আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, অসম চুক্তি এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষের একাধিক আপত্তির মুখে পাঁচ বছর আগে বাতিল হয় চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে জিইসি মোড়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পটি। পরবর্তীতে পিপিপির তালিকা থেকেও প্রকল্পটিকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে বিধিগতভাবে পিপিপি কাঠামোর আওতায় এটি পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই। সেই বাতিল প্রকল্পটি ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে তৎপরতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইঙ্গিত পাওয়ার পর মাঠে নেমেছেন কর্মকর্তারা। এ জন্য চলতি বছরের আগস্টে জাগৃক থেকে নতুন করে গঠন করা হয়েছে যাচাই-বাছাই কমিটি। অথচ পূর্বের শর্তে চায়না ইউনাইটেড ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন (সিইউসি) ও তাদের অংশীদারদের সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে জাগৃকের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে কমবেশি প্রায় ৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।
নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী থাকাকালে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জিয়া-বাবলু (গণপূর্তে ঠিকাদার ও তদবির বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত) এবং ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীনের ছোট ভাই ড. মোহাম্মদ এ আমীন (চায়না ইউনাইটেড ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর) মিলে এ প্রকল্পে হাত দেন। এভাবে চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে জিইসি মোড়ে জাগৃকের ৮ দশমিক ৫ একর জমিতে বাণিজ্যিক, আবাসিক ও অফিস কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রস্তাবনা সামনে আসে।
এরপর দরপত্র মূল্যায়নের জন্য কোয়ালিফিকেশন অ্যান্ড টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটি (কিউটেক) গঠন করা হয়। তৎকালীন জাগৃকের সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) এস এ এম ফজলুল কবিরকে সভাপতি করে গঠিত কমিটিতে সদস্য ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল লতিফ হেলালী, পিপিপি কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক (অ্যাডমিন অ্যান্ড ফাইন্যান্স) মো. ফারুক আহমেদ, বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী, স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. আশিকুর রহমান জোয়ার্দার এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মুমিতুর রহমান। সদস্যসচিব ছিলেন জাগৃকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম সার্কেল) মো. শামসুল আলম। এই কমিটি ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই চায়না ইউনাইটেড ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন (সিইউসি) ও ইমপালস প্রপার্টিজ লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগকে (জেভি) প্রথম স্থান দিয়ে সুপারিশ করে।
পিপিপি কর্তৃপক্ষের আপত্তি
সিইউসি-ইমপালস জেভির কাগজপত্র ও কনসোর্টিয়াম চুক্তি পর্যালোচনা করে পিপিপি কর্তৃপক্ষ একাধিক অসঙ্গতি খুঁজে পায়। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাইয়ের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে সংস্থাটি ৬টি বড় আপত্তি তুলে ধরে।
নথিপত্রে দেখা যায়, কনসোর্টিয়াম চুক্তি অনুযায়ী চায়না ইউনাইটেড ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন প্রকল্প কোম্পানির ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিক হবে। অথচ একই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়, তারা কোনো ইকুইটি বিনিয়োগ করবে না এবং প্রকল্পের মুনাফায়ও অংশ নেবে না। তাদের অবদান থাকবে শুধু কারিগরি অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তায়।
পিপিপি কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন তোলে, কোনো মূলধন বিনিয়োগ ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিক হতে পারে। পিপিপি গাইডলাইন অনুযায়ী কনসোর্টিয়ামের লিড মেম্বারের ন্যূনতম ২৬ শতাংশ ইকুইটি অংশীদারত্ব থাকা বাধ্যতামূলক।
এছাড়া পূর্ণাঙ্গ তথ্যের অনুপস্থিতি, ন্যূনতম যোগ্যতার শর্তের সঙ্গে অসামঞ্জস্য, উদ্ভাবনী নির্মাণ প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকা এবং আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও তোলে পিপিপি কর্তৃপক্ষ।
২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দেওয়া মতামতে পিপিপি কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে, কনসোর্টিয়াম চুক্তিটি গ্রহণযোগ্য না হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নতুন মূল্যায়ন কিংবা নতুন প্রেফার্ড বিডার নির্বাচনের সুযোগ রয়েছে বলেও জানানো হয়।
দরপত্র মূল্যায়ন নিয়েও বিতর্ক
দরপত্র মূল্যায়নকে ঘিরেও সামনে আসে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ। সিইউসি-ইমপালস জেভির জমা দেওয়া নথিতে পৃষ্ঠা নম্বর ছিল না। বাধ্যতামূলক স্ক্যানকৃত পিডিএফের পরিবর্তে সম্পাদনাযোগ্য ওয়ার্ড ফাইল জমা দেওয়া হয়েছিল। হার্ডকপি ও সফটকপির মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল। এমনকি কনসেপ্ট প্ল্যানের অংশ হিসেবে জমা দেওয়া একটি লে-আউট ডায়াগ্রামে দরপত্র উন্মুক্তকরণ কমিটির কোনো স্বাক্ষরও ছিল না। এসব বিষয়ে পিপিপি কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা চাইলেও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিষয়গুলোকে ‘মাইনর ইনফরমালিটি’ হিসেবে দেখার পক্ষে মত দেয়।
নথিপত্র পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, কমিটির পঞ্চম সভার কার্যবিবরণীতে সিইউসির পক্ষে ব্যাখ্যা উপস্থাপনের বিষয়ে কমিটির সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। এই বিষয়ে (৭ সেপ্টেম্বর, সোমবার) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর সঙ্গে কথা হলে বিস্তারিত শুনে বলেন ‘নো কমেন্টস’।
সরকারের গচ্চা যেতে পারে ৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা
প্রকল্পটির আর্থিক হিসাব নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক। হিসাবের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘শুভংকরের ফাঁকি’ দেওয়া হয়েছে। কাগজে-কলমে পুরো প্রকল্পের ৪৫ দশমিক ১৮ শতাংশ অংশ জাগৃক পাবে বলে দেখানো হয়েছে। এই হিসাব দাঁড় করাতে প্রকল্প অংশে বিদ্যমান তিনটি ভবন, বিড ভ্যারিয়েবল, ইনফ্রাস্ট্রাকচার কস্ট এবং প্রিমিয়াম ও ফির বিপরীতে নির্ধারিত চারটি পৃথক শতকরা হার ১৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ১৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ সরাসরি যোগ করা হয়। ভিন্ন ভিন্ন খাতের শতকরা হার এভাবে যোগ করে পুরো প্রকল্পে জাগৃকের অংশ নির্ধারণ প্রক্রিয়া গাণিতিকভাবে জটিল করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে প্রস্তাবিত জাগৃকের প্রাপ্য অর্থ এবং নির্ধারিত শতকরা হার বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত মূল্যমান বেরিয়ে আসে। সে হিসাবে তিনটি ভবনের অংশে জাগৃকের ১৯ দশমিক ৬৪ শতাংশের বিপরীতে প্রাপ্য ধরা হয়েছিল ১২৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যা থেকে ওই খাতের মোট মূল্য দাঁড়ায় ৬৪৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। বিড ভ্যারিয়েবল খাতে ১৬ দশমিক ৮৭ শতাংশের বিপরীতে ৯৯১ কোটি টাকা ধরলে এর মূল্য দাঁড়ায় ৫ হাজার ৮৭৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ইনফ্রাস্ট্রাকচার কস্ট খাতে ৫ দশমিক ২৭ শতাংশের বিপরীতে ৯২ কোটি ৫২ লাখ টাকা হিসেবে মোট মূল্য দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৫৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে, প্রিমিয়াম ও ফি খাতে ৩ দশমিক ৪০ শতাংশের বিপরীতে ৫৪ কোটি টাকা ধরে এর মূল্য দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৮৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। চারটি খাতের পূর্ণাঙ্গ মূল্য একত্র করলে প্রকল্পটির মোট সম্ভাব্য মূল্য দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮৬৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা
এভাবেই সামনে আসে লোকসানের বড় অঙ্ক। প্রকল্পের মোট মূল্য যদি ৯ হাজার ৮৬৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা হয়, তাহলে ৪৫ দশমিক ১৮ শতাংশ হিসেবে জাগৃকের প্রাপ্য হওয়ার কথা প্রায় ৪ হাজার ৪৫৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। কিন্তু জাগৃকের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ২৬৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। এতে প্রায় ৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট মূল্যের বিপরীতে জাগৃকের প্রকৃত প্রাপ্তি দাঁড়ায় মাত্র ১২ দশমিক ৮২ শতাংশ।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামের জিইসি মোড় এলাকার ৮ দশমিক ৫০ একর বা ৫১৪ কাঠা মূল্যবান সরকারি জমির বর্তমান বাজারমূল্য ও বিদ্যমান স্থাপনার মূল্য প্রায় ২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। অথচ যাবতীয় ফি ও ব্যয় বাদ দিয়ে জাগৃকের প্রাপ্য ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। ফলে শুধু জমির মূল্য বিবেচনায় সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা।
চেয়ারম্যানের ওপর চাপ, তবুও আটকে গেল ফাইল
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী থাকাকালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবেও তিনি বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালান। তবে অসম চুক্তির কারণে প্রকল্পটি অনুমোদন দিলে ভবিষ্যতে জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে এমন আশঙ্কায় জাগৃক কর্মকর্তারা এতে সম্মত হননি।
সূত্রমতে, পদে পদে অনিয়মে ভরপুর প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য তৎকালীন জাগৃক চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হায়দারের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন সেই সময়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। তবে এতেও রাজি হননি দেলওয়ার হায়দার। যার ফলে মুখ্য সচিব ক্ষিপ্ত হয়ে পরবর্তীতে সচিব পদে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করেন সরকারের মেধাবী আমলা হিসেবে পরিচিত দেলওয়ার হায়দারকে।
যেভাবে বাতিল হলো প্রকল্পটি
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাগৃক চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হায়দারের সভাপতিত্বে সংস্থাটির ২১৭তম বোর্ড সভায় দরপত্র কার্যক্রম বাতিল করা হয়। বোর্ডের সিদ্ধান্তে বলা হয়, কনসোর্টিয়াম গঠনে ইকুইটি শেয়ারের বাধ্যবাধকতা মানা হয়নি, লিড মেম্বার হিসেবে সিইউসিকে বিবেচনা করা যায় না। বিডের বৈধতার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, কনসোর্টিয়াম চুক্তি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
৫ বছর পর যেভাবে আলোচনা শুরু
২০২৫ সালে ড. মোহাম্মদ এ আমীন নতুন করে প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার নানামুখী উদ্যোগ নেন। চীনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য পূর্ত মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন করা হয়। এরপর গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর সাবেক গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সেখানে ড. মোহাম্মদ এ আমীনও উপস্থিত ছিলেন।
একটি কমিটি গঠন করার অর্থ এই নয় যে প্রকল্পটি চালু করা হবে। নতুন করে কমিটি গঠন করা হয়েছে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য। তারা সুপারিশ দেবে। পরে সিদ্ধান্ত আসবে এখানে প্রকল্প করা হবে কি না
মোসা. ফেরদৌসী বেগম
চেয়ারম্যান, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ২ আগস্ট জাগৃক থেকে নতুন একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। সেখানে আহ্বায়ক হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হারিজুর রহমান, চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী, পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মেহেদী হাসান, নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম, উপপরিচালক মারিয়া হক, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ হিল বাকী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীনকে সদস্য এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইনকে সদস্য সচিব করা হয়।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
এ বিষয়ে জানতে জাগৃকের সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) আবুল কাশেম মোহাম্মদ শাহজালাল মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে এড়িয়ে যান।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘একটি কমিটি গঠন করার অর্থ এই নয় যে প্রকল্পটি চালু করা হবে। নতুন করে কমিটি গঠন করা হয়েছে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য। তারা সুপারিশ দেবে। পরে সিদ্ধান্ত আসবে এখানে প্রকল্প করা হবে কি না।’
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি।’ পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এদিকে, চায়না ইউনাইটেড ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. মোহাম্মদ এ আমীনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৫ আন্তর্জাতিক হকি বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ ফুটবল প্রেমীদের মতো হকি প্রেমীদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের কঠিন পর্ব অতিক্রম করে দুই দলই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ফাইনালে উঠেছে। আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য এই ফাইনাল ম্যাচে উভয় দল নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত। আর্জেন্টিনা দল এই টুর্নামেন্টে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। অধিনায়ক লুকাস মার্টিনেজ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছি। দলের সবাই একসঙ্গে কাজ করে ফাইনালে পৌঁছেছি। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট — বিশ্বকাপ জিততে হবে। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ বজায় রেখেছি এবং আগামী ম্যাচেও তা বজায় রাখব।” আর্জেন্টিনা দলের ফিজিক্যাল ট্রেনার জানান, দল খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য বিশেষ অনুশীলন চালাচ্ছে যাতে ফাইনালে তারা চাপ সামলাতে পারে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের কোচ মাইকেল ডি ইয়ং ফাইনালের আগের প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দল গত কয়েক মাস ধরে কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েছে। খেলোয়াড়রা মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা চাই এই বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস গড়ে একটি শক্তিশালী ছাপ রেখে যেতে।” কোচ আরো বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র ফাইনালে উঠা নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়। আমরা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিজেদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।” বিশ্বের হকি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ফাইনাল ম্যাচটি গত দশকের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা হতে চলেছে। উভয় দলের কৌশল, বল নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুতগতির খেলায় যে মেধা প্রদর্শিত হয়েছে, তা ফুটবলের মতো অন্য কোনো খেলার ক্ষেত্রে বিরল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফাইনালে দলের মানসিক স্থিতিশীলতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা বিজয় নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে। মাঠে উভয় দলের খেলোয়াড়রা দ্রুতগতির পাস, শক্তিশালী ডিফেন্স এবং আক্রমণাত্মক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মাঠ মাতানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকারের গতিবেগ এবং নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডারদের কৌশলগত দক্ষতা ম্যাচে প্রধান আকর্ষণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও গোলরক্ষকদের প্রতিটি সেভ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়াও ম্যাচের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিশ্বজুড়ে লাখো হকি ভক্ত এই ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার দেখার জন্য অপেক্ষায় আছেন। অনলাইনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ম্যাচের লাইভ স্ট্রিমিং অনুষ্ঠিত হবে এবং অনেক দেশের টেলিভিশনও সরাসরি সম্প্রচার করবে। হকি প্রেমীরা এই ম্যাচ থেকে দারুণ উত্তেজনা, দক্ষতা এবং খেলা উপভোগ করার আশা করছে। মাঠের বাইরেও ভক্তদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ফ্যান জোন আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে খেলোয়াড় ও দর্শকরা একত্রে সময় কাটিয়ে খেলার আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। এছাড়াও টুর্নামেন্ট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে এবং খেলা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে দুই দলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে আগামী দিনে বিশ্ব হকির নতুন ধারার রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। এই ম্যাচের ফলাফল আগামী দশক ধরে হকির কৌশলগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের হকি টুর্নামেন্ট হওয়ায় এর প্রতি ভক্তদের আগ্রহ ও উন্মাদনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সবাই আশা করছেন, আগামীকালের ফাইনাল হবে একটি স্মরণীয় খেলা, যেখানে স্পোর্টসম্যানশিপ, দক্ষতা ও উত্তেজনা থাকবে সর্বোচ্চ মাত্রায়।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
পিরোজপুরে এক ব্যক্তির দাফনের জন্য তার মেয়ে ও বোনেরা কবর খুঁড়ছেন। মৃত ব্যক্তি মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বাদী ছিলেন।মি. সাঈদীর অনুসারীরা ওই ব্যক্তির দাফনে বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মৃত ব্যক্তির দাফন রাতের বেলা তার মেয়ে ও বোনদের খোঁড়া কবরে করা হয়েছে।মানিক পশারী শনিবার সকালে গোপালগঞ্জে মারা যান। তিনি ৮৭ বছর বয়সী ছিলেন। তার মরদেহ দাফনের জন্য পিরোজপুরে আনা হয়।দাফনের সময় প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ২০১০ সালে গ্রেপ্তার হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস। সাক্ষাতে স্পিকার বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস উত্তোলনে সুইডিশ কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় সংসদে স্পিকারের কার্যালয়ে এই বৈঠক ও সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের সংসদীয় সম্পর্ক জোরদার, সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ গঠন, বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ক্রীড়া ও সংস্কৃতিসহ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংস্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে সুইডেন। সুইডেনের পার্লামেন্ট ব্যবস্থার প্রশংসা করে তিনি বলেন, সুইডেনের এক-কক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংসদীয় কাঠামোর অনেক ক্ষেত্রে চমৎকার সাদৃশ্য রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও সুইডেনের মধ্যে ‘সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ’ গঠন করা সম্ভব হলে তা উভয় দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ও বিস্তারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গণতন্ত্রের প্রতি দেশের মানুষের অঙ্গীকার তুলে ধরে স্পিকার বলেন, বাংলাদেশের জনগণ সবসময়ই গণতন্ত্রপ্রেমী। এদেশের মানুষ গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেনি। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের মাধ্যমে এদেশের মানুষের মৌলিক ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমাদের ছাত্রসমাজ এবং আপামর জনসাধারণ সেই স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। ভবিষ্যৎ সংসদীয় গণতন্ত্র প্রসঙ্গে স্পিকার বলেবন, জনগণ যাতে নিজেদের পছন্দসই দল ও প্রার্থীর পক্ষে স্বাধীনভাবে ভোটদান করতে পারে, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে। ভোটাররা তাদের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেন। সুইডেনের শাসনব্যবস্থা ও পার্লামেন্টের চিত্র তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস জানান, সুইডেনের পার্লামেন্টে মোট ৩৪৯টি আসন রয়েছে এবং সদস্যরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ৪ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তিনি বলেন, সুইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার যাবতীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা পার্লামেন্ট এবং নির্বাচিত সরকারের হাতেই ন্যস্ত থাকে। বৈঠকে তারা উভয়েই দুই দেশের সংসদের মধ্যে সম্পর্ক নিবিড় করতে সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ ও ককাস গঠনের ওপর জোর দেন। একইসঙ্গে ক্রীড়া, সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশে সুইডিশ বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করা হয়। তেল-গ্যাস উত্তোলনে সুইডিশ বিনিয়োগের আহ্বান বৈঠকে স্পিকার চলমান সংবিধান সংস্কার কমিটির বিভিন্ন কার্যক্রম ও অগ্রগতি সম্পর্কে রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করেন। এছাড়া, বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মজুদকৃত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ-তেল ও গ্যাস উত্তোলনে সুইডেনের অভিজ্ঞ ও শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসার ও বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান স্পিকার। সৌজন্য সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন, সুইডিশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভুঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তারা।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আমদানিকৃত খাদ্যশস্যের মান পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যশস্য সংরক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি সহায়তা চেয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম। রোববার সচিবালয়ে খাদ্যমন্ত্রীর অফিস কক্ষে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় খাদ্যমন্ত্রী তাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে স্বাগত জানান। সাক্ষাৎকালে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। সাক্ষাৎকালে খাদ্যমন্ত্রী বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি সহায়তা কামনা করেন। বিশেষ করে আমদানিকৃত চাল ও গমের গুণগত মান পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে খাদ্য পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের অনুরোধ জানান তিনি। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়াগত বাস্তবতার কারণে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চাল ও গম সংরক্ষণে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে খাদ্যশস্য সংরক্ষণ প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত খাদ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান এবং তার কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে কারিগরি সহায়তার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে বলে তিনি জানান। সাক্ষাৎকালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে গম আমদানির বিষয়েও আলোচনা হয়। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গম আমদানি সম্পন্ন হওয়া এবং এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা না থাকায় উভয় পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত গমবাহী জাহাজ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যাটাশে এরিন কোভার্ট, খাদ্য সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মু. জসীম উদ্দিন খানসহ খাদ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আমদানিকৃত খাদ্যশস্যের গুণগত মান পরীক্ষা এবং খাদ্যশস্যের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।