়ী। আবার সার্বিয়ান ভাষায় মূল আমমোক্তারনামার তারিখ দেখানো হয়েছে ১৫ মে ২০২৬ এবং এর ইংরেজি অনুবাদের প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে। আইনবিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোনো আদালত বা নোটারি কীভাবে দুই বছর পরের (২০২৬ সালের জুন) তথ্য প্রত্যয়ন করতে পারে? নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, অতীতের কোনো পুরোনো দলিলের নোটারি সিল ও স্বাক্ষরের পাতা স্ক্যান করে জালিয়াতির মাধ্যমে এই দলিলের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মূল চাহিদাপত্রে তারিখ দেওয়া রয়েছে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, অথচ আমমোক্তারনামায় চাহিদাপত্রের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৫ মে ২০২৬। ফলে আইনিভাবে এই আমমোক্তারনামা দিয়ে সেপ্টেম্বর মাসের চাহিদাপত্র কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই। কোনো যাচাই ছাড়াই রোম দূতাবাসের সিলমোহর সার্বিয়ায় বাংলাদেশের কোনো আবাসিক মিশন নেই। ফলে ইতালির রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসই সার্বিয়ার কূটনৈতিক ও শ্রমের বিষয়গুলো অনাবাসিক হিসেবে দেখভাল করে। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর রোম দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম ও কল্যাণ) আসিফ এনাম সিদ্দিকী কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই এই বিতর্কিত চাহিদাপত্র ও আমমোক্তারনামায় সত্যায়ন (রেফারেন্স: Rec. RM. Ser 2026/20(1) ও 20(2)) দেন। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, ইউরোপের কোনো অচেনা বা ঝুঁকিপূর্ণ দেশে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কর্মীর চাহিদাপত্র এলে সংশ্লিষ্ট শ্রম কর্মকর্তার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা, কর পরিশোধের তথ্য এবং কাজের পরিবেশ সরেজমিন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা। কিন্তু রোম দূতাবাস কোনো তদন্ত ছাড়াই এই নথিতে সিলমোহর দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং সিন্ডিকেটের সুবিধা নিশ্চিত করতেই তড়িঘড়ি করে এই সত্যায়ন দেওয়া হয়েছে। চাহিদাপত্র এক এজেন্সির, ছাড়পত্র অন্যের চাহিদাপত্র ও আমমোক্তারনামা অনুযায়ী, সার্বিয়ার প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে তাদের আইনি প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিল মেসার্স মোহাম্মদী ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে (লাইসেন্স নং: RL-919)। অথচ এই একই চাহিদাপত্র ব্যবহার করে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে ১৫ জন কর্মীর নিয়োগানুমতি বের করে নিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠান—মেসার্স এইচ.পি ওভারসীজ লিমিটেড (লাইসেন্স নং: RL-1388; ব্যবস্থাপনা পরিচালক: প্রবীর বণিক)। বিএমইটির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর এইচ.পি ওভারসীজের অনুকূলে এই ১৫ জনের নিয়োগানুমতি (অনুমোদন নম্বর: RS-RL1388-2026-615276) দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এক এজেন্সির চাহিদাপত্র অন্য এজেন্সির কাছে বিক্রি করে কর্মী পাঠানোর যে অবৈধ চক্র সক্রিয়, এটি তারই অংশ। চুক্তিপত্রে মাসে ১৮ হাজার টাকা গায়েব রোম দূতাবাস যে চাহিদাপত্র সত্যায়ন করেছে, তার সঙ্গে কর্মীদের ধরিয়ে দেওয়া ব্যক্তিগত নিয়োগপত্র (জব অফার লেটার) ও সার্বিয়ান ভাষার মূল শ্রমচুক্তির (উগোভর ও রাদু) শর্তে বড় ধরনের গরমিল রয়েছে। দূতাবাস সত্যায়িত চাহিদাপত্রে কর্মীদের জন্য সপ্তাহে দুই দিন ছুটি এবং মাসিক মূল বেতন ৭৫ হাজার সার্বিয়ান দিনার উল্লেখ ছিল। কিন্তু কর্মীদের হাতে যে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে, তাতে সপ্তাহে মাত্র এক দিন ছুটি এবং মাসিক বেতন কমিয়ে ৬০ হাজার দিনার করা হয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে উচ্চ বেতন ও দুই দিন ছুটির কথা বলে দূতাবাস থেকে সরকারি অনুমোদন নেওয়া হলেও বাস্তবে বাংলাদেশ থেকেই কর্মীদের কম বেতনের চুক্তিতে সই করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রতি কর্মীর বেতন থেকে প্রতি মাসে ১৫ হাজার দিনার বা প্রায় ১৮ হাজার টাকা করে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। বলকান রুটে মানবপাচারের শঙ্কা আন্তর্জাতিক অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সার্বিয়া, বসনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া হয়ে বলকান রুট দিয়ে ইতালি ও ইউরোপের দেশগুলোতে প্রবেশের জন্য মানবপাচারকারী চক্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ৫০০ সাধারণ কর্মী নেওয়ার এই প্রক্রিয়া মূলত মানবপাচারেরই বড় ফাঁদ। কর্মীরা সার্বিয়ায় পৌঁছানোর পর কাজ না পেয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে আটক কিংবা অমানবিক বন্দিদশায় পড়তে পারেন। নথিপত্রে এমন গুরুতর অসংগতি থাকার পরও কেন সত্যায়ন দেওয়া হলো, তা জানতে রোম দূতাবাসের প্রথম সচিব আসিফ এনাম সিদ্দিকীর দাপ্তরিক ই-মেইল ও অফিশিয়াল টেলিফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া মেলেনি। এইচ.পি ওভারসীজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রবীর বণিকের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনিও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর (RMMRU) এক জ্যেষ্ঠ ফেলো ন্যাশনাল ভয়েস নিউজ বাংলা একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা না থাকা এবং নোটারির তারিখে দুই বছরের গরমিল থাকার পরও দূতাবাস কীভাবে তাতে সিল মারল, তা বোধগম্য নয়। অবিলম্বে রোম দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া দরকার এবং এই চাহিদাপত্রের অধীনে সব ধরনের ছাড়পত্র বাতিল করা উচিত। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ন্যাশনাল ভয়েস নিউজ বাংলা দূতাবাস সত্যায়িত নথিতে জালিয়াতির প্রমাণ থাকলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। রোম মিশন ও বিএমইটির সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আলোচিত সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের ছেলে ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামকে ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ বি এম তারিকুল কবীর এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী আরিফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রায় ঘোষণার আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুদক ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য আজকের দিনটি ধার্য করা হয়েছিল। এ মামলায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে আদালত। পরবর্তীতে ২৪ সেপ্টেম্বর আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছিলেন সিয়াম। এর আগে গত ১৭ জুন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিল একই আদালত। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৩৭ লাখ ৩০ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছরের ৫ জানুয়ারি সিয়ামের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপসহকারী পরিচালক জাকির হোসেন। তদন্ত শেষে একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। তদন্তে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৩১ লাখ ৮১ হাজার টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। উল্লেখ্য, সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম পিএসসির প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে আলোচিত ড্রাইভার আবেদ আলীর ছেলে। সিয়াম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
, ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ডেপুটেশনে (প্রেষণে) কর্মরত খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রশাসনিক ব্ল্যাকমেইল এবং অঢেল অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এক সাধারণ সেচপাম্প মেরামতকারীর সন্তান হয়েও সরকারি চাকরির সুবাদে তিনি কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের মালিক হয়েছেন। ১৫ অক্টোবর ২০২৬ প্রাপ্ত বিস্তৃত অনুসন্ধানী তথ্য ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বরাতে জানা যায়, বিগত দুই যুগ ধরে নিজ মূল কর্মস্থলে না ফিরে ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ে অবস্থান করে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সরকারি পদে অবস্থান সত্ত্বেও বদলি-বাণিজ্য, পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগে তদবির এবং অবৈধ অর্থের লেনদেনে জড়িয়ে পড়ার দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিভাগীয় তদন্তের জোর দাবি উঠেছে। প্রাপ্ত অনুসন্ধানী নথি সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালের ২৬ ডিসেম্বর সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের জোরালো সুপারিশ ও রাজনৈতিক প্রভাবে খাদ্য বিভাগে যোগদান করেন শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল। চাকরিতে প্রবেশের পূর্বে তিনি গফরগাঁও সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের পদধারী নেতা এবং তৎকালীন কলেজ ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুধু প্রশাসনিক দুর্নীতিই নয়, ১৯৯৭ সালের ২৯ এপ্রিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গফরগাঁও সফরকালে বিএনপির জনসমাবেশমুখী বহরে হামলাকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য হিসেবেও তাঁর নাম স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের জুলাই মাসে ময়মনসিংহের ফুলপুর এলএসডিতে ধান সংগ্রহের সময় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলায় পদায়ন করা হয়। তবে রহস্যজনকভাবে সেখান থেকে কয়েক মাসের মধ্যে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় বদলি হয়ে কৌশলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে প্রেষণে (ডেপুটেশনে) যুক্ত হন তিনি। এরপর থেকে আর মূল কর্মস্থলে ফেরেননি তিনি। জেলা কার্যালয়ে দীর্ঘ অবস্থানের সুযোগে সহকর্মীদের বদলি-পদায়ন নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং কোনো কর্মকর্তা প্রতিবাদ জানালে নিজস্ব অনুগত সাংবাদিকদের লেলিয়ে দিয়ে হেনস্তা করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি এবং সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে চরম অসংগতিপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন কামাল। তাঁর দৃশ্যমান ও বেনামি সম্পদের তালিকার মধ্যে রয়েছে— ময়মনসিংহের আবাসন ও সম্পত্তি: শহরের মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজায় ৭সি নম্বরের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, আমলাপাড়া মাদ্রাসার পাশে একটি আস্ত ফ্ল্যাট, দুর্গাবাড়ী রোডে একটি বাণিজ্যিক দোকান এবং কাঁচিঝুলি এলাকায় দুই ভাইয়ের নামে চারতলা নির্মিত (ছয়তলা ফাউন্ডেশন) আবাসন। এ ছাড়া নতুন বাজার ফারহান কমপ্লেক্সে দুটি নতুন ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বাণিজ্যিক জমি ও অন্যান্য: ময়মনসিংহের ঢাকা বাইপাস মোড়ে এসএসসি-৯৩ ব্যাচের বন্ধুদের সঙ্গে কেনা মূল্যবান জমিতে তাঁর তিনটি নিজস্ব শেয়ার রয়েছে। একই সঙ্গে গফরগাঁও জামতলা মোড়ে একটি দোকান এবং ইমামবাড়ী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন বাজারে একাধিক বাণিজ্যিক পজিশন রয়েছে। রাজধানীর সম্পত্তি ও বিলাসবহুল গাড়ি: ঢাকার উত্তরা অভিজাত এলাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং ঢাকা মেট্রো-গ-৪৩-২৬৪৭ নম্বরের একটি উন্নত টয়োটা প্রিমিও গাড়ি ব্যবহার করেন তিনি। তবে বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটি সাবেক যুবলীগ নেতা ও খাদ্য বিভাগের পরিবহন ঠিকাদার আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে আজাদের নামে নিবন্ধিত, যা কামালের ইনডেক্স প্লাজার গ্যারেজে সংরক্ষিত থাকে। স্বজনদের নামে বিনিয়োগ: নিজের স্ত্রী নূরজাহান বেগম, ছোট ভাই শাহ ইশতিয়াক রুবেল এবং বেকার শ্যালক ফাহিমের এনআইডি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার জমি, ব্যবসা ও বেনামি ব্যাংকিং বিনিয়োগ গড়ে তোলারও সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে এসেছে। খাদ্য পরিদর্শকের অনিয়মের মাত্রা কেবল সম্পদ অর্জনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার কাঁচাবাজারে অবস্থিত ‘ময়মনসিংহ খাদ্য পরিদর্শক সমিতির কার্যালয়ে’ প্রতিরাতে কোটি কোটি টাকার অবৈধ জুয়ার আসর বসানোর সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছে অনুসন্ধানী মহল। সেখান থেকে তথাকথিত ‘বিডার’ হিসেবে কামাল দৈনিক গড়ে এক থেকে দেড় লাখ টাকা অবৈধ কমিশন আয় করেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সহকর্মীরা নিশ্চিত করেছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসান ফোনে জানান, তিনি প্রশাসনিক প্রশিক্ষণে ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং জেলায় ফিরে বিষয়গুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজ নেবেন। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) আশরাফুল আলম স্পষ্ট জানান, কামাল তাঁর যোগদানের পূর্ব থেকেই জেলা কার্যালয়ে অবস্থান করছেন এবং তাঁর মেয়াদে কোনো প্রেষণ আদেশ জারি হয়নি। তিনি উত্থাপিত অভিযোগগুলো প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী তাঁর বৈধ ও ঘোষিত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জন করলে তা শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ (জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন)। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী, প্রেষণ বা ডেপুটেশনের সুনির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে মূল কর্মস্থলে যোগদান না করা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করা চরম প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ) লঙ্ঘন করে সরকারি পরিবহনের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ বা অন্যের নামে গাড়ি ব্যবহার করা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীনে অনুসন্ধানযোগ্য বিষয়। সরকারি পদের অপব্যবহার করে অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিপরীতে আয়কর বিবরণী ও ব্যাংক নথি তদারকি করা এখন আইনি বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি জানতে চাইলে খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেন। তবে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের সরেজমিন অনুসন্ধান এবং খাদ্য বিভাগের সহকর্মীদের দেওয়া দাপ্তরিক প্রমাণের ভিত্তিতে জানা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অনিয়মের বিবরণী শতভাগ বস্তুনিষ্ঠ এবং বাস্তব সম্পদের পরিমাণ লিখিত রূপের চেয়েও বহুগুণ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, একজন নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীর এই অভূতপূর্ব প্রশাসনিক বেপরোয়া ভাব রাষ্ট্রের রাজস্ব খাত ও খাদ্য বিভাগের ভাবমূর্তিকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। সাধারণ নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গোয়েন্দা সেল, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কামালের অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু অনুসন্ধান চালিয়ে উপযুক্ত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।